হোম / আওয়ামী দুঃশাসনে শহীদ / শহীদ মুন্নাছ আলী
শহীদ মুন্নাছ আলী

শহীদ মুন্নাছ আলী

আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

শহীদ মুন্নাছ আলী পাবনার ঈশ্বরদীর সরাইকান্দি গ্রামের দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া এক পরিশ্রমী কৃষিশ্রমিক ও রাজমিস্ত্রি, যিনি সামান্য শিক্ষায় বড় হতে না পারলেও সততা, ঈমানদারি ও সমাজচেতনায় নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন। কর্মজীবনের ফাঁকে তিনি স্থানীয়ভাবে নানা কর্মসূচিতে অংশ নিতেন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার অবস্থান তাকে সাধারণ মানুষের আস্থাভাজন করে তোলে। ২০১৩ সালের হরতাল উত্তেজনার দিন মুলাডুলি শেখপাড়া এলাকায় পিকেটিং চলাকালে সশস্ত্র সংঘর্ষের মুখে পড়েই তিনি প্রাণ হারান। মৃত্যুর আগের দিন সহকর্মীদের সঙ্গে আশ্রয়ে বসে শহীদ হওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথা বলেছিলেন, যা তার ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও আদর্শের প্রতি অটল মানসিকতার ইঙ্গিত বহন করে। স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েকে রেখে যাওয়া এই সাধারণ শ্রমজীবী মানুষটি আজও স্মরণীয় তৃণমূলের সংগ্রামী মানুষের জীবনের এক বাস্তব, মানবিক প্রতিচ্ছবি হিসেবে।

🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ

শহীদ মুন্নাছ আলী
পাবনা-৫
শাহাদাতের আগের দিন আমরা দাগুড়িয়া থেকে লালন সড়কে মিছিল করি। র‍্যাবের ধাওয়ায় মিছিল ছত্রভঙ্গ হলে আমরা মুল্লাহ আলীসহ পাশের একটি বাড়িতে ঢুকি। বাড়ির লোকজন আমাদের মুড়ি খেতে দেন। মুড়ি খেতে খেতে মুন্নাহ ভাই বললেন- "ভাই আমার খুব শহীদ হবার শখ। আল্লাহ যদি আমাকে শহীদ হিসেবে কবুল করতো।" আমরা বললাম- আল্লাহ আপনাকে গাজী হিসেবে কবুল করুন।
-মোঃ হাফিজুর রহমান, মেম্বার, ছলিমপুর ২নং ওয়ার্ড
শহীদের পরিচিতি
পিতামাতার ৫ (পাঁচ) সন্তানের মধ্যে ১ম সন্তান শহীদ মোঃ মুন্নাছ আলী ১৯৮০ খ্রস্টাব্দের ১০ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। গ্রাম: সরাইকান্দি, ডাকঘর- মুলাডুলি, থানা: ঈশ্বরদী, জেলা: পাবনা। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অতি সহজ সরল মানুষ ছিলেন। ৩ ভাই ২ বোনের সংসারে দরিদ্র পিতামাতা কোন রকম সন্তানের মুখে দুটো খাবার তুলে দিতে ব্যস্ত ছিলেন। তাই প্রাথমিকের বেশি পড়ালেখার ব্যবস্থা করাতে পারেনি। শারীরিক সামর্থ্যবান হওয়ার পর থেকে বাবার সঙ্গে অন্যের ক্ষেত-খামারে কাজ করাই ছিল পেশা। দুই সন্তানের পিতা শহীদ মোঃ মুন্নাছ আলী দীর্ঘদিন থেকে রাজমিস্ত্রির কাজ করে সংসার চালাতেন।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
মহাজোটের নামে আওয়ামী সরকার ক্ষমতায় এসেই দেশের ইসলামী ও তৌহিদী জনতার উপর চরম জুলুম নির্যাতন শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় সংবিধানে 'আল্লাহ সকল ক্ষমতার উৎস' এ কথা থাকার অভিযোগে বাংলাদেশের বৃহত্তম ইসলামী দল জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করে দেয় সরকার। এই অবিচারের প্রতিবাদে ২০১৩ সালের ২৭, ২৮, ২৯ অক্টোবর সকাল-সন্ধা হরতালের ডাক দেয় ১৮ দলীয় জোট। ২৭ অক্টোবর মুলাডুলি ইউনিয়নের শেখপাড়া ইক্ষু খামারের সামনে পাকা রাস্তার উপরে হরতালের সমর্থনে মিছিল করার সময় ছাত্রলীগের একদল সন্ত্রাসীরা এসে তাদের উপর হামলা চালায় এবং ঘটনাস্থলে তিনি শাহাদাতবরণ করেন।
ঘটনার সামগ্রীক বিবরণ
২৭ অক্টোবর ২০১৩, সকাল ৮.০০টা থেকে ঈশ্বরদী উপজেলার ১০টি স্থানে হরতালের সমর্থনে মিছিল চলছিল। পিকেটিং চলাকালীন মুলাডুলী ইউনিয়নের শেখপাড়া স্থানে আওয়ামীলীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ অত্যন্ত গোপনে সংগঠিত হয়ে বন্দুক, পিস্তল, হাতবোমা, রামদা ইত্যাদি নিয়ে শেখপাড়া হরতাল সমর্থকদের উপর হামলা চালায়। এতে জামায়াত কর্মীরা প্রতিরোধ গড়ে তুললে আওয়ামীলীগ সন্ত্রাসীরা পিছু হটতে থাকে। পরে পুলিশের উপস্থিতিতে তারা সংগঠিত হয়ে জামায়াত কর্মীদের উপর ব্যাপক গুলি চালায় এবং বোমা ফাটায়। মিঠু, মিল্টনের গুলিতে শহীদ মুন্নাছ আলীর বুক ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায় এবং ঘটনাস্থলে শাহাদাত বরণ করেন। শিবিরের ঈশ্বরদী উত্তর থানা শাখার সভাপতি ফরিদ আহমদ শেখ, মোখলেছুর রহমান, ঈসমাঈল হোসেনসহ ৫ জন গুরুত্বর আহত হয়।
পরিবারের বর্তমান প্রতিক্রিয়া/ অনভূতি
