হোম / আওয়ামী দুঃশাসনে শহীদ / শহীদ মোঃ ছলেমান শেখ
শহীদ মোঃ ছলেমান শেখ

শহীদ মোঃ ছলেমান শেখ

আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

শহীদ মোঃ ছলেমান শেখ মেহেরপুর সদরের রঘুনাথপুর গ্রামের এক নীরব পরিশ্রমী দিনমজুর। যিনি দরিদ্রতার মাঝেও পরিবার, সমাজ ও ধর্মীয় দায়িত্বে ছিলেন অটল। কর্মজীবনের অবসরে তিনি গ্রামবাসীকে কোরআন শিক্ষা দিতেন এবং সংগঠনের যে কোনো ডাকেই ছুটে যেতেন অকুণ্ঠ নিষ্ঠায়। ২০১৩ সালের আগস্টে সংগঠনের নিবন্ধন-বাতিলের প্রতিবাদে অনুষ্ঠিত মিছিল ও সড়ক অবরোধে অংশ নিয়ে ফিরে যাওয়ার পথে পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হন এবং দুইদিন পরে রাজশাহী মেডিক্যালে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যু গ্রামের মানুষকে গভীর শোকে আচ্ছন্ন করে; এমনকি প্রিয় ভাইপোর লাশ দেখে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ফুফু আমেনা বেগমও। দায়িত্ববান পুত্র, মায়াবী স্বভাবের ভাই, এবং দুই সন্তানের স্নেহময় পিতা ছলেমান আজ মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে আছেন সততা, নৈতিকতা ও তৃণমূল সংগ্রামের প্রতীক হয়ে।

🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ

শহীদ মোঃ ছলেমান শেখ
মেহেরপুর
"শহীদের পিতা বলেন: "আমার ৬টি সন্তানের মধ্যে সে ছিল সবচেয়ে ভাল এবং দায়িত্ববান, বৃদ্ধ পিতামাতাকে দেখাশুনা করত: কোন খাবার পিতা-মাতাকে আগে না দিয়ে খেত না। সব ভাইবোনদের সাথে ছিল তার গভীর সম্পর্ক। সুখে-দুঃখে সবার সাথে থাকত। ছলেমান লাশ দাফনের এক ঘণ্টা পর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন ফুফু আমেনা বেগম। প্রিয় ভাইপোর লাশ দেখে অজ্ঞান হয়ে পড়েন তিনি। মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার বেলা সাড়ে দশটার দিকে তিনি মারা যান।"
১. শহীদের পরিচিতি
শহীদ মোঃ ছলেমান শেখ মেহেরপুর সদরের আমঝুপির রঘুনাথপুর গ্রামে ১৯৮২ সালে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মোঃ সৈয়দ আলী শেখ ও মাতা মোছা: মর্জিনা খাতুনের প্রিয় সন্তান মোঃ ছলেমান শেখ ছিলেন ছয় ভাই বোনদের মধ্যে চতুর্থ। তিনি নুরানী পদ্ধতিতে নিজে কুরআন শিখে কাজের অবসরে বিশেষ করে বাদ মাগরিব ও এশা কর্মীদের কুরআন শিক্ষা দিতেন। জামায়াতের কর্মী হিসাবে নিজের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে তিনি সব সময় সচেষ্ট থাকতেন। শাহাদাতকালে তিনি তার পিতা-মাতা এবং স্ত্রী: শিউলী খাতুন (২৫ বছর) ও মোঃ ইকবাল, ৩য় শ্রেণী, আবু বক্কর সিদ্দিক, বয়স ২ বছর দুজন সন্তান রেখে যান।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
ছলেমান ভাই ছিলেন আল্লাহর প্রিয় বান্দা। দারিদ্র্যের কশাঘাতেও তিনি ছিলেন সৎ ও সত্যবাদী, ইসলামের একজন মূর্ত প্রতীক, তিনি নিয়মিত নামাজ আদায় করতেন মানুষকে কোরআন শিক্ষা দিতেন। ইসলামী সংগঠনের কোন কাজে অবহেলা করতেন না। সকল কর্মকান্ডে সময় মত উপস্থিত হতেন। ছলেমান ভাই ইসলামী আন্দোলনের একনিষ্ঠ কর্মী ছিলেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংবিধানে সার্বভৌমত্বের মালিক আল্লাহ থাকায়, কোর্ট নিবন্ধন বাতিল করেছেন এর প্রতিবাদে মিছিল ও অবোরোধ হবে, এ কথা শুনে ছলেমান ভাই ঘরে বসে থাকতে পারেননি প্রতিবাদ মিছিলে অংশগ্রহণ করেন তিনি। মিছিল শেষে বাড়ি ফিরে যাওয়ার পথে আওয়ামী সন্ত্রাসী ও পুলিশ এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ে। পুলিশের গুলিতে ছলেমান ভাইসহ আরও ১০ জন আহত হয়। দ্রুত তাকে চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিক্যালে নেয়া হয়। সেখানে দুই দিন চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় ১৫ আগস্ট ২০১৩ বেলা ২টায় তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
৩. সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংবিধানে সার্বভৌমত্বের মালিক আল্লাহ থাকায়, কোর্ট নিবন্ধন বাতিল করেছেন এর প্রতিবাদে কেন্দ্র ঘোষিত ১৩ ও ১৪ ই আগস্ট হরতালের প্রথম দিনে হরতাল সফল করার জন্য মিছিল ও অবরোধ হবে, এ কথা শুনে ছলেমান ভাই ঘরে বসে থাকতে পারে নি। তিনি স্ত্রী, পিতা-মাতার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ ও কর্মীদের সাথে শহীদ ছলেমান শেখ প্রতিবাদ মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। মেহেরপুর মহাসড়কের আমঝুপি থেকে বারাদী বাজার পর্যন্ত ৬ কিলোমটিার জুড়ে হাজার হাজার নেতা কর্মী ১৩ তারিখ ভোর থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত রাস্তা অবরোধ করে মিছিল মিটিং করে। মিছিল ও অবরোধ শেষে ছলেমান ভাইসহ ৫০ জন গ্রামের বাড়ির দিকে যাচ্ছিল। বাড়ি ফেরার পথে রাজনগর গ্রামে পৌঁছালে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আনোয়ার হোসেন, সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলামসহ চার গাড়ি পুলিশ নেতা কর্মীদের ওপর হায়েনার মত ঝাঁপিয়ে পড়ে। পুলিশের নির্মম গুলিতে ছলেমান ভাই সহ আরও ১০ জন মারাত্মক ভাবে আহত হয়। পুলিশের গুলি ছলেমান ভাই-এর পেটের সামনে ঢুকে পিছন দিক দিয়ে বের হয়ে যায়। দ্রুত তাকে চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেলে নেয়া হয়। সেখানে দুই দিন চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় ১৫ আগস্ট ২০১৩ বেলা ২টায় তিনি শাহাদাত বরণ করেন। ১৭ আগস্ট ২০১৩ জাতীয় পত্রিকা দৈনিক সংগ্রামে এ বিষয়ে বিস্তারিত নিউজ আসে;
মেহেরপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত জামায়াত কর্মী ছলেমানের দাফন সম্পন্ন -ভাইপোর লাশ দেখে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন ফুফু
