শহীদ মো: মজিদুল রহমান
আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
শহীদ মো: মজিদুল রহমান (০৩৫), পেশা: কৃষি।
সাংগঠনিক মান: সমর্থক, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
জন্ম তারিখ: ০৮.০২.১৯৭২, ৪১ বছর। আহত হওয়ার তারিখ: ৩ মার্চ ২০১৩, বেলা ১১টা, বুকের ডান পাশ দিয়ে গুলি ঢুকে বাম পাশ দিয়ে বের হয়ে যায়।
শাহাদাতের তারিখ: ৩ মার্চ ২০১৩, বেলা ১১টা, স্থান: জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি থানার কাছে মহিপুর হাসপাতাল, দাফন করা হয়। স্থানীয় কবরস্থান।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম। কাসড়া, ডাকঘর: আমদই, কুসুম্বা থানা। পাঁচবিবি, জেলা। জয়পুরহাট।
পিতা: মো: মফিজ উদ্দীন প্রামাণিক, ৬০ বছর, কৃষক।
মাতা: হাছিনা খাতুন, ৫০ বছর, গৃহিণী।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা: মাটির তৈরি ছোট একটি ঘর। চাষাবাদের কোন জমি নেই। টিউবওয়েল ও টয়লেট নেই। কৃষিকাজ করে সংসার চালাতেন।
স্ত্রী ও সন্তানদের বিবরণ: বিউটি আক্তার, বয়স ৩০ বছর, গৃহিণী। ১ম ছেলে। মোঃ খায়রুল ইসলাম, কৃষিকাজ, বয়স ১৮ বছর, মেয়ে: মোছা: মরিয়ম, বয়স ১৫, ৬ষ্ঠ শ্রেণী, মোছা: মীম, বয়স ৩ বছর।
ভাই-বোনের বিবরণ: মোসা: মজিদা খাতুন, বিবাহিতা- স্বামী কৃষক, মোসা: আজিদা খাতুন, বিবাহিতা- স্বামী কৃষক, মোসা: ওজিদা খাতুন, বিবাহিতা- স্বামী কৃষক, মো: মামুনুর রশিদ, কৃষি।
সাংগঠনিক মান: সমর্থক, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
জন্ম তারিখ: ০৮.০২.১৯৭২, ৪১ বছর। আহত হওয়ার তারিখ: ৩ মার্চ ২০১৩, বেলা ১১টা, বুকের ডান পাশ দিয়ে গুলি ঢুকে বাম পাশ দিয়ে বের হয়ে যায়।
শাহাদাতের তারিখ: ৩ মার্চ ২০১৩, বেলা ১১টা, স্থান: জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি থানার কাছে মহিপুর হাসপাতাল, দাফন করা হয়। স্থানীয় কবরস্থান।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম। কাসড়া, ডাকঘর: আমদই, কুসুম্বা থানা। পাঁচবিবি, জেলা। জয়পুরহাট।
পিতা: মো: মফিজ উদ্দীন প্রামাণিক, ৬০ বছর, কৃষক।
মাতা: হাছিনা খাতুন, ৫০ বছর, গৃহিণী।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা: মাটির তৈরি ছোট একটি ঘর। চাষাবাদের কোন জমি নেই। টিউবওয়েল ও টয়লেট নেই। কৃষিকাজ করে সংসার চালাতেন।
স্ত্রী ও সন্তানদের বিবরণ: বিউটি আক্তার, বয়স ৩০ বছর, গৃহিণী। ১ম ছেলে। মোঃ খায়রুল ইসলাম, কৃষিকাজ, বয়স ১৮ বছর, মেয়ে: মোছা: মরিয়ম, বয়স ১৫, ৬ষ্ঠ শ্রেণী, মোছা: মীম, বয়স ৩ বছর।
ভাই-বোনের বিবরণ: মোসা: মজিদা খাতুন, বিবাহিতা- স্বামী কৃষক, মোসা: আজিদা খাতুন, বিবাহিতা- স্বামী কৃষক, মোসা: ওজিদা খাতুন, বিবাহিতা- স্বামী কৃষক, মো: মামুনুর রশিদ, কৃষি।
🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ
"ছোটভাই মামুন মজিদুলকে স্বপ্নে দেখেছে, ফজরের নামাজের আজানের সময় তার ভাই ও অচেনা চারজন এসেছে। কী চমৎকার হাসিখুশি আর কী অদ্ভুত নুরানী চেহারা তাদের।... মজিদুরের স্ত্রীও এই চেতনায় উদ্বুদ্ধ ছিলেন। তাই আল্লামা সাঈদী সাহেবকে নিয়ে প্রোগ্রাম শুনে তিনিও যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মজিদুল কি ভেবে বলেছিল, 'তুমি বাচ্চাদের দেখ।...। স্ত্রী বিউটি আক্তার ভাবেন; শহীদ স্বামী তাকে সন্তানদের দেখার যে গুরু দায়িত্ব দিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেল। ডায়াবেটিসের কারণে এমনিতেই তিনি চোখে ভাল দেখতে পান না। মাত্র ৩০ বছর বয়সেই সাড়ে তিন বছরের মীমসহ তিন সন্তান নিয়ে আজ বিধবা হলেন। অনাগত দিনের কঠিন ও অজানা পথে তিনি এই এতিমদের নিয়ে কিভাবে হাঁটবেন?"
