শহীদ মো: নাসির উদ্দীন
আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
শহীদ মোঃ নাসির উদ্দীন (০৩৩), পেশা। দিনমজুরি।
সাংগঠনিক মান: কর্মী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
জন্ম তারিখ ও বয়স: ১৯৯৫ সাল, ১৮ বছর। আহত হওয়ার তারিখ। ০৩ মার্চ ২০১৩, বেলা ১১ টা। পেটে গুলি লেগেছিল।
শাহাদাতের তারিখ: ৩ মার্চ ২০১৩ বেলা ১১টা, জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি উপজেলার। দাফন করা হয়: নিজ বাড়ির কবরস্থান।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: বাঁশখোর, ডাকঘর: সালাইপুর, ইউনিয়ন: কুসুম্বা, থানা: পাঁচবিবি, জেলা: জয়পুরহাট।
পিতা: মো: মোজাহারুল ইসলাম, ৪৫ বছর, দিনমুজুর।
মাতা। মোছা: নুর বানু, ৩৫ বছর, গৃহিণী।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা: খড়ের চালবিশিষ্ট মাটির বাড়ি। খুব খারাপ অবস্থা। চাষাবাদের জমি নেই। দিনমজুরি করে সংসারের খরচ নির্বাহ করতেন।
ভাই-বোনের বিবরণ: মো: আশিক-বয়স-১৫, দিনমুজুর, উম্মে কুলসুম- বয়স-১৩, ৫ম শ্রেণী।
সাংগঠনিক মান: কর্মী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
জন্ম তারিখ ও বয়স: ১৯৯৫ সাল, ১৮ বছর। আহত হওয়ার তারিখ। ০৩ মার্চ ২০১৩, বেলা ১১ টা। পেটে গুলি লেগেছিল।
শাহাদাতের তারিখ: ৩ মার্চ ২০১৩ বেলা ১১টা, জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি উপজেলার। দাফন করা হয়: নিজ বাড়ির কবরস্থান।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: বাঁশখোর, ডাকঘর: সালাইপুর, ইউনিয়ন: কুসুম্বা, থানা: পাঁচবিবি, জেলা: জয়পুরহাট।
পিতা: মো: মোজাহারুল ইসলাম, ৪৫ বছর, দিনমুজুর।
মাতা। মোছা: নুর বানু, ৩৫ বছর, গৃহিণী।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা: খড়ের চালবিশিষ্ট মাটির বাড়ি। খুব খারাপ অবস্থা। চাষাবাদের জমি নেই। দিনমজুরি করে সংসারের খরচ নির্বাহ করতেন।
ভাই-বোনের বিবরণ: মো: আশিক-বয়স-১৫, দিনমুজুর, উম্মে কুলসুম- বয়স-১৩, ৫ম শ্রেণী।
🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ
"মা, মিছিলে গেলাম। মা, যতক্ষণ মিছিল থেকে না ফিরবো আপনি কুরআন তেলাওয়াত করতে থাকবেন। ও "একটি কুকুর পালতো। মিছিলে যাওয়ার আগে শেষ রুটিটি কুকুরের সাথে ভাগাভাগি করে খায়। আর বলে, 'নে যা, এটিই হয়তো তোকে দেওয়া আমার শেষ রুটি'। কুকুরটিও ওর সাথে সাথে মিছিলে যায় এবং ৩র শাহাদাতের পর চিৎকার করতে করতে বাড়ি আসে। মুখে শহীদ নাসিরের একপাটি স্যান্ডেল। ঘেউ ঘেউ করে সেটি এখনও কাঁদে তার মনিবের জন্য। গ্রামবাসী তাকে খেতে দেয় ও বিশেষ সমাদর করে।"
১. শহীদের পরিচিতি
শহীদ মো। নাসির উদ্দীন জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি উপজেলার বাঁশখুর গ্রামে ১৯৯৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাবা মোজাহারুল ইসলাম ও মা নুর বানুর ৩ ছেলে-মেয়ের মধ্যে সবার বড় ছিলেন। বাবা পেশায় একজন দিনমজুর। তাই শহীদ নাসির উদ্দিন ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনা চালিয়ে যেতে পারেন। অভাবের তাড়নায় এর বেশি পড়াশুনা করা সম্ভব হয়নি। তাই তিনি বাবার মত দিনমজুরের কাজটাই বেছে নেন। ধানকাটার মতো কাজে প্রতিদিন ১৫০/২০০ হারে মাসে ৪৫০০/৫০০০ টাকা আয় হতো। তার সহোদর ভাই তারই মতো দিনমজুরের কাজ করে সংসারের ভরণ পোষণে সাহায্য করে। আর একমাত্র ছোট বোনটি ৫ম শ্রেণীতে পড়াশুনা করে। দরিদ্রতা থাকলেও তাদের ৫ জনের পরিবারের মাটির ঘরে চাঁদের নির্মল জোস্নার মতই সুখ ছিল।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
