শহীদ মো: সিরাজুল ইসলাম
আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
শহীদ মো: সিরাজুল ইসলামের জীবন ছিল সংগ্রাম, সততা আর অদম্য সাহসের এক মর্মস্পর্শী যাত্রা। অভাবের সংসারে বড় হতে না পারলেও তিনি পরিশ্রম ও আমানতের শক্তিকে আঁকড়ে ধরেছিলেন। করিমন চালানো থেকে ধান ভাঙানো, সব কাজেই ছিল তার নিষ্ঠার ছাপ। অন্যায়ের মুখে তিনি কখনো পিছিয়ে যাননি; মানুষের প্রতি তার মমতা ও দায়িত্ববোধই তাকে শেষবারের মতো পিকেটিংয়ের মাঠে দাঁড় করায়। বন্ধুকে উদ্ধারে ছুটে যাওয়া সেই মুহূর্তেই তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেন ন্যায় ও বিশ্বাসের পথে। রেখে যান এক দেড় বছরের কন্যা, শোকাহত পরিবার আর অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী হয়ে থাকা এক সাহসী, মানবিক মানুষের স্মৃতি।
🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ
শহীদ মো: সিরাজুল ইসলাম
পাবনা-১
"সিরাজুল অত্যন্ত সাহসী ছিল। ঘটনার দিন তার বন্ধু আলমকে সে বলেছিল, 'পুলিশ গুলি করছে, লোকজনকে মেরে ফেললো, তাদের নিয়ে আসতে হবি, চল যাই।' সকালে বাড়ি থেকে বিদায় নেওয়ার সময় স্ত্রীকে বলেছিল, 'আজকে আমার শেষ মিছিল যা হয় হবি। তার ঘোষণা ছিল, 'নেতৃবৃন্দের জন্যে প্রয়োজনে শহীদ হব।' আল্লাহ তার প্রত্যাশাকে পূর্ণ করেছেন। তার স্ত্রী স্বপ্নে দেখেছে, 'সিরাজুল বলছে, আমি ভাল আছি। আর শুধু কালেমা পড়ছে।"
১. শহীদের পরিচিতি
শহীদ মো: সিরাজুল ইসলাম পাবনা জেলার সদর উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে ১৯৮৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন পিতা আব্দুল কুদ্দুস ও মাতা রাবেয়া খাতুনের চার সন্তানের মধ্যে তৃতীয়। অভাবের সংসার হওয়ায় পিতা-মাতা সন্তানদের জন্য দু'বেলা দু'মুঠো খাবার যোগাড় করতেই ব্যস্ত ছিলেন। পারেননি তাদের পড়া-লেখার কোন ব্যবস্থা করতে। তাইতো সিরাজুল ইসলাম প্রাথমিকের গন্ডিও পেরোতে পারেননি। পিতার সাথে ধরতে হয়েছে সংসারের হাল। আয় রোজগারের জন্য চালিয়েছেন করিমন নামক ইঞ্জিন চালিত গাড়ি। ফাঁকে ফাঁকে করেছেন বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধান ভাঙানোর কাজ। মাত্র সাড়ে তিন বছর আগে বিয়ে করেছেন। তাদের রয়েছে মীম নামে মাত্র ১৫ মাসের একটি ফুটফুটে কন্যাসন্তান। পিতা-মাতা ও স্ত্রী-সন্তান নিয়ে দেখছিলেন সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন। কিন্তু স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের ঘাতক বুলেট তার সে স্বপ্নকে ভেঙে খান খান করে দেয়।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
দিনটি ছিল ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩। ফজরের নামাজ পড়ে সিরাজুল ইসলাম তার করিমন নিয়ে বের হন। কিন্তু বাংলাদেশ ছাত্রলীগের অত্যাচার ও তাণ্ডবের প্রতিবাদে জামায়াতের আহবানে সেদিন পাবনায় ছিল অর্ধদিবস হরতাল। শহীদ মো: সিরাজুল ইসলাম হরতালের কারণে করিমন রেখে হরতাল সফল করতে পিকেটিং এ যান। হরতাল পালন করতে পুষ্পপাড়া সড়কে অবস্থান করে সাধারণ জনতা। এ সময় পুলিশ তাদের ওপর হামলা করে এবং নির্বিচারে গুলি করে। এতে ধোপাঘাটা মোড় এলাকায় শহীদ মো: সিরাজুল ইসলাম কপালে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই শহীদ হন। এছাড়াও আরো অনেকেই গুলিবিদ্ধ হন।
শহীদের জানাযার নামাজে ইমামতি করেন মাওলানা জহুরুল ইসলাম। জানাযায় প্রায় ২৫ হাজার লোক উপস্থিত হন। জানাযা পরবর্তী বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।
৩. সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
দিনটি ছিল ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩। সেদিন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের অত্যাচার ও তাণ্ডবের প্রতিবাদে জামায়াতের আহবানে পাবনায় ছিল অর্ধদিবস হরতাল। হরতাল পালন করতে পুষ্পপাড়া সড়কে অবস্থান নেয় সাধারণ জনতা। এ সময় পুলিশ তাদের ওপর হামলা করে এবং নির্বিচারে গুলি করে। এতে ধোপাঘাটা মোড় এলাকায় মো: সিরাজুল ইসলাম কপালে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই শহীদ হন। এছাড়াও আরো অনেকেই গুলিবিদ্ধ হন। পরের দিন জাতীয় পত্রিকাসমূহে এ বিষয়ে বিস্তারিত নিউজ আসে।
২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ দৈনিক সংগ্রামে নিউজ আসে; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আওয়ামী ক্যাডারদের সশস্ত্র হামলা। শহরে বিজিবি মোতায়েন পাবনায় হরতালে পুলিশের গুলিতে ২ জামায়াত কর্মী নিহত আহত ৫০।
পাবনা সংবাদদাতা:
পাবনায় জামায়াত-শিবির অফিসে অগ্নিসংযোগ, পত্রিকা অফিসে আগুন ও মাওলানা