১. শহীদের পরিচিতি
শহীদ মো: মজিদুল রহমান জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি উপজেলার কাসড়া গ্রামে ১৯৭২ সালে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা মফিজ উদ্দীন ও মাতা হাসিনা খাতুনের ৫ ছেলে-মেয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। তিনি প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন বাঁশখুড় মাদ্রাসা থেকে। তারপর অসচ্ছলতার কারণে আর তার পড়াশুনা হয়নি। পিতা ৬০ বছরের বৃদ্ধ হওয়ায় এবং বড় ছেলে হিসেবে তার ওপর সংসারের গুরু দায়িত্ব পড়ে। শহীদ মজিদুল রহমান কৃষিকাজ করতেন এবং পাশাপাশি ট্রাক্টর চালাতেন। তার তিন সন্তানের মধ্যে বড় ছেলে খায়রুলের বয়স ১৮, সেও বাবাকে সহযোগিতা করতে কৃষিকাজ করে। দুই মেয়ের একজন ৬ষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করেছে আর সবার ছোটজন মীমের বয়স কেবল সাড়ে তিন বছর। সাংসারিক জীবনে অভাব অনটন নিত্যদিনের সাথী হলেও তিনি পরহেজগার ব্যক্তি হিসাবে সকলের কাছে পরিচিত ছিলেন।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
৩ মার্চ ২০১৩। দেশবরেণ্য আলেমে দ্বীন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে প্রহসনমূলক মিথ্যা মামলার রায় মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে সারাদেশে যখন বিক্ষোভ, হরতাল পালিত হচ্ছে, তারই অংশ হিসেবে ৩ মার্চের হরতাল সমর্থনে মিছিল বের হয়। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ডাকা ঐ হরতাল সমর্থনে মিছিলের উদ্দেশে সকাল ৭টায় মজিদুল রহমান বাড়ি থেকে বের হন। বেলা ১০:৩০ টার দিকে পাঁচবিবি থানার কছে পুলিশ মিছিলে গুলি করে। গুলিটি মজিদুল রহমানের বুকের ডান পাশ দিয়ে ঢুকে বাম পাশ দিয়ে বের হয়ে যায়। এতে তিনি সেখানেই পড়ে যান। তারপর ২০ মিনিটের মধ্যে মহিপুর হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত ডাক্তার মৃত ঘোষণা করেন। পোস্টমর্টেম শেষে রাত ১০:৩০ টার দিকে লাশ বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। পরের দিন সকাল ১০টায় সালাইপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে কফিন নেয়া হয়। সেখানে তিনিসহ চারজনের জানাযার নামাজ একসাথে অনুষ্ঠিত হয়।
শহীদের নামাযে জানাযা সালাইপুর বাজার হাইস্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। জামায়াতে ইসলামীর জেলা আমির ডা: মো: ফজলুর রহমান সাঈদ-এর ইমামতিতে উক্ত জানাযায় প্রায় ৫০ হাজার মানুষ শরিক হন।
৩. সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
৩ মার্চ ২০১৩। দেশবরেণ্য আলেমে দ্বীন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অবৈধ মৃত্যুদণ্ডের রায়ের প্রতিবাদে সারাদেশে আন্দোলনের অংশ হিসেবে জয়পুরহাটেও হরতালের সমর্থনে মিছিল বের হয়। জাতীয় পত্রিকাসমূহে এ সংক্রান্ত বিস্তারিত নিউজ আসে।
৪ মার্চ, ২০১৩ দৈনিক মানবজমিন লিখে
জয়পুরহাটে নিহত ৬: জয়পুরহাট/পাঁচবিবি প্রতিনিধি জানান, পুলিশ, বিজিবি, র্যাব ও আর্মড ব্যাটালিয়নের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষে জয়পুরহাট ও পাঁচবিবিতে ৬ হরতাল সমর্থক নিহত হয়েছেন। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন আরও ৩৬ জন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে জয়পুরহাট শহরে ও পাঁচবিবি সদরে ১৪৪ ধারা জারি করেছে প্রশাসন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল ১১টার দিকে হরতালের সমর্থনে কয়েক হাজার জামায়াত-শিবির নেতাকর্মী ও নারী-পুরুষ জয়পুরহাট শহরের পল্লী বিদ্যুৎ, হিচমি এলাকায় মিছিল বের করলে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও আর্মড ব্যাটালিয়নের সদস্যরা বাধা দেয়। এতে উভয়ের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। এ সময় পুলিশ গুলি চালালে কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হন। তাদের জয়পুরহাট জেলা আধুনিক হাসপাতালে ভর্তি করা হলে পাঁচবিবি উপজেলার রহমতপুর গ্রামের মজনু (৩০) মারা যান। অন্যদিকে পাঁচবিবিতে পুলিশের হরতাল সমর্থকদের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষে ঘটনাস্থলে মারা যান বড় মানিক গ্রামের হাসিব (৫০) ও শালাইপুর গ্রামের আবদুল হাকিম (৩২)। এ সময় অন্তত ২০ জনের মতো গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। আহতদের জয়পুরহাট জেলা আধুনিক হাসপাতালে ও পাঁচবিবি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। জয়পুরহাট হাসপাতালে নাসির (১৬) নামে এক শিবিরকর্মী মারা যান। পাঁচবিবির মহিপুর হাসপাতালে মারা যান কাশরা গ্রামের মজিদুল ইসলাম (২০) ও আয়মারসুলপুরের আবদুল হাকিম (৩২)।
