শহীদ তারিক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম
আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
শহীদ তারিক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম মেহেরপুরের বোসপাড়ায় জন্ম নেওয়া এক শিক্ষিত, মানবিক ও জনপ্রিয় জননেতা। যিনি ছাত্রজীবন থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র ও সংগঠক হিসেবে সমাজগঠনের পথ বেছে নেন। ব্যবসা ও জনসেবাকে সমান্তরালে এগিয়ে নিয়ে তিনি দরিদ্র, হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকল মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে বিরল জনপ্রিয়তার অধিকারী হয়ে ওঠেন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের দিনগুলোতে বছরের পর বছর আত্মগোপনে থেকেও তিনি সংগঠন পরিচালনা ও সাধারণ মানুষের সেবায় ছিলেন অটল। ঠিক এই জনপ্রিয়তাই তাঁকে টার্গেটে পরিণত করে ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে ডিবি পুলিশের তুলে নেওয়ার পরদিন ক্রসফায়ারের নামে তাঁর জীবন brutally শেষ করে দেওয়া হয়। তবুও তিনি রয়ে যান ত্যাগ, সাহস, মানবিকতা ও জনকল্যাণের এক অবিনশ্বর প্রতীক হয়ে।
🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ
শহীদ তারিক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম
মেহেরপুর-8
মেহেরপুর জেলায় এক অসাধারণ জননেতা ছিলেন শহীদ তারিক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। বছরের পর বছর আত্মগোপনে থেকেও তিনি ছিলেন জনসেবায় তৎপর। তিনি বিভিন্ন ঈদের সময় নিজের জন্য যে পোশাক কিনতেন তার। ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের জন্যও একই পোশাক কিনে দিতেন। নিজের শিশু সন্তানকে মায়ের কোলে রেখে তাকে আত্মগোপনে থাকতে হয়েছে এবং এ অবস্থায়ই তিনি শাহাদাতবরণ করেছেন।
জন্ম: ১৯ জুন, ১৯৭৯, শাহাদাতবরণ: ২০ জানুয়ারি, ২০১৪
শহীদের পরিচিতি
মেহেরপুর জেলার মেহেরপুর পৌরসভার ২নং ওয়ার্ডের বোসপাড়া প্রধান সড়কে নিজ বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন শহীদ তারিক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। তাঁর মূল পৈত্রিক বাড়ি মেহেরপুর জেলার মুজিবনগর থানার, মহাজনপুর ইউনিয়নের টুঙ্গি গোপালপুর গ্রামে। শহীদের পিতা মোহাম্মদ সমির উদ্দীন ছিলেন মেহেরপুর জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর। শহীদের মাতা তাসলিমা খাতুন জামায়াতে ইসলামীর রুকন। পাঁচ ভাই ও চার বোনের সংসারে তিনি ছিলেন সবার বড়।
স্থানীয় বিএম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ালেখা শেষে তিনি মেহেরপুর সরকারি উচ্চ বালক বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করেন। মেহেরপুর সরকারী কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে এইচএসসি পাস করেন। একই কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অর্নাসে ভর্তি হন। এরপর এশিয়ান ইউনির্ভাসিটি থেকে তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। মাঝখানে তিনি মুজিবনগর ডিগ্রি কলেজ থেকে বিএ পাস কোর্সও সম্পন্ন করেন। ছাত্রজীবনে তিনি ছিলেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের মেহেরপুর জেলা সভাপতি। ছাত্রজীবন শেষ করে তিনি বিভিন্ন ব্যবসায় শুরু করেন। মটরসাইকেল পার্টসের দোকান, ইটভাটা ও ট্রান্সপোর্টের ব্যবসায় ছিলো তাঁর। এসময় তিনি জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন। শাহাদাতবরণ কালে তিনি ছিলেন জামায়াতের মেহেরপুর জেলা সেক্রেটারি।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে যান
