হোম / আওয়ামী দুঃশাসনে শহীদ / শহীদ মোঃ ইউনুস মোল্লা
শহীদ মোঃ ইউনুস মোল্লা

শহীদ মোঃ ইউনুস মোল্লা

আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

বরিশালের পশ্চিম রূপাতলীতে ১৯৭২ সালে জন্ম নেওয়া মোঃ ইউনুস মোল্লা ছিলেন এক পরিশ্রমী দিনমজুর ও নিষ্ঠাবান ধর্মপ্রাণ মানুষ। জীবনের প্রতিটি পদে তিনি ন্যায়, দায়িত্ব ও ঈমানী দৃঢ়তার পরিচয় দিয়ে গেছেন। ইসলামী আন্দোলনের কর্মী হিসেবে মানুষের অধিকার ও ন্যায়ের দাবিতে তিনি নিজের সময়, শ্রম ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। ২০১৩ সালের অবরোধে অংশ নিতে ঢাকায় গিয়ে পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে তিনি শাহাদাতবরণ করেন।

🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ

শহীদ মো: ইউনুস মোল্লা
বরিশাল
"শহীদ মোঃ ইউনুস মোল্লা তার স্ত্রী ফরিদা বেগমের সাথে সেদিন শেষ কথা বলেন এভাবে; তুমি আমাদের ভাইদের জন্য দোয়া কর, সবার জন্য দোয়া করবে, আমার সাথে তোমার আর হয়তো কথা হবে না। সন্তানদের নিয়ে ভাল থেকো। আমাকে ক্ষমা করে দিও।"
১. শহীদের পরিচিতি
শহীদ মো: ইউনুস মোল্লা, বরিশাল সদরের ২৫ নং ওয়ার্ড এর পশ্চিম রূপাতলী গ্রামে ১৯৭২ সালে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মরহুম শাহজাহান মোল্লা ও মাতা আম্বিয়া খাতুন-এর তিন সন্তানের ভেতর তিনি অন্যতম। অভাবের সংসার হলেও ব্যক্তিজীবনে ইউনুস মোল্লা ছিলেন একজন নিবেদিত ইসলামী আন্দোলনের কর্মী ও ধর্মপ্রাণ মানুষ। তাইতো হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবি আদায়ে ঈমানী শক্তি নিয়ে শহীদি চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে বরিশাল থেকে ঢাকায় গিয়ে অংশ নিয়েছিলেন অবরোধ কর্মসূচিতে। শাহাদাতকালে তিনি স্ত্রী ফরিদা বেগম ও মো: ইউসুফ-৫ম শ্রেণী, মোঃ ইব্রাহীম-৫ম শ্রেণী, মোঃ মুসা-২য় শ্রেণী নামক তিনটি ছেলে রেখে যান।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
বিগত ৫ মে-২০১৩ইং বিকালে তিনি পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হন। পুলিশের গুলি তার দুই স্থানে বিদ্ধ হয়। একটি গুলি তার বুকের ডানপাশে বিদ্ধ হয় এবং অপরটি গলার মাঝখানে কন্ঠনালির ভেতরে বিদ্ধ হয়। গুরুতর আহত শহীদ ইউনুস মোল্লাকে হেফাজতের কর্মীরা রাজধানীর আল-বারাকা হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণের ফলে রাত্র ১০ টার কিছু পরে তিনি আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে সকলকে ছেড়ে শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করেন। মহান রাব্বুল আলামীনের মেহমান হয়ে সকলকে রেখে চলে যান। উল্লেখ্য তার শাহাদাতের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি কথা বলেছেন, অপর আহতদের খবর নিয়েছেন এবং শহীদ হওয়ার জন্য তিনি ব্যাকুলতা প্রকাশ করেছেন।
৩. শাহাদাতের পূর্বের বিভিন্ন ঘটনা
শহীদ ইউনুস মোল্লা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর শ্রমিক সংগঠন বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণের একজন নিবেদিতকর্মী ছিলেন। তিনি হেফাজতের অবরোধ কর্মসূচিতে অংশ নেয়ার জন্য একদিন আগে বিগত ৩ মে বরিশাল থেকে লঞ্চ যোগে ঢাকায় যান। সংগঠনের কাজে তিনি একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী ছিলেন।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ঢাকায় অবস্থান কালে ইসলামী আন্দোলনের দাওয়াত পান। রাজধানীর ঢাকার পোস্তগোলা এলাকায় তিনি ছেলে সন্তান নিয়ে বসবাস করতেন। কর্ম হিসাবে তিনি নিজের অটোরিক্সা চালিয়ে জীবন ধারণ করতেন। তিনি দ্বীনের পথের অকুতোভয় সৈনিক ছিলেন। দ্বীনের দাওয়াত পাওয়ার পর থেকে তিনি সবসময় সক্রিয় থেকে কাজ করেছেন। শহীদের মর্যাদা তার বুঝে তৈরি হওয়ার পরে তিনি তার সংগঠনের ভাইদের সাথে শহীদ হওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথা নানা সময় প্রকাশ করেছেন।