দিনটি ছিল ৩ মার্চ ২০১৩। শহীদ নাসির সবার কাছে বলেছে, আগের রাতে সে আল্লামা সাঈদীকে চাঁদে দেখেছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ডাকা হরতালের সমর্থনে মিছিলে যোগদান করার জন্য তিনি সকাল ৭টার দিকে মিছিলের উদ্দেশে বাসা থেকে বের হন। বেলা ১১টার দিকে খানা থেকে ২০০ গজ দূরে পাঁচমাথা মোড়ে পুলিশের গুলিবৃষ্টির শিকার হয় মিছিলটি। সেখানেই পেটের ডান পার্শ্বে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। ২০ মিনিটি পরে রিক্সায় করে জয়পুরহাট সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। তখন কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পোস্টমর্টেম শেষ করে রাত ০৮:৩০ টার দিকে লাশ বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। পরের দিন সকাল ১০ টায় সালাইপুরে কফিন নেয়া হয়। সেখানে তিনিসহ চারজনের জানাযার নামাজ একসাথে অনুষ্ঠিত হয়।
শহীদের নামাজে জানাযা সালাইপুর বাজার হাইস্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। জামায়াতে ইসলামী জেনা আমির ডা। মো: ফজলুর রহমান সাঈদ এর ইমামতিতে উক্ত জানাযায় প্রায় ৫০ হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। ৩. সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
৩ মার্চ ২০১৩। দেশবরেণ্য আলেমে দ্বীন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অবৈধ মৃত্যুদণ্ডের রায়ের প্রতিবাদে সারাদেশে আন্দোলনের অংশ হিসেবে জয়পুরহাটেও হরতালের সমর্থনে মিছিল বের হয়। জাতীয় পত্রিকাসমূহে এ সংক্রান্ত বিস্তারিত নিউজ আসে।
৪ মার্চ, ২০১৩ দৈনিক মানবজমিন লিখে
জয়পুরহাটে নিহত ৬: জয়পুরহাট/পাঁচবিবি প্রতিনিধি জানান, পুলিশ, বিজিবি, র্যাব ও আর্মড ব্যাটালিয়নের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষে জয়পুরহাট ও পাঁচবিবিতে ৬ হরতাল সমর্থক নিহত হয়েছেন। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন আরও ৩৬ জন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে জয়পুরহাট শহরে ও পাঁচবিবি সদরে ১৪৪ ধারা জারি করেছে প্রশাসন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল ১১টার দিকে হরতালের সমর্থনে কয়েক হাজার জামায়াত-শিবির নেতাকর্মী ও নারী-পুরুষ জয়পুরহাট শহরের পল্লী বিদ্যুৎ, হিচমি এলাকায় মিছিল বের করলে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও আর্মস ব্যাটালিয়নের সদস্যরা বাধা দেয়। এতে উভয়ের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। এ সময় পুলিশ গুলি চালালে কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হন। তাদের জয়পুরহাট জেলা আধুনিক হাসপাতালে ভর্তি করা হলে পাঁচবিবি উপজেলার রহমতপুর গ্রামের মজনু (৩০) মারা যান। অন্যদিকে পাঁচবিবিতে পুলিশের হরতাল সমর্থকদের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষে ঘটনাস্থলে মারা যান বড় মানিক গ্রামের হাসিব (৫০) ও শালাইপুর গ্রামের আবদুল হাকিম (৩২)। এ সময় অন্তত ২০ জনের মতো গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। আহতদের জয়পুরহাট জেলা আধুনিক হাসপাতালে ও পাঁচবিবি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। জয়পুরহাট হাসপাতালে নাসির (১৬) নামে এক শিবিরকর্মী মারা যান। পাঁচবিবির মহিপুর হাসপাতালে মারা যান কাশরা গ্রামের মজিদুল ইসলাম (২০) ও আয়মারসুলপুরের আবদুল হাকিম (৩২)।
সাপ্তাহিক সোনার বাংলা, ৮ মার্চ, ২০১৩। শহীদদের জানাজা নিয়ে একটি রিপোর্ট করে। "জয়পুরহাটে ৬
শহীদের জানাজা সম্পন্ন" এই শিরোনামে