জামায়াতে ইসলামীর জনপ্রিয় নেতৃবৃন্দ স্বৈরাচার সরকারের হত্যার টার্গেটে পরিণত হলে তিনি আত্মগোপনে থেকে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছিলেন। এমতাবস্থায় ১৯ জানুয়ারি ২০১৪ দুপুর ২:৩০ মিনিটে স্থানীয় ইসলামী ব্যাংকের নিচ তলা থেকে ডিবি পুলিশ তাকে তুলে নিয়ে যায়। তাঁর পিতার মতোই তাঁর বিরুদ্ধেও বহুসংখ্যক রাজনৈতিক মামলা দাঁড় করানো হয়। তাঁর বিরুদ্ধে ৯টি রাজনৈতিক মামলা ছিলো। পরদিন ২০ তারিখ রাত ১:৪৫ মিনিটে মেহেরপুর পৌর শশ্মশানঘাটে ক্রসফায়ারের নামে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
কেমন ছিলেন শহীদ তারিক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম
ইসলামী আন্দোলনে নিবেদিত প্রাণ একটি পরিবারে জন্মগ্রহণ করায় শহীদ তারিক শৈশব থেকেই এ আন্দোলনে যুক্ত হয়ে পড়েন। ছাত্রজীবনে তিনি বেশ কয়েকবছর মেহেরপুর জেলা সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবের জন্য ছুটে যেতেন। কখনোই চিন্তা করতেন না- কে হিন্দু, কে মুসলিম। এজন্য স্থানীয় মালোপাড়া, হালদার পাড়াসহ যত হিন্দুপাড়া ছিলো সেখানেও তাঁর ছিলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা। তিনি নিজের জন্য যা পছন্দ করতেন নিজের কর্মচারীদের জন্যও তাই করতেন। তিনি অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল ও প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও নিজের জন্য খুব কমই করতেন। তিনি নিজে উপোস থেকেও অভুক্তদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করতেন। বছরের পর বছর আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় কতো রকম দুঃখ কষ্ট তাকে সহ্য করতে হয়েছে, কিন্তু এসবকে তিনি কখনো মনেই নিতেন না। উল্টো তিনি অন্যদের দুঃখ কষ্ট ঘোচানোর জন্য পেরেশান থাকতেন।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর শহীদ তারিক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের বোসপাড়ার বাড়িটি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয় আওয়ামী লীগের লগি-বৈঠাধারী সন্ত্রাসীরা। তাঁর বৃদ্ধ পিতার বিরুদ্ধে দেয়া হতে থাকে একটার পর একটা মামলা। এ অবস্থায় জামায়াত নেতা মোহাম্মদ সমির উদ্দীন বিদেশে হিজরত করেন। শহীদের আমেরিকা প্রবাসী ভাইয়ের সহযোগিতায় শহীদের পিতামাতা হিজরত করতে সক্ষম হন। এমতাবস্থায় শহীদ তারিক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। তিনি ইসলামী আন্দোলনের নেতা কর্মীদের আগলে রাখার পাশাপাশি সাধারণ জনগণের সেবা ও নিরাপত্তার ব্যাপারে মনোযোগ দেন। তাঁর অসাধারণ চারিত্রিক গুণাবলীর কারণে তিনি আওয়ামী লীগ, বিএনপি, হিন্দু, মুসলিম নির্বিশেষে সধারণ জনগণের নিকট হয়ে ওঠেন এক প্রিয় মুখ। স্বৈরাচার সরকারের দালালরা তাঁর এই জনপ্রিয়তা সহ্য করতে পারে না। তারা তাঁর বিরুদ্ধে প্রশাসনকে লেলিয়ে দেয়। ঘরে থাকা আর সম্ভব হয় না তাঁর পক্ষে। নিজের দুই বছরের শিশু সন্তানকে রেখে তিনি প্রায় একবছর একটানা আত্মত্মগোপনে থাকেন। এক বছর পর বাড়ি ফিরে দেখেন নিজের মেয়ে আর তাকে চিনতে পারছে না। এই ঘটনা শহীদ তারিক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামকে মারাত্মকভাবে আহত করে। এরপর তিনি গোপনে মাঝে মাঝে বাড়ি আসার চেষ্টা করেন। কিন্তু তিনি যতবারই বাড়ি আসেন ততবারই মুহূর্তের মধ্যে বাড়ি ঘেরাও করে ফেলে বিভিন্ন বাহিনী। তিনি পালিয়ে আত্মরক্ষা করেন। এ অবস্থা চলতে চলতেই একদিন ডিবিপুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। ক্রসফায়ারের নামে তাঁকে হত্যার পরদিন শহীদের বাসার পাশে শামসুজ্জোহা পার্কে তাঁর নামাজে জানাজা লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের পাশাপাশি সমাজের দুর্বল, দরিদ্র ও সংখ্যালগু হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা তাঁর জন্য অঝোর ধারায় চোখের পানি ফেলে কেঁদেছিলো।
