হোম / আওয়ামী দুঃশাসনে শহীদ / শহীদ মাওলানা সেকান্দার আলী
শহীদ মাওলানা সেকান্দার আলী

শহীদ মাওলানা সেকান্দার আলী

আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

শহীদ মাওলানা সেকান্দার আলীর জীবন ছিল নীরব সংগ্রাম আর মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসার এক দীপ্ত প্রতিচ্ছবি। দরিদ্র পরিবারে জন্ম নিয়েও তিনি জ্ঞান ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোকে নিজের জীবনের ব্রত বানিয়েছিলেন। নন-এমপিও শিক্ষকদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে মুখোমুখি হয়েছেন টিয়ার গ্যাস, পিপার স্প্রে, লাঠির আঘাত কিন্তু তার মন ভাঙেনি কখনো। শেষ পর্যন্ত শিক্ষকদের ন্যায়বিচারের সেই পথেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। শোকাহত রেখে গেলেন স্ত্রী, চার কন্যাসন্তান ও বৃদ্ধা মা। তার আত্মত্যাগ আজও মনে করিয়ে দেয় মানুষের অধিকারের জন্য দাঁড়ানো এক মহৎ ইবাদত, আর সত্যের পথে হাঁটলে সাধারণ জীবনও হয়ে ওঠে শহীদির নক্ষত্রখচিত আলোয় আলোকিত।

🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ

শহীদ মাওলানা সেকান্দার আলী
পটুয়াখালী-২
রাজধানীর ন্যাম ভবনে সংসদ সদস্যদের কাছে স্মারকলিপি দিতে যাওয়া আন্দোলনরত শিক্ষকদের আবারো মরিচের গুঁড়া মিশ্রিত পিপার গ্যাস ছুঁড়ে ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে পুলিশ। এ দিকে গত বৃহস্পতিবার শহীদ মিনারে পুলিশের মরিচের গুঁড়া মিশ্রিত টিয়ার স্প্রেতে অসুস্থ হওয়া পটুয়াখালীর এক মাদরাসা শিক্ষক গতকাল মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৪টায় মারা গেছেন বলে জানিয়েছেন নন-এমপিও শিক্ষক কর্মচারী ঐক্যজোটের সভাপতি অধ্যক্ষ এশারত আলী।

১. শহীদের পরিচিতি
শহীদ মাওলানা সেকান্দার আলী পটুয়াখালী জেলার দুমকী থানার চরবয়ড়া গ্রামে ১৯৭০ জনন্মগ্রহণ করেন। পিতা রুস্তুম আলী ঘরামী ও মাতা সুরাতুন্নেছা বেগমের সন্তান শহীদ মাওলানা সেকান্দার আলী। ৫ ভাই ৩ বোনের সংসারে দরিদ্র পিতামাতা কোন রকম সন্তানের মুখে দুটো অন্ন এবং কাপড়ের ব্যবস্থা করতেই ব্যতিব্যস্ত ছিলেন। পারেননি পড়ালেখার ভাল কোন ব্যবস্থা করতে। মাওলানা সেকান্দার আলী, নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের পটুয়াখালী জেলা সাংগঠনিক সম্পাদক ও মাদরাসা শিক্ষক পরিষদের জেলা সেক্রেটারি। বৃহত্তর ইসলামী আন্দোলনের দায়িত্বশীল এবং ওয়ামীর শিক্ষকদের প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে একাধিকবার অংশগ্রহণ ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। মৃত্যুকালে তিনি তার বয়স্কা মা এবং স্ত্রী কুলসুম বেগম, মেয়ে সিরাজুম মনিরা (১৫) ১০ম শ্রেণী, সুমাইয়া আক্তার (১২)-৮ম শ্রেণী, মাহিরা (৩)-এখনও স্কুলে যাওয়ার বয়স হয়নি। তানিসা (৮ মাস) নামক চার সন্তান রেখে যান।

২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
২০১৩ সালের গত ৯ থেকে ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত ঢাকায় নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির দাবিতে শিক্ষকদের আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। সেখানে অন্য শিক্ষকদের সঙ্গে মাওলানা সেকান্দার আলী প্রতিদিনই পুলিশের টিয়ার শেল, মরিচের গুঁড়া মিশ্রিত স্প্রে ও লাঠি পেটার শিকার হন। সেখান থেকে ১২ জানুয়ারি রাতে অসুস্থ অবস্থায় গাড়িতে পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার নিজ বাড়িতে পৌঁছেন তিনি। কিন্তু বাড়িতে ফিরে পুলিশের হয়রানির ভয়ে পাশের বাড়িতে রাতে ঘুমিয়ে ছিলেন। সোমবার রাত আড়াইটার দিকে হঠাৎ মারাতাক অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেখানেই জ্ঞান হারান মাওলানা সেকান্দার আলী। পরে রাত ৪টার দিকে দুমকি উপজেলা সদরে লুথান হেলথ সেন্টারে নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয় (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