আব্দুস সুবহানের বাড়িতে হামলার প্রতিবাদে জেলা জামায়াতের ডাকা অর্ধদিবস হরতাল চলাকালে পুলিশের গুলিবর্ষণে জামায়াত কর্মী আলাল হোসেন (২২) ও সিরাজুল ইসলাম (২৫) নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে কমপক্ষে ৫০ জন। এর মধ্যে গুলিবিদ্ধ দুজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। আহতদের হাসপাতালে ভর্তি করলে অনেককে বেডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গ্রেফতার করে পুলিশ। এ পর্যন্ত ২৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। দিন ভর আওয়ামী লীগ যুবলীগের ক্যাডাররা শহরে পুলিশের সহায়তায় জামায়াত নিয়ন্ত্রিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলা করে। পরে জনতার প্রতিরোধে পিছু হটতে বাধ্য হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য বিজিবি ও রেঞ্জরিজার্ভ পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। জামায়াতের ২ কর্মী নিহত ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে জেলা জামায়াত আগামী সোমবার বিক্ষোভ ও মঙ্গলবার দোয়া দিবস কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, মহাসড়ক অবরোধ, টায়ারে আগুন ও বিক্ষোভের মধ্যদিয়ে গতকাল শনিবার পাবনা জেলায় শুরু করে জামায়াতের ডাকা আধা বেলার হরতাল। পাবনা জেলা জামায়াত-শিবিরের অফিস ও স্থানীয় দৈনিক জীবনকথা পত্রিকার অফিসে ভাঙচুর, লুটতরাজ ও অগ্নিসংযোগ, ৩টি ব্যাংকে ভাঙচুর, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আইনজীবীদের বাসভবন এবং সাবেক সংসদ সদস্য মাওলানা আব্দুস সুবহানের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর, লুটতরাজ ও অগ্নিসংযোগের প্রতিবাদে এ হরতালের ডাক দেয় জেলা জামায়াত। এ দিনে ভোর ৬টা থেকে পাবনা-ঢাকা মহাসড়কের জালালপুর, মন্দিরপুর, ধোপাঘাটা, পূর্বপাড়া, মাধপুরসহ বেশ কয়েকটি স্থানে গাছের গুঁড়ি ফেলে, টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে ও লাঠিসোটা নিয়ে অবরোধ করে হরতাল সমর্থক জামায়াত-শিবির কর্মী ও পিকেটাররা। এছাড়া আধা বেলা হরতালের সমর্থনে সকালে শহরের মাসুম বাজার থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করে বাস টার্মিনাল প্রদক্ষিণ করে জামায়াত-শিবির কর্মীরা। হরতাল চলাকালে শহরের অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ ছিল। কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লার যানবাহন ছেড়ে যায়নি এবং বাইরে থেকে কোনো যান পাবনায় আসেনি। বন্ধ ছিল আন্তঃজেলা রুটে সকল যানবাহন চলাচল। পাবনা সদর উপজেলার ঢাকা-পাবনা মহাসড়কের ধুপাঘাটা এলাকায় পিকেটিং করলে পুলিশ এসে অতর্কিত গুলি চালায় জামায়াত-শিবির কর্মীদের ওপর। এসময় গুলিবিদ্ধ হয়ে ধর্মগ্রাম এলাকার শমসের আলীর ছেলে আলাল হোসেন (২২) ও মনোহরপুর এলাকার আবদুল কুদ্দুসের ছেলে সিরাজুল ইসলাম (২৫) নিহত হয়। আহত হয় কমপক্ষে ৩৫ জন। এছাড়া মধুপুরে পুলিশের গুলিতে আহত হয় ১৫ জন। নিহতদের লাশ পুলিশ হেফাজতে রয়েছে বলে পরিবার জানিয়েছে। সন্ধ্যা পর্যন্ত তাদের লাশ সজনদের কাছে পৌঁছানো হয়নি। আহতদের পাবনা জেনারেল হাসপাতাল ও বিভিন্ন ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। এদের মধ্যে দুজনের অবস্থা আশংকাজনক হলে তাদের রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এসব রোগীদের চিকিৎসাধীন অবস্থায় গ্রেফতার করেছে পুলিশ। রোগীদের সেবার জন্য আসা সজনদেরও এসময় গ্রেফতার করা হয়। আহত গ্রেফতারকৃতরা হলেন, আব্দুল হাকিম (৫১), ওহিদুল ইসলাম (২১), রাবিব (২০), মহসিন (১৮), সাইফুল ইসলাম (১৯), সরোয়ার আলম (১৮), আল-আমীন (১৮), এবাদত (২০), সুমন (২০), রহিজুল ইসলাম (২৫), আলমগীর (২২), আব্দুল আলিম মৃধা (৩৭), শিহাবউদ্দীন (১৯), শফিউল ইসলাম (২৭), সাদ্দাম (১৮), রিপন (১৮), আলম (২৫), আব্দুস সুবহান (৫৫), আরিফুল ইসলাম (২৫), আবুল হাসান (৩৫), শাহীন ইসলাম (১৯), রহিম উদ্দীন (৫৫), সাগর শেখ (১৮)। এদেরকে বিকালে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে।
পাবনা সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নুরে আলম জানান, জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীরা সকালে মহাসড়ক অবরোধ করলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। এ সময় তারা পুলিশের ওপর চড়াও হলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। কিন্তু এরপরও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে পুলিশ তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। নিহত ২ জামায়াত কর্মীর গ্রাম মনোহরপুর ও ধর্মগ্রামে এখন শোকের মাতম চলছে। উভয়ের ময়নাতদন্ত হয়েছে, রিপোর্ট প্রস্তুত না হওয়ায় সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত কোন মামলা দায়ের হয়নি বলে জানিয়েছে সদর থানার ওসি জসিম উদ্দিন সরকার।
এদিকে হরতাল চলাকালে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে হরতাল বিরোধী একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় টার্মিনাল বাইপাস মোড়ে। এ সময় তারা কয়েকটি মোটর-সাইকেলে করে ভারী অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিতে দেখা গেছে বলে জানিয়েছে প্রত্যক্ষদর্শীরা। সমাবেশ শেষে তাদের নেতৃত্বে সমাবেশে অংশগ্রহণকারী আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সশস্ত্র শতাধিক ক্যাডার ট্রাস্টে হামলা করার জন্য ট্রাস্টের মূল ফটকের দিকে অগ্রসর হয়। এ সময় মাদরাসা-কলেজের হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রী, শিশু, অভিভাবকসহ শিক্ষকরা আতংকিত হয়ে ওঠে। তারা ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে শ্রেণীকক্ষে আশ্রয় নিতে থাকে। ট্রাস্ট ক্যাম্পাসের মসজিদ থেকে দেশের শীর্ষস্থানীয় এই