হোম / আওয়ামী দুঃশাসনে শহীদ / শহীদ হাফেজ আবদুল্লাহ আল সালমান
শহীদ হাফেজ আবদুল্লাহ আল সালমান

শহীদ হাফেজ আবদুল্লাহ আল সালমান

আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

শহীদ হাফেজ আবদুল্লাহ আল সালমান
পিতা: মাওলানা হাফেজ সুলতান আহমদ
মাতা: সালেহা বেগম
জন্ম: ২০ নভেম্বর ১৯৯৬ ইং
ঠিকানা: গ্রাম- উত্তর করইয়া, মুন্সিরহাট, ফুলগাজী, ফেনী
ভাই-বোনের সংখ্যা: তিন ভাই এক বোনের মধ্যে দ্বিতীয়
সর্বশেষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: আল জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদ্রাসা, ফেনী, দাখিল পরীক্ষার্থী
সাংগঠনিক মান: সাথী
কিভাবে শহীদ হলেন: শহীদ আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরের প্রতিবাদে আয়োজিত মিছিলে পুলিশের গুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে শাহাদাত বরণ করেন।
শাহাদাতের তারিখ: ১০ ডিসেম্বর ২০১৩ইং

🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ

শহীদ হাফেজ আবদুল্লাহ আল সালমান ছিলেন অসাধারণ এক মেধাবী তরুণ। ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের এই নিবেদিতপ্রাণ কর্মী হৃদয়ে শহীদ হবার তামান্না লালন করতেন। তাঁর চরিত্র ও আচার ব্যবহার ছিল অত্যন্ত উন্নত ও মাধুর্যপূর্ণ।
জন্ম: ২০ নভেম্বর ১৯৯৬, শাহাদাতবরণ: ১০ ডিসেম্বর ২০১৩