৩. শাহাদাতের পূর্বের বিভিন্ন ঘটনা
তিনি চর বয়রা মহিলা দাখিল মাদরাসার অবৈতনিক সুপার ছিলেন। এদিকে দেশের নন-এমপিওভুক্ত মাদরাসা ও স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারীরা তাদের দাবি আদায়ে ঢাকায় অবস্থান কর্মসূচি, শিক্ষামন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ঘেরাও ও স্মারকলিপি প্রদানের কর্মসূচি পালনের চেষ্টা করেন। মাওলানা সেকান্দার আলী বৃহত্তর ইসলামী আন্দোলনের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এবং শিক্ষকদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে প্রথম কাতারে থেকে আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। এতে তিনি পুলিশ বাহিনীর হাতে বার বার চরম নির্যাতন ও ২বার গ্রেফতারের শিকার হন। এতে তিনি শারীরিক ও মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন।

৪. সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
২০১৩ সালের ৯ থেকে ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত ঢাকায় নন-এমপিওভূক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভূক্তির দাবিতে শিক্ষকদের আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। সেখানে অন্য শিক্ষকদের সঙ্গে মাওলানা সেকান্দার আলী প্রতিদিনই পুলিশের টিয়ার শেল, মরিচেরগুঁড়া মিশ্রিত স্প্রে ও লাঠি পেটার শিকার হন। ১৬ জানুয়ারি, ২০১৩ দৈনিক সংগ্রামে এ সংক্রান্ত বিস্তারিত নিউজ আসে;
স্প্রেতে আহত শিক্ষকের মৃত্যু ন্যাম ভবনের সামনে আবারো শিক্ষকদের ওপর পিপার গ্যাস।
স্টাফ রিপোর্টার: এমপিওর দাবিতে রাজধানীর ন্যাম ভবনে সংসদ সদস্যদের কাছে স্মারকলিপি দিতে যাওয়া আন্দোলনরত শিক্ষকদের আবারো মরিচের গুঁড়া মিশ্রিত পিপার গ্যাস ছুঁড়ে ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে পুলিশ। এ দিকে গত বৃহস্পতিবার শহীদ মিনারে পুলিশের মরিচের গুড়া মিশ্রিত টিয়ার স্প্রেতে অসুস্থ হওয়া পটুয়াখালীর এক মাদরাসা শিক্ষক গতকাল মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৪টায় মারা গেছেন বলে জানিয়েছেন নন-এমপিও শিক্ষক কর্মচারী ঐক্যজোটের সভাপতি অধ্যক্ষ এশারত আলী।
গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১১টা থেকে ন্যাম ভবনের সামনে এবং মানিক মিয়া এভিনিউয়ের পশ্চিম পাশে অবস্থান করছিলেন প্রায় তিনশত শিক্ষক। দুপুর ১২টা থেকে সংসদ সদস্যদের বাসায় গিয়ে স্মারকলিপি প্রদানের সিদ্ধান্ত ছিল সংগঠনের। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পুলিশ ন্যাম ভবনের সামনে থেকে সরিয়ে দেয় শিক্ষকদের। পরে মানিক মিয়া এভিনিউ এবং সোবহানবাগে বিক্ষিপ্তভাবে শিক্ষকরা অবস্থান নিলে পুলিশ সেখান থেকেও চলে যেতে বলে। এক পর্যায়ে দুপুর ১২টার দিকে শিক্ষকদের ছত্রভঙ্গ করতে আবারো মরিচের গুঁড়া মিশ্রিত টিয়ার স্প্রে এবং গরম পানি ছোঁড়ে পুলিশ। আন্দোলনরত শিক্ষকরা অভিযোগ করেছেন, পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী তারা ন্যাম ভবনের সামনে অনশন করতে রওনা হলে মানিক মিয়া এভিনিউয়ের পশ্চিম পাশে পুলিশ তাদের ধাওয়া করে সোবহানবাগ পর্যন্ত নিয়ে যায়। শিক্ষকরা তাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত রাজপথ ছাড়বেন না বলেও ঘোষণা দেন।
সোবহানবাগের প্রিন্স প্লাজার সামনে শিক্ষক-কর্মচারীরা অবস্থান নিতে চাইলে পুলিশ তাদের ওপর আবারো জলকামান থেকে পানি ও তরল কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। এতে ১০-১৫ জনের মতো আহত হয়েছেন। আহতদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেয়া হয়েছে।
এশারত আলী অভিযোগ করেন, এমপিওর দাবিতে ঢাকায় আন্দোলন করতে এসেছিলেন নন-এমপিও শিক্ষক কর্মচারী ঐক্যজোটের পটুয়াখালী জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ সেকান্দার আলী (আনুমানিক ৪৫)। তিনি জেলার দুমকি উপজেলার চরবয়রা দাখিল বালিকা মাদরাসার শিক্ষক ছিলেন।
এশারত আলী বলেন, আন্দোলনের প্রথম দিন থেকেই তিনি সক্রিয় ছিলেন। গত বৃহস্পতিবার শহীদ মিনারে শিক্ষকরা আমরণ অনশন কর্মসূচি পালন করার সময় পুলিশ সেখানে বাধা দেয়। শিক্ষকদের তাড়াতে পুলিশ মরিচের গুঁড়া মিশ্রিত টিয়ার স্প্রে মারে। সরাসরি নাক, মুখ এবং চোখে এ বিষাক্ত স্প্রে প্রবেশ করলে গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন সেকান্দার আলী।
সংগঠনের সভাপতি জানান, তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকায় প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হলেও বিকেলের দিকে আবারও অসুস্থ হয়ে পড়েন এ মাদরাসা শিক্ষক। বৃহস্পতিবারই তাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। সেখানে অবস্থার আরও অবনতি হয় তার। চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েও বাঁচানো যায়নি সেকান্দার আলীকে। অবশেষে গতকাল মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৪টায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি। পুলিশের ছোড়া স্প্রের কারণেই সেকান্দার আলীর মৃত্যু হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন এশারত।
এশারত আলী বলেন, গণতান্ত্রিক দেশে এরকম শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে বাধা দেয়া মৌলিক অধিকার হরণ করার শামিল। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি, এমপিওভুক্তকরণসহ আমাদের দাবিগুলো মেনে নিয়ে ক্লাসে ফিরে যেতে সহায়তা করুন।