বহুমুখী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রক্ষার্থে এলাকাবাসীর সহযোগিতা চাওয়া হলে স্থানীয় শত শত নারী পুরুষ তাদের সন্তানদের ও প্রতিষ্ঠানগুলো রক্ষার্থে বাঁশ ও কাঠের লাঠি-সোটা নিয়ে দারুল আমান ট্রাস্ট ময়দানে অবস্থান নেন। শিশু থেকে শুরু বৃদ্ধ পর্যন্ত সকল বয়সী হাজার হাজার ইসলামপ্রিয় জনতা লাঠি-সোটা নিয়ে মাদরাসা প্রাঙ্গণে জড়ো হন। সকাল সাড়ে ৯টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত প্রায় ৩ ঘণ্টা এরূপ আতংকিত অবস্থা চলতে থাকে। এর পরপরই এই প্রতিষ্ঠানে হামলা ঠেকাতে পুলিশের একটি থ্রি-টোন ভ্যান রাস্তায় দাঁড় করিয়ে এবং পুলিশ ও র্যাবের কয়েক স্তরের বাধা তৈরি করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তখন মহড়ারত সশস্ত্র আওয়ামী ক্যাডাররা স্থান ত্যাগ করে। এতে বহুমুখী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দারুল আমান ট্রাস্টসমূহ হামলার হাত থেকে রক্ষা পায়। সন্ধ্যায় দারুল আমান ট্রাস্ট রক্ষার্থে শতশত ছাত্র-শিক্ষক, অভিভাবকের সাথে কয়েক হাজার এলাকাবাসী অবস্থান করতে দেখা গেছে।
কোন অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে বাস টার্মিনাল, বাইপাস ও ইসলামিয়া মাদরাসা এলাকার আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পুলিশ টহল ছাড়াও পর্যাপ্ত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন ছিল। এর পাশাপাশি যেকোন প্রকার অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে শহরে বিকাল ৪টা থেকে ২ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা পুলিশ সুপার মিরাজুল ইসলাম। তিনি আরও জানান, পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অপরদিকে সকালে সংবাদপত্র বহনের গাড়ি থেকে দৈনিক সংগ্রাম, দৈনিক নয়া দিগন্ত, ও দৈনিক আমার দেশ নামিয়ে পুড়িয়ে দেয় এবং দিগন্ত টিভির সম্প্রচার বন্ধ করে দেয় আওয়ামী ক্যাডাররা। সংবাদপত্রের এজেন্ট ও হকারদের এসব পত্রিকা বিক্রি ও বিলি না করতে হুমকি দেয়া হয়েছে।
২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ দৈনিক সংগ্রামে নিউজ আসে;
দুই শহীদের পিতা বললেন ইসলামের জন্য আমরাও জীবন দিতে প্রস্তুত; পাবনায় পুলিশের গুলিতে নিহত দুই জামায়াত কর্মীর জানাযায় মানুষের ঢল (ছবি: দুই শহীদের জানাযায় হাজার হাজার মানুষের ঢল (নিচে ইনসেটে) শহীদ আলাল হোসেন ও শহীদ সিরাজুল ইসলাম। (ইনসেটে উপরে বাম থেকে) জানাযা পূর্ব বক্তব্য রাখছেন জেলা জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমীর মাওলানা জহুরুল ইসলাম, সেক্রেটারি অধ্যাপক আবু তালেব মন্ডল, শহীদ আলাল হোসেনের গর্বিত পিতা শমসের আলী ও শহীদ সিরাজুল ইসলামের গর্বিত পিতা আব্দুল কুদ্দুস, পুলিশের গুলিতে নিহত শহীদ সিরাজুল ইসলামের এক মাত্র মেয়ে মিম। আব্বুর কোলে যাওয়ার জন্য কান্নাকাটি করছে সারাক্ষণ।)
পাবনা সংবাদদাতা:
পুলিশের গুলিতে নিহত জামায়াত কর্মী আলাল হোসেন ও সিরাজুল ইসলামের নামাযে জানাযায় হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে। সকাল সাড়ে ৯টায় পাবনা সদর উপজেলার পূর্বপাড়া বিপি স্কুল মাঠে দুই শহীদের জানাযা একই স্থানে অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় স্কুল মাঠে শুধু কান্নার আওয়াজ শুনা যায়। শহীদদের এক নজর দেখার জন্য ভিড় করতে থাকে। দুই শহীদের পিতা বললেন, আমার ছেলে শহীদ হয়েছে। আমার কোন দুঃখ নাই। আপনারা শুধু ওদের জন্য দোয়া করবেন। জানাযা মাঠে সিরাজের অবুঝ শিশুর কান্না দেখে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। এ সময় চতুর্দিকে শুধু বুকফাটা কান্নায় আকাশ বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। জানাযা শেষে তাদের নিজ নিজ কবরস্থানে দাফন করা হয়।
সন্ধ্যা পর্যন্ত স্বজনদের কাছে দুই শহীদের লাশ ফেরত না দেয়ায় শনিবার দাফন করা সম্ভব হয়নি। এশার নামাযের সময় তাদের লাশ পাবনা মর্গ থেকে বাড়ি নিয়ে এলে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। স্বজনদের কান্নায় গোটা এলাকা ভারী হয়ে ওঠে। আলাল হোসেনের নব বিবাহিতা স্ত্রী মিতা খাতুন বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। এবার দাখিল পরীক্ষা দিচ্ছেন তিনি। তার আরো ৪টি পরীক্ষা বাকি রয়েছে। মাত্র বিয়ের ৪ মাসের মাথায় স্বামীকে হারাতে হবে কখনো কল্পনাও করেননি। আলাল ছিলেন একজন দিন মজুর। তাঁতের কাজ করে কোনমতে দিনাতিপাত করতেন। সেই সাথে স্ত্রীর লেখাপড়ার খরচ যোগাতেন। রাসূলের (সা.) অবমাননার কথা শুনে তার স্বামী ঘরে বসে থাকতে পারেনি। নিজের জীবনকে উৎসর্গ করলেন আল্লাহর রাস্তায়। ৩ ভাইয়ের মধ্যে আলাল দ্বিতীয়। আলাল-দুলাল যমজ ভাই। জানাযা পূর্ব সমাবেশে দুলাল বলেন, সেদিন আমি আর আমার ভাই একই সাথে ছিলাম। আল্লাহ আমাকে কবুল না করে আমার ভাইকে কবুল করেছেন। আমিও যেন আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হতে পারি। আপনারা আমার ভাই ও আমার জন্য দোয়া করবেন। তার প্রতিবেশীরা বলেন, আলালের মতো ভদ্র ও নামাজি ছেলে বর্তমান সমাজে পাওয়া দুষ্কর। তিনি সবার সাথে হাসি মুখে কথা বলতেন। সবাইকে আগে সালাম দিতেন। আমরা তার মৃত্যুতে মর্মাহত।
