শহীদ হাফেজ নজরুল ইসলাম
আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
শহীদ হাফেজ নজরুল ইসলাম
পিতা: মৃত আব্দুল হাকিম
মাতা: জুলেখা বেগম
জন্ম: ১ জানুয়ারি ১৯৯৮
ঠিকানা: গ্রাম- অভিরামপুর, পোঃ- জয়নারায়ণপুর, উপজেলা- বেগমগঞ্জ, জেলা- নোয়াখালী
সর্বশেষ পড়ালেখা: অনার্স (রাষ্ট্রবিজ্ঞান), মাস্টার্স (রাষ্ট্রবিজ্ঞান), কামিল অধ্যয়নরত
ভাই-বোনের সংখ্যা: তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সবার ছোট
সাংগঠনিক মান: সাথী, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবির; রোকনপ্রার্থী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী
কিভাবে শহীদ হলেন: চৌমুহনী লজিং বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে ক্রসফায়ারের নাটক সাজিয়ে গুলি করে হত্যা।
শাহাদাতের তারিখ: ২ মার্চ, ২০২০
শহীদের কবর: পারিবারিক কবরস্থানে
পিতা: মৃত আব্দুল হাকিম
মাতা: জুলেখা বেগম
জন্ম: ১ জানুয়ারি ১৯৯৮
ঠিকানা: গ্রাম- অভিরামপুর, পোঃ- জয়নারায়ণপুর, উপজেলা- বেগমগঞ্জ, জেলা- নোয়াখালী
সর্বশেষ পড়ালেখা: অনার্স (রাষ্ট্রবিজ্ঞান), মাস্টার্স (রাষ্ট্রবিজ্ঞান), কামিল অধ্যয়নরত
ভাই-বোনের সংখ্যা: তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সবার ছোট
সাংগঠনিক মান: সাথী, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবির; রোকনপ্রার্থী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী
কিভাবে শহীদ হলেন: চৌমুহনী লজিং বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে ক্রসফায়ারের নাটক সাজিয়ে গুলি করে হত্যা।
শাহাদাতের তারিখ: ২ মার্চ, ২০২০
শহীদের কবর: পারিবারিক কবরস্থানে
🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ
জন্মের পর বাবা আদর করে নাম রেখেছিলেন মাহফুজুর রহমান। হাফেজী পড়ার সময় হুজুর তাঁর নাম পরিবর্তন করে রাখেন নজরুল ইসলাম। হুজুরকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করায় তিনি বলেন— তাঁর মধ্যে এমন কিছু প্রতিভা আমরা দেখতে পেয়েছি, যার দ্বারা সে ভবিষ্যতে অনেক বড় কিছু হবে। তাই তার নাম পরিবর্তন করে দিয়েছি।
জন্ম: ১ জানুয়ারি ১৯৯৮, শাহাদাতবরণ: ২ মার্চ ২০২০
শহীদের পরিচিতি
শহীদ হাফেজ নজরুল ইসলাম ১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলার অভিরামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মৃত আব্দুল হাকিম। মাতার নাম জুলেখা বেগম। তিন ভাই ও তিন বোনের সংসারে তিনি সবার ছোট। তিনি পবিত্র কোরআন হেফজ করার পর সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায় রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্স সমাপ্ত করেন। এরই সাথে সাথে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় দাখিল, আলিম ও ফাজিল পাশ করে কামিলে অধ্যয়নরত ছিলেন।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে যান
