হোম / আওয়ামী দুঃশাসনে শহীদ / শহীদ মো: মজনু মিয়া
শহীদ মো: মজনু মিয়া

শহীদ মো: মজনু মিয়া

আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

শহীদ মোঃ মজনু মিয়া গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর এক পরিশ্রমী কৃষিশ্রমিক। যিনি দারিদ্র্যের বাস্তবতা বয়ে পরিবারকে টিকিয়ে রেখেও ছিলেন নম্র, সৎ ও নিরীহ চরিত্রের প্রতিচ্ছবি। হাটে দোকান চালানো থেকে ভ্যান চালানো জীবিকার কঠিন পথে হাঁটলেও পরিবারের জন্য স্বপ্ন দেখতেন, বিশেষ করে একমাত্র সন্তানকে মানুষ করার আকাঙ্ক্ষায় বেঁচে ছিলেন। ২০১৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি রাসুল (সা.)-কে অবমাননার প্রতিবাদে তৌহিদি জনতার মিছিলে অংশ নিয়ে গুলিবর্ষণ ও নৃশংস আক্রমণের শিকার হয়ে তিনি ঘটনাস্থলেই শহীদ হন। তাঁর মৃত্যু শুধু স্ত্রী ও সন্তানের ভবিষ্যৎ নয়, এক দরিদ্র পরিবারের নির্ভরতার স্তম্ভটিকেও ভেঙে দেয়। তবুও মানুষ আজও তাকে স্মরণ করে এক সাধারণ কিন্তু ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো অসাধারণ মানুষের প্রতীক হিসেবে।

🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ

শহীদ মো: মজনু মিয়া
গাইবান্ধা
د
"লাশ এসেছে শুনে স্ত্রী বার বার বুক ফাটা কান্নায় মুর্ছা যাচ্ছিলেন। বৃদ্ধ পিতা মনসুর আলী বলেন, ছেলের মুখটাও ভাল করে দেখা হলো না। জানাজা হয়েছে কিনা জানি না। গোসল কাফন কিছুই নিজ হাতে করতে পারলাম না। মা মনোয়ারা বেগম বলেন- রাতের অন্ধকারে তাড়াহুড়া করে ছেলের মুখ বোঝা যায়নি। স্ত্রী পেয়ারা বেগম বলেন, আমার স্বামী নিরীহ। আমি আমার স্বামী হত্যার বিচার চাই। চাই আমার ছেলের বাঁচার গ্যারান্টি।"
১. শহীদের পরিচিতি
শহীদ মো: মজনু মিয়া গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ী উপজেলার মহেশপুর গ্রামে ১৯৮১ ইং সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পিতা মনসুর আলী ও মাতা মনোয়ারা বেগমের পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবার বড় ছিলেন। পিতা-মাতার অভাবী সংসারে অর্থনৈতিক সঙ্কটের কারণে শহীদ মো: মজনু মিয়া ১০ম শ্রেণীর পর আর লেখা-পড়া চালিয়ে যেতে পারেননি। বরং পিতার সহযোগী হিসেবে ক্ষেত-খামারে কাজ করাটাকেই পেশা হিসেবে নিতে হয়েছে। ধরতে হয়েছে গোটা পরিবারের হাল। মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত তিনি হাটে দোকান ও ভ্যান চালিয়ে রোজগার করতেন। চার ভাই এক বোনের সংসারে বাকিরাও অর্থনৈতিক দৈন্যতার কারণে পড়ালেখায় প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোতে পারেননি। তথাপি চতুর্থ ভাই এবং সবার ছোট একমাত্র বোনকে নিয়ে তাদের স্বপ্ন ছিল যে, এদেরকে শিক্ষিত করে মানুষের মত মানুষ করে গড়ে তুলবেন। এত অভাব-অনটন সত্ত্বেও ব্যক্তিগতভাবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত নম্র, ভদ্র, বিনয়ী ও সৎ চরিত্রের অধিকারী। তিন বছর আগে বিয়ে করেছিলেন। তার রয়েছে মো: মুজাহিদ নামে মাত্র বিশ মাস বয়সের একটি ফুটফুটে সন্তান। এদের নিয়ে তিনি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। পিতা-মাতা, ভাই-বোন, স্ত্রী ও সন্তানের মায়ার বাঁধন ছিন্ন করে সকলকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে আল্লাহর রাহে ইহধাম ত্যাগ করেন।