শহীদ শাহারুল ইসলাম
আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
শহীদ শাহারুল ইসলাম, গাইবান্ধার রাঘবপুরের এক শান্ত-নম্র আলিম পরীক্ষার্থী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের কর্মী, পরিবার ও প্রতিবেশীদের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে উৎসাহিত করার জন্য পরিচিত ছিলেন। আলিম পরীক্ষার প্রস্তুতির মধ্যেই ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ তাকে বাসা থেকে গ্রেফতার করে নির্যাতনের পর কারাগারে পাঠানো হয়। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায়ও কারাগার থেকেই পরীক্ষা দিতে থাকা শাহারুল ৩ এপ্রিল সুবহে সাদিকে ইন্তেকাল করেন। ধর্মনিষ্ঠতা, দায়িত্ববোধ ও স্বপ্নভরা জীবনের এই তরুণ আজ স্মরণীয় হয়ে আছেন ত্যাগ ও আদর্শের প্রতীক হিসেবে।
🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ
শহীদ শাহারুল ইসলাম
গাইবান্ধা
মেসে থাকা অবস্থায় মোবাইল এর মাধ্যমে আমাকে পাচ ওয়াক্ত নামাযের কথা বলতেন এবং পর্দা বিষয়েও উপদেশ দিতেন। মাদরাসা থেকে সে বাড়িতে আসলে বাড়ির সকল চাচা চাচী ও ছোট ভাইদের নামাযের তাকিদ দিতেন।
-শহীদ শাহারুল ইসলামের মা
শহীদের পরিচিতি
শহীদ শাহারুল ইসলাম ১৯৯৫ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ থানাধীন রাঘবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আব্দুর রাজ্জাক এবং মাতা শামসুন নাহারের বড় ছেলে তিনি। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কর্মী ছিলেন। শাহাদাতকালে তিনি আলিম পরীক্ষার্থী ছিলেন।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে যান
৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, বাসা থেকে গ্রেফতারের পর কারাগারে থেকেই আলিম পরীক্ষা দিচ্ছিলেন শহীদ শাহারুল ইসলাম। পরীক্ষা চলাকালে ৩ এপ্রিল ২০১৫ শুক্রবার কারাগারে শাহাদাত বরণ করেন।
শাহাদাতের পূর্বের বিভিন্ন ঘটনা
শহীদ শাহারুল ইসলাম মাঝে মাঝে বলতো- বাবা চিন্তা করার কিছু নেই। পড়ালেখা শেষ করে আমি সরকারী চাকরি করবো তখন আর আমাদের দুঃখ কষ্ট থাকবে না।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
শহীদ শাহারুল ইসলাম ছিলেন ২০১৫ সালে আলিম পরিক্ষার্থী। তার পরিক্ষার কেন্দ্র ছিল মহিমাগঞ্জ আলিয়া কামিল মাদরাসা। শাহারুল ভালোভাবে পরিক্ষা দেয়ার জন্য তার বন্ধুদের সাথে মহিমাগঞ্জ আলিয়া মাদরাসার পার্শ্বে একটি বাসা ভাড়া নিয়ে সেখানে থাকতেন। কিন্তু আওয়ামী পুলিশ বাহিনী তার পরিক্ষাটাও শেষ করতে দেয়নি। আলিম পরিক্ষা শুরু হওয়ার আগেই ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ দুপুর ২টার সময় তাকে বাসা হতে গ্রেফতার করে থানায় এনে তার উপর অমানুষিক নির্যাতন করে পুলিশ ও গোবিন্দগঞ্জ থানার ওসি নিজে। যার কারণে সে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় কোন চিকিৎসা