শহীদ আবদুল জাব্বার
আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
শহীদ আবদুল জাব্বার মেহেরপুরের হিজলি গ্রামের জনমানসে যিনি পরিচিত ছিলেন ন্যায়পরায়ণ জনপ্রতিনিধি, সমৃদ্ধ ব্যবসায়ী এবং ধর্মপরায়ণ এক নিবেদিত মানুষ হিসেবে। মাত্র সপ্তম শ্রেণির শিক্ষায় বেড়ে ওঠা এই ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য নিজ প্রচেষ্টায় জ্ঞান অর্জন করে এলাকায় মসজিদের ইমামতি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের কল্যাণে নিজের সম্পদ ও প্রভাব অকাতরে ব্যয় করেছেন। ২০১৩ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার ভেতর মাত্র জামায়াতে ইসলামী করার কারণে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে, এবং সেদিন রাতেই গ্রামের পানের বরোজে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে ‘ক্রসফায়ার’-এর গল্প সাজিয়ে। সততা, দানশীলতা ও নৈতিক দৃঢ়তার জন্য স্থানীয়রা আজও তাকে স্মরণ করেন যিনি সরকারি চাল বিতরণ থেকে জমির বিরোধ সব ক্ষেত্রেই সত্যের পক্ষে অটল ছিলেন। স্ত্রী, পাঁচ কন্যা এবং দুই পুত্রকে রেখে যাওয়া এই মানুষটি তৃণমূল সমাজে ন্যায়, মানবিকতা ও ঈমানি অবদানের এক উজ্জ্বল দলিল হয়ে আছেন।
🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ
শহীদ আবদুল জাব্বার
মেহেরপুর
শহীদ আবদুল জাব্বার ছিলেন ৬০ বছর বয়সী অসাধারণ একজন জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন স্থানীয় ইউনিয়ন। পরিষদের মেম্বার। উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি প্রচুর সম্পদের অধিকারী ছিলেন। ব্যবসায় বাণিজ্য করে সে সম্পদকে তিনি বহুগুণ বৃদ্ধিও করেছেন। জীবনে কেউ তাকে নামাজ কাজা করতে দেখেননি। ইসলামের জন্য তিনি অকাতরে অর্থ ব্যয় করতেন।
জন্য: ১ মার্চ ১৯৫৩, শাহাদাতবরণ। ৩০ ডিসেম্বর ২০১৩।
শহীদের পরিচিতি
মেহেরপুর জেলার সদর থানার আমঝুপি ইউনিয়নের হিজলি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন শহীদ আবদুল জাব্বার। তাঁর পিতার নাম আবদুল মালিথা, মায়ের নাম সাধু বিবি। তাঁর স্ত্রীর নাম মোসাম্মাৎ মহিমা খাতুন। পাঁচ কন্যা ও দুই পুত্র সন্তানের পিতা ছিলেন তিনি। মাত্র সপ্তম-অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা করেছিলেন তিনি, কিন্তু নিজ প্রচেষ্টায় তিনি নানামুখি জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। বিশেষ করে কুরআন হাদিস অধ্যয়নের মাধ্যমে তিনি নিজের জ্ঞানকে বিকশিত করেছিলেন। তিনি পাড়ার মসজিদে বিভিন্ন সময় ইমামতির পাশাপাশি এলাকার বড় মসজিদেও ইমামতি করেছেন। তাঁর বাড়িতে একজন ক্বারী সাহেবকে রেখে নিয়মিত তাঁর কাছে কুরআন শিখেছিলেন শহীদ আবদুল জব্বার। তিনি যৌবনকাল থেকেই ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং শাহাদাতের সময় জামায়াতে ইসলামীর কর্মী ছিলেন। ব্যবসায় করতেন আমঝুপি বাজারে।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে যান