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে জুম'আর নামায শেষে ছোট ভাইকে সঙ্গে নিয়ে রাসূল (সা:) এর প্রতি কটূক্তি করার প্রতিবাদে নাস্তিক ব্লগারদের বিরুদ্ধে তৌহিদি জনতার মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। মিছিলটি পলাশবাড়ী বাজার মসজিদ চত্বর থেকে শুরু হয়ে রংপুর স্ট্যান্ড হয়ে পলাশবাড়ী চৌমাথায় গেলে পুলিশের সাথে সংঘর্ষ শুরু হয়। ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া চলতে থাকে এবং পুলিশ রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল মারতে থাকে। মিছিল শেষে বিচ্ছিন্নভাবে বাজারের মধ্য দিয়ে যাওযার পথে কালিবাড়ি বাজার মহিলা মার্কেটের পশ্চিম গলিতে প্রথমে পুলিশ থেকে ছাত্রলীগ রাইফেল ছিনিয়ে নিয়ে গুলি করে। পেটে গুলি ঢুকে পিছন দিয়ে বেরিয়ে যায়। রাস্তায় পড়ে গেলে ছাত্রলীগ রামদা দিয়ে কোপাতে থাকে। কোপাতে কোপাতে এক সময় শরীর থেকে পা বিচ্ছিন্ন হয়ে ঝুলে পড়ে। এভাবে ঘটনাস্থলেই তিনি শাহাদাৎ বরণ করেন। পরে বিকেল চারটার দিকে পুলিশ লাশ নিয়ে যায়। পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তর না করার কারণে পলাশবাড়ী আদর্শ ডিগ্রি কলেজ মাঠে একটি গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে ইমামতি করেন অধ্যক্ষ মমতাজ উদ্দিন। সেখানে পনের হাজারের অধিক লোক উপস্থিত হয়।
পরের দিন ২৩.০২.২০১৩ তারিখ রাত নয়টার দিকে তার বাড়িতে পুলিশ, বিজিবি ও র‍্যাব এর তত্ত্বাবধানে জানাজা দিয়ে লাশ দাফন করা হয়।
৩. সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে জুমআর নামায শেষে রাসুল (সা:) এর প্রতি কটূক্তি করার প্রতিবাদে নাস্তিক ব্লগারদের বিরুদ্ধে তৌহিদি জনতার মিছিল ছিল সারা দেশব্যাপী। তারই অংশ হিসেবে গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ী বাজার মসজিদ চত্বর থেকে মিছিল শুরু হয়। মিছিলটি পলাশবাড়ী বাজার মসজিদ চত্বর থেকে রংপুর স্ট্যান্ড হয়ে পলাশবাড়ী চৌমাথায় গেলে পুলিশের সাথে সংঘর্ষ শুরু হয়। জাতীয় দৈনিক মানবজমিন এ বিষয়ে বিস্তারিত নিউজ করেছে, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩। তাদের শিরোনাম ছিল "অন্ধকারে ছেলের মুখটাও দেখা হলো না"।