সর্বশেষ ২০১২ সালের মাঝামাঝি পারিবারিক কারণে ঢাকা থেকে নিজ গ্রাম বরিশালে ছেলে সন্তান নিয়ে পরোপুরি চলে আসেন। বরিশালে এসে তিনি নিজ উদ্যোগে সংগঠনের দায়িত্বশীলদের খুঁজে বের করে নিজের পরিচয় দিয়ে সংগঠনের কাজে যোগদান করেন। তিনি নিয়মিত দাওয়াতী কাজ করতেন এবং সংগঠন অর্পিত দায়িত্ব বিশেষ করে বর্তমান রাজনৈতিক কঠিন পরিস্থিতিতে প্রায় প্রতিটি মিছিলে অংশ নিতেন। সংগঠনের দায়িত্বশীল এবং কর্মীদের সাথে বিভিন্ন সময় আলাপকালে এ অকুতোভয় সৈনিক আল্লাহর পথে শহীদ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করতেন এবং মহান আল্লাহর ফয়সালা সকল অবস্থায় মেনে নেয়ার ক্ষেত্রে তার মানসিক প্রস্তুতি ছিল অনেকের চেয়ে দৃষ্টান্তস্বরূপ।
৪. সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
বিগত ৫ মে রোববার রাতে রাজধানী ঢাকায় হেফাজতে ইসলামের অবরোধ চলাকালে মতিঝিল ও পল্টন এলাকায় পুলিশের গুলিতে নিহত হন ইউনুস মোল্লা।
বরিশাল নগরীর রূপাতলী ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা দিনমজুর ইউনুস মোল্লা হেফাজতে ইসলামের ঢাকা অবরোধ কর্মসূচিতে যোগ দেয়ার জন্য ৩ মে বরিশাল থেকে লঞ্চ যোগে ঢাকায় যান। রোববার আসরের কিছু পরে তিনি পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লে পরে ঢাকার রাজারবাগে আল বারাকা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে জরুরি চিকিৎসা দেওয়া হয়। সেখানে রাত্র ১০টার পরে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে তার মৃত্যু হয়। ৬ মে সোমবার সকাল ১১টায় তার লাশের কফিন বরিশালে পৌঁছলে ঐ দিন বেলা দুইটায় নামাজে জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
৫. শহীদের আপনজনদের কথা
অভাবের সংসার হলেও ব্যক্তিজীবনে ইউনুস মোল্লা ছিলেন একজন নিবেদিত ইসলামী আন্দোলনের কর্মী ও ধর্মপ্রাণ মানুষ। হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবি আদায়ে ঈমানী শক্তি নিয়ে শহীদি চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে বরিশাল থেকে ঢাকায় গিয়ে অংশ নিয়েছিলেন অবরোধ কর্মসূচিতে। দিনভর মতিঝিল শাপলা চত্বরে অবস্থান করে ইসলামের পক্ষে শ্লোগান দেন তিনি। সেদিন তাকে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের ফুটেজে দেখা গেছে। ঐ দিন রাত্র এশার পরে বড় ছেলে ইউসুফকে মোবাইল ফোনে শেষ কথাগুলো এভাবেই বলেন, "আমি এখন শাপলা চতুরের সমাবেশে আছি, এইমাত্র এশার নামাজ পড়েছি, আমার জন্য দোয়া করো' আমি যদি বাড়ি ফিরে না আসি তবে তোমরা দুই ভাই, তোমার মা এবং ছোট ভাইকে দেখে রাখবে, তোমার মায়ের যেন কোন কষ্ট না হয়, ছোট ভাইটিকে মাদ্রাসায় পড়ানোর ব্যবস্থা করবে, তোমাদের পড়ালেখার দরকার নেই, রোজগার করে সংসার দেখাশুনা করো, আমার সাথে তোমাদের আর দেখা নাও হতে পারে।" তিনি তার স্ত্রী ফরিদা বেগমের সাথে একই সময় শেষ কথা বলেন এভাবে, "তুমি আমাদের ভাইদের জন্য দোয়া কর, সবার জন্য দোয়া করবে। আমার সাথে তোমার আর কথা হবে না। সন্তানদের নিয়ে ভাল থেকো। আমাকে ক্ষমা করে দিও।"
৬. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম: শহীদ মোঃ ইউনুস মোল্লা ।
জন্ম তারিখ ও বয়স: ১০.১২.১৯৭২ইং, বয়স ৪২ বছর ভোটার আইডি নং-২৬৯৭৬৮৮৪৯৮১০৭।
আহত হওয়ার তারিখ: ০৫.০৫.১৩ ইং।
শাহাদাতের তারিখ: ০৫.০৫.১৩, সন্ধ্যা ১০.১৫টায়।
স্থান: আল বারাকা হাসপাতালে চিকিৎসা অবস্থায় শাহাদাত বরণ করেন।
দাফন করা হয়: পারিবারিক গোরস্থানে।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম- পশ্চিম রূপাতলী, ডাকঘর- পশ্চিম রূপাতলী, থানা-কোতয়ালি, জেলা-বরিশাল।
পিতা: মৃত মোঃ শাহজাহান মোল্লা, ১৯৭৩ মৃত্যু।
মাতা: আম্বিয়া খাতুন বয়স প্রায় ৫০ বছর। গৃহিণী।
স্ত্রী ও সন্তানদের বিবরণ: স্ত্রী: ফরিদা বেগম।
ছেলে: মোঃ ইউসুফ- অটোচালক। মোঃ ইব্রাহীম- বেকার। মোঃ মুসা- দাখিল নবম শ্রেণি, সাগরদি আলিয়া মাদরাসা, বরিশাল।
ভাই- বোনের বিবরণ: মোঃ শাহ আলম (সৎ ভাই)- কৃষি। মোসা: শাহিনুর (সৎ বোন) গৃহিণী

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