২ মার্চ ২০২০। চৌমুহনী হাজিপুরে লজিং বাড়ি থেকে দায়িত্বশীলদের ডাকে প্রোগ্রামে উপস্থিত হওয়ার উদ্দেশ্যে বের হন। বের হওয়ার সময় ফোনে কথা বলছিলেন তাঁর ভাতিজি সুমাইয়া সুলতানা তানিয়ার সাথে। এ সময় সাদা পোশাকের পুলিশ তাঁর পথ রোধ করে নাম জানতে চায় এবং হাত থেকে ফোন কেড়ে নেয়। ভাতিজি তানিয়া ব্যাপারটা বুঝতে পেরে শহীদ নজরুল ইসলামের আটক হওয়ার খবর জানায়। ওইদিন রাতের অন্ধকারে তাঁকে গুলি করে হত্যার পর গণমাধ্যমে ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে বলে সংবাদ প্রেরণ করে।
কেমন ছিলেন শহীদ হাফেজ নজরুল ইসলাম
শহীদের মেঝ ভাই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বেগমগঞ্জ উপজেলার সেক্রেটারি মো: আবু জায়েদ বলেন— জন্মের পর বাবা আদর করে তাঁর নাম রেখেছিলেন মাহফুজুর রহমান। ছোট্ট শিশু মাহফুজ হেফজখানায় লেখাপড়া করে। একদিন তার খাতায় দেখি তাঁর না লেখা— নজরুল ইসলাম। জিজ্ঞেস করে জানতে পারি হুজুর তার নাম পরিবর্তন করে দেন। আমরা হুজুরের সাথে সাক্ষাৎ করলে হুজুর জানান— “যিনি হাফেজ তাঁর কাছে কুরআন মাহফুজ (সংরক্ষিত)। আমরা তার মধ্যে কিছু প্রতিভা দেখতে পেয়েছি, ভবিষ্যতে অনেক বড় কিছু হবে সে। তাই তার নাম পরিবর্তন করে দিয়েছি।”
সত্যিকার অর্থে সে আজ জগতব্যাপী পরিচিত। এ দেশে যতদিন ইসলামী আন্দোলন থাকবে হাফেজ নজরুল ইসলামের নাম ততদিন থাকবে।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
১ মার্চ, রাত আটটায় নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলার ১ নং ইউনিয়নের আমানুল্লাহপুর বাজারে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষ হয়। ওই সংঘর্ষে ছাত্রলীগ কর্মী রাকিব নিহত হয়। স্থানীয় ছাত্রলীগ ও হলুদ মিডিয়া এই ঘটনার দায় চাপায় বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের উপর। রাকিব হত্যার দুই নং আসামী করা হয় শহীদ হাফেজ নজরুল ইসলামকে। অথচ হাফেজ নজরুল ইসলাম ১ মার্চ, ২০২০ অপর একটি মামলায় জামিনের জন্য বিকেল তিনটা পঞ্চাশ মিনিটের পরেও ছিলেন ঢাকার হাইকোর্টে। সুপ্রিম কোর্ট ওয়েব সাইট এর তথ্য অনুযায়ী ০১ মার্চ ঢাকা সুপ্রিম কোর্টের এনেক্স ১২নং কোর্টের বিচারক আব্দুল হাফিজ ও বিচারক এজারুল হক আকন্দ সমন্বিত বেঞ্চের মামলা তালিকায় (নোয়াখালী ০৫১০৭৬৪/২০২০, Tender Number:12791), সিরিয়াল-৬২২, নজরুল ইসলাম বনাম রাষ্ট্র মামলাটি বিকেল ৩ টা ৫০ এ জামিনের শুনানি শুরু হয়।
অথচ ঐ একই দিন অর্থাৎ ১ মার্চ ২০২০, রোববার রাত ৮টার দিকে নোয়াখালীর ১নং আমানুল্লাহপুর ইউনিয়নের আমানুল্লাহপুর পলোয়ান বাজারে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় নজরুল ইসলামকে আসামী দেখিয়ে মামলা দায়ের করা হয়।
ঢাকা থেকে ফেরার পর শহীদ নজরুল ইসলাম ২ মার্চ ২০২০ আলেকজান্ডার কামিল মাদরাসায় কামিল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। পরীক্ষা শেষে বন্ধুদের সাথে রায়পুরে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁর। রায়পুরে রাতে অবস্থান করে পরদিন ৩ মার্চ পরবর্তী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে আবার চৌমুহনী ফেরার কথা। লক্ষ্মীপুর পর্যন্ত আসার পর আসরের নামাজ পড়ে নজরুল ইসলাম তাঁর বন্ধুদের বলেন— আমি চৌমুহনী চলে যাব। তোমরা রায়পুরে যাও। বন্ধুরা সবাই চলে যায় রায়পুরে।