শহীদ সিরাজুল ইসলামের ৪ ভাই ৩ বোন। ভাই বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। সাত বছর আগে তিনি সংসার জীবনে আবদ্ধ হন। দীর্ঘ ৫ বছর পর আল্লাহ তার ঘরে একটি ফুটফুটে কন্যা দান করেন। আদর করে তার নাম রাখেন মীম। মীমের বয়স দেড় বছর। রাতে বাবার সাথে ঘুমাতে যাবে। এমন সময় লাশের কফিন এসে বাড়িতে হাজির। অবুঝ শিশু কফিন বোঝে না। বাবা বাবা বলে চিৎকার করতে থাকলে গোটা এলাকা শোকে নিথর হয়ে যায়। এমন দৃশ্য যেন কেউ কোন দিন দেখেনি। সিরাজ ছিলেন খুবই দরিদ্র। টাকা ধার নিয়ে একটি ইঞ্জিন চালিত ভ্যান (করিমন) কিনে কোনমতে দিন পার করছিলেন। রাসুলের অবমাননার কথা শুনে তিনি আর ঘরে বসে থাকেননি। তিনিও পুলিশের গুলিতে শাহাদত বরণ করেন।
সকাল সাড়ে ৯টার সময় জানাযার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। ইমামতি করেন পাবনা জেলা জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমীর মাওলানা জহুরুল ইসলাম। জানাযা পূর্ব বক্তব্য রাখেন শহীদ সিরাজের গর্বিত পিতা আব্দুল কুদ্দুস। তিনি বলেন, আমার ছেলে আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হয়েছে। এজন্য আমার আর কোন দুঃখ নাই। আপনারা আমার ছেলের জন্য দোয়া করবেন। আল্লাহ যেন তাকে জান্নাতবাসী করেন। শহীদ আলাল হোসেনের গর্বিত পিতা শমসের আলী বলেন, আমার ছেলে একজন ভাল মানুষ ছিল। সে নিয়মিত নামাজ পড়তো, অন্যদের সালাম করতো। আমার ছেলে ও ছেলের বউয়ের জন্য দোয়া করবেন। আমার ছেলে আল্লাহর রাস্তায় জীবন দিয়েছে। এতে আমি খুশি। ইসলামের জন্য প্রয়োজনে আমি এবং আমার বাকি দুই ছেলে জীবন দিতে রাজি আছি। আপনাদের যখন আমাকে প্রয়োজন হবে ডাকবেন। আমি সাথে সাথে ছুটে আসবো আপনাদের ডাকে। আমার ছেলের জানাযায় এতো মানুষ দেখে আমি গর্বিত। জানাযা শেষে আলাল হোসেনকে ধর্মগ্রাম কবরস্থানে এবং সিরাজুল ইসলামকে দোগাছি ইউনিয়নের রাঘবপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়। এদিকে জানাযার পূর্বে ৮ প্লাটুন বিজিবি, র্যাব ও পুলিশের জানাযা মাঠের পাশ দিয়ে টহল দিচ্ছিল।
২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ দৈনিক আমার দেশে নিউজ আসে; পাবনায় পুলিশের গুলিতে নিহত দুজনের জানাজায় মানুষের ঢল
পাবনায় পুলিশের গুলিতে শনিবার নিহত জামায়াতকর্মী আলাল হোসেন ও সিরাজুল ইসলামের জানাজায় হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে। সকাল সাড়ে নয়টায় পাবনা সদর উপজেলার পুষ্পপাড়া বিপি স্কুলমাঠে দুই শহীদের জানাজা একই স্থানে অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় স্কুলমাঠে শুধু কান্নার আওয়াজ শোনা যায়। তাকে স্বজনরা একনজর দেখার জন্য ভিড় করতে থাকেন। এক শহীদের বাবা বলেন, আমার ছেলে শহীদ হয়েছে, কোনো দুঃখ নেই। আপনারা শুধু ওর জন্য দোয়া করবেন। জানাজা মাঠে সিরাজের অবুঝ শিশুর কান্না দেখে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। এ সময় চার দিকে বুকফাটা কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। জানাজা শেষে তাদের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। উল্লেখ্য, পাবনায় জামায়াত-শিবির অফিসে অগ্নিসংযোগ, পত্রিকা অফিসে আগুন ও মাওলানা আবদুস সুবহানের বাড়িতে হামলার প্রতিবাদে জেলা জামায়াতের ডাকা গত শনিবার অর্ধদিবস হরতাল চলাকালে পিকেটারদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণে জামায়াতকর্মী আলাল হোসেন (২২) ও সিরাজুল ইসলাম (২৫) নিহত হন। এ সময় আহত হয় প্রায় ৫০ জন। আহতদের চিকিৎসাধীন অবস্থায় গ্রেফতার করে নিয়ে যায় পুলিশ।
৪. শহীদের আপনজনদের কথা
প্রতিবেশীর কথা: সে ছিল নিয়মিত নামাজী। তার মত ভাল লোক দ্বিতীয় জন পাওয়া দুষ্কর। সে ছিল সকল প্রকার অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদী কন্ঠস্বর।
এলাকাবাসীর কথা: তিনি ছিলেন নম্র, ভদ্র, সৎ ও উত্তম চরিত্রের অধিকারী। তিনি ছিলেন সকলের নিকট বিশ্বস্ততা ও আমানতদারিতার প্রতীক। তিনি যখন ধান ভাঙাতেন তখন জনগণ ১০-১৫ মণ ধানও একসাথে তার কাছে রেখে চলে যেত এ ভরসায় যে, তার মাধ্যমে বিন্দুমাত্র ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা নেই। সিরাজুল অত্যন্ত সাহসী ছিলেন ঘটনার দিন তার বন্ধু আলমকে তিনি বলেছিলেন, 'পুলিশ গুলি করছে, লোকজনকে মেরে ফেললো তাদের নিয়ে আসতে হবে; চল যাই। সকালে বাড়ি থেকে বিদায় নেওয়ার সময় স্ত্রীকে বলেছিলেন, 'আজকে আমার শেষ মিছিল যা হয় হবে। তার ঘোষণা ছিল, 'নেতৃবৃন্দের জন্যে প্রয়োজনে শহীদ হব।' আল্লাহ তার প্রত্যাশাকে পূর্ণ করেছেন। তার স্ত্রী স্বপ্নে দেখেছে, 'সিরাজুল বলছে, আমি ভাল আছি। আর শুধু কালেমা পড়ছে।'
৫. বর্তমান বাড়ি-ঘরের অবস্থা
১টি দোচালা ও ১টি একচালা টিনের ঘর:চাষাবাদের জন্য তেমন কোন জমি নেই।
৬. ব্যক্তিগত তথ্য
নাম: মো: সিরাজুল ইসলাম (০৪৫)
পিতার নাম: মো: আব্দুল কুদ্দুস, বয়স ৬২ বছর, পেশায় কৃষি কাজ করেন।
মাতা নাম: রাবেয়া খাতুন। বয়স ৫৫ বছর, গৃহিণী।
স্ত্রীর নাম: ময়না খাতুন এবং ১৫ মাস বয়সের মীম নামের এক কন্যাসন্তান রয়েছে।
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা: গ্রাম: মনোহরপুর, ডাকঘর: পুষ্পপাড়া, থানা: সদর, জেলা: পাবনা
সাংগঠনিক মান: কর্মী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