জয়পুরহাট থেকে সংবাদদাতা জামায়াতের ডাকা হরতালের প্রথম দিনে জেলার সদর ও পাঁচবিবি শহরে জামায়াত-শিবির কর্মী-সমর্থক ও সাঈদী ভক্ত এলাকাবাসীর সাথে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনায় পাঁচবিবিতে নিহত ৬ জনের মধ্যে কুসুম্বা ইউপি'র ৪ জনের জানাজা স্থানীয় শালাইপুর হাইস্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। শহীদদের নামাজে জানাজায় জামায়াত-শিবির নেতাকর্মী ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষসহ সর্বস্তরের হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মুসল্লির ঢল নামে। জানাজা শেষে নিহতদের স্ব-স্ব পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। সাঈদী মুক্তি আন্দোলনে যোগদানকৃত হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রায় ৩ শতাধিক জনতা জানাজায় সংহতি প্রকাশ করতে জানাজা মাঠে উপস্থিত হন। অপরদিকে জেলার পাঁচবিবি উপজেলার আরজজিপুরে নিহত আয়মা রসুলপুর ইউপি জামায়াতের সেক্রেটারি ফরমান আলীর নামাজে জানাজা স্থানীয় এবতেদায়ী মাদরাসা মাঠে অনুষ্ঠিত হয়।
দৈনিক আমার দেশ, "আওয়ামী লীগের হামলা ও পুলিশি হয়রানিতে পুরুষশূন্য অনেক গ্রাম' শিরোনামে কাজী জেবেল ও নজরুল ইসলাম এর একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশ করে যা বাংলাদেশের অনেক এলাকার সাথে মিলে যায়:
"পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে জয়পুরহাটের পাঁচবিবি, কালাই ও আক্কেলপুর উপজেলার প্রায় অর্ধশত গ্রাম। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ক্যাডারদের হামলা, মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় ও পুলিশি গ্রেফতার আতঙ্কে বাড়িতে থাকতে সাহস পাচ্ছেন না তারা। বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন পুরুষ সদস্যরা। এসব গ্রামে শুধু নারী ও শিশুরা আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করছে। অনেক বাড়িঘরে তালা ঝুলছে।জেলার বাকি দুই উপজেলা ক্ষেতলাল ও সদরের বাসিন্দাদের মধ্যেও আতঙ্ক বিরাজ করছে। এতে স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে। বেশিরভাগ বাজারের অনেক দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের প্রতিবাদে বিভিন্ন স্থানে সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের গুলি ও সংঘর্ষের ঘটনার পর থেকে জয়পুরহাট শহর ও উপজেলাগুলোতে এ অবস্থা বিরাজ করছে। এ ঘটনায় পাঁচবিবিতে ৪২টি মামলা, সদর থানায় ৭টি, কালাইয়ে ৪টি ও ক্ষেতলালে ১টি মামলা হয়েছে। এতে অর্ধলক্ষাধিক মানুষকে আসামি করা হয়েছে। দুই শতাধিক মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর স্থানীয় বাসিন্দাদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে গ্রামে গ্রামে মাইকিং করছে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন। 'নিরীহ' বাসিন্দাদের 'নির্ভয়ে' বাড়িঘরে ফিরতে মাইকে ঘোষণা দেয়া হচ্ছে। তবে পুলিশের এ ঘোষণায় আস্থা রাখতে পারছেন না গ্রামবাসী। বিএনপি নেতা পাঁচবিবির কুশম্বা ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল গফুর মণ্ডল, জামায়াত নেতা সদরের বন্ধু ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম কিবরিয়া ও আমদই ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম রব্বানী চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হবে বলে জনসভায় ঘোষণা দেন আওয়ামী লীগের নেতারা। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আরও বেশি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক থাকার বিষয়টি স্বীকার করে জয়পুরহাটের জেলা পুলিশ সুপার হামিদুল আলম আমার দেশকে বলেছেন, নিরীহ বাসিন্দাদের বাড়িঘরে ফিরে আসার জন্য প্রতিটি থানায় মাইকিং করা হচ্ছে। তাদের কোনো ধরনের হয়রানি করা হবে না। তিনি বলেন, মামলা থেকে নাম বাদ দেয়ার কথা বলে অনেকের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ পেয়েছি। কেউ যাতে টাকা লেনদেন না করে সেজন্য অনুরোধ জানিয়েছি। যারা অপরাধের সঙ্গে জড়িত তাদের ছাড় দেয়া হবে না।