সাপ্তাহিক সোনার বাংলা, ৮ মার্চ, ২০১৩, শহীদদের জানাজা নিয়ে একটি রিপোর্ট করে; "জয়পুরহাটে ৬ শহীদের জানাজা সম্পন্ন" এই শিরোনামে।
জয়পুরহাট থেকে সংবাদদাতা: জামায়াতের ডাকা হরতালের প্রথম দিনে জেলার সদর ও পাঁচবিবি শহরে জামায়াত-শিবির কর্মী-সমর্থক ও সাঈদী ভক্ত এলাকাবাসীর সাথে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনায় পাঁচবিবিতে নিহত ৬ জনের মধ্যে কুসুম্বা ইউপি'র ৪ জনের জানাজা স্থানীয় শালাইপুর হাইস্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। শহীদদের নামাজে জানাজায় জামায়াত-শিবির নেতাকর্মী ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষসহ সর্বস্তরের হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মুসল্লির ঢল নামে। জানাজা শেষে নিহতদের স্ব-স্ব পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। সাঈদী মুক্তি আন্দোলনে যোগদানকৃত হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রায় ৩ শতাধিক জনতা জানাজায় সংহতি প্রকাশ করতে জানাজা মাঠে উপস্থিত হন। অপরদিকে জেলার পাঁচবিবি উপজেলার আরজড়িপুরে নিহত আয়মা রসুলপুর ইউপি জামায়াতের সেক্রেটারি ফরমান আলীর নামাজে জানাজা স্থানীয় এবতেদায়ী মাদরাসা মাঠে অনুষ্ঠিত হয়।
দৈনিক আমার দেশ, "আওয়ামী লীগের হামলা ও পুলিশি হয়রানিতে পুরুষশূন্য অনেক গ্রাম' শিরোনামে কাজী জেবেল ও নজরুল ইসলাম-এর একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশ করে যা বাংলাদেশের অনেক এলাকার সাথে মিলে যায়। "পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে জয়পুরহাটের পাঁচবিবি, কালাই ও আক্কেলপুর উপজেলার প্রায় অর্ধশত গ্রাম। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ক্যাডারদের হামলা, মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় ও পুলিশি গ্রেফতার আতঙ্কে বাড়িতে থাকতে সাহস পাচ্ছেন না তারা। বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন পুরুষ সদস্যরা। এসব গ্রামে শুধু নারী ও শিশুরা আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করছে। অনেক বাড়িঘরে তালা ঝুলছে। জেলার বাকি দুই উপজেলা ক্ষেতলাল ও সদরের বাসিন্দাদের মধ্যেও আতঙ্ক বিরাজ করছে। এতে স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে। বেশিরভাগ বাজারের অনেক দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের প্রতিবাদে বিভিন্ন স্থানে সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের গুলি ও সংঘর্ষের ঘটনার পর থেকে জয়পুরহাট শহর ও উপজেলাগুলোতে এ অবস্থা বিরাজ করছে। এ ঘটনায় পাঁচবিবিতে ৪২টি মামলা, সদর থানায় ৭টি, কালাইয়ে ৪টি ও ক্ষেতলালে ১টি মামলা হয়েছে। এতে অর্ধলক্ষাধিক মানুষকে আসামি করা হয়েছে। দুই শতাধিক মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর স্থানীয় বাসিন্দাদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে গ্রামে গ্রামে মাইকিং করছে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন। 'নিরীহ' বাসিন্দাদের 'নির্ভয়ে' বাড়িঘরে ফিরতে মাইকে ঘোষণা দেয়া হচ্ছে। তবে পুলিশের এ ঘোষণায় আস্থা রাখতে পারছেন না গ্রামবাসী। বিএনপি নেতা পাঁচবিবির কুশম্বা ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল গফুর মণ্ডল, জামায়াত নেতা সদরের বন্ধু ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম কিবরিয়া ও আমদই ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম রব্বানী চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হবে বলে জনসভায় ঘোষণা দেন আওয়ামী লীগের নেতারা। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আরও বেশি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক থাকার বিষয়টি স্বীকার করে জয়পুরহাটের জেলা পুলিশ সুপার হামিদুল আলম আমার দেশকে বলেছেন, নিরীহ বাসিন্দাদের বাড়িঘরে ফিরে আসার জন্য প্রতিটি থানায় মাইকিং করা হচ্ছে। তাদের কোনো ধরনের হয়রানি করা হবে না। তিনি বলেন, মামলা থেকে নাম বাদ দেয়ার কথা বলে অনেকের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ পেয়েছি। কেউ যাতে টাকা লেনদেন না করে সেজন্য অনুরোধ জানিয়েছি। যারা অপরাধের সঙ্গে জড়িত তাদের ছাড় দেয়া হবে না।
আওয়ামী হামলা ও পুলিশি হয়রানি এড়াতে সদর উপজেলার অন্তত ২০টি গ্রাম, পাঁচবিবিতে অন্তত ৫০টি, কালাইয়ে ২৫টি, ক্ষেতলালে ১০টি গ্রামে পুরুষ বসবাস করছেন না। গত ৩ মার্চ সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় পাঁচবিবিতে। এতে ৫ জনের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় ৪২ মামলা দায়েরের পর থেকে উপজেলার বেশিরভাগ গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। উপজেলার প্রাণকেন্দ্র পাঁচমাথার অনেক মার্কেটের দোকান গতকালও খোলেনি। আশপাশের ব্যবসায়ীরা জানান, গ্রেফতার এড়াতে এসব দোকানি আত্মগোপনে রয়েছেন। এ উপজেলার কুশম্বা, ভাড়াহুত, কাশড়া গোবিন্দপুর, ছোটো মানিক, খুবইল, শালাইপুর, গোরনা, আরজী অনন্তপুর, রতনপুর, ধরঞ্জি, বাকিলা, ছাতিনালীসহ অন্যান্য গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। এসব গ্রামে অপরিচিত কেউ গেলে মহিলা ও শিশুরা ভয়ে সরে যাচ্ছে। তারা কোনো কথা বলতে রাজি নয়। পাঁচবিবি থানার ওসি (তদন্ত) নুর হোসেন আমার দেশ-কে বলেন, গ্রামবাসীকে বাড়ি ফেরার অনুরোধ জানিয়ে মাইকিং করা হয়েছে। নিরীহ মানুষকে হয়রানি করা হবে না। একইভাবে সদর উপজেলার আমদই, পুরানাপৈল ও বন্ধু ইউপির ২০টি গ্রামে পুরুষ নেই বললেই চলে। বিষয়টি স্বীকার করে সদর খানার ওসি খায়রুল বাশার জানান, পুরানাপৈল ও আমদই ইউনিয়নের অবস্থা বেশি খারাপ। এ দুই ইউনিয়নের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে। কালাই উপজেলার মাত্রাই, ভাউজাপাতার, বলিগ্রাম, অনিহার, শমসিরা, ছিলিমপুর, শালুকগাড়ী, শাইলগুন, রঘুনাথপুর, বালাখুর, বিয়ালা, শিবসমদ্র, বেজখণ্ড, গাড়ইল, সাঁতার, উলিপুর, ভেরেন্ডী, বানদীঘি, ছত্রগ্রাম, হিমাইল, ইন্দাহার, পার্বতীপুরসহ কালাই উপজেলার মাত্রাই ইউনিয়নের অন্তত ২৭টি গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। এদিকে আওয়ামী তাণ্ডব ও পুলিশি হয়রানি থেকে দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের হয়রানি না করতে স্থানীয় প্রশাসনকে অনুরোধ জানানো হয়েছে, পাশাপাশি প্রতিটি মহল্লায় প্রতিরোধ কমিটি গঠনের কাজ চলছে এবং একই সঙ্গে বিভিন্ন উপজেলায় সভা-সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন মহল্লায় কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা সারারাত পালাক্রমে পাহারা দিচ্ছে।"
সন্ত্রাসীদের কিংবা পুলিশের অন্যায় গ্রেফতার বাণিজ্য মোকাবেলায় গ্রামের মানুষরা যেভাবে রুখে দাঁড়াচ্ছে স্মরণকালে এমন ঘটনা দেখা যায়নি।
৪. স্বজনদের কান্না
ছোটভাই মামুন মজিদুলকে স্বপ্নে দেখেছে, ফজরের নামাজের আজানের সময় তার ভাই ও অচেনা চারজন এসেছে। কী চমৎকার হাসিখুশি আর কী অদ্ভুত নুরানী চেহারা তাদের। সবাই শুনে কষ্টের মধ্যেও সান্ত্বনা খুঁজেন। মজিদুরের স্ত্রীও এই চেতনায় উদ্বুদ্ধ ছিলেন। তাই আল্লামা সাঈদী সাহেবকে নিয়ে প্রোগ্রাম শুনে তিনিও যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মজিদুল কী ভেবে বলেছিল, 'তুমি বাচ্চাদের দেখ।' রায়ের দিন ছেলে খায়রুলও যেতে চেয়েছিল কিন্তু পিতা তাকেও নেননি। স্ত্রী বিউটি আক্তার ভাবেন: শহীদ স্বামী তাকে সন্তানদের দেখার যে গুরু দায়িত্ব দিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেল। ডায়াবেটিসের কারণে এমনিতেই তিনি চোখে ভাল দেখতে পান না। মাত্র ৩০ বছর বয়সেই সাড়ে তিন বছরের মীমসহ তিন সন্তান নিয়ে আজ বিধবা হলেন। অনাগত দিনের কঠিন ও অজানা পথে তিনি এই এতিমদের নিয়ে কিভাবে হাঁটবেন?