৩০ ডিসেম্বর ২০১৩ সকাল ৮ টার দিকে গ্রাম থেকে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। তাঁর বিরুদ্ধে থানায় কখনো কোনো মামলা ছিলো না। শুধুমাত্র জামায়াতে ইসলামী করাই ছিলো তাঁর অপরাধ। দুপুরের দিকে তাকে থানায় দেখতে যান তাঁর ছেলে মোমিনুল হক। তাকেও আটক করে পুলিশ। রাতে পুত্রের সামনে থেকে পিতাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। নিয়ে আসা হয় গ্রামের পানের বরোজে। সেখানেই তাকে গুলি করে হত্যা করার পর ক্রসফায়ার বলে চালিয়ে দেয় পুলিশ। দীনদত্ত ব্রিজ থেকে নেমে পোয়াতিখালের পাশের সেই পানের বরোজ থেকে তাঁর লাশ উদ্ধার করে জনগণ। সেদিনই জানাজা শেষে গ্রামের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। পুলিশ তার দাফন কাফনেও বাধা প্রদানের চেষ্টা করে। জনগণকে ১ ঘণ্টা সময় বেঁধে হয় দাফন-কাফনের জন্য।
কেমন ছিলেন শহীদ আবদুল জাব্বার
ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন উত্তম চরিত্রের পরোপকারী মানুষ। অঢেল সম্পদের অধিকারী হয়ে তিনি সারাজীবন সত্য ও সুন্দরের পথে নিজেকে পরিচালনা করেছেন। তাঁর দানশীলতার কথা এলাকার মানুষের মুখে মুখে কিংবদন্তির মতো ঘোরাফেরা করে। শহীদের মামা ৯৫ বছর বয়সী আবদুল গফুর বলেন, 'শতকরা ৯৯ জন লোক আমার ভাগ্নের পক্ষে ভোট দিয়েছিলো। অথচ সে কারো কাছে ভোট চাইতেও যায়নি, কোনো পয়সাও খরচ করেনি, শুধু প্রার্থী হইছিলো। সে দু'বার হজ্ব করেছিলো। আমরা তাঁর বয়সে অনেক বড় ছিলাম তবু সে বিভিন্ন বিষয়ে আমাদেরকে শিক্ষা দিতো। ৪৮ বছর বয়সী ইয়ারুল ইসলাম হিজলি গ্রামের বাসিন্দা। তিনি বলেন, 'শুধু আমি কেন, এলাকার প্রতিটি মানুষ বলবে, এলাকার সবকিছু বলবে তিনি খুব খুব ভালো মানুষ ছিলেন।' সমবয়সী ইসরাইল হোসেন বলেন, তিনি ছিলেন আমাদের ইমাম, আমাদের বড় মসজিদে। তিনি ইমামতি করতেন।' ৮৫ বছর বয়সী জমির উদ্দীন আর ৪৬ বছর বয়সী রাশিদুল ইসলাম বলেন,' তিনি যেমন ভালো মানুষ ছিলেন, তেমনি জ্ঞানী মানুষও ছিলেন।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
সম্পূর্ণ সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে তিনি এলাকায় মেম্বার ইলেকশনে অংশ নেন। বিপুল পরিমাণ ভোটে তিনি মেম্বার নির্বাচিত হন। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর জনপ্রিয়তা প্রতিপক্ষকে ক্ষুব্ধ করে। এর আগে তিনি কখনো নির্বাচনে অংশ নেননি। পারিবারিক বাধা সত্ত্বেও তিনি এ নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিজয়ী হয়ে পূর্বের মতোই জনগণের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। এতে করে এলাকায় তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ একেবারে বিলুপ্ত হওয়ার পথে চলে যায়। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী করার কারণে তিনি সরকারী দল ও ওই দলের স্থানীয় নেতাদের কাছেও ছিলেন বিরাগভাজন। প্রশাসনও সে সময় ছিলো সরকারের ভিন্ন মতাবলম্বীদের নিশ্চিহ্ন করার কাজে বেপরোয়া। এরকম পরিস্থিতিতে তিনি বাড়ি থাকতে পারতেন না। ওই সময় গ্রামে রাজনৈতিক পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে পাল্টাপাল্টি দোকানঘর ও বাড়িঘর ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। সেই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে পুলিশ ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত মেম্বার বিপুল জনপ্রিয় নেতা আবদুল জব্বারকে ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করে।
শহীদের আপন জনদের কথা
শহীদের ছেলে মোমিনুল হক বলেন,'আমার বাবাকে আমার সামনে থেকে তুলে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে অথচ তিনি ছিলেন জনগণের জিম্মাদার। একবার সরকারি বরাদ্দের চাউল বিতরণের পর বেশ কিছু বস্তা ছিলো খালি। আমি আব্বুকে বললাম, এখান থেকে কিছু বস্তা নিয়ে যাই। তিনি আমাকে আমাদের পারিবারিক ব্যবসায়িক গোডাউনের চাবি দিয়ে বললেন,' গোডাউনে যাও সেখানে অনেক বস্তা আছে। এগুলো মানুষের বস্তা।' আরেকবার আমাদের জমির আলে লাগানো একটা বড় গাছ নতুন করে মাপ দেওয়ার পর পাশের জমির মালিকের ভাগে পড়ে যায়। তিনি গাছটির দাবি ছাড়তে রাজি হন না। অন্যদিকে তাঁর লাগানো কিছু চারা গাছ আমাদের ভাগে পড়ে যায়। তিনি সেগুলোও কেটে নিয়ে যান। অথচ উচিৎ ছিলো ওই গাছগুলো আমাদের দিয়ে দেওয়া। আব্বু এই অন্যায় নিয়ে বেশ বিচলিত হয়ে পড়লেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন মামলা করবেন। উকিলের সঙ্গে আলাপ করলেন। উকিল বললেন, শুধু এই অভিযোগ দিলে মামলা করা যাবে না বরং এর সঙ্গে আরও কিছু শক্ত অভিযোগ যোগ করে দেন। কিন্তু আব্বু সত্যের সঙ্গে মিথ্যাকে যুক্ত করতে রাজি হননি। তিনি মামলা থেকে পিছিয়ে আসেন।
শহীদের স্ত্রী মহিমা খাতুন বলেন, 'আমার একটা মেয়ে কিছুটা প্রতিবন্ধী। ও ঘাটে বসে অনেক সময় ধরে গায়ে সাবান ঘষলে আমি একটু বকা দিতাম। তিনি কষ্ট পেতেন। নিজে কখনো বকতেন না। আমাকে বলতেন, ওকে যেন কখনো বকা না দিই।' তিনি জানান একবার সরকারি চাল বিলি শেষ হয়ে গেলে, কিছু লোক চাল পাওয়া থেকে বাদ পড়ে যায়। পরে তিনি নিজের গোডাউন থেকে বস্তা ভরে চাল এনে সমপরিমাণ চাল ওদেরকেও দিয়ে দিন।
পারিবারিক অবস্থা
পরিবারটি ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত। আর্থিকভাবে স্বচ্ছল। দুই পুত্রের একজন ব্যবসায় আর একজন চাষাবাদের বিষয়গুলো দেখাশুনা করেন।
সন্তানদের বিবরণ
১। মোমিনুল হক, চাষাবাদ, দুই মেয়ের পিতা।
২। ইনজামুল হক, ব্যবসায়, দুই মেয়ের পিতা।
৩। হোসনে আরা খাতুন, গৃহিণী।
৪। মুনজিরা খাতুন, গৃহিণী।
৫। বেলী খাতুন, গৃহিণী।
৬। শেলী খাতুন, গৃহিণী।
৭। শেফালী খাতুন, মানসিক প্রতিবন্ধী।
এক নজরে শহীদ আবদুল জাব্বার