নজরুল ইসলাম চলে আসেন চৌমুহনী হাজিপুর। চৌমুহনী আনন্দ বাসস্ট্যান্ডে মাগরিবের নামাজ পড়ে লজিং বাড়িতে যান। ক্ষুধার্ত পিপাসার্ত নজরুল ইসলাম লজিং মিসেসকে বলেন— “আপু ক্ষুধায় গা কাঁপছে। কিছু খেতে দেন।” লজিং মিসেস তাঁর জন্য খাবার প্রস্তুত করছিলেন, এ সময় দায়িত্বশীল ফোন করে প্রোগ্রামে যেতে বলেন। আগের দিন ঢাকায় হাইকোর্টে জামিনের জন্য এবং পরের দিন পরীক্ষার ব্যস্ততার কারণে সাংগঠনিক বৈঠকে উপস্থিত হতে পারেননি। তাই আজ আর প্রোগ্রাম মিস করতে চাইলেন না তিনি। লজিং মিসেসকে বলেন— “আপু আমি হোটেলে খেয়ে নেব।” বলেই তিনি ভাতিজীর সাথে ফোনে কথা বলতে বলতে বেরিয়ে যান। ঘর থেকে বের হতেই কেউ একজন জিজ্ঞেস করল— “আপনি কি নজরুল?” জবাবে নজরুল ইসলাম কৌশল করে বললেন— “না, আমি সাগর।” কিন্তু হায়েনারা তাঁর পরিচয় নিশ্চিত হয়েই তাঁর কাছে এসেছে। তারা বলে— “না, আপনিই নজরুল।” এ কথা বলেই তাঁর হাত থেকে ফোন নিয়ে নেয়। ফোনের অপরপ্রান্তে থাকা শহীদের ভাতিজী বুঝতে পারে যে, পুলিশ তার চাচ্চুকে নিয়ে যাচ্ছে। সে সবাইকে তার গ্রেফতারের খবর জানাতে সক্ষম হয়। লজিং মিসেসকে বলেছিলেন রাতের খাবার হোটেল থেকে খেয়ে নেবেন, আল্লাহ জানে হায়েনারা তাঁকে আর খাবার খাওয়ার সুযোগ দিয়েছিল কিনা? পরে রাতের অন্ধকারে তাঁকে গুলি করে হত্যার পর ক্রসফায়ারের নাটক সাজিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রেরণ করে।
জামায়াতের নিন্দা
নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলার আমানুল্লাহপুর গ্রামে জামায়াতকর্মী হাফেজ নজরুল ইসলামকে পুলিশ হেফাজতে থাকাবস্থায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছে উল্লেখ করে এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান ৫ মার্চ ২০২০ একটি বিবৃতি দিয়েছেন। বিবৃতিতে তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিচারের দাবি জানান।
আপনজনদের কথা
শহীদের মেঝ ভাই আবু জায়েদ বলেন— হৃদয়ে রক্ত ক্ষরণ হচ্ছে। মনের মণিকোঠায় জ্বালা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। চারিদিকে শুধু শূন্যতা হাহাকার কলিজার টুকরা ছোট ভাই শহীদ হাফেজ নজরুল নেই। অবুঝ মন যেন মানতেই চায় না। তাঁর ছবিগুলো দেখলে জীবন্ত আশায় বুক ভরে ওঠে। অন্তর কেঁপে ওঠে। আত্মা ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায়। শুধু আরশ পানে তাকিয়ে থাকি। শ্রেষ্ঠ বিচারকের ফয়সালার অপেক্ষা করতে করতে সময় পার করছি।
লজিং মিসেস এর প্রতিক্রিয়া
হাফেজ নজরুল ইসলামের লজিং মিসেস তার শাহাদাতের সংবাদ শুনে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। হাসপাতালে নেয়ার পরে জ্ঞান আসে অনেক পরে। তিনি তিন বার বেহুঁশ হন। অনেক আফসোস করেছেন। নজরুলের মত লজিং মাস্টার পাবেন না বলে অনেক কান্না কাটি করেছেন।
ভাই-বোনদের বিবরণ
১. ইসমাঈল হোসেন, কামিল, বয়স- ৫০, পেশা- মসজিদের ইমাম ২. মো: আবু জায়েদ, কামিল, বিএবিএড, বয়স- ৪২, পেশা- হাইস্কুলে শিক্ষকতা ৩. মো ওমর ফারুক, বয়স- ৩৮, পেশা- ব্যবসা ৪. হালিমা আক্তার, বয়স- ৩৪, পেশা- গৃহিণী ৫. রাবেয়া সুলতানা, বয়স- ৩১, পেশা- গৃহিণী ৬. ফাতেমা সুলতানা, বয়স- ২৮, গৃহিণী ৭. হাফেজ নজরুল ইসলাম, শহীদ