৫. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
* নাম: শহীদ মো: মজিদুল রহমান (০৩৫), পেশা: কৃষি।
সাংগঠনিক মান: সমর্থক, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
জন্ম তারিখ: ০৮.০২.১৯৭২, ৪১ বছর। আহত হওয়ার তারিখ: ৩ মার্চ ২০১৩, বেলা ১১টা, বুকের ডান পাশ দিয়ে গুলি ঢুকে বাম পাশ দিয়ে বের হয়ে যায়।
শাহাদাতের তারিখ: ৩ মার্চ ২০১৩, বেলা ১১টা, স্থান: জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি থানার কাছে মহিপুর হাসপাতাল, দাফন করা হয়। স্থানীয় কবরস্থান।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম। কাসড়া, ডাকঘর: আমদই, কুসুম্বা থানা। পাঁচবিবি, জেলা। জয়পুরহাট।
পিতা: মো: মফিজ উদ্দীন প্রামাণিক, ৬০ বছর, কৃষক।
মাতা: হাছিনা খাতুন, ৫০ বছর, গৃহিণী।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা: মাটির তৈরি ছোট একটি ঘর। চাষাবাদের কোন জমি নেই। টিউবওয়েল ও টয়লেট নেই। কৃষিকাজ করে সংসার চালাতেন।
স্ত্রী ও সন্তানদের বিবরণ: বিউটি আক্তার, বয়স ৩০ বছর, গৃহিণী। ১ম ছেলে। মোঃ খায়রুল ইসলাম, কৃষিকাজ, বয়স ১৮ বছর, মেয়ে: মোছা: মরিয়ম, বয়স ১৫, ৬ষ্ঠ শ্রেণী, মোছা: মীম, বয়স ৩ বছর।
ভাই-বোনের বিবরণ: মোসা: মজিদা খাতুন, বিবাহিতা- স্বামী কৃষক, মোসা: আজিদা খাতুন, বিবাহিতা- স্বামী কৃষক, মোসা: ওজিদা খাতুন, বিবাহিতা- স্বামী কৃষক, মো: মামুনুর রশিদ, কৃষি।
১. শহীদের পরিচিতি
শহীদ মো: মজিদুল রহমান জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি উপজেলার কাসড়া গ্রামে ১৯৭২ সালে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা মফিজ উদ্দীন ও মাতা হাসিনা খাতুনের ৫ ছেলে-মেয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। তিনি প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন বাঁশখুড় মাদ্রাসা থেকে। তারপর অসচ্ছলতার কারণে আর তার পড়াশুনা হয়নি। পিতা ৬০ বছরের বৃদ্ধ হওয়ায় এবং বড় ছেলে হিসেবে তার ওপর সংসারের গুরু দায়িত্ব পড়ে। শহীদ মজিদুল রহমান কৃষিকাজ করতেন এবং পাশাপাশি ট্রাক্টর চালাতেন। তার তিন সন্তানের মধ্যে বড় ছেলে খায়রুলের বয়স ১৮, সেও বাবাকে সহযোগিতা করতে কৃষিকাজ করে। দুই মেয়ের একজন ৬ষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করেছে আর সবার ছোটজন মীমের বয়স কেবল সাড়ে তিন বছর। সাংসারিক জীবনে অভাব অনটন নিত্যদিনের সাথী হলেও তিনি পরহেজগার ব্যক্তি হিসাবে সকলের কাছে পরিচিত ছিলেন।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
৩ মার্চ ২০১৩। দেশবরেণ্য আলেমে দ্বীন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে প্রহসনমূলক মিথ্যা মামলার রায় মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে সারাদেশে যখন বিক্ষোভ, হরতাল পালিত হচ্ছে, তারই অংশ হিসেবে ৩ মার্চের হরতাল সমর্থনে মিছিল বের হয়। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ডাকা ঐ হরতাল সমর্থনে মিছিলের উদ্দেশে সকাল ৭টায় মজিদুল রহমান বাড়ি থেকে বের হন। বেলা ১০:৩০ টার দিকে পাঁচবিবি থানার কছে পুলিশ মিছিলে গুলি করে। গুলিটি মজিদুল রহমানের বুকের ডান পাশ দিয়ে ঢুকে বাম পাশ দিয়ে বের হয়ে যায়। এতে তিনি সেখানেই পড়ে যান। তারপর ২০ মিনিটের মধ্যে মহিপুর হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত ডাক্তার মৃত ঘোষণা করেন। পোস্টমর্টেম শেষে রাত ১০:৩০ টার দিকে লাশ বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। পরের দিন সকাল ১০টায় সালাইপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে কফিন নেয়া হয়। সেখানে তিনিসহ চারজনের জানাযার নামাজ একসাথে অনুষ্ঠিত হয়।
শহীদের নামাযে জানাযা সালাইপুর বাজার হাইস্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। জামায়াতে ইসলামীর জেলা আমির ডা: মো: ফজলুর রহমান সাঈদ-এর ইমামতিতে উক্ত জানাযায় প্রায় ৫০ হাজার মানুষ শরিক হন।