সিদ্দিক আলম দয়াল, উত্তরাঞ্চল থেকে: মৃত ছেলের মুখ দেখতে পেলেন না হতভাগ্য জননী। নামাজ পড়তে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। ফিরেছে রক্তাক্ত লাশ হয়ে পরদিন শনিবার রাতে। সঙ্গে বিজিবি-পুলিশ। তাড়াহুড়া করে রাতের অন্ধকারে ছেলেকে কবর দিতে বাধ্য করায় আত্মীয়স্বজন ও গ্রামবাসীদের মুখ দেখতে দেয়া হলো না। এ অভিযোগ পুলিশের গুলিতে নিহত মজনু মিয়ার স্ত্রী ও বৃদ্ধ মাতা মনোয়ারা বেগমের। পলাশবাড়ী উপজেলার মহেশপুর গ্রামের দরিদ্র বাসিন্দা মনসুর আলীর প্রথম ছেলে মামিনুল ইসলাম মজনু। জমিজমা নেই তাই বড় ছেলেসহ সবাই অন্যের জমিতে বর্গা চাষ ও শ্রমিক হিসেবে কাজ করে। মাঝে মধ্যে ভ্যান চালাতেন মজনু মিয়া। শুক্রবার ভ্যান চালিয়ে নামাজ পড়েন বাড়ির পাশের মসজিদে। নামাজ শেষে বাড়িতে গিয়ে ভ্যানের প্যাডেল হাতে ধরতেই স্ত্রী পিয়ারা তার কোলের শিশু মোজাহিদকে নিয়ে আসেন স্বামীর কাছে। স্ত্রী তাকে দুপুরে ভাত খেয়ে ভ্যান নিয়ে যেতে বলেন। মজনু সন্তানকে আদর করে স্ত্রীকে বলেন ভাড়াটা নামিয়ে দিয়ে বাড়ি এসে এক সঙ্গে খাবো। কিন্তু এই যাওয়াই যে তার শেষ যাওয়া হবে তা স্ত্রী পেয়ারা খাতুন বুঝতে পারেননি। স্বামী ফিরে আসবেন- এই আশায় থালে ভাত তৈরি করে স্ত্রী পেয়ারা খাতুন অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু অনেকক্ষণ পর তার কাছে খবর আসে পলাশবাড়ী চৌমাথায় পুলিশের সঙ্গে গণ্ডগোল হয়েছে। পুলিশ গুলি করেছে। কিন্তু তার স্বামী কোথায় আছে কিছু হয়েছে কিনা তা পেয়ারার কানে যায়নি। অপেক্ষা করে যখন সন্ধ্যা নামে তখন গ্রামের মানুষের কাছে জানতে পারেন, তার স্বামী মজনু থানায় পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। তখনও তিনি জানেন না তার স্বামী আর নেই। জুম্মার নামাজের পর মুসল্লিরা যখন পলাশবাড়ী বন্দরে আসেন তখন পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। বুঝে ওঠার আগেই তার বুকে এসে বিদ্ধ হয় পুলিশের গুলি। আশপাশের লোকজন রক্তাক্ত অবস্থায় ভ্যানে তুলে নিয়ে যেতেই পুলিশ তাদের নিয়ে যায় পলাশবাড়ী থানায়। তাদের অভিযোগ পুলিশের ওপর হামলা করেছেন তিনি।
গুরুতর আহত অবস্থায় পুলিশ তাকে নিয়ে যায় পলাশবাড়ী থানায়। তখনও তিনি ভ্যানে শুয়ে নড়াচড়া করছিলেন বলে ভিডিও ক্যামেরায় ধরা পড়ে। পুলিশ মজনুসহ ২ জন গুলিবিদ্ধকে থানায় নিয়ে রাখে। তখনও তার বাড়িতে কেউ জানেন না মজনু কোথায়। স্বামীর জন্য অনেকক্ষণ ভাত নিয়ে বসে থাকার পর দেরি হওয়ায় খোঁজ নিতে বের হন পাশের রাস্তায়। তখন তিনি শুনতে পান পলাশবাড়ীতে গোলমাল হয়েছে। পুলিশ গুলি করেছে। ইতোমধ্যে পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনা জানাজানি হলে বন্দর ছেড়ে বিক্ষুব্ধ লোকজন অবস্থান নেয় ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের দুই পাশে। তারপর লোকমুখে খবর পৌঁছে যায় মজনু পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন। খবর শুনে পেয়ারা বেগম ও মা মনোয়ারা বেগম ছেলেকে খুঁজতে যান থানায়। থানা থেকে তাঁদের তাড়িয়ে দেয়া হয় বলে অভিযোগ করেন মনোয়ারা বেগম।