নাম: শহীদ আবদুল জাব্বার
পিতা: আবদুল মালিথা
মাতা: সাধু বিবি
স্ত্রীর নাম: মোসাম্মাৎ মহিমা খাতুন
ঠিকানা: গ্রাম- হিজলী, ইউনিয়ন- আমঝুপি, থানা- সদর, জেলা- মেহেরপুর
পেশা: ব্যবসা, আমঝুপি বাজার
সন্তান: পাঁচ কন্যা ও দুই পুত্র
সাংগঠনিক মান:কর্মী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী
কিভাবে শহীদ হলেন: ৩০ ডিসেম্বর ২০১৩ সকাল ৮ টার দিকে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। পরে রাতে গ্রামের পানের বরোজে নিয়ে তাকে গুলি করে হত্যা করার পর ক্রসফায়ার বলে চালিয়ে দেয় পুলিশ
শাহাদাতের তারিখ: ৩০ ডিসেম্বর ২০১৩।
মেহেরপুর
শহীদ আবদুল জাব্বার ছিলেন ৬০ বছর বয়সী অসাধারণ একজন জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন স্থানীয় ইউনিয়ন। পরিষদের মেম্বার। উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি প্রচুর সম্পদের অধিকারী ছিলেন। ব্যবসায় বাণিজ্য করে সে সম্পদকে তিনি বহুগুণ বৃদ্ধিও করেছেন। জীবনে কেউ তাকে নামাজ কাজা করতে দেখেননি। ইসলামের জন্য তিনি অকাতরে অর্থ ব্যয় করতেন।
জন্য: ১ মার্চ ১৯৫৩, শাহাদাতবরণ। ৩০ ডিসেম্বর ২০১৩।
শহীদের পরিচিতি
মেহেরপুর জেলার সদর থানার আমঝুপি ইউনিয়নের হিজলি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন শহীদ আবদুল জাব্বার। তাঁর পিতার নাম আবদুল মালিথা, মায়ের নাম সাধু বিবি। তাঁর স্ত্রীর নাম মোসাম্মাৎ মহিমা খাতুন। পাঁচ কন্যা ও দুই পুত্র সন্তানের পিতা ছিলেন তিনি। মাত্র সপ্তম-অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা করেছিলেন তিনি, কিন্তু নিজ প্রচেষ্টায় তিনি নানামুখি জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। বিশেষ করে কুরআন হাদিস অধ্যয়নের মাধ্যমে তিনি নিজের জ্ঞানকে বিকশিত করেছিলেন। তিনি পাড়ার মসজিদে বিভিন্ন সময় ইমামতির পাশাপাশি এলাকার বড় মসজিদেও ইমামতি করেছেন। তাঁর বাড়িতে একজন ক্বারী সাহেবকে রেখে নিয়মিত তাঁর কাছে কুরআন শিখেছিলেন শহীদ আবদুল জব্বার। তিনি যৌবনকাল থেকেই ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং শাহাদাতের সময় জামায়াতে ইসলামীর কর্মী ছিলেন। ব্যবসায় করতেন আমঝুপি বাজারে।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে যান
৩০ ডিসেম্বর ২০১৩ সকাল ৮ টার দিকে গ্রাম থেকে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। তাঁর বিরুদ্ধে থানায় কখনো কোনো মামলা ছিলো না। শুধুমাত্র জামায়াতে ইসলামী করাই ছিলো তাঁর অপরাধ। দুপুরের দিকে তাকে থানায় দেখতে যান তাঁর ছেলে মোমিনুল হক। তাকেও আটক করে পুলিশ। রাতে পুত্রের সামনে থেকে পিতাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। নিয়ে আসা হয় গ্রামের পানের বরোজে। সেখানেই তাকে গুলি করে হত্যা করার পর ক্রসফায়ার বলে চালিয়ে দেয় পুলিশ। দীনদত্ত ব্রিজ থেকে নেমে পোয়াতিখালের পাশের সেই পানের বরোজ থেকে তাঁর লাশ উদ্ধার করে জনগণ। সেদিনই জানাজা শেষে গ্রামের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। পুলিশ তার দাফন কাফনেও বাধা প্রদানের চেষ্টা করে। জনগণকে ১ ঘণ্টা সময় বেঁধে হয় দাফন-কাফনের জন্য।