এক নজরে শহীদ হাফেজ নজরুল ইসলাম
নাম: শহীদ হাফেজ নজরুল ইসলাম
পিতা: মৃত আব্দুল হাকিম
মাতা: জুলেখা বেগম
জন্ম: ১ জানুয়ারি ১৯৯৮
ঠিকানা: গ্রাম- অভিরামপুর, পোঃ- জয়নারায়ণপুর, উপজেলা- বেগমগঞ্জ, জেলা- নোয়াখালী
সর্বশেষ পড়ালেখা: অনার্স (রাষ্ট্রবিজ্ঞান), মাস্টার্স (রাষ্ট্রবিজ্ঞান), কামিল অধ্যয়নরত
ভাই-বোনের সংখ্যা: তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সবার ছোট
সাংগঠনিক মান: সাথী, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবির; রোকনপ্রার্থী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী
কিভাবে শহীদ হলেন: চৌমুহনী লজিং বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে ক্রসফায়ারের নাটক সাজিয়ে গুলি করে হত্যা।
শাহাদাতের তারিখ: ২ মার্চ, ২০২০
শহীদের কবর: পারিবারিক কবরস্থানে
জন্ম: ১ জানুয়ারি ১৯৯৮, শাহাদাতবরণ: ২ মার্চ ২০২০
শহীদের পরিচিতি
শহীদ হাফেজ নজরুল ইসলাম ১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলার অভিরামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মৃত আব্দুল হাকিম। মাতার নাম জুলেখা বেগম। তিন ভাই ও তিন বোনের সংসারে তিনি সবার ছোট। তিনি পবিত্র কোরআন হেফজ করার পর সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায় রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্স সমাপ্ত করেন। এরই সাথে সাথে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় দাখিল, আলিম ও ফাজিল পাশ করে কামিলে অধ্যয়নরত ছিলেন।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে যান
২ মার্চ ২০২০। চৌমুহনী হাজিপুরে লজিং বাড়ি থেকে দায়িত্বশীলদের ডাকে প্রোগ্রামে উপস্থিত হওয়ার উদ্দেশ্যে বের হন। বের হওয়ার সময় ফোনে কথা বলছিলেন তাঁর ভাতিজি সুমাইয়া সুলতানা তানিয়ার সাথে। এ সময় সাদা পোশাকের পুলিশ তাঁর পথ রোধ করে নাম জানতে চায় এবং হাত থেকে ফোন কেড়ে নেয়। ভাতিজি তানিয়া ব্যাপারটা বুঝতে পেরে শহীদ নজরুল ইসলামের আটক হওয়ার খবর জানায়। ওইদিন রাতের অন্ধকারে তাঁকে গুলি করে হত্যার পর গণমাধ্যমে ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে বলে সংবাদ প্রেরণ করে।
কেমন ছিলেন শহীদ হাফেজ নজরুল ইসলাম
শহীদের মেঝ ভাই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বেগমগঞ্জ উপজেলার সেক্রেটারি মো: আবু জায়েদ বলেন— জন্মের পর বাবা আদর করে তাঁর নাম রেখেছিলেন মাহফুজুর রহমান। ছোট্ট শিশু মাহফুজ হেফজখানায় লেখাপড়া করে। একদিন তার খাতায় দেখি তাঁর না লেখা— নজরুল ইসলাম। জিজ্ঞেস করে জানতে পারি হুজুর তার নাম পরিবর্তন করে দেন। আমরা হুজুরের সাথে সাক্ষাৎ করলে হুজুর জানান— “যিনি হাফেজ তাঁর কাছে কুরআন মাহফুজ (সংরক্ষিত)। আমরা তার মধ্যে কিছু প্রতিভা দেখতে পেয়েছি, ভবিষ্যতে অনেক বড় কিছু হবে সে। তাই তার নাম পরিবর্তন করে দিয়েছি।”