৫. শহীদের আপনজনদের কথা
মাওলানা সেকান্দার আলীর ভাগিনা মাওলানা হাবিবুর রহমান জানান, তিনি ঢাকায় পিপার স্প্রে ও লাঠি পেটার শিকার হয়ে আহত অবস্থায় বাড়ি ফিরেন। সেই অসুস্থতায় হার্ট স্ট্রোক করে মৃত্যু বরণ করেন। তার পরিবারে ৪ মেয়ে, স্ত্রী এবং মা জীবিত আছেন।

৬. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম: শহীদ মাওলানা সেকান্দার আলী (১১৪)।
পেশা: চাকরিজীবী।
জন্ম তারিখ ও বয়স: ০৫.০৬.১৯৭০ইং। বয়স ৪৪ বছর।
আহত হওয়ার তারিখ: ৯.১০.১১.১২ জানুয়ারি'১৩।
শাহাদাতের তারিখ: ১৪.০১.১৩, দিবাগত রাত ৪টা।
স্থান: দুমকি উপজেলা সদরে লুথান হেলথ সেন্টারে নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম-চরবয়ড়া, ডাকঘর-চরবয়ড়, থানা-দুমকি, জেলা-পটুয়াখালী।
পিতা: মৃত্যু রুস্তুম আলী ঘরামী, কাঠমিস্ত্রী ছিলেন এবং ১৯৭১ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
মাতা: সুরাতুন্নেছা বেগম, বয়স প্রায় ৬৫ বছর, গৃহিণী।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা: বাড়ির চারপাশে দেওয়াল এবং উপরে টিনের ছাউনি। উপার্জন করার কেউ নেই। কৃষি কাজ করার জন্য কোন জমি নেই।
স্ত্রী ও সন্তানদের বিবরণ: স্ত্রী: কুলসুম বেগম। মেয়ে: সিরাজুম মনিরা (১৫)-১০ম শ্রেণী, সৃজনী বিদ্যানিকেতন, দুমকি। সুমাইয়া আক্তার (১২)-৮ম শ্রেণী, সৃজনী বিদ্যানিকেতন। মাহিরা (৩)-এখনও স্কুলে যাওয়ার বয়স হয়নি। তানিসা (৮ মাস)।

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