কেমন ছিলেন শহীদ আবদুল জাব্বার
ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন উত্তম চরিত্রের পরোপকারী মানুষ। অঢেল সম্পদের অধিকারী হয়ে তিনি সারাজীবন সত্য ও সুন্দরের পথে নিজেকে পরিচালনা করেছেন। তাঁর দানশীলতার কথা এলাকার মানুষের মুখে মুখে কিংবদন্তির মতো ঘোরাফেরা করে। শহীদের মামা ৯৫ বছর বয়সী আবদুল গফুর বলেন, 'শতকরা ৯৯ জন লোক আমার ভাগ্নের পক্ষে ভোট দিয়েছিলো। অথচ সে কারো কাছে ভোট চাইতেও যায়নি, কোনো পয়সাও খরচ করেনি, শুধু প্রার্থী হইছিলো। সে দু'বার হজ্ব করেছিলো। আমরা তাঁর বয়সে অনেক বড় ছিলাম তবু সে বিভিন্ন বিষয়ে আমাদেরকে শিক্ষা দিতো। ৪৮ বছর বয়সী ইয়ারুল ইসলাম হিজলি গ্রামের বাসিন্দা। তিনি বলেন, 'শুধু আমি কেন, এলাকার প্রতিটি মানুষ বলবে, এলাকার সবকিছু বলবে তিনি খুব খুব ভালো মানুষ ছিলেন।' সমবয়সী ইসরাইল হোসেন বলেন, তিনি ছিলেন আমাদের ইমাম, আমাদের বড় মসজিদে। তিনি ইমামতি করতেন।' ৮৫ বছর বয়সী জমির উদ্দীন আর ৪৬ বছর বয়সী রাশিদুল ইসলাম বলেন,' তিনি যেমন ভালো মানুষ ছিলেন, তেমনি জ্ঞানী মানুষও ছিলেন।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
সম্পূর্ণ সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে তিনি এলাকায় মেম্বার ইলেকশনে অংশ নেন। বিপুল পরিমাণ ভোটে তিনি মেম্বার নির্বাচিত হন। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর জনপ্রিয়তা প্রতিপক্ষকে ক্ষুব্ধ করে। এর আগে তিনি কখনো নির্বাচনে অংশ নেননি। পারিবারিক বাধা সত্ত্বেও তিনি এ নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিজয়ী হয়ে পূর্বের মতোই জনগণের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। এতে করে এলাকায় তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ একেবারে বিলুপ্ত হওয়ার পথে চলে যায়। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী করার কারণে তিনি সরকারী দল ও ওই দলের স্থানীয় নেতাদের কাছেও ছিলেন বিরাগভাজন। প্রশাসনও সে সময় ছিলো সরকারের ভিন্ন মতাবলম্বীদের নিশ্চিহ্ন করার কাজে বেপরোয়া। এরকম পরিস্থিতিতে তিনি বাড়ি থাকতে পারতেন না। ওই সময় গ্রামে রাজনৈতিক পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে পাল্টাপাল্টি দোকানঘর ও বাড়িঘর ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। সেই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে পুলিশ ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত মেম্বার বিপুল জনপ্রিয় নেতা আবদুল জব্বারকে ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করে।