আওয়ামী হামলা ও পুলিশি হয়রানি এড়াতে সদর উপজেলার অন্তত ২০টি গ্রাম, পাঁচবিবিতে অন্তত ৫০টি, কালাইয়ে ২৫টি, ক্ষেতলালে ১০টি গ্রামে পুরুষ বসবাস করছেন না। গত ৩ মার্চ সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় পাঁচবিবিতে। এতে ৫ জনের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় ৪২ মামলা দায়েরের পর থেকে উপজেলার বেশিরভাগ গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। উপজেলার প্রাণকেন্দ্র পাঁচমাথার অনেক মার্কেটের দোকান গতকালও খোলেনি। আশপাশের ব্যবসায়ীরা জানান, গ্রেফতার এড়াতে এসব দোকানি আত্মত্মগোপনে রয়েছেন। এ উপজেলার কুশম্বা, ভাড়াহুত, কাশড়া গোবিন্দপুর, ছোটো মানিক, ধুবইল, শালাইপুর, গোরনা, আরজী অনন্তপুর, রতনপুর, ধরঞ্জি, বাকিলা, ছাতিনালীসহ অন্যান্য গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। এসব গ্রামে অপরিচিত কেউ গেলে মহিলা ও শিশুরা ভয়ে সরে যাচ্ছে। তারা কোনো কথা বলতে রাজি নয়। পাঁচবিবি থানার ওসি (তদন্ত) মুর হোসেন আমার দেশ-কে বলেন, গ্রামবাসীকে বাড়ি ফেরার অনুরোধ জানিয়ে মাইকিং করা হয়েছে। নিরীহ মানুষকে হয়রানি করা হবে না। একইভাবে সদর উপজেলার আমদই, পুরানাপৈল ও বন্ধু ইউপির ২০টি গ্রামে পুরুষ নেই বললেই চলে। বিষয়টি স্বীকার করে সদর থানার ওসি খায়রুল বাশার জানান, পুরানাপৈল ও আমদই ইউনিয়নের অবস্থা বেশি খারাপ। এ দুই ইউনিয়নের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে। কালাই উপজেলার মাত্রাই, ভাউজাপাতার, বলিগ্রাম, অনিহার, শমসিরা, ছিলিমপুর, শালুকগাড়ী, শাইলগুন, রঘুনাথপুর, বালাখুর, বিয়ালা, শিবসমদ্র, বেজখণ্ড, গাড়ইল, সাঁতার, উলিপুর, ভেরেণ্ডী, বানদীঘি, ছত্রগ্রাম, হিমাইল, ইন্দাহার, পার্বতীপুরসহ কালাই উপজেলার মাত্রাই ইউনিয়নের অন্তত ২৭টি গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে।
এদিকে আওয়ামী তাণ্ডব ও পুলিশি হয়রানি থেকে দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের হয়রানি না করতে স্থানীয় প্রশাসনকে অনুরোধ জানানো হয়েছে, পাশাপাশি প্রতিটি মহল্লায় প্রতিরোধ কমিটি গঠনের কাজ চলছে এবং একই সঙ্গে বিভিন্ন উপজেলায় সভা-সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন মহল্লায় কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা সারারাত পালাক্রমে পাহারা দিচ্ছে।" সন্ত্রাসীদের কিংবা পুলিশের অন্যায় গ্রেফতার বাণিজ্য মোকাবেলায় গ্রামের মানুষরা যেভাবে রুখে দাঁড়াচ্ছে স্মরণকালে এমন ঘটনা দেখা যায়নি।
৪. শহীদের আপনজনদের কথা
শহীদের গর্বিত পিতা: দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মুক্তির দাবিতে মিছিলে যায়। মিছিলে এ এলাকা থেকে ১৪-১৫ কিলোমিটার হেঁটে প্রায় ২০ হাজার লোক গিয়েছিল। মিছিলে পুলিশ গুলি করে আমার ছেলেকে মেরে ফেলে। আমার ছেলে খুবই ভালো ছিল। সে কোন অন্যায় করেনি।
শহীদের গর্বিত মাতা: শহীদ নাসির মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যাওয়ার সময় হাসিমুখে শেষ কথা বলে
যায়, 'মা, মিছিলে গেলাম। মা, যতক্ষণ মিছিল থেকে না ফিরব্যে আপনি কুরআন তেলাওয়াত করতে থাকবেন। ও একটি কুকুর পালতো। মিছিলে যাওয়ার আগে শেষ রুটিটি কুকুরের সাথে ভাগাভাগি করে খায়। আর বলে, 'নে খা, এটিই হয়তো তোকে দেওয়া আমার শেষ রুটি'। কুকুরটিও ওর সাথে সাথে মিছিলে যায়। ওর শাহাদাতের পর চিৎকার করতে করতে বাড়ি আসে। মুখে শহীদ নাসিরের একপাটি স্যান্ডেল। ঘেউ ঘেউ করে সে এখনও কাঁদে তার মনিবের জন্য। গ্রামবাসী তাকে খেতে দিয়ে আদর করে বিশেষ সমাদর করে।