তারপর কাঁদতে কাঁদতে ফিরে আসেন বাড়িতে। বাড়ি এসে শুনতে পারেন মজনু আর নেই। বাড়িসহ মহেশপুর গ্রাম জুড়ে শুরু হয় হাহাকার। স্ত্রী পেয়ারা বেগম, মা মনোয়ারা বেগমসহ স্বজনদের গগনবিদারি কান্নায় মহেশপুর গ্রামের বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। বার বার জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন স্ত্রী পেয়ারা বেগম ও মা মনোয়ারা বেগম। শুরু হয় খোঁজখবর, লাশ কোথায়? থানা থেকে নাকি বলা হয় যথাসময়ে লাশ দেয়া হবে। বিকালে পলাশবাড়ী থেকে লাশ গাইবান্ধা হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। সেখানে রাখা হয় শনিবার বিকাল পর্যন্ত। নিহতের গ্রামের বাড়িতে খবর দেয়া হয় কবর তৈরি করতে। এ খবর পেয়ে পলাশবাড়ীতে গায়েবানা জানাজা হয়। তারপর রাতে কড়া পুলিশ ও বিজিবি প্রহরায় লাশ নিয়ে যাওয়া হয় রাতে। সোজা কবরের পাশে। হস্তান্তর করা হয় নিহতের স্বজনদের হাতে। কিন্তু শর্ত দেয়া হয় তাড়াতাড়ি কবর দেয়ার। লাশ এসেছে খবর পেয়ে হাজার হাজার লোক জড়ো হতে থাকে নিহত মজনুকে এক নজর দেখতে। কিন্তু অন্ধকারে তার মুখ দেখা যায়নি। লাশ এসেছে শুনে স্ত্রী বার বার বুক ফাটা কান্নায় মূর্ছা যাচ্ছিলেন। বৃদ্ধ পিতা মনসুর আলী বলেন, ছেলের মুখটাও ভাল করে দেখা হলো না। জানাজা হয়েছে কিনা জানি না। গোসল কাফন কিছুই নিজ হাতে করতে পারলাম না। মা মনোয়ারা বেগম বলেন- রাতের অন্ধকারে তাড়াহুড়া করে ছেলের মুখ বোঝা যায়নি। তাড়াহুড়া করে কবর দেয়ায় গ্রামের কেউ তাকে শেষ বারের মতো দেখতে পায়নি। বাড়ির লোকজনও অন্ধকার আর তাড়াহুড়ার মধ্যে নিহত মজনুর মুখটাও ভাল করে দেখতে পায়নি। স্ত্রী পেয়ারা বেগম বলেন-আমার স্বামী নিরীহ। তার কোন দল নাই। আমি আমার স্বামী হত্যার বিচার চাই। চাই আমার ছেলের বাঁচার গ্যারান্টি।
৪. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম: শহীদ মোঃ মজনু মিয়া,
পেশা: কৃষি।
সাংগঠনিক মান: সমর্থক, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
জন্ম তারিখ ও বয়স: ০৩.০৯.১৯৮১, ৩২ বছর।
আহত হওয়ার তারিখ: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, পেটে গুলি ঢুকে পিছন থেকে বেরিযে যায়।
শাহাদাতের তারিখ: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, স্থান: গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ী উপজেলা।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: মহেশপুর, ডাকঘর: পলাশবাড়ী, থানা: পলাশবাড়ী, জেলা: গাইবান্ধা।
পিতা: মো. মনসুর আলী, বয়স ৬০ বছর, কৃষি।
মাতাঃ মোসা: মনোয়ারা বেগম, ৫০ বছর, গৃহিণী।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা: একটি টিনের ঘর আছে, নিজেদের কোন কৃষিজমি নেই, ভ্যান চালিয়ে যে আয় হতো তা দিয়ে পরিবার চলতো।
স্ত্রী ও সন্তানদের বিবরণ: পেয়ারা বেগম, ২১ বছর, গৃহিণী, একমাত্র সন্তানের নাম: মো: মুজাহিদ, ২০ মাস বয়স।
ভাই-বোনের বিবরণ: মো: রনজু মিয়া, ভ্যান চালক, মোঃ শনজু মিয়া, কৃষক, মোঃ ইউসুফ, মহেশপুর দাখিল মাদ্রাসা, দশম শ্রেণী, মোসা, নাসরিন, ছাত্রী, নার্সারী।

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