আহত হওয়ার তারিখ: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩।
শাহাদাতের তারিখ: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩।
জানাজা নামাজ পড়ান: জনাব মাওলানা জহুরুল ইসলাম এবং এত প্রায় ১৫০০০ লোক উপস্থিত ছিল। জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
ভাই-বোনের বিবরণ: রাসেল-৩০, কৃষিকাজ করে, সোহেল-২৮, কৃষিকাজ করে, মিরাজুল-১৮, নসিমন চালক।
পাবনা-১
"সিরাজুল অত্যন্ত সাহসী ছিল। ঘটনার দিন তার বন্ধু আলমকে সে বলেছিল, 'পুলিশ গুলি করছে, লোকজনকে মেরে ফেললো, তাদের নিয়ে আসতে হবি, চল যাই।' সকালে বাড়ি থেকে বিদায় নেওয়ার সময় স্ত্রীকে বলেছিল, 'আজকে আমার শেষ মিছিল যা হয় হবি। তার ঘোষণা ছিল, 'নেতৃবৃন্দের জন্যে প্রয়োজনে শহীদ হব।' আল্লাহ তার প্রত্যাশাকে পূর্ণ করেছেন। তার স্ত্রী স্বপ্নে দেখেছে, 'সিরাজুল বলছে, আমি ভাল আছি। আর শুধু কালেমা পড়ছে।"
১. শহীদের পরিচিতি
শহীদ মো: সিরাজুল ইসলাম পাবনা জেলার সদর উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে ১৯৮৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন পিতা আব্দুল কুদ্দুস ও মাতা রাবেয়া খাতুনের চার সন্তানের মধ্যে তৃতীয়। অভাবের সংসার হওয়ায় পিতা-মাতা সন্তানদের জন্য দু'বেলা দু'মুঠো খাবার যোগাড় করতেই ব্যস্ত ছিলেন। পারেননি তাদের পড়া-লেখার কোন ব্যবস্থা করতে। তাইতো সিরাজুল ইসলাম প্রাথমিকের গন্ডিও পেরোতে পারেননি। পিতার সাথে ধরতে হয়েছে সংসারের হাল। আয় রোজগারের জন্য চালিয়েছেন করিমন নামক ইঞ্জিন চালিত গাড়ি। ফাঁকে ফাঁকে করেছেন বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধান ভাঙানোর কাজ। মাত্র সাড়ে তিন বছর আগে বিয়ে করেছেন। তাদের রয়েছে মীম নামে মাত্র ১৫ মাসের একটি ফুটফুটে কন্যাসন্তান। পিতা-মাতা ও স্ত্রী-সন্তান নিয়ে দেখছিলেন সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন। কিন্তু স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের ঘাতক বুলেট তার সে স্বপ্নকে ভেঙে খান খান করে দেয়।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
দিনটি ছিল ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩। ফজরের নামাজ পড়ে সিরাজুল ইসলাম তার করিমন নিয়ে বের হন। কিন্তু বাংলাদেশ ছাত্রলীগের অত্যাচার ও তাণ্ডবের প্রতিবাদে জামায়াতের আহবানে সেদিন পাবনায় ছিল অর্ধদিবস হরতাল। শহীদ মো: সিরাজুল ইসলাম হরতালের কারণে করিমন রেখে হরতাল সফল করতে পিকেটিং এ যান। হরতাল পালন করতে পুষ্পপাড়া সড়কে অবস্থান করে সাধারণ জনতা। এ সময় পুলিশ তাদের ওপর হামলা করে এবং নির্বিচারে গুলি করে। এতে ধোপাঘাটা মোড় এলাকায় শহীদ মো: সিরাজুল ইসলাম কপালে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই শহীদ হন। এছাড়াও আরো অনেকেই গুলিবিদ্ধ হন।
শহীদের জানাযার নামাজে ইমামতি করেন মাওলানা জহুরুল ইসলাম। জানাযায় প্রায় ২৫ হাজার লোক উপস্থিত হন। জানাযা পরবর্তী বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।
৩. সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
দিনটি ছিল ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩। সেদিন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের অত্যাচার ও তাণ্ডবের প্রতিবাদে জামায়াতের আহবানে পাবনায় ছিল অর্ধদিবস হরতাল। হরতাল পালন করতে পুষ্পপাড়া সড়কে অবস্থান নেয় সাধারণ জনতা। এ সময় পুলিশ তাদের ওপর হামলা করে এবং নির্বিচারে গুলি করে। এতে ধোপাঘাটা মোড় এলাকায় মো: সিরাজুল ইসলাম কপালে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই শহীদ হন। এছাড়াও আরো অনেকেই গুলিবিদ্ধ হন। পরের দিন জাতীয় পত্রিকাসমূহে এ বিষয়ে বিস্তারিত নিউজ আসে।
২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ দৈনিক সংগ্রামে নিউজ আসে; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আওয়ামী ক্যাডারদের সশস্ত্র হামলা। শহরে বিজিবি মোতায়েন পাবনায় হরতালে পুলিশের গুলিতে ২ জামায়াত কর্মী নিহত আহত ৫০।
পাবনা সংবাদদাতা:
পাবনায় জামায়াত-শিবির অফিসে অগ্নিসংযোগ, পত্রিকা অফিসে আগুন ও মাওলানা
আব্দুস সুবহানের বাড়িতে হামলার প্রতিবাদে জেলা জামায়াতের ডাকা অর্ধদিবস হরতাল চলাকালে পুলিশের গুলিবর্ষণে জামায়াত কর্মী আলাল হোসেন (২২) ও সিরাজুল ইসলাম (২৫) নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে কমপক্ষে ৫০ জন। এর মধ্যে গুলিবিদ্ধ দুজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। আহতদের হাসপাতালে ভর্তি করলে অনেককে বেডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গ্রেফতার করে পুলিশ। এ পর্যন্ত ২৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। দিন ভর আওয়ামী লীগ যুবলীগের ক্যাডাররা শহরে পুলিশের সহায়তায় জামায়াত নিয়ন্ত্রিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলা করে। পরে জনতার প্রতিরোধে পিছু হটতে বাধ্য হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য বিজিবি ও রেঞ্জরিজার্ভ পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। জামায়াতের ২ কর্মী নিহত ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে জেলা জামায়াত আগামী সোমবার