৩. সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
৩ মার্চ ২০১৩। দেশবরেণ্য আলেমে দ্বীন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অবৈধ মৃত্যুদণ্ডের রায়ের প্রতিবাদে সারাদেশে আন্দোলনের অংশ হিসেবে জয়পুরহাটেও হরতালের সমর্থনে মিছিল বের হয়। জাতীয় পত্রিকাসমূহে এ সংক্রান্ত বিস্তারিত নিউজ আসে।
৪ মার্চ, ২০১৩ দৈনিক মানবজমিন লিখে
জয়পুরহাটে নিহত ৬: জয়পুরহাট/পাঁচবিবি প্রতিনিধি জানান, পুলিশ, বিজিবি, র্যাব ও আর্মড ব্যাটালিয়নের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষে জয়পুরহাট ও পাঁচবিবিতে ৬ হরতাল সমর্থক নিহত হয়েছেন। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন আরও ৩৬ জন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে জয়পুরহাট শহরে ও পাঁচবিবি সদরে ১৪৪ ধারা জারি করেছে প্রশাসন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল ১১টার দিকে হরতালের সমর্থনে কয়েক হাজার জামায়াত-শিবির নেতাকর্মী ও নারী-পুরুষ জয়পুরহাট শহরের পল্লী বিদ্যুৎ, হিচমি এলাকায় মিছিল বের করলে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও আর্মড ব্যাটালিয়নের সদস্যরা বাধা দেয়। এতে উভয়ের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। এ সময় পুলিশ গুলি চালালে কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হন। তাদের জয়পুরহাট জেলা আধুনিক হাসপাতালে ভর্তি করা হলে পাঁচবিবি উপজেলার রহমতপুর গ্রামের মজনু (৩০) মারা যান। অন্যদিকে পাঁচবিবিতে পুলিশের হরতাল সমর্থকদের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষে ঘটনাস্থলে মারা যান বড় মানিক গ্রামের হাসিব (৫০) ও শালাইপুর গ্রামের আবদুল হাকিম (৩২)। এ সময় অন্তত ২০ জনের মতো গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। আহতদের জয়পুরহাট জেলা আধুনিক হাসপাতালে ও পাঁচবিবি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। জয়পুরহাট হাসপাতালে নাসির (১৬) নামে এক শিবিরকর্মী মারা যান। পাঁচবিবির মহিপুর হাসপাতালে মারা যান কাশরা গ্রামের মজিদুল ইসলাম (২০) ও আয়মারসুলপুরের আবদুল হাকিম (৩২)।
সাপ্তাহিক সোনার বাংলা, ৮ মার্চ, ২০১৩, শহীদদের জানাজা নিয়ে একটি রিপোর্ট করে; "জয়পুরহাটে ৬ শহীদের জানাজা সম্পন্ন" এই শিরোনামে।
জয়পুরহাট থেকে সংবাদদাতা: জামায়াতের ডাকা হরতালের প্রথম দিনে জেলার সদর ও পাঁচবিবি শহরে জামায়াত-শিবির কর্মী-সমর্থক ও সাঈদী ভক্ত এলাকাবাসীর সাথে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনায় পাঁচবিবিতে নিহত ৬ জনের মধ্যে কুসুম্বা ইউপি'র ৪ জনের জানাজা স্থানীয় শালাইপুর হাইস্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। শহীদদের নামাজে জানাজায় জামায়াত-শিবির নেতাকর্মী ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষসহ সর্বস্তরের হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মুসল্লির ঢল নামে। জানাজা শেষে নিহতদের স্ব-স্ব পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। সাঈদী মুক্তি আন্দোলনে যোগদানকৃত হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রায় ৩ শতাধিক জনতা জানাজায় সংহতি প্রকাশ করতে জানাজা মাঠে উপস্থিত হন। অপরদিকে জেলার পাঁচবিবি উপজেলার আরজড়িপুরে নিহত আয়মা রসুলপুর ইউপি জামায়াতের সেক্রেটারি ফরমান আলীর নামাজে জানাজা স্থানীয় এবতেদায়ী মাদরাসা মাঠে অনুষ্ঠিত হয়।