শহীদের আপনজনদের কথা
শহীদ তারিক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের গর্বিত মা তাসলিমা খাতুন বলেন, 'ওকে নিয়ে যাওয়ার জন্য যখন-তখন পুলিশ বাড়িতে হানা দিতো। এমনও হয়েছে যে, ওরে আমি ভাত খাইতে দিছি, ঠিক সে সময় খবর আসলো যে, পুলিশ চর্তুদিকে ঘেরাও করে ফেলছে। আমি ওকে বললাম, তুই এখনই বের হয়ে যা। ও বলল, ভাত কয়টা খেয়ে যাই। আমি ওকে ভাত খাইতে না দিয়ে, ভাতের থালা কেড়ে রেখে দিলাম। জোর করে ঘর থেকে বের করে দিলাম ২০০৬ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ৮/৯ বছর এভাবেই কেটেছে। শহীদের স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, 'তাকে আমি খুব কমই পেয়েছি। আমার চেয়ে বেশি পেয়েছে সাধারণ মানুষ। তারা তাঁর সম্পর্কে অনেক বেশি জানে আমার চেয়ে।' তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, 'ও মটর সাইকেল নিয়ে ঘুরতো। এক শীতকালে দেখি ওর পায়ে শুধু একটা সেন্ডেল। আমি কিছু টাকা দিলাম একটা জুতা কেনার জন্য। ও টাকাটা নিল্যে কিন্তু জুতা কিনলো না, কাদের যেন ঘরবাড়ি আগুনে পুড়ে গেছে তাদের জন্য কাপড় কিনে নিয়ে গেল। আমি বললাম টাকাটাতো তোমাকে জুতা কেনার জন্য দিয়েছি। ও আমাকে বলল, 'দরকার হলে তোমার টাকা ফেরৎ নিয়ে নাও।' ঈদ আসলে ও সবার জন্য কেনাকাটা করতো, নিজের জন্য তেমন কিছু নিতো না। কিছু বলেলে বলতো, 'এতো কিছু পরব কখন।' শহীদের স্ত্রী বলেন, 'মেয়েটা জন্মের পর দু'বছর পর্যন্ত বাবাকে পেয়েছিলো। তারপর ও দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থেকে ফিরে আসলে মেয়ে আর বাবাকে চিনতে পারেনি। আব্বু বলে ডাকেনি। এ নিয়ে ও খুব মন খারাপ করছিলো।'
পারিবারিক অবস্থা
ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত শহীদ পরিবারটি আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী। শহীদের পিতা-মাতা হিজরত করে বিদেশে অবস্থান করছেন। শহীদের রেখে যাওয়া ব্যবসায়-বাণিজ্য পরিচালনা করেন ছোট ভাইয়েরা।
ভাই-বোনদের বিবরণ
১। তাওহীদুল ইসলাম, আমেরিকা প্রবাসী।
২। তাওফিকুল ইসলাম, ব্যবসায়ী।
৩। তাওয়াবুল ইসলাম, ডাক্তার।
৪। তানভীরুল ইসলাম, ছাত্র।
৫। আসমা পারভীন, গৃহিণী।
৬। সুমাইয়া পারভীন, আমেরিকা প্রবাসী।
৭। আফসানা পারভীন, শিক্ষার্থী।
৮। আফিফা পারভীন, শিক্ষার্থী।
স্ত্রী-সন্তানদের বিবরণ
স্ত্রী: জান্নাতুল ফেরদৌস, সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষিকা।
কন্যা: তাশফি তাবাসসুম, বয়স- ৩ বছর।
এক নজরে শহীদ তারিক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম
নাম: শহীদ তরিক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম
পিতা: মোহাম্মদ সমির উদ্দীন, সাবেক জেলা আমীর, মেহেরপুর
মাতা: তাসলিমা খাতুন, রুকন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী
জন্ম: ১৯ জুন, ১৯৭৯
ঠিকানা: ২নং ওয়ার্ড, বোসপাড়া, মেহেরপুর পৌরসভা, মেহেরপুর
ভাই-বোনের সংখ্যা: পাঁচ ভাই ও চার বোনের সংসারে তিনি ছিলেন সবার বড়