বিক্ষোভ ও মঙ্গলবার দোয়া দিবস কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, মহাসড়ক অবরোধ, টায়ারে আগুন ও বিক্ষোভের মধ্যদিয়ে গতকাল শনিবার পাবনা জেলায় শুরু করে জামায়াতের ডাকা আধা বেলার হরতাল। পাবনা জেলা জামায়াত-শিবিরের অফিস ও স্থানীয় দৈনিক জীবনকথা পত্রিকার অফিসে ভাঙচুর, লুটতরাজ ও অগ্নিসংযোগ, ৩টি ব্যাংকে ভাঙচুর, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আইনজীবীদের বাসভবন এবং সাবেক সংসদ সদস্য মাওলানা আব্দুস সুবহানের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর, লুটতরাজ ও অগ্নিসংযোগের প্রতিবাদে এ হরতালের ডাক দেয় জেলা জামায়াত। এ দিনে ভোর ৬টা থেকে পাবনা-ঢাকা মহাসড়কের জালালপুর, মন্দিরপুর, ধোপাঘাটা, পূর্বপাড়া, মাধপুরসহ বেশ কয়েকটি স্থানে গাছের গুঁড়ি ফেলে, টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে ও লাঠিসোটা নিয়ে অবরোধ করে হরতাল সমর্থক জামায়াত-শিবির কর্মী ও পিকেটাররা। এছাড়া আধা বেলা হরতালের সমর্থনে সকালে শহরের মাসুম বাজার থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করে বাস টার্মিনাল প্রদক্ষিণ করে জামায়াত-শিবির কর্মীরা। হরতাল চলাকালে শহরের অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ ছিল। কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লার যানবাহন ছেড়ে যায়নি এবং বাইরে থেকে কোনো যান পাবনায় আসেনি। বন্ধ ছিল আন্তঃজেলা রুটে সকল যানবাহন চলাচল। পাবনা সদর উপজেলার ঢাকা-পাবনা মহাসড়কের ধুপাঘাটা এলাকায় পিকেটিং করলে পুলিশ এসে অতর্কিত গুলি চালায় জামায়াত-শিবির কর্মীদের ওপর। এসময় গুলিবিদ্ধ হয়ে ধর্মগ্রাম এলাকার শমসের আলীর ছেলে আলাল হোসেন (২২) ও মনোহরপুর এলাকার আবদুল কুদ্দুসের ছেলে সিরাজুল ইসলাম (২৫) নিহত হয়। আহত হয় কমপক্ষে ৩৫ জন। এছাড়া মধুপুরে পুলিশের গুলিতে আহত হয় ১৫ জন। নিহতদের লাশ পুলিশ হেফাজতে রয়েছে বলে পরিবার জানিয়েছে। সন্ধ্যা পর্যন্ত তাদের লাশ সজনদের কাছে পৌঁছানো হয়নি। আহতদের পাবনা জেনারেল হাসপাতাল ও বিভিন্ন ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। এদের মধ্যে দুজনের অবস্থা আশংকাজনক হলে তাদের রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এসব রোগীদের চিকিৎসাধীন অবস্থায় গ্রেফতার করেছে পুলিশ। রোগীদের সেবার জন্য আসা সজনদেরও এসময় গ্রেফতার করা হয়। আহত গ্রেফতারকৃতরা হলেন, আব্দুল হাকিম (৫১), ওহিদুল ইসলাম (২১), রাবিব (২০), মহসিন (১৮), সাইফুল ইসলাম (১৯), সরোয়ার আলম (১৮), আল-আমীন (১৮), এবাদত (২০), সুমন (২০), রহিজুল ইসলাম (২৫), আলমগীর (২২), আব্দুল আলিম মৃধা (৩৭), শিহাবউদ্দীন (১৯), শফিউল ইসলাম (২৭), সাদ্দাম (১৮), রিপন (১৮), আলম (২৫), আব্দুস সুবহান (৫৫), আরিফুল ইসলাম (২৫), আবুল হাসান (৩৫), শাহীন ইসলাম (১৯), রহিম উদ্দীন (৫৫), সাগর শেখ (১৮)। এদেরকে বিকালে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে।
পাবনা সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নুরে আলম জানান, জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীরা সকালে মহাসড়ক অবরোধ করলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। এ সময় তারা পুলিশের ওপর চড়াও হলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। কিন্তু এরপরও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে পুলিশ তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। নিহত ২ জামায়াত কর্মীর গ্রাম মনোহরপুর ও ধর্মগ্রামে এখন শোকের মাতম চলছে। উভয়ের ময়নাতদন্ত হয়েছে, রিপোর্ট প্রস্তুত না হওয়ায় সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত কোন মামলা দায়ের হয়নি বলে জানিয়েছে সদর থানার ওসি জসিম উদ্দিন সরকার।
এদিকে হরতাল চলাকালে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে হরতাল বিরোধী একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় টার্মিনাল বাইপাস মোড়ে। এ সময় তারা কয়েকটি মোটর-সাইকেলে করে ভারী অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিতে দেখা গেছে বলে জানিয়েছে প্রত্যক্ষদর্শীরা। সমাবেশ শেষে তাদের নেতৃত্বে সমাবেশে অংশগ্রহণকারী আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সশস্ত্র শতাধিক ক্যাডার ট্রাস্টে হামলা করার জন্য ট্রাস্টের মূল ফটকের দিকে অগ্রসর হয়। এ সময় মাদরাসা-কলেজের হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রী, শিশু, অভিভাবকসহ শিক্ষকরা আতংকিত হয়ে ওঠে। তারা ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে শ্রেণীকক্ষে আশ্রয় নিতে থাকে। ট্রাস্ট ক্যাম্পাসের মসজিদ থেকে দেশের শীর্ষস্থানীয় এই বহুমুখী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রক্ষার্থে এলাকাবাসীর সহযোগিতা চাওয়া হলে স্থানীয় শত শত নারী পুরুষ তাদের সন্তানদের ও প্রতিষ্ঠানগুলো রক্ষার্থে বাঁশ ও কাঠের লাঠি-সোটা নিয়ে দারুল আমান ট্রাস্ট ময়দানে অবস্থান নেন। শিশু থেকে শুরু বৃদ্ধ পর্যন্ত সকল বয়সী হাজার হাজার ইসলামপ্রিয় জনতা লাঠি-সোটা নিয়ে মাদরাসা প্রাঙ্গণে জড়ো হন। সকাল সাড়ে ৯টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত প্রায় ৩ ঘণ্টা এরূপ আতংকিত অবস্থা চলতে থাকে। এর পরপরই এই প্রতিষ্ঠানে হামলা ঠেকাতে পুলিশের একটি থ্রি-টোন ভ্যান রাস্তায় দাঁড় করিয়ে এবং পুলিশ ও র্যাবের কয়েক স্তরের বাধা তৈরি করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তখন মহড়ারত সশস্ত্র আওয়ামী ক্যাডাররা স্থান ত্যাগ করে। এতে বহুমুখী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দারুল আমান ট্রাস্টসমূহ হামলার হাত থেকে রক্ষা পায়। সন্ধ্যায় দারুল আমান ট্রাস্ট রক্ষার্থে শতশত ছাত্র-শিক্ষক, অভিভাবকের সাথে কয়েক হাজার এলাকাবাসী অবস্থান করতে দেখা গেছে।