শহীদের পরিচিতি
ফেনী জেলার ফুলগাজী থানার মুন্সিরহাট ইউনিয়নের উত্তর করইয়া গ্রামের ঐতিহ্যবাহী বড় বাড়ির সন্তান শহীদ হাফেজ আবদুল্লাহ আল সালমান। বাড়িটি শহীদের পিতা মাওলানা সুলতান আহমদ সাহেবের বাড়ি নামেও পরিচিত। শহীদের পিতা মাওলানা সুলতান আহমদ একজন প্রবাসী। মা সালেহা বেগম গৃহিণী। তিন ভাই এক বোনের সংসারে সালমান ছিলেন দ্বিতীয়। ছোটবেলাতেই তিনি পবিত্র কোরআনের হিফজ সম্পন্ন করেন। মাদ্রাসা বোর্ড থেকে তিনি জেডিসি পরীক্ষায় বৃত্তিসহ জিপিএ ৫ লাভ করেন। তিনি ছিলেন ফেনীর ঐতিহ্যবাহী আল জামেয়াতুল ফালাহিয়ার ছাত্র। শাহাদাতকালে তিনি দাখিল পরীক্ষার্থী। দাখিল টেস্ট পরীক্ষায়ও তিনি জিপিএ ৫ পেয়েছেন।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে যান
১০ ডিসেম্বর ২০১৩ রাতে শহীদ আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর করার প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এর প্রতিবাদে তাৎক্ষণিকভাবে রাত ৯ টার দিকে ফেনীর কুমিল্লা বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রতিবাদ মিছিল বের করা হয়। ওই মিছিলে অংশ নেন সালমান। তিনি সামনের দিকে চলে আসেন। পুলিশ মিছিলে বাধা প্রদান করে। পুলিশি বাধা উপেক্ষা করতে চাইলে ওসি মোয়াজ্জেম নিজ হাতে শহীদ সালমানের বুকে পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করেন। গুলিটি শহীদ সালমানের শরীরকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়। ঘটনাস্থলেই তিনি শাহাদাতবরণ করেন।
কেমন ছিলেন শহীদ সালমান
তিনি ছিলেন অসাধারণ মেধাবী এক তরুণ। অল্প সময়েই তিনি পবিত্র কোরআন হেফজ করতে সক্ষম হন। এরপরও তিনি সব পরীক্ষায় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। পরিবারে তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনিই ছিলেন স্বাস্থ্যবান ও সুঠাম দেহের অধিকারী। তাঁর লক্ষ্য ছিল ডাক্তার হওয়া। সে লক্ষ্যে তিনি নিজেকে তৈরি করেছিলেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি অন্যদের থেকে আলাদা প্রকৃতির। ছোটবেলায় তিনি যা কিছু পড়তেন সুর করে পড়তেন, হোক সে বাংলা, ইংরেজী কিংবা আরবি। এজন্যই পিতা তাকে কোরআনে হাফেজ বানানোর চিন্তা করেন এবং শহীদের দাদার সঙ্গে আলাপ করে তাকে হেফজ বিভাগে ভর্তি করিয়ে দেন। শহীদ সালমানের বন্ধু মাঈনুদ্দিন একবার কারাবরণ করেন। তিনি মুক্ত হয়ে আসার পর শহীদ সালমান তাকে বলেছিলেন, ‘আমরা একসাথে থাকি, একসাথে খাই, একসাথে ওঠাবসা করি, আর তুই কিনা আমাকে রেখে একা একাই কারাগারে চলে গেলি।’
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
ইসলামী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দকে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করার উদ্দেশ্যে সরকার যে প্রহসনের বিচার কার্য শুরু করে এর মাধ্যমে শহীদ আবদুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়। ২০১৩ সালের ১০ ডিসেম্বর রাতে এই দণ্ডাদেশ কার্যকর করার জন্য প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এরই প্রতিবাদে তাৎক্ষণিকভাবে বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করা হয়। পুলিশ এই মিছিলে বাধা প্রদান করে এবং গুলিবর্ষণ শুরু করে। পুলিশের বাধার মুখে বিক্ষুব্ধ জনতা প্রতিবাদ জানাতে থাকলে এক পর্যায়ে ওসি নিজ হাতে পিস্তল ঠেকিয়ে সালমানের বুকে গুলি করে। তখন ছাত্র ও সাধারণ জনতা সালমান হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও রাজপথ অবরোধ করে। এইদিকে রাত ১টায় ছাত্রলীগ পুলিশের সহায়তায় লাশ নিয়ে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করে। লাশ না পেয়ে ফালাহিয়া অফিস ও ডাইনিং রুম ভাঙচুর করে, আবাসিক ছাত্রদের উপর হামলা করে। এতে প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয় এবং শিক্ষার্থীদের নগদ টাকা, মোবাইল, ঘড়িসহ গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র লুট করে। তৎক্ষণাৎ ছাত্রজনতার বাধার মুখে ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়। পরে পুলিশ পুনরায় এসে ২০ জন নিরপরাধ ছাত্র ও ৩ জন শিক্ষককে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। এই ঘটনায় উল্টো মাদরাসার অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষসহ শিক্ষকদের নাম উল্লেখ করে একটি মামলা দায়ের করে।
শহীদের আপন জনদের কথা