দৈনিক আমার দেশ, "আওয়ামী লীগের হামলা ও পুলিশি হয়রানিতে পুরুষশূন্য অনেক গ্রাম' শিরোনামে কাজী জেবেল ও নজরুল ইসলাম-এর একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশ করে যা বাংলাদেশের অনেক এলাকার সাথে মিলে যায়। "পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে জয়পুরহাটের পাঁচবিবি, কালাই ও আক্কেলপুর উপজেলার প্রায় অর্ধশত গ্রাম। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ক্যাডারদের হামলা, মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় ও পুলিশি গ্রেফতার আতঙ্কে বাড়িতে থাকতে সাহস পাচ্ছেন না তারা। বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন পুরুষ সদস্যরা। এসব গ্রামে শুধু নারী ও শিশুরা আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করছে। অনেক বাড়িঘরে তালা ঝুলছে। জেলার বাকি দুই উপজেলা ক্ষেতলাল ও সদরের বাসিন্দাদের মধ্যেও আতঙ্ক বিরাজ করছে। এতে স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে। বেশিরভাগ বাজারের অনেক দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের প্রতিবাদে বিভিন্ন স্থানে সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের গুলি ও সংঘর্ষের ঘটনার পর থেকে জয়পুরহাট শহর ও উপজেলাগুলোতে এ অবস্থা বিরাজ করছে। এ ঘটনায় পাঁচবিবিতে ৪২টি মামলা, সদর থানায় ৭টি, কালাইয়ে ৪টি ও ক্ষেতলালে ১টি মামলা হয়েছে। এতে অর্ধলক্ষাধিক মানুষকে আসামি করা হয়েছে। দুই শতাধিক মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর স্থানীয় বাসিন্দাদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে গ্রামে গ্রামে মাইকিং করছে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন। 'নিরীহ' বাসিন্দাদের 'নির্ভয়ে' বাড়িঘরে ফিরতে মাইকে ঘোষণা দেয়া হচ্ছে। তবে পুলিশের এ ঘোষণায় আস্থা রাখতে পারছেন না গ্রামবাসী। বিএনপি নেতা পাঁচবিবির কুশম্বা ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল গফুর মণ্ডল, জামায়াত নেতা সদরের বন্ধু ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম কিবরিয়া ও আমদই ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম রব্বানী চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হবে বলে জনসভায় ঘোষণা দেন আওয়ামী লীগের নেতারা। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আরও বেশি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক থাকার বিষয়টি স্বীকার করে জয়পুরহাটের জেলা পুলিশ সুপার হামিদুল আলম আমার দেশকে বলেছেন, নিরীহ বাসিন্দাদের বাড়িঘরে ফিরে আসার জন্য প্রতিটি থানায় মাইকিং করা হচ্ছে। তাদের কোনো ধরনের হয়রানি করা হবে না। তিনি বলেন, মামলা থেকে নাম বাদ দেয়ার কথা বলে অনেকের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ পেয়েছি। কেউ যাতে টাকা লেনদেন না করে সেজন্য অনুরোধ জানিয়েছি। যারা অপরাধের সঙ্গে জড়িত তাদের ছাড় দেয়া হবে না।
আওয়ামী হামলা ও পুলিশি হয়রানি এড়াতে সদর উপজেলার অন্তত ২০টি গ্রাম, পাঁচবিবিতে অন্তত ৫০টি, কালাইয়ে ২৫টি, ক্ষেতলালে ১০টি গ্রামে পুরুষ বসবাস করছেন না। গত ৩ মার্চ সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় পাঁচবিবিতে। এতে ৫ জনের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় ৪২ মামলা দায়েরের পর থেকে উপজেলার বেশিরভাগ গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। উপজেলার প্রাণকেন্দ্র পাঁচমাথার অনেক মার্কেটের দোকান গতকালও খোলেনি। আশপাশের ব্যবসায়ীরা জানান, গ্রেফতার এড়াতে এসব দোকানি আত্মগোপনে রয়েছেন। এ উপজেলার কুশম্বা, ভাড়াহুত, কাশড়া গোবিন্দপুর, ছোটো মানিক, খুবইল, শালাইপুর, গোরনা, আরজী অনন্তপুর, রতনপুর, ধরঞ্জি, বাকিলা, ছাতিনালীসহ অন্যান্য গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। এসব গ্রামে অপরিচিত কেউ গেলে মহিলা ও শিশুরা ভয়ে সরে যাচ্ছে। তারা কোনো কথা বলতে রাজি নয়। পাঁচবিবি থানার ওসি (তদন্ত) নুর হোসেন আমার দেশ-কে বলেন, গ্রামবাসীকে বাড়ি ফেরার অনুরোধ জানিয়ে মাইকিং করা হয়েছে। নিরীহ মানুষকে