শহীদের আপন জনদের কথা
শহীদের ছেলে মোমিনুল হক বলেন,'আমার বাবাকে আমার সামনে থেকে তুলে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে অথচ তিনি ছিলেন জনগণের জিম্মাদার। একবার সরকারি বরাদ্দের চাউল বিতরণের পর বেশ কিছু বস্তা ছিলো খালি। আমি আব্বুকে বললাম, এখান থেকে কিছু বস্তা নিয়ে যাই। তিনি আমাকে আমাদের পারিবারিক ব্যবসায়িক গোডাউনের চাবি দিয়ে বললেন,' গোডাউনে যাও সেখানে অনেক বস্তা আছে। এগুলো মানুষের বস্তা।' আরেকবার আমাদের জমির আলে লাগানো একটা বড় গাছ নতুন করে মাপ দেওয়ার পর পাশের জমির মালিকের ভাগে পড়ে যায়। তিনি গাছটির দাবি ছাড়তে রাজি হন না। অন্যদিকে তাঁর লাগানো কিছু চারা গাছ আমাদের ভাগে পড়ে যায়। তিনি সেগুলোও কেটে নিয়ে যান। অথচ উচিৎ ছিলো ওই গাছগুলো আমাদের দিয়ে দেওয়া। আব্বু এই অন্যায় নিয়ে বেশ বিচলিত হয়ে পড়লেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন মামলা করবেন। উকিলের সঙ্গে আলাপ করলেন। উকিল বললেন, শুধু এই অভিযোগ দিলে মামলা করা যাবে না বরং এর সঙ্গে আরও কিছু শক্ত অভিযোগ যোগ করে দেন। কিন্তু আব্বু সত্যের সঙ্গে মিথ্যাকে যুক্ত করতে রাজি হননি। তিনি মামলা থেকে পিছিয়ে আসেন।
শহীদের স্ত্রী মহিমা খাতুন বলেন, 'আমার একটা মেয়ে কিছুটা প্রতিবন্ধী। ও ঘাটে বসে অনেক সময় ধরে গায়ে সাবান ঘষলে আমি একটু বকা দিতাম। তিনি কষ্ট পেতেন। নিজে কখনো বকতেন না। আমাকে বলতেন, ওকে যেন কখনো বকা না দিই।' তিনি জানান একবার সরকারি চাল বিলি শেষ হয়ে গেলে, কিছু লোক চাল পাওয়া থেকে বাদ পড়ে যায়। পরে তিনি নিজের গোডাউন থেকে বস্তা ভরে চাল এনে সমপরিমাণ চাল ওদেরকেও দিয়ে দিন।
পারিবারিক অবস্থা
পরিবারটি ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত। আর্থিকভাবে স্বচ্ছল। দুই পুত্রের একজন ব্যবসায় আর একজন চাষাবাদের বিষয়গুলো দেখাশুনা করেন।
সন্তানদের বিবরণ
১। মোমিনুল হক, চাষাবাদ, দুই মেয়ের পিতা।
২। ইনজামুল হক, ব্যবসায়, দুই মেয়ের পিতা।
৩। হোসনে আরা খাতুন, গৃহিণী।
৪। মুনজিরা খাতুন, গৃহিণী।
৫। বেলী খাতুন, গৃহিণী।
৬। শেলী খাতুন, গৃহিণী।
৭। শেফালী খাতুন, মানসিক প্রতিবন্ধী।
এক নজরে শহীদ আবদুল জাব্বার
নাম: শহীদ আবদুল জাব্বার
পিতা: আবদুল মালিথা
মাতা: সাধু বিবি
স্ত্রীর নাম: মোসাম্মাৎ মহিমা খাতুন
ঠিকানা: গ্রাম- হিজলী, ইউনিয়ন- আমঝুপি, থানা- সদর, জেলা- মেহেরপুর
পেশা: ব্যবসা, আমঝুপি বাজার
সন্তান: পাঁচ কন্যা ও দুই পুত্র
সাংগঠনিক মান:কর্মী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী
কিভাবে শহীদ হলেন: ৩০ ডিসেম্বর ২০১৩ সকাল ৮ টার দিকে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। পরে রাতে গ্রামের পানের বরোজে নিয়ে তাকে গুলি করে হত্যা করার পর ক্রসফায়ার বলে চালিয়ে দেয় পুলিশ
শাহাদাতের তারিখ: ৩০ ডিসেম্বর ২০১৩।
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