সর্বশেষ পড়ালেখা: ডিগ্রী পাস, এশিয়া ইউনিভার্সিটি
পেশা: ব্যবসা, মোটর সাইকেলে পার্টস, ইটভাঁটা ও ট্রান্সপোর্ট
সাংগঠনিক মান: রুকন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী
দায়িত্ব: জেলা সহ-সেক্রেটারি, মেহেরপুর। শিবিরের সাবেক জেলা সভাপতি, মেহেরপুর
কিভাবে শহীদ হলেন: ১৯ জানুয়ারি ২০১৪ দুপুর ২:৩০ মিনিটে স্থানীয় ইসলামী ব্যাংকের নিচ তলা থেকে ডিবি পুলিশ তাকে তুলে নিয়ে যায়। পরদিন ২০ তারিখ রাত ১:৪৫ মিনিটে মেহেরপুর পৌর শ্মশানঘাটে ক্রসফায়ারের নামে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
শাহাদাতের তারিখ: ২০ জানুয়ারি ২০১৪
মেহেরপুর-8
মেহেরপুর জেলায় এক অসাধারণ জননেতা ছিলেন শহীদ তারিক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। বছরের পর বছর আত্মগোপনে থেকেও তিনি ছিলেন জনসেবায় তৎপর। তিনি বিভিন্ন ঈদের সময় নিজের জন্য যে পোশাক কিনতেন তার। ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের জন্যও একই পোশাক কিনে দিতেন। নিজের শিশু সন্তানকে মায়ের কোলে রেখে তাকে আত্মগোপনে থাকতে হয়েছে এবং এ অবস্থায়ই তিনি শাহাদাতবরণ করেছেন।
জন্ম: ১৯ জুন, ১৯৭৯, শাহাদাতবরণ: ২০ জানুয়ারি, ২০১৪
শহীদের পরিচিতি
মেহেরপুর জেলার মেহেরপুর পৌরসভার ২নং ওয়ার্ডের বোসপাড়া প্রধান সড়কে নিজ বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন শহীদ তারিক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। তাঁর মূল পৈত্রিক বাড়ি মেহেরপুর জেলার মুজিবনগর থানার, মহাজনপুর ইউনিয়নের টুঙ্গি গোপালপুর গ্রামে। শহীদের পিতা মোহাম্মদ সমির উদ্দীন ছিলেন মেহেরপুর জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর। শহীদের মাতা তাসলিমা খাতুন জামায়াতে ইসলামীর রুকন। পাঁচ ভাই ও চার বোনের সংসারে তিনি ছিলেন সবার বড়।
স্থানীয় বিএম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ালেখা শেষে তিনি মেহেরপুর সরকারি উচ্চ বালক বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করেন। মেহেরপুর সরকারী কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে এইচএসসি পাস করেন। একই কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অর্নাসে ভর্তি হন। এরপর এশিয়ান ইউনির্ভাসিটি থেকে তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। মাঝখানে তিনি মুজিবনগর ডিগ্রি কলেজ থেকে বিএ পাস কোর্সও সম্পন্ন করেন। ছাত্রজীবনে তিনি ছিলেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের মেহেরপুর জেলা সভাপতি। ছাত্রজীবন শেষ করে তিনি বিভিন্ন ব্যবসায় শুরু করেন। মটরসাইকেল পার্টসের দোকান, ইটভাটা ও ট্রান্সপোর্টের ব্যবসায় ছিলো তাঁর। এসময় তিনি জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন। শাহাদাতবরণ কালে তিনি ছিলেন জামায়াতের মেহেরপুর জেলা সেক্রেটারি।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে যান
জামায়াতে ইসলামীর জনপ্রিয় নেতৃবৃন্দ স্বৈরাচার সরকারের হত্যার টার্গেটে পরিণত হলে তিনি আত্মগোপনে থেকে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছিলেন। এমতাবস্থায় ১৯ জানুয়ারি ২০১৪ দুপুর ২:৩০ মিনিটে স্থানীয় ইসলামী ব্যাংকের নিচ তলা থেকে ডিবি পুলিশ তাকে তুলে নিয়ে যায়। তাঁর পিতার মতোই তাঁর বিরুদ্ধেও বহুসংখ্যক রাজনৈতিক মামলা দাঁড় করানো হয়। তাঁর বিরুদ্ধে ৯টি রাজনৈতিক মামলা ছিলো। পরদিন ২০ তারিখ রাত ১:৪৫ মিনিটে মেহেরপুর পৌর শশ্মশানঘাটে ক্রসফায়ারের নামে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