কোন অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে বাস টার্মিনাল, বাইপাস ও ইসলামিয়া মাদরাসা এলাকার আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পুলিশ টহল ছাড়াও পর্যাপ্ত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন ছিল। এর পাশাপাশি যেকোন প্রকার অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে শহরে বিকাল ৪টা থেকে ২ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা পুলিশ সুপার মিরাজুল ইসলাম। তিনি আরও জানান, পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অপরদিকে সকালে সংবাদপত্র বহনের গাড়ি থেকে দৈনিক সংগ্রাম, দৈনিক নয়া দিগন্ত, ও দৈনিক আমার দেশ নামিয়ে পুড়িয়ে দেয় এবং দিগন্ত টিভির সম্প্রচার বন্ধ করে দেয় আওয়ামী ক্যাডাররা। সংবাদপত্রের এজেন্ট ও হকারদের এসব পত্রিকা বিক্রি ও বিলি না করতে হুমকি দেয়া হয়েছে।
২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ দৈনিক সংগ্রামে নিউজ আসে;
দুই শহীদের পিতা বললেন ইসলামের জন্য আমরাও জীবন দিতে প্রস্তুত; পাবনায় পুলিশের গুলিতে নিহত দুই জামায়াত কর্মীর জানাযায় মানুষের ঢল (ছবি: দুই শহীদের জানাযায় হাজার হাজার মানুষের ঢল (নিচে ইনসেটে) শহীদ আলাল হোসেন ও শহীদ সিরাজুল ইসলাম। (ইনসেটে উপরে বাম থেকে) জানাযা পূর্ব বক্তব্য রাখছেন জেলা জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমীর মাওলানা জহুরুল ইসলাম, সেক্রেটারি অধ্যাপক আবু তালেব মন্ডল, শহীদ আলাল হোসেনের গর্বিত পিতা শমসের আলী ও শহীদ সিরাজুল ইসলামের গর্বিত পিতা আব্দুল কুদ্দুস, পুলিশের গুলিতে নিহত শহীদ সিরাজুল ইসলামের এক মাত্র মেয়ে মিম। আব্বুর কোলে যাওয়ার জন্য কান্নাকাটি করছে সারাক্ষণ।)
পাবনা সংবাদদাতা:
পুলিশের গুলিতে নিহত জামায়াত কর্মী আলাল হোসেন ও সিরাজুল ইসলামের নামাযে জানাযায় হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে। সকাল সাড়ে ৯টায় পাবনা সদর উপজেলার পূর্বপাড়া বিপি স্কুল মাঠে দুই শহীদের জানাযা একই স্থানে অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় স্কুল মাঠে শুধু কান্নার আওয়াজ শুনা যায়। শহীদদের এক নজর দেখার জন্য ভিড় করতে থাকে। দুই শহীদের পিতা বললেন, আমার ছেলে শহীদ হয়েছে। আমার কোন দুঃখ নাই। আপনারা শুধু ওদের জন্য দোয়া করবেন। জানাযা মাঠে সিরাজের অবুঝ শিশুর কান্না দেখে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। এ সময় চতুর্দিকে শুধু বুকফাটা কান্নায় আকাশ বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। জানাযা শেষে তাদের নিজ নিজ কবরস্থানে দাফন করা হয়।
সন্ধ্যা পর্যন্ত স্বজনদের কাছে দুই শহীদের লাশ ফেরত না দেয়ায় শনিবার দাফন করা সম্ভব হয়নি। এশার নামাযের সময় তাদের লাশ পাবনা মর্গ থেকে বাড়ি নিয়ে এলে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। স্বজনদের কান্নায় গোটা এলাকা ভারী হয়ে ওঠে। আলাল হোসেনের নব বিবাহিতা স্ত্রী মিতা খাতুন বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। এবার দাখিল পরীক্ষা দিচ্ছেন তিনি। তার আরো ৪টি পরীক্ষা বাকি রয়েছে। মাত্র বিয়ের ৪ মাসের মাথায় স্বামীকে হারাতে হবে কখনো কল্পনাও করেননি। আলাল ছিলেন একজন দিন মজুর। তাঁতের কাজ করে কোনমতে দিনাতিপাত করতেন। সেই সাথে স্ত্রীর লেখাপড়ার খরচ যোগাতেন। রাসূলের (সা.) অবমাননার কথা শুনে তার স্বামী ঘরে বসে থাকতে পারেনি। নিজের জীবনকে উৎসর্গ করলেন আল্লাহর রাস্তায়। ৩ ভাইয়ের মধ্যে আলাল দ্বিতীয়। আলাল-দুলাল যমজ ভাই। জানাযা পূর্ব সমাবেশে দুলাল বলেন, সেদিন আমি আর আমার ভাই একই সাথে ছিলাম। আল্লাহ আমাকে কবুল না করে আমার ভাইকে কবুল করেছেন। আমিও যেন আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হতে পারি। আপনারা আমার ভাই ও আমার জন্য দোয়া করবেন। তার প্রতিবেশীরা বলেন, আলালের মতো ভদ্র ও নামাজি ছেলে বর্তমান সমাজে পাওয়া দুষ্কর। তিনি সবার সাথে হাসি মুখে কথা বলতেন। সবাইকে আগে সালাম দিতেন। আমরা তার মৃত্যুতে মর্মাহত।
শহীদ সিরাজুল ইসলামের ৪ ভাই ৩ বোন। ভাই বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। সাত বছর আগে তিনি সংসার জীবনে আবদ্ধ হন। দীর্ঘ ৫ বছর পর আল্লাহ তার ঘরে একটি ফুটফুটে কন্যা দান করেন। আদর করে তার নাম রাখেন মীম। মীমের বয়স দেড় বছর। রাতে বাবার সাথে ঘুমাতে যাবে। এমন সময় লাশের কফিন এসে বাড়িতে হাজির। অবুঝ শিশু কফিন বোঝে না। বাবা বাবা বলে চিৎকার করতে থাকলে গোটা এলাকা শোকে নিথর হয়ে যায়। এমন দৃশ্য যেন কেউ কোন দিন দেখেনি। সিরাজ ছিলেন খুবই দরিদ্র। টাকা ধার নিয়ে একটি ইঞ্জিন চালিত ভ্যান (করিমন) কিনে কোনমতে দিন পার করছিলেন। রাসুলের অবমাননার কথা শুনে তিনি আর ঘরে বসে থাকেননি। তিনিও পুলিশের গুলিতে শাহাদত বরণ করেন।