মেহেরপুর সংবাদদাতা। মেহেরপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত জামায়াত কর্মী ছলেমানের লাশ দাফন সম্পন্ন হয়েছে। এদিকে ছলেমানের লাশ দাফনের এক ঘণ্টা পর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন ফুফু আমেনা বেগম। তিনি রঘুনাথপুর গ্রামের মৃত ইছাহাক আলীর স্ত্রী। বৃহস্পতিবার রাতে প্রিয় ভাইপো ছলেমানের লাশ দেখে অজ্ঞান হয়ে পড়েন তিনি। এরপর তাকে মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার বেলা সাড়ে দশটার দিকে তিনি মারা যান। বাদ জুমআ জানাজা শেষে ভাইপো ছলেমানের পাশে দাফন করা হয় ফুফু আমেনা বেগমকে। এর আগে শুক্রবার সকাল ৮টায় ঈদগাহ। মাঠে জানাজা শেষে ছলেমানের লাশ দাফন করা হয় স্থানীয় কবরস্থানে।
এদিকে ছলেমানের জানাজায় উপস্থিত জামায়াতের নেতারা এ হত্যাকান্ডের বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তা না হলে হরতালসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হবে বলেও জানান তারা। ছলেমানের দুই শিশুসন্তানের পড়ালেখাসহ পরিবারের দায়িত্বভার সংগঠন বহন করবে বলেও ঘোষণা দেয়া হয়। জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য মাওলানা আব্দুল মতিন, মেহেরপুর জেলা জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমীর মাওলানা তাজউদ্দিন খান, সেক্রেটারি সিদ্দিকুর রহমান, মেহেরপুর পৌর আমীর মাওলানা মাহাবুবুল আলম, সিনিয়র নায়েবে আমীর সিরাজুল ইসলাম, নায়েবে আমীর সিরাজুল হক, সদর উপজেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা রুহুল আমিন, জেলা ছাত্রশিবিরের সভাপতি সাইফুল ইসলাম, সেক্রেটারি সাব্বির হোসেন, শিবিরের সাবেক সভাপতি তারিক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, আল আমিন ইসলাম বকুল, মেহেরপুর-১ আসনের সাবেক এমপি মাসুদ অরুন, আমঝুপি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলামসহ সহস্রাধিক ধর্মপ্রাণ মানুষ জানাজায় অংশ নেন।
উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার জামায়াতের ডাকা হরতাল সফল করতে সকালে রাজনগরে মেহেরপুর-চুয়াডাঙ্গা সড়কে অবরোধ কর্মসূচি পালন শেষে বাড়ি ফিরছিলেন ছলেমান শেখ। এ সময় পুলিশ তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। পেটে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি রাজশাহী ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার বেলা ২টার দিকে মারা যান। এদিন রাত ১১টার দিকে তার লাশ রঘুনাথপুর গ্রামের বাড়িতে নেয়া হলে অসুস্থ হয়ে পড়েন ফুফু আমেনা বেগম। ছলেমান সদর উপজেলার রঘুনাথপুর গ্রামের সৈয়দ শেখের ছেলে।
৪. শহীদের আপনজনদের কথা
শহীদের পিতা: "আমার ৬টি সন্তানের মধ্যে সে ছিল সবচেয়ে ভাল এবং দায়িত্ববান, বৃদ্ধ পিতামাতাকে দেখাশুনা করত কোন খাবার পিতা-মাতাকে আগে না দিয়ে খেত না। সব ভাইবোনদের সাথে ছিল তার গভীর সম্পর্ক সুখে-দুঃখে সবার সাথে থাকত।"
বড় ভাই কোরবান আলী: গ্রামের মধ্যে তার সমালোচনা করার মত কোন লোক নেই। দলমত নির্বিশেষে সবাই তাকে ভাল জানে।
গ্রামবাসী: ছলেমান ছিল সদালাপী ও মিষ্টভাষী, নামাজ ও অন্যান্য ইবাদতের ক্ষেত্রে সে ছিল একনিষ্ঠ।
৫. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম: শহীদ মোঃ ছলেমান শেখ (১৩৮)।
পেশা: দিনমজুরি।
জন্ম তারিখ ও বয়স: ০৫.১২.১৯৮২ ইং, ৩১ বছর।
আহত হওয়ার তারিখ: ১৩.০৮.২০১৩ সন্ধ্যা ৬টা, পুলিশের গুলিতে মারাত্মক আহত।
শাহাদাতের তারিখ: ১৫.০৮.২০১৩, বেলা ২টা। স্থান: রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল।
দাফন করা হয়: পারিবারিক কবরস্থান।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: রঘুনাথপুর, ডাকঘর: আমঝুপি, থানা: মেহেরপুর সদর, জেলা: মেহেরপুর।
পিতা: মোঃ সৈয়দ আলী শেখ, ৬০ বছর, দিনমজুর।
মাতা: মর্জিনা খাতুন, ৫০ বছর, গৃহিণী।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা: পিতার বসতবাড়ির আঙিনায় বাঁশের চাটায়ের ওপর টিনের ছাপরা দিয়ে বারান্দাসহ একটি ঘর। চাষাবাদের জন্য কোন জায়গা জমি নেই। একমাত্র আয়ের উৎস ছিল দিনমজুরি, দিন আয় দিন খাওয়া।
স্ত্রী ও সন্তানদের বিবরণ: স্ত্রী: শিউলী খাতুন, ২৫ বছর, গৃহিণী। মোঃ ইকবাল, ৩য় শ্রেণী। আবু বক্কর সিদ্দিক, বয়স ২ বছর।
ভাই-বোনের বিবরণ: কোরবান আলী, কৃষক। আরমান আলী, কৃষক/ দিন মজুর। মো: ছলেমান শেখ, শহীদ। আব্দুর রহমান, লেদমিস্ত্রি। মোছা: ফাহিমা খাতুন, বিবাহিতা। মোছা: রুনা খাতুন, বিবাহিতা।

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