শহীদের দাদী। সে খুব ভালো ছেলে ছিল। মানুষের জমিতে কাজ করতো। দশ বার জান একসাথে কাজ করে এক সাথে যায়। সবার সাথে খুব ভালো সম্পর্ক ছিল, ওকে কেউ খারাপ বলতে পারবে না। এখন বাবার কিছুই নাই, কিভাবে সংসার চলবে আল্লাহই ভালো জানেন।
৫. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম: শহীদ মোঃ নাসির উদ্দীন (০৩৩), পেশা। দিনমজুরি।
সাংগঠনিক মান: কর্মী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
জন্ম তারিখ ও বয়স: ১৯৯৫ সাল, ১৮ বছর। আহত হওয়ার তারিখ। ০৩ মার্চ ২০১৩, বেলা ১১ টা। পেটে গুলি লেগেছিল।
শাহাদাতের তারিখ: ৩ মার্চ ২০১৩ বেলা ১১টা, জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি উপজেলার। দাফন করা হয়: নিজ বাড়ির কবরস্থান।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: বাঁশখোর, ডাকঘর: সালাইপুর, ইউনিয়ন: কুসুম্বা, থানা: পাঁচবিবি, জেলা: জয়পুরহাট।
পিতা: মো: মোজাহারুল ইসলাম, ৪৫ বছর, দিনমুজুর।
মাতা। মোছা: নুর বানু, ৩৫ বছর, গৃহিণী।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা: খড়ের চালবিশিষ্ট মাটির বাড়ি। খুব খারাপ অবস্থা। চাষাবাদের জমি নেই। দিনমজুরি করে সংসারের খরচ নির্বাহ করতেন।
ভাই-বোনের বিবরণ: মো: আশিক-বয়স-১৫, দিনমুজুর, উম্মে কুলসুম- বয়স-১৩, ৫ম শ্রেণী।
১. শহীদের পরিচিতি
শহীদ মো। নাসির উদ্দীন জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি উপজেলার বাঁশখুর গ্রামে ১৯৯৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাবা মোজাহারুল ইসলাম ও মা নুর বানুর ৩ ছেলে-মেয়ের মধ্যে সবার বড় ছিলেন। বাবা পেশায় একজন দিনমজুর। তাই শহীদ নাসির উদ্দিন ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনা চালিয়ে যেতে পারেন। অভাবের তাড়নায় এর বেশি পড়াশুনা করা সম্ভব হয়নি। তাই তিনি বাবার মত দিনমজুরের কাজটাই বেছে নেন। ধানকাটার মতো কাজে প্রতিদিন ১৫০/২০০ হারে মাসে ৪৫০০/৫০০০ টাকা আয় হতো। তার সহোদর ভাই তারই মতো দিনমজুরের কাজ করে সংসারের ভরণ পোষণে সাহায্য করে। আর একমাত্র ছোট বোনটি ৫ম শ্রেণীতে পড়াশুনা করে। দরিদ্রতা থাকলেও তাদের ৫ জনের পরিবারের মাটির ঘরে চাঁদের নির্মল জোস্নার মতই সুখ ছিল।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
দিনটি ছিল ৩ মার্চ ২০১৩। শহীদ নাসির সবার কাছে বলেছে, আগের রাতে সে আল্লামা সাঈদীকে চাঁদে দেখেছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ডাকা হরতালের সমর্থনে মিছিলে যোগদান করার জন্য তিনি সকাল ৭টার দিকে মিছিলের উদ্দেশে বাসা থেকে বের হন। বেলা ১১টার দিকে খানা থেকে ২০০ গজ দূরে পাঁচমাথা মোড়ে পুলিশের গুলিবৃষ্টির শিকার হয় মিছিলটি। সেখানেই পেটের ডান পার্শ্বে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। ২০ মিনিটি পরে রিক্সায় করে জয়পুরহাট সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। তখন কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পোস্টমর্টেম শেষ করে রাত ০৮:৩০ টার দিকে লাশ বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। পরের দিন সকাল ১০ টায় সালাইপুরে কফিন নেয়া হয়। সেখানে তিনিসহ চারজনের জানাযার নামাজ একসাথে অনুষ্ঠিত হয়।
শহীদের নামাজে জানাযা সালাইপুর বাজার হাইস্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। জামায়াতে ইসলামী জেনা আমির ডা। মো: ফজলুর রহমান সাঈদ এর ইমামতিতে উক্ত জানাযায় প্রায় ৫০ হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। ৩. সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
৩ মার্চ ২০১৩। দেশবরেণ্য আলেমে দ্বীন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অবৈধ মৃত্যুদণ্ডের রায়ের প্রতিবাদে সারাদেশে আন্দোলনের অংশ হিসেবে জয়পুরহাটেও হরতালের সমর্থনে মিছিল বের হয়। জাতীয় পত্রিকাসমূহে এ সংক্রান্ত বিস্তারিত নিউজ আসে।