সকাল সাড়ে ৯টার সময় জানাযার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। ইমামতি করেন পাবনা জেলা জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমীর মাওলানা জহুরুল ইসলাম। জানাযা পূর্ব বক্তব্য রাখেন শহীদ সিরাজের গর্বিত পিতা আব্দুল কুদ্দুস। তিনি বলেন, আমার ছেলে আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হয়েছে। এজন্য আমার আর কোন দুঃখ নাই। আপনারা আমার ছেলের জন্য দোয়া করবেন। আল্লাহ যেন তাকে জান্নাতবাসী করেন। শহীদ আলাল হোসেনের গর্বিত পিতা শমসের আলী বলেন, আমার ছেলে একজন ভাল মানুষ ছিল। সে নিয়মিত নামাজ পড়তো, অন্যদের সালাম করতো। আমার ছেলে ও ছেলের বউয়ের জন্য দোয়া করবেন। আমার ছেলে আল্লাহর রাস্তায় জীবন দিয়েছে। এতে আমি খুশি। ইসলামের জন্য প্রয়োজনে আমি এবং আমার বাকি দুই ছেলে জীবন দিতে রাজি আছি। আপনাদের যখন আমাকে প্রয়োজন হবে ডাকবেন। আমি সাথে সাথে ছুটে আসবো আপনাদের ডাকে। আমার ছেলের জানাযায় এতো মানুষ দেখে আমি গর্বিত। জানাযা শেষে আলাল হোসেনকে ধর্মগ্রাম কবরস্থানে এবং সিরাজুল ইসলামকে দোগাছি ইউনিয়নের রাঘবপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়। এদিকে জানাযার পূর্বে ৮ প্লাটুন বিজিবি, র্যাব ও পুলিশের জানাযা মাঠের পাশ দিয়ে টহল দিচ্ছিল।
২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ দৈনিক আমার দেশে নিউজ আসে; পাবনায় পুলিশের গুলিতে নিহত দুজনের জানাজায় মানুষের ঢল
পাবনায় পুলিশের গুলিতে শনিবার নিহত জামায়াতকর্মী আলাল হোসেন ও সিরাজুল ইসলামের জানাজায় হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে। সকাল সাড়ে নয়টায় পাবনা সদর উপজেলার পুষ্পপাড়া বিপি স্কুলমাঠে দুই শহীদের জানাজা একই স্থানে অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় স্কুলমাঠে শুধু কান্নার আওয়াজ শোনা যায়। তাকে স্বজনরা একনজর দেখার জন্য ভিড় করতে থাকেন। এক শহীদের বাবা বলেন, আমার ছেলে শহীদ হয়েছে, কোনো দুঃখ নেই। আপনারা শুধু ওর জন্য দোয়া করবেন। জানাজা মাঠে সিরাজের অবুঝ শিশুর কান্না দেখে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। এ সময় চার দিকে বুকফাটা কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। জানাজা শেষে তাদের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। উল্লেখ্য, পাবনায় জামায়াত-শিবির অফিসে অগ্নিসংযোগ, পত্রিকা অফিসে আগুন ও মাওলানা আবদুস সুবহানের বাড়িতে হামলার প্রতিবাদে জেলা জামায়াতের ডাকা গত শনিবার অর্ধদিবস হরতাল চলাকালে পিকেটারদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণে জামায়াতকর্মী আলাল হোসেন (২২) ও সিরাজুল ইসলাম (২৫) নিহত হন। এ সময় আহত হয় প্রায় ৫০ জন। আহতদের চিকিৎসাধীন অবস্থায় গ্রেফতার করে নিয়ে যায় পুলিশ।
৪. শহীদের আপনজনদের কথা
প্রতিবেশীর কথা: সে ছিল নিয়মিত নামাজী। তার মত ভাল লোক দ্বিতীয় জন পাওয়া দুষ্কর। সে ছিল সকল প্রকার অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদী কন্ঠস্বর।
এলাকাবাসীর কথা: তিনি ছিলেন নম্র, ভদ্র, সৎ ও উত্তম চরিত্রের অধিকারী। তিনি ছিলেন সকলের নিকট বিশ্বস্ততা ও আমানতদারিতার প্রতীক। তিনি যখন ধান ভাঙাতেন তখন জনগণ ১০-১৫ মণ ধানও একসাথে তার কাছে রেখে চলে যেত এ ভরসায় যে, তার মাধ্যমে বিন্দুমাত্র ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা নেই। সিরাজুল অত্যন্ত সাহসী ছিলেন ঘটনার দিন তার বন্ধু আলমকে তিনি বলেছিলেন, 'পুলিশ গুলি করছে, লোকজনকে মেরে ফেললো তাদের নিয়ে আসতে হবে; চল যাই। সকালে বাড়ি থেকে বিদায় নেওয়ার সময় স্ত্রীকে বলেছিলেন, 'আজকে আমার শেষ মিছিল যা হয় হবে। তার ঘোষণা ছিল, 'নেতৃবৃন্দের জন্যে প্রয়োজনে শহীদ হব।' আল্লাহ তার প্রত্যাশাকে পূর্ণ করেছেন। তার স্ত্রী স্বপ্নে দেখেছে, 'সিরাজুল বলছে, আমি ভাল আছি। আর শুধু কালেমা পড়ছে।'
৫. বর্তমান বাড়ি-ঘরের অবস্থা
১টি দোচালা ও ১টি একচালা টিনের ঘর:চাষাবাদের জন্য তেমন কোন জমি নেই।
৬. ব্যক্তিগত তথ্য
নাম: মো: সিরাজুল ইসলাম (০৪৫)
পিতার নাম: মো: আব্দুল কুদ্দুস, বয়স ৬২ বছর, পেশায় কৃষি কাজ করেন।
মাতা নাম: রাবেয়া খাতুন। বয়স ৫৫ বছর, গৃহিণী।
স্ত্রীর নাম: ময়না খাতুন এবং ১৫ মাস বয়সের মীম নামের এক কন্যাসন্তান রয়েছে।
স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা: গ্রাম: মনোহরপুর, ডাকঘর: পুষ্পপাড়া, থানা: সদর, জেলা: পাবনা
সাংগঠনিক মান: কর্মী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
আহত হওয়ার তারিখ: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩।
শাহাদাতের তারিখ: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩।
জানাজা নামাজ পড়ান: জনাব মাওলানা জহুরুল ইসলাম এবং এত প্রায় ১৫০০০ লোক উপস্থিত ছিল। জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
ভাই-বোনের বিবরণ: রাসেল-৩০, কৃষিকাজ করে, সোহেল-২৮, কৃষিকাজ করে, মিরাজুল-১৮, নসিমন চালক।
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