সত্যিকার অর্থে সে আজ জগতব্যাপী পরিচিত। এ দেশে যতদিন ইসলামী আন্দোলন থাকবে হাফেজ নজরুল ইসলামের নাম ততদিন থাকবে।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
১ মার্চ, রাত আটটায় নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলার ১ নং ইউনিয়নের আমানুল্লাহপুর বাজারে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষ হয়। ওই সংঘর্ষে ছাত্রলীগ কর্মী রাকিব নিহত হয়। স্থানীয় ছাত্রলীগ ও হলুদ মিডিয়া এই ঘটনার দায় চাপায় বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের উপর। রাকিব হত্যার দুই নং আসামী করা হয় শহীদ হাফেজ নজরুল ইসলামকে। অথচ হাফেজ নজরুল ইসলাম ১ মার্চ, ২০২০ অপর একটি মামলায় জামিনের জন্য বিকেল তিনটা পঞ্চাশ মিনিটের পরেও ছিলেন ঢাকার হাইকোর্টে। সুপ্রিম কোর্ট ওয়েব সাইট এর তথ্য অনুযায়ী ০১ মার্চ ঢাকা সুপ্রিম কোর্টের এনেক্স ১২নং কোর্টের বিচারক আব্দুল হাফিজ ও বিচারক এজারুল হক আকন্দ সমন্বিত বেঞ্চের মামলা তালিকায় (নোয়াখালী ০৫১০৭৬৪/২০২০, Tender Number:12791), সিরিয়াল-৬২২, নজরুল ইসলাম বনাম রাষ্ট্র মামলাটি বিকেল ৩ টা ৫০ এ জামিনের শুনানি শুরু হয়।
অথচ ঐ একই দিন অর্থাৎ ১ মার্চ ২০২০, রোববার রাত ৮টার দিকে নোয়াখালীর ১নং আমানুল্লাহপুর ইউনিয়নের আমানুল্লাহপুর পলোয়ান বাজারে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় নজরুল ইসলামকে আসামী দেখিয়ে মামলা দায়ের করা হয়।
ঢাকা থেকে ফেরার পর শহীদ নজরুল ইসলাম ২ মার্চ ২০২০ আলেকজান্ডার কামিল মাদরাসায় কামিল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। পরীক্ষা শেষে বন্ধুদের সাথে রায়পুরে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁর। রায়পুরে রাতে অবস্থান করে পরদিন ৩ মার্চ পরবর্তী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে আবার চৌমুহনী ফেরার কথা। লক্ষ্মীপুর পর্যন্ত আসার পর আসরের নামাজ পড়ে নজরুল ইসলাম তাঁর বন্ধুদের বলেন— আমি চৌমুহনী চলে যাব। তোমরা রায়পুরে যাও। বন্ধুরা সবাই চলে যায় রায়পুরে।
নজরুল ইসলাম চলে আসেন চৌমুহনী হাজিপুর। চৌমুহনী আনন্দ বাসস্ট্যান্ডে মাগরিবের নামাজ পড়ে লজিং বাড়িতে যান। ক্ষুধার্ত পিপাসার্ত নজরুল ইসলাম লজিং মিসেসকে বলেন— “আপু ক্ষুধায় গা কাঁপছে। কিছু খেতে দেন।” লজিং মিসেস তাঁর জন্য খাবার প্রস্তুত করছিলেন, এ সময় দায়িত্বশীল ফোন করে প্রোগ্রামে যেতে বলেন। আগের দিন ঢাকায় হাইকোর্টে জামিনের জন্য এবং পরের দিন পরীক্ষার ব্যস্ততার কারণে সাংগঠনিক বৈঠকে উপস্থিত হতে পারেননি। তাই আজ আর প্রোগ্রাম মিস করতে চাইলেন না তিনি। লজিং মিসেসকে বলেন— “আপু আমি হোটেলে খেয়ে নেব।” বলেই তিনি ভাতিজীর সাথে ফোনে কথা বলতে বলতে বেরিয়ে যান। ঘর থেকে বের হতেই কেউ একজন জিজ্ঞেস করল— “আপনি কি নজরুল?” জবাবে নজরুল ইসলাম কৌশল করে বললেন— “না, আমি সাগর।” কিন্তু হায়েনারা তাঁর পরিচয় নিশ্চিত হয়েই তাঁর কাছে এসেছে। তারা বলে— “না, আপনিই নজরুল।” এ কথা বলেই তাঁর হাত থেকে ফোন নিয়ে নেয়। ফোনের অপরপ্রান্তে থাকা শহীদের ভাতিজী বুঝতে পারে যে, পুলিশ তার চাচ্চুকে নিয়ে যাচ্ছে। সে সবাইকে তার গ্রেফতারের খবর জানাতে সক্ষম হয়। লজিং মিসেসকে বলেছিলেন রাতের খাবার হোটেল থেকে খেয়ে নেবেন, আল্লাহ জানে হায়েনারা তাঁকে আর খাবার খাওয়ার সুযোগ দিয়েছিল কিনা? পরে রাতের অন্ধকারে তাঁকে গুলি করে হত্যার পর ক্রসফায়ারের নাটক সাজিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রেরণ করে।