কেমন ছিলেন শহীদ তারিক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম
ইসলামী আন্দোলনে নিবেদিত প্রাণ একটি পরিবারে জন্মগ্রহণ করায় শহীদ তারিক শৈশব থেকেই এ আন্দোলনে যুক্ত হয়ে পড়েন। ছাত্রজীবনে তিনি বেশ কয়েকবছর মেহেরপুর জেলা সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবের জন্য ছুটে যেতেন। কখনোই চিন্তা করতেন না- কে হিন্দু, কে মুসলিম। এজন্য স্থানীয় মালোপাড়া, হালদার পাড়াসহ যত হিন্দুপাড়া ছিলো সেখানেও তাঁর ছিলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা। তিনি নিজের জন্য যা পছন্দ করতেন নিজের কর্মচারীদের জন্যও তাই করতেন। তিনি অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল ও প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও নিজের জন্য খুব কমই করতেন। তিনি নিজে উপোস থেকেও অভুক্তদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করতেন। বছরের পর বছর আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় কতো রকম দুঃখ কষ্ট তাকে সহ্য করতে হয়েছে, কিন্তু এসবকে তিনি কখনো মনেই নিতেন না। উল্টো তিনি অন্যদের দুঃখ কষ্ট ঘোচানোর জন্য পেরেশান থাকতেন।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর শহীদ তারিক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের বোসপাড়ার বাড়িটি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয় আওয়ামী লীগের লগি-বৈঠাধারী সন্ত্রাসীরা। তাঁর বৃদ্ধ পিতার বিরুদ্ধে দেয়া হতে থাকে একটার পর একটা মামলা। এ অবস্থায় জামায়াত নেতা মোহাম্মদ সমির উদ্দীন বিদেশে হিজরত করেন। শহীদের আমেরিকা প্রবাসী ভাইয়ের সহযোগিতায় শহীদের পিতামাতা হিজরত করতে সক্ষম হন। এমতাবস্থায় শহীদ তারিক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। তিনি ইসলামী আন্দোলনের নেতা কর্মীদের আগলে রাখার পাশাপাশি সাধারণ জনগণের সেবা ও নিরাপত্তার ব্যাপারে মনোযোগ দেন। তাঁর অসাধারণ চারিত্রিক গুণাবলীর কারণে তিনি আওয়ামী লীগ, বিএনপি, হিন্দু, মুসলিম নির্বিশেষে সধারণ জনগণের নিকট হয়ে ওঠেন এক প্রিয় মুখ। স্বৈরাচার সরকারের দালালরা তাঁর এই জনপ্রিয়তা সহ্য করতে পারে না। তারা তাঁর বিরুদ্ধে প্রশাসনকে লেলিয়ে দেয়। ঘরে থাকা আর সম্ভব হয় না তাঁর পক্ষে। নিজের দুই বছরের শিশু সন্তানকে রেখে তিনি প্রায় একবছর একটানা আত্মত্মগোপনে থাকেন। এক বছর পর বাড়ি ফিরে দেখেন নিজের মেয়ে আর তাকে চিনতে পারছে না। এই ঘটনা শহীদ তারিক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামকে মারাত্মকভাবে আহত করে। এরপর তিনি গোপনে মাঝে মাঝে বাড়ি আসার চেষ্টা করেন। কিন্তু তিনি যতবারই বাড়ি আসেন ততবারই মুহূর্তের মধ্যে বাড়ি ঘেরাও করে ফেলে বিভিন্ন বাহিনী। তিনি পালিয়ে আত্মরক্ষা করেন। এ অবস্থা চলতে চলতেই একদিন ডিবিপুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। ক্রসফায়ারের নামে তাঁকে হত্যার পরদিন শহীদের বাসার পাশে শামসুজ্জোহা পার্কে তাঁর নামাজে জানাজা লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের পাশাপাশি সমাজের দুর্বল, দরিদ্র ও সংখ্যালগু হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা তাঁর জন্য অঝোর ধারায় চোখের পানি ফেলে কেঁদেছিলো।
শহীদের আপনজনদের কথা