শহীদের বাবা বলেন, বাগানের সবচেয়ে সুন্দর ফুলটিকেই মালিক তুলে নেয়। আমার সন্তান সালমানকে আল্লাহ পছন্দ করেছেন বিধায় আল্লাহ তাকে তুলে নিয়ে গেছেন। আমি শহীদের পিতা হিসেবে গর্বিত। আমি তার জান্নাতের সুউচ্চ মাকাম কামনা করি। শহীদের আম্মা জানান, একদিন তিনি ঘরে বসে চিন্তা করছিলেন যে, কোন পরিবারে ছোট ছেলে-মেয়ে বা যে কোন সন্তান কিংবা বাবা-মা যদি মৃত্যুবরণ করে তখন ওই পরিবারটি কি অবস্থায় হয়। এ কথা চিন্তা করতে করতে তাঁর চোখে পানি এসে যায়। এমন সময় শহীদ সালমান তাঁর সামনে গিয়ে হাজির হন। মায়ের কাছে জানতে চান, “কেন তাঁর চোখে পানি?” মা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন এবং বলেন যে, নিজের পিতা মাতার কথা মনে পড়ায় চোখে পানি এসে গেছে। তিনি বলেন, তখন ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারিনি যে, আমার ছেলেই শহীদ হয়ে যাবে। শহীদের বড় ভাই নোমান বলেন, ও যখন হেফজ পড়ছিল, তখন প্রতি শুক্রবার আমি ওকে বাড়িতে আনতে যেতাম। কোন কারণে যদি এক শুক্রবার যাওয়া না হতো পরের শুক্রবার গেলে ওর বন্ধুরা বলতো ও আপনার জন্য ওইদিন সারাদিন অপেক্ষা করেছে। খুব মন খারাপ ছিল ওর। তিনি বলেন, আমাদের পরিবারে সবার চেয়ে মেধাবী, ধী-শক্তি-সম্পন্ন ছিল সে। পারিবারিক যে কোন ব্যাপারে তাঁর মতামতগুলো আমাদের চাইতে উত্তম হতো। শহীদের ছোট ভাই সাঈদ বলেন, আমার ভাইয়ার ইচ্ছা ছিল ডাক্তার হওয়ার। কিন্তু তার আগেই তিনি শহীদ হয়ে গেছেন। এজন্য আব্বা-আম্মা আমাকে ডাক্তার বানানোর স্বপ্ন দেখেন। আমার ভাইয়ের সাথে আমার চেহারা, মেজাজ-মর্জি ইত্যাদিতে অসম্ভব রকম একটা মিল আছে। এজন্য আব্বু-আম্মু আমাকে ডাক্তার হওয়ার কথা বলেন। আমি ভাইয়া ও আব্বু-আম্মুর স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছি। আল্লাহ আমাদের কামিয়াব করুন।
ভাই-বোনদের বিবরণ
১। বড় ভাই : আবদুল্লাহ আল নোমান : চাকুরীজীবী। ২। ছোট ভাই : আবদুল্লাহ আল সাঈদ : শিক্ষার্থী। ৩। ছোট বোন : ফাতেমাতুজ জোহরা : শিক্ষার্থী।
গণমাধ্যমে শাহাদাতের খবর
ফেনীতে পুলিশের গুলিতে শিবির কর্মী হাফেজ আবদুল্লাহ আল সালমানের দাফন সম্পন্ন হয় তার নিজ উপজেলার ফুলগাজীর করইয়া গ্রামে। ১ম জানাজা তার নিজ প্রতিষ্ঠান আল জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদরাসার মাঠে এবং ২য় জানাজা ফুলগাজী উপজেলা জামায়াত ও শিবিরের উদ্যোগে পুরাতন মুন্সিরহাটে অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় অংশ নিতে এসে দরবারপুর ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য ও বি.এন.পি দরবারপুর ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি শহিদুল ইসলাম ডালিম মেম্বার (৫৫) শোকে হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যু বরণ করেন। এ সময় ফুলগাজীর মুন্সিরহাটে জানাজাটি একটি জনস্রোতে পরিণত হয় এবং জানাজার পূর্বে আসরের নামাজের পরে মুন্সিরহাট বাজারের আবদুল্লাহ আল সালমানের হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করে জামায়াত শিবির ও সাধারণ। যখন সালমানের লাশ এসে উপস্থিত জনতার মাঝে হাজির হয় তখন এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। এবং সবাই এক যোগে বলতে থাকে ২০১৪ সালের মুন্সিরহাট বাজারের সর্বকালের সর্ববৃহৎ জানাজা এটি। সবাই হাফেজ সালমানের জন্য দোয়া ও মাগফিরাত কামনা করেন। পরে ৩য় জানাজাটি মাগরিবের নামাজের পরে তার নিজ গ্রামে অনুষ্ঠিত হয়। এখানেও হাজার হাজার লোকের সমাগম ঘটে।

এক নজরে শহীদ হাফেজ আবদুল্লাহ আল সালমান
নাম: শহীদ হাফেজ আবদুল্লাহ আল সালমান
পিতা: মাওলানা হাফেজ সুলতান আহমদ
মাতা: সালেহা বেগম
জন্ম: ২০ নভেম্বর ১৯৯৬ ইং
ঠিকানা: গ্রাম- উত্তর করইয়া, মুন্সিরহাট, ফুলগাজী, ফেনী
ভাই-বোনের সংখ্যা: তিন ভাই এক বোনের মধ্যে দ্বিতীয়
সর্বশেষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: আল জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদ্রাসা, ফেনী, দাখিল পরীক্ষার্থী
সাংগঠনিক মান: সাথী
কিভাবে শহীদ হলেন: শহীদ আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরের প্রতিবাদে আয়োজিত মিছিলে পুলিশের গুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে শাহাদাত বরণ করেন।
শাহাদাতের তারিখ: ১০ ডিসেম্বর ২০১৩ইং

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