জামায়াতের নিন্দা
নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলার আমানুল্লাহপুর গ্রামে জামায়াতকর্মী হাফেজ নজরুল ইসলামকে পুলিশ হেফাজতে থাকাবস্থায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছে উল্লেখ করে এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান ৫ মার্চ ২০২০ একটি বিবৃতি দিয়েছেন। বিবৃতিতে তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিচারের দাবি জানান।
আপনজনদের কথা
শহীদের মেঝ ভাই আবু জায়েদ বলেন— হৃদয়ে রক্ত ক্ষরণ হচ্ছে। মনের মণিকোঠায় জ্বালা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। চারিদিকে শুধু শূন্যতা হাহাকার কলিজার টুকরা ছোট ভাই শহীদ হাফেজ নজরুল নেই। অবুঝ মন যেন মানতেই চায় না। তাঁর ছবিগুলো দেখলে জীবন্ত আশায় বুক ভরে ওঠে। অন্তর কেঁপে ওঠে। আত্মা ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায়। শুধু আরশ পানে তাকিয়ে থাকি। শ্রেষ্ঠ বিচারকের ফয়সালার অপেক্ষা করতে করতে সময় পার করছি।
লজিং মিসেস এর প্রতিক্রিয়া
হাফেজ নজরুল ইসলামের লজিং মিসেস তার শাহাদাতের সংবাদ শুনে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। হাসপাতালে নেয়ার পরে জ্ঞান আসে অনেক পরে। তিনি তিন বার বেহুঁশ হন। অনেক আফসোস করেছেন। নজরুলের মত লজিং মাস্টার পাবেন না বলে অনেক কান্না কাটি করেছেন।
ভাই-বোনদের বিবরণ
১. ইসমাঈল হোসেন, কামিল, বয়স- ৫০, পেশা- মসজিদের ইমাম ২. মো: আবু জায়েদ, কামিল, বিএবিএড, বয়স- ৪২, পেশা- হাইস্কুলে শিক্ষকতা ৩. মো ওমর ফারুক, বয়স- ৩৮, পেশা- ব্যবসা ৪. হালিমা আক্তার, বয়স- ৩৪, পেশা- গৃহিণী ৫. রাবেয়া সুলতানা, বয়স- ৩১, পেশা- গৃহিণী ৬. ফাতেমা সুলতানা, বয়স- ২৮, গৃহিণী ৭. হাফেজ নজরুল ইসলাম, শহীদ
এক নজরে শহীদ হাফেজ নজরুল ইসলাম
নাম: শহীদ হাফেজ নজরুল ইসলাম
পিতা: মৃত আব্দুল হাকিম
মাতা: জুলেখা বেগম
জন্ম: ১ জানুয়ারি ১৯৯৮
ঠিকানা: গ্রাম- অভিরামপুর, পোঃ- জয়নারায়ণপুর, উপজেলা- বেগমগঞ্জ, জেলা- নোয়াখালী
সর্বশেষ পড়ালেখা: অনার্স (রাষ্ট্রবিজ্ঞান), মাস্টার্স (রাষ্ট্রবিজ্ঞান), কামিল অধ্যয়নরত
ভাই-বোনের সংখ্যা: তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সবার ছোট
সাংগঠনিক মান: সাথী, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবির; রোকনপ্রার্থী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী
কিভাবে শহীদ হলেন: চৌমুহনী লজিং বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে ক্রসফায়ারের নাটক সাজিয়ে গুলি করে হত্যা।
শাহাদাতের তারিখ: ২ মার্চ, ২০২০
শহীদের কবর: পারিবারিক কবরস্থানে
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