শহীদ তারিক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের গর্বিত মা তাসলিমা খাতুন বলেন, 'ওকে নিয়ে যাওয়ার জন্য যখন-তখন পুলিশ বাড়িতে হানা দিতো। এমনও হয়েছে যে, ওরে আমি ভাত খাইতে দিছি, ঠিক সে সময় খবর আসলো যে, পুলিশ চর্তুদিকে ঘেরাও করে ফেলছে। আমি ওকে বললাম, তুই এখনই বের হয়ে যা। ও বলল, ভাত কয়টা খেয়ে যাই। আমি ওকে ভাত খাইতে না দিয়ে, ভাতের থালা কেড়ে রেখে দিলাম। জোর করে ঘর থেকে বের করে দিলাম ২০০৬ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ৮/৯ বছর এভাবেই কেটেছে। শহীদের স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, 'তাকে আমি খুব কমই পেয়েছি। আমার চেয়ে বেশি পেয়েছে সাধারণ মানুষ। তারা তাঁর সম্পর্কে অনেক বেশি জানে আমার চেয়ে।' তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, 'ও মটর সাইকেল নিয়ে ঘুরতো। এক শীতকালে দেখি ওর পায়ে শুধু একটা সেন্ডেল। আমি কিছু টাকা দিলাম একটা জুতা কেনার জন্য। ও টাকাটা নিল্যে কিন্তু জুতা কিনলো না, কাদের যেন ঘরবাড়ি আগুনে পুড়ে গেছে তাদের জন্য কাপড় কিনে নিয়ে গেল। আমি বললাম টাকাটাতো তোমাকে জুতা কেনার জন্য দিয়েছি। ও আমাকে বলল, 'দরকার হলে তোমার টাকা ফেরৎ নিয়ে নাও।' ঈদ আসলে ও সবার জন্য কেনাকাটা করতো, নিজের জন্য তেমন কিছু নিতো না। কিছু বলেলে বলতো, 'এতো কিছু পরব কখন।' শহীদের স্ত্রী বলেন, 'মেয়েটা জন্মের পর দু'বছর পর্যন্ত বাবাকে পেয়েছিলো। তারপর ও দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থেকে ফিরে আসলে মেয়ে আর বাবাকে চিনতে পারেনি। আব্বু বলে ডাকেনি। এ নিয়ে ও খুব মন খারাপ করছিলো।'
পারিবারিক অবস্থা
ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত শহীদ পরিবারটি আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী। শহীদের পিতা-মাতা হিজরত করে বিদেশে অবস্থান করছেন। শহীদের রেখে যাওয়া ব্যবসায়-বাণিজ্য পরিচালনা করেন ছোট ভাইয়েরা।
ভাই-বোনদের বিবরণ
১। তাওহীদুল ইসলাম, আমেরিকা প্রবাসী।
২। তাওফিকুল ইসলাম, ব্যবসায়ী।
৩। তাওয়াবুল ইসলাম, ডাক্তার।
৪। তানভীরুল ইসলাম, ছাত্র।
৫। আসমা পারভীন, গৃহিণী।
৬। সুমাইয়া পারভীন, আমেরিকা প্রবাসী।
৭। আফসানা পারভীন, শিক্ষার্থী।
৮। আফিফা পারভীন, শিক্ষার্থী।
স্ত্রী-সন্তানদের বিবরণ
স্ত্রী: জান্নাতুল ফেরদৌস, সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষিকা।
কন্যা: তাশফি তাবাসসুম, বয়স- ৩ বছর।
এক নজরে শহীদ তারিক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম
নাম: শহীদ তরিক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম
পিতা: মোহাম্মদ সমির উদ্দীন, সাবেক জেলা আমীর, মেহেরপুর
মাতা: তাসলিমা খাতুন, রুকন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী
জন্ম: ১৯ জুন, ১৯৭৯
ঠিকানা: ২নং ওয়ার্ড, বোসপাড়া, মেহেরপুর পৌরসভা, মেহেরপুর
ভাই-বোনের সংখ্যা: পাঁচ ভাই ও চার বোনের সংসারে তিনি ছিলেন সবার বড়
সর্বশেষ পড়ালেখা: ডিগ্রী পাস, এশিয়া ইউনিভার্সিটি
পেশা: ব্যবসা, মোটর সাইকেলে পার্টস, ইটভাঁটা ও ট্রান্সপোর্ট
সাংগঠনিক মান: রুকন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী
দায়িত্ব: জেলা সহ-সেক্রেটারি, মেহেরপুর। শিবিরের সাবেক জেলা সভাপতি, মেহেরপুর
কিভাবে শহীদ হলেন: ১৯ জানুয়ারি ২০১৪ দুপুর ২:৩০ মিনিটে স্থানীয় ইসলামী ব্যাংকের নিচ তলা থেকে ডিবি পুলিশ তাকে তুলে নিয়ে যায়। পরদিন ২০ তারিখ রাত ১:৪৫ মিনিটে মেহেরপুর পৌর শ্মশানঘাটে ক্রসফায়ারের নামে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
শাহাদাতের তারিখ: ২০ জানুয়ারি ২০১৪
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