৪ মার্চ, ২০১৩ দৈনিক মানবজমিন লিখে
জয়পুরহাটে নিহত ৬: জয়পুরহাট/পাঁচবিবি প্রতিনিধি জানান, পুলিশ, বিজিবি, র্যাব ও আর্মড ব্যাটালিয়নের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষে জয়পুরহাট ও পাঁচবিবিতে ৬ হরতাল সমর্থক নিহত হয়েছেন। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন আরও ৩৬ জন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে জয়পুরহাট শহরে ও পাঁচবিবি সদরে ১৪৪ ধারা জারি করেছে প্রশাসন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল ১১টার দিকে হরতালের সমর্থনে কয়েক হাজার জামায়াত-শিবির নেতাকর্মী ও নারী-পুরুষ জয়পুরহাট শহরের পল্লী বিদ্যুৎ, হিচমি এলাকায় মিছিল বের করলে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও আর্মস ব্যাটালিয়নের সদস্যরা বাধা দেয়। এতে উভয়ের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। এ সময় পুলিশ গুলি চালালে কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হন। তাদের জয়পুরহাট জেলা আধুনিক হাসপাতালে ভর্তি করা হলে পাঁচবিবি উপজেলার রহমতপুর গ্রামের মজনু (৩০) মারা যান। অন্যদিকে পাঁচবিবিতে পুলিশের হরতাল সমর্থকদের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষে ঘটনাস্থলে মারা যান বড় মানিক গ্রামের হাসিব (৫০) ও শালাইপুর গ্রামের আবদুল হাকিম (৩২)। এ সময় অন্তত ২০ জনের মতো গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। আহতদের জয়পুরহাট জেলা আধুনিক হাসপাতালে ও পাঁচবিবি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। জয়পুরহাট হাসপাতালে নাসির (১৬) নামে এক শিবিরকর্মী মারা যান। পাঁচবিবির মহিপুর হাসপাতালে মারা যান কাশরা গ্রামের মজিদুল ইসলাম (২০) ও আয়মারসুলপুরের আবদুল হাকিম (৩২)।
সাপ্তাহিক সোনার বাংলা, ৮ মার্চ, ২০১৩। শহীদদের জানাজা নিয়ে একটি রিপোর্ট করে। "জয়পুরহাটে ৬
শহীদের জানাজা সম্পন্ন" এই শিরোনামে
জয়পুরহাট থেকে সংবাদদাতা জামায়াতের ডাকা হরতালের প্রথম দিনে জেলার সদর ও পাঁচবিবি শহরে জামায়াত-শিবির কর্মী-সমর্থক ও সাঈদী ভক্ত এলাকাবাসীর সাথে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনায় পাঁচবিবিতে নিহত ৬ জনের মধ্যে কুসুম্বা ইউপি'র ৪ জনের জানাজা স্থানীয় শালাইপুর হাইস্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। শহীদদের নামাজে জানাজায় জামায়াত-শিবির নেতাকর্মী ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষসহ সর্বস্তরের হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মুসল্লির ঢল নামে। জানাজা শেষে নিহতদের স্ব-স্ব পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। সাঈদী মুক্তি আন্দোলনে যোগদানকৃত হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রায় ৩ শতাধিক জনতা জানাজায় সংহতি প্রকাশ করতে জানাজা মাঠে উপস্থিত হন। অপরদিকে জেলার পাঁচবিবি উপজেলার আরজজিপুরে নিহত আয়মা রসুলপুর ইউপি জামায়াতের সেক্রেটারি ফরমান আলীর নামাজে জানাজা স্থানীয় এবতেদায়ী মাদরাসা মাঠে অনুষ্ঠিত হয়।
দৈনিক আমার দেশ, "আওয়ামী লীগের হামলা ও পুলিশি হয়রানিতে পুরুষশূন্য অনেক গ্রাম' শিরোনামে কাজী জেবেল ও নজরুল ইসলাম এর একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশ করে যা বাংলাদেশের অনেক এলাকার সাথে মিলে যায়:
"পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে জয়পুরহাটের পাঁচবিবি, কালাই ও আক্কেলপুর উপজেলার প্রায় অর্ধশত গ্রাম। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ক্যাডারদের হামলা, মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় ও পুলিশি গ্রেফতার আতঙ্কে বাড়িতে থাকতে সাহস পাচ্ছেন না তারা। বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন পুরুষ সদস্যরা। এসব গ্রামে শুধু নারী ও শিশুরা আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করছে। অনেক বাড়িঘরে তালা ঝুলছে।জেলার বাকি দুই উপজেলা ক্ষেতলাল ও সদরের বাসিন্দাদের মধ্যেও আতঙ্ক বিরাজ করছে। এতে স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে। বেশিরভাগ বাজারের অনেক দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের প্রতিবাদে বিভিন্ন স্থানে সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের গুলি ও সংঘর্ষের ঘটনার পর থেকে জয়পুরহাট শহর ও উপজেলাগুলোতে এ অবস্থা বিরাজ করছে। এ ঘটনায় পাঁচবিবিতে ৪২টি মামলা, সদর থানায় ৭টি, কালাইয়ে ৪টি ও ক্ষেতলালে ১টি মামলা হয়েছে। এতে অর্ধলক্ষাধিক মানুষকে আসামি করা হয়েছে। দুই শতাধিক মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর স্থানীয় বাসিন্দাদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে গ্রামে গ্রামে মাইকিং করছে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন। 'নিরীহ' বাসিন্দাদের 'নির্ভয়ে' বাড়িঘরে ফিরতে মাইকে ঘোষণা দেয়া হচ্ছে। তবে পুলিশের এ ঘোষণায় আস্থা রাখতে পারছেন না গ্রামবাসী। বিএনপি নেতা পাঁচবিবির কুশম্বা ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল গফুর মণ্ডল, জামায়াত নেতা সদরের বন্ধু ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম কিবরিয়া ও আমদই ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম রব্বানী চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হবে বলে জনসভায় ঘোষণা দেন আওয়ামী লীগের নেতারা। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আরও বেশি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক থাকার বিষয়টি স্বীকার করে জয়পুরহাটের জেলা পুলিশ সুপার হামিদুল আলম আমার দেশকে বলেছেন, নিরীহ বাসিন্দাদের বাড়িঘরে ফিরে আসার জন্য প্রতিটি থানায় মাইকিং করা হচ্ছে। তাদের কোনো ধরনের হয়রানি করা হবে না। তিনি বলেন, মামলা থেকে নাম বাদ দেয়ার কথা বলে অনেকের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ পেয়েছি। কেউ যাতে টাকা লেনদেন না করে সেজন্য অনুরোধ জানিয়েছি। যারা অপরাধের সঙ্গে জড়িত তাদের ছাড় দেয়া হবে না।
আওয়ামী হামলা ও পুলিশি হয়রানি এড়াতে সদর উপজেলার অন্তত ২০টি গ্রাম, পাঁচবিবিতে অন্তত ৫০টি, কালাইয়ে ২৫টি, ক্ষেতলালে ১০টি গ্রামে পুরুষ বসবাস করছেন না। গত ৩ মার্চ সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় পাঁচবিবিতে। এতে ৫ জনের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় ৪২ মামলা দায়েরের পর থেকে উপজেলার বেশিরভাগ গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। উপজেলার প্রাণকেন্দ্র পাঁচমাথার অনেক মার্কেটের দোকান গতকালও খোলেনি। আশপাশের ব্যবসায়ীরা জানান, গ্রেফতার এড়াতে এসব দোকানি আত্মত্মগোপনে রয়েছেন। এ উপজেলার কুশম্বা, ভাড়াহুত, কাশড়া গোবিন্দপুর, ছোটো মানিক, ধুবইল, শালাইপুর, গোরনা, আরজী অনন্তপুর, রতনপুর, ধরঞ্জি, বাকিলা, ছাতিনালীসহ অন্যান্য গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। এসব গ্রামে অপরিচিত কেউ গেলে মহিলা ও শিশুরা ভয়ে সরে যাচ্ছে। তারা কোনো কথা বলতে রাজি নয়। পাঁচবিবি থানার ওসি (তদন্ত) মুর হোসেন আমার দেশ-কে বলেন, গ্রামবাসীকে বাড়ি ফেরার অনুরোধ জানিয়ে মাইকিং করা হয়েছে। নিরীহ মানুষকে হয়রানি করা হবে না। একইভাবে সদর উপজেলার আমদই, পুরানাপৈল ও বন্ধু ইউপির ২০টি গ্রামে পুরুষ নেই বললেই চলে। বিষয়টি স্বীকার করে সদর থানার ওসি খায়রুল বাশার জানান, পুরানাপৈল ও আমদই ইউনিয়নের অবস্থা বেশি খারাপ। এ দুই ইউনিয়নের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে। কালাই উপজেলার মাত্রাই, ভাউজাপাতার, বলিগ্রাম, অনিহার, শমসিরা, ছিলিমপুর, শালুকগাড়ী, শাইলগুন, রঘুনাথপুর, বালাখুর, বিয়ালা, শিবসমদ্র, বেজখণ্ড, গাড়ইল, সাঁতার, উলিপুর, ভেরেণ্ডী, বানদীঘি, ছত্রগ্রাম, হিমাইল, ইন্দাহার, পার্বতীপুরসহ কালাই উপজেলার মাত্রাই ইউনিয়নের অন্তত ২৭টি গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে।
এদিকে আওয়ামী তাণ্ডব ও পুলিশি হয়রানি থেকে দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের হয়রানি না করতে স্থানীয় প্রশাসনকে অনুরোধ জানানো হয়েছে, পাশাপাশি প্রতিটি মহল্লায় প্রতিরোধ কমিটি গঠনের কাজ চলছে এবং একই সঙ্গে বিভিন্ন উপজেলায় সভা-সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন মহল্লায় কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা সারারাত পালাক্রমে পাহারা দিচ্ছে।" সন্ত্রাসীদের কিংবা পুলিশের অন্যায় গ্রেফতার বাণিজ্য মোকাবেলায় গ্রামের মানুষরা যেভাবে রুখে দাঁড়াচ্ছে স্মরণকালে এমন ঘটনা দেখা যায়নি।
৪. শহীদের আপনজনদের কথা
শহীদের গর্বিত পিতা: দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মুক্তির দাবিতে মিছিলে যায়। মিছিলে এ এলাকা থেকে ১৪-১৫ কিলোমিটার হেঁটে প্রায় ২০ হাজার লোক গিয়েছিল। মিছিলে পুলিশ গুলি করে আমার ছেলেকে মেরে ফেলে। আমার ছেলে খুবই ভালো ছিল। সে কোন অন্যায় করেনি।
শহীদের গর্বিত মাতা: শহীদ নাসির মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যাওয়ার সময় হাসিমুখে শেষ কথা বলে
যায়, 'মা, মিছিলে গেলাম। মা, যতক্ষণ মিছিল থেকে না ফিরব্যে আপনি কুরআন তেলাওয়াত করতে থাকবেন। ও একটি কুকুর পালতো। মিছিলে যাওয়ার আগে শেষ রুটিটি কুকুরের সাথে ভাগাভাগি করে খায়। আর বলে, 'নে খা, এটিই হয়তো তোকে দেওয়া আমার শেষ রুটি'। কুকুরটিও ওর সাথে সাথে মিছিলে যায়। ওর শাহাদাতের পর চিৎকার করতে করতে বাড়ি আসে। মুখে শহীদ নাসিরের একপাটি স্যান্ডেল। ঘেউ ঘেউ করে সে এখনও কাঁদে তার মনিবের জন্য। গ্রামবাসী তাকে খেতে দিয়ে আদর করে বিশেষ সমাদর করে।
শহীদের দাদী। সে খুব ভালো ছেলে ছিল। মানুষের জমিতে কাজ করতো। দশ বার জান একসাথে কাজ করে এক সাথে যায়। সবার সাথে খুব ভালো সম্পর্ক ছিল, ওকে কেউ খারাপ বলতে পারবে না। এখন বাবার কিছুই নাই, কিভাবে সংসার চলবে আল্লাহই ভালো জানেন।
৫. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম: শহীদ মোঃ নাসির উদ্দীন (০৩৩), পেশা। দিনমজুরি।
সাংগঠনিক মান: কর্মী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
জন্ম তারিখ ও বয়স: ১৯৯৫ সাল, ১৮ বছর। আহত হওয়ার তারিখ। ০৩ মার্চ ২০১৩, বেলা ১১ টা। পেটে গুলি লেগেছিল।
শাহাদাতের তারিখ: ৩ মার্চ ২০১৩ বেলা ১১টা, জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি উপজেলার। দাফন করা হয়: নিজ বাড়ির কবরস্থান।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: বাঁশখোর, ডাকঘর: সালাইপুর, ইউনিয়ন: কুসুম্বা, থানা: পাঁচবিবি, জেলা: জয়পুরহাট।
পিতা: মো: মোজাহারুল ইসলাম, ৪৫ বছর, দিনমুজুর।
মাতা। মোছা: নুর বানু, ৩৫ বছর, গৃহিণী।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা: খড়ের চালবিশিষ্ট মাটির বাড়ি। খুব খারাপ অবস্থা। চাষাবাদের জমি নেই। দিনমজুরি করে সংসারের খরচ নির্বাহ করতেন।
ভাই-বোনের বিবরণ: মো: আশিক-বয়স-১৫, দিনমুজুর, উম্মে কুলসুম- বয়স-১৩, ৫ম শ্রেণী।
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