স্ত্রী: শহীদ মুন্নাছ যেদিন শহীদ হয় সেদিন রাতে সে সারারাত কুরআন শরীফ পড়ে রাত কাটিয়ে দিয়েছেন। ফজরের নামাজ পড়ে কয়েকটি মেহেগনীর গাছ লাগিয়ে স্ত্রীকে বলেছিলেন- আজ যদি আমি শহীদ হয়ে যাই তাহলে এই গাছগুলো বিক্রয় করে আমার ছেলে-মেয়েকে মানুষ করবে। তিনি সব সময় শহীদ হওয়ার আকাঙ্খা পেশ করতেন এবং বলতেন আমি শহীদ হলে আল্লাহ তোমাদের দেখবে।
শহীদ হওয়ার পরের দিন তার স্ত্রী স্বপ্নে তাকে দেখেছিলেন। তিনি স্বপ্নে বলেছেন- আমি ভাল আছি। আমি মরি নাই। তিনি স্ত্রীকে আরো বলেছেন- তুমি বাইরে বের হওয়ার সময় বোরকার সাথে হাত মোজা পরবে।
বাবা মার প্রতিক্রিয়া: তার বাবা এবং মা বলেন- "ছেলেকে আমরা সময় সময় বলতাম, বাবা আমরা গরীব
মানুষ। তুমি সবসময় মিছিলে যেও না। আওয়ামীলীগ তোমাকে মেরে ফেলবে। তখন আমরা কিভাবে চলবো।" তখন মুন্নাছ বলতেন- "আল্লাহ আমাদের দেখবে। তোমরা দোয়া করবে আমি যেন শহীদ হতে পারি।" তার পিতা মাতা আরো বলেন- "আমার সন্তান সত্যিকারে শহীদ হয়েছে। এজন্য আমার কোন দুঃখ নেই।"
শিশু সন্তানের প্রতিক্রিয়া। শহীদের শিশুসন্তান আব্দুল্লাহ আল নোমান প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। সে শুধু এতটুকু বলেন- "আমার আব্বুর জন্য দোয়া করবেন, আমাদের জন্য দোয়া করবেন।"
জনপ্রতিনিধির প্রতিক্রিয়া: ছলিমপুর ২নং ওয়ার্ডের মেম্বার মোঃ হাফিজুর রহমান বলেন- শাহাদাতের আগের
দিন আমরা দাশুড়িয়া থেকে লালন সড়কে মিছিল করি। র‍্যাবের ধাওয়ায় মিছিল ছত্রভঙ্গ হলে আমরা মুন্নাছ আলীসহ পাশের একটি বাড়িতে ঢুকি। বাড়ির লোকজন আমাদের মুড়ি খেতে দেন। মুড়ি খেতে খেতে মুন্নাছ ভাই বললেন- "ভাই আমার খুব শহীদ হবার শখ। আল্লাহ যদি আমাকে শহীদ হিসেবে কবুল করতো।" আমরা বললাম- "আল্লাহ আপনাকে গাজী হিসেবে কবুল করুন।"
হাফিজুর রহমান আরো বলেন- "মুন্নাছ আলী ছিলেন খোদাভীরু। দিনমজুরের কাজ করতেন কিন্তু সংগঠনের কোন ডাক এলে সাথে সাথে চলে আসতেন। শাহাদাতের ১০/১৫ দিন আগে একদিন দেখি তার মুখ শুকনো।" জিজ্ঞেস করলে বললো- "কিছু খাইনি। ঘরে চাল নাই তাই আপনার ভাবীর সাথে রাগ করে এসেছি।" তখন আমি উপজেলা জামায়াতের সমাজকল্যাণ সম্পাদক। তাকে ১০ কেজি চাল দিলাম। তিনি নিতে চাইলেন না। জোর করে তার হাতে ধরিয়ে দিলাম। তিনি চালটা ভাবীর হাতে দিয়েই আবার চলে আসলেন।
হাফিজুর রহমান আরো বলেন- তখন আমরা মামলার কারণে বিভিন্ন জায়গায় পালিয়ে বেড়াই। একদিন মুন্নাছ ভাই আর আমি লিচুর বাগানে শুয়ে রাত কাটাচ্ছি। শুইতে শুইতে রাত ১২টা বেজে গেছে। হঠাৎ ঘুম ভাঙতে দেখি মুন্নাছ ভাই তাহাজ্জুদ পড়ছেন।
সন্তানদের বিবরণ
আব্দুল্লাহ আল নোমান। বয়স ১২ বছর।
মাইমুনা। বয়স ৪ বছর।

ব্যক্তিগত তথ্য
নাম: মুল্লাছ আলী
পিতার নাম: শফিউদ্দিন প্রমানিক, বয়স- ৬২, পেশা- কৃষি
মাতার নাম: পারছিন নেছা
স্ত্রীর নাম: মেছা, চাম্পা খাতুন, বয়স- ৩৩, পেশা- গৃহিণী
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: সরাইকান্দি, ডাকঘর: মুলাডুলি, থানা- ঈশ্বরদী, জেলা- পাবনা।
সাংগঠনিক মান: কর্মী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী
শাহাদাতের তারিখ: ২৭ অক্টোবর ২০১৩, সকাল ১০:৩০ টায়, মুলাডুলী শেখপাড়া ইক্ষু খামারের।
সামনে পাকা রাস্তায় পুলিশ ও আওয়ামীলের গুলিতে
জানাজা। তেথুলিয়া হাইস্কুল মাঠে,
ভাই-বোন: তিন ভাই দুই বোনের মধ্যে সবার বড়
সন্তান: এক ছেলে এক মেয়ে।

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