হয়রানি করা হবে না। একইভাবে সদর উপজেলার আমদই, পুরানাপৈল ও বন্ধু ইউপির ২০টি গ্রামে পুরুষ নেই বললেই চলে। বিষয়টি স্বীকার করে সদর খানার ওসি খায়রুল বাশার জানান, পুরানাপৈল ও আমদই ইউনিয়নের অবস্থা বেশি খারাপ। এ দুই ইউনিয়নের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে। কালাই উপজেলার মাত্রাই, ভাউজাপাতার, বলিগ্রাম, অনিহার, শমসিরা, ছিলিমপুর, শালুকগাড়ী, শাইলগুন, রঘুনাথপুর, বালাখুর, বিয়ালা, শিবসমদ্র, বেজখণ্ড, গাড়ইল, সাঁতার, উলিপুর, ভেরেন্ডী, বানদীঘি, ছত্রগ্রাম, হিমাইল, ইন্দাহার, পার্বতীপুরসহ কালাই উপজেলার মাত্রাই ইউনিয়নের অন্তত ২৭টি গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। এদিকে আওয়ামী তাণ্ডব ও পুলিশি হয়রানি থেকে দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের হয়রানি না করতে স্থানীয় প্রশাসনকে অনুরোধ জানানো হয়েছে, পাশাপাশি প্রতিটি মহল্লায় প্রতিরোধ কমিটি গঠনের কাজ চলছে এবং একই সঙ্গে বিভিন্ন উপজেলায় সভা-সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন মহল্লায় কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা সারারাত পালাক্রমে পাহারা দিচ্ছে।"
সন্ত্রাসীদের কিংবা পুলিশের অন্যায় গ্রেফতার বাণিজ্য মোকাবেলায় গ্রামের মানুষরা যেভাবে রুখে দাঁড়াচ্ছে স্মরণকালে এমন ঘটনা দেখা যায়নি।
৪. স্বজনদের কান্না
ছোটভাই মামুন মজিদুলকে স্বপ্নে দেখেছে, ফজরের নামাজের আজানের সময় তার ভাই ও অচেনা চারজন এসেছে। কী চমৎকার হাসিখুশি আর কী অদ্ভুত নুরানী চেহারা তাদের। সবাই শুনে কষ্টের মধ্যেও সান্ত্বনা খুঁজেন। মজিদুরের স্ত্রীও এই চেতনায় উদ্বুদ্ধ ছিলেন। তাই আল্লামা সাঈদী সাহেবকে নিয়ে প্রোগ্রাম শুনে তিনিও যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মজিদুল কী ভেবে বলেছিল, 'তুমি বাচ্চাদের দেখ।' রায়ের দিন ছেলে খায়রুলও যেতে চেয়েছিল কিন্তু পিতা তাকেও নেননি। স্ত্রী বিউটি আক্তার ভাবেন: শহীদ স্বামী তাকে সন্তানদের দেখার যে গুরু দায়িত্ব দিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেল। ডায়াবেটিসের কারণে এমনিতেই তিনি চোখে ভাল দেখতে পান না। মাত্র ৩০ বছর বয়সেই সাড়ে তিন বছরের মীমসহ তিন সন্তান নিয়ে আজ বিধবা হলেন। অনাগত দিনের কঠিন ও অজানা পথে তিনি এই এতিমদের নিয়ে কিভাবে হাঁটবেন?
৫. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
* নাম: শহীদ মো: মজিদুল রহমান (০৩৫), পেশা: কৃষি।
সাংগঠনিক মান: সমর্থক, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
জন্ম তারিখ: ০৮.০২.১৯৭২, ৪১ বছর। আহত হওয়ার তারিখ: ৩ মার্চ ২০১৩, বেলা ১১টা, বুকের ডান পাশ দিয়ে গুলি ঢুকে বাম পাশ দিয়ে বের হয়ে যায়।
শাহাদাতের তারিখ: ৩ মার্চ ২০১৩, বেলা ১১টা, স্থান: জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি থানার কাছে মহিপুর হাসপাতাল, দাফন করা হয়। স্থানীয় কবরস্থান।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম। কাসড়া, ডাকঘর: আমদই, কুসুম্বা থানা। পাঁচবিবি, জেলা। জয়পুরহাট।
পিতা: মো: মফিজ উদ্দীন প্রামাণিক, ৬০ বছর, কৃষক।
মাতা: হাছিনা খাতুন, ৫০ বছর, গৃহিণী।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা: মাটির তৈরি ছোট একটি ঘর। চাষাবাদের কোন জমি নেই। টিউবওয়েল ও টয়লেট নেই। কৃষিকাজ করে সংসার চালাতেন।
স্ত্রী ও সন্তানদের বিবরণ: বিউটি আক্তার, বয়স ৩০ বছর, গৃহিণী। ১ম ছেলে। মোঃ খায়রুল ইসলাম, কৃষিকাজ, বয়স ১৮ বছর, মেয়ে: মোছা: মরিয়ম, বয়স ১৫, ৬ষ্ঠ শ্রেণী, মোছা: মীম, বয়স ৩ বছর।
ভাই-বোনের বিবরণ: মোসা: মজিদা খাতুন, বিবাহিতা- স্বামী কৃষক, মোসা: আজিদা খাতুন, বিবাহিতা- স্বামী কৃষক, মোসা: ওজিদা খাতুন, বিবাহিতা- স্বামী কৃষক, মো: মামুনুর রশিদ, কৃষি।
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