ছাড়াই তাকে কোর্টের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়। কারাগারেই তার চিকিৎসা চলতে থাকে একই সাথে কারাগার থেকেই সে আলিম পরিক্ষা দেয়া শুরু করে। তার স্বপ্ন ছিল সরকারি চাকুরি করে পরিবারের সকল অভাব দূর করে পিতা মাতার মুখে হাসি ফোটাবে। কিন্তু তার উপর নির্যাতনের পরিমাণ এতবেশি ছিল যে তার স্বপ্ন আর পূর্ণ হল না। অবশেষে কারাগারে থাকা অবস্থায় ৩ এপ্রিল ২০১৫ রোজ শুক্রবার সুবহে সাদিকে ফজরের নামায আদায় শেষে যখন কারাগারের সকল মজলুম ভাইয়েরা দুহাত তুলে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করছিলেন ঠিক সে সময় শহীদ শাহারুল ইসলাম ভাই আল্লাহর কাছে প্রার্থনারত অবস্থায় তার সকল সাথীদের কাঁদিয়ে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
শহীদের মা-বাবার কথা
শহীদ শাহারুলের বাবা মোঃ আব্দুর রাজ্জাক বলেন- শহীদ শাহারুল ইসলাম আমার তিন সন্তানের ১ম সন্তান। আমাদের পরিবারের অবস্থা ভালো না থাকায় অত্যন্ত কষ্ট করে আমি আমার সন্তানেদর পড়ালেখায় কোন প্রকার কষ্ট দেইনি। আমি শহীদ শাহারুল ইসলামকে নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখতাম। শহীদ শাহারুল ইসলাম আমাকে মাঝে মাঝে বলতো- "বাবা চিন্তা করার কিছু নেই। পড়ালেখা শেষ করে আমি সরকারী চাকুরী করবো তখন আর আমাদের দুঃখ কষ্ট থাকবে না।" কিন্তু বাতিল শক্তি আমার সন্তানের সে স্বপ্নকে পূর্ণ করতে দিলো না। ইয়া আল্লাহ! আমি তোমার কাছে বিচার চাই, যারা আমার সন্তানকে অন্যায়ভাবে হত্যা করলো আল্লাহ তুমি তার সঠিক বিচার করো।
শহীদ শাহারুলের মার উক্তি
শহীদ শাহারুল ইসলামের মা বলেন- শাহারুল আমার গর্ভের প্রথম সন্তান। আমি তাকে অত্যন্ত কষ্ট করে গর্ভ ধারণ করেছি। তাকে নিয়ে আমি অনেক আশা-আকাঙ্খা করতাম। সে যখন স্কুলে যেত তখন আমি তার দিকে একপানে তাকিয়ে থাকতাম। সে মেসে থাকা অবস্থায় মোবাইল এর মাধ্যমে আমাকে পাচ ওয়াক্ত নামাযের কথা বলতো এবং পর্দা বিষয়েও উপদেশ দিতো। মাদরাসা থেকে সে বাড়িতে আসলে বাড়ীর সকল চাচা-চাচী ও ছোট ভাইদের নামাযের তাগিদ দিতো। আমি আমার সন্তানকে কোন দিন কষ্ট দেইনি। যারা আমার এই প্রাণের সহজ-সরল সন্তানকে অন্যায়ভাবে হত্যা করলো। হে আল্লাহ! তুমি তো উত্তম বিচারক, আমি তোমার কাছে বিচার চাই এবং আমার শহীদ সন্তান শাহারুলকে জান্নাতের উত্তম স্থান দান করো।
দায়িত্বশীলদের মতামত
শহীদ শাহারুল ইসলাম আমার একান্ত আত্মার পরম আত্মীয় রক্তের বাধনের দীনের সিপাহসালার ইসলামী ছাত্রশিবিরের কর্মী। তার সাথে আমার সাক্ষাতের সময় বেশি দিনের নয়। তিনি ইসলামী ছাত্রশিবিরের নতুন কর্মী শপথ নিয়ে ছিলেন। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে মহান আল্লাহ তায়ালা তাকে শহীদের মর্যাদা দান করেছেন। তার জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত ভদ্র ও মার্জিত। তিনি কখনো কাউকে কষ্ট দিতেন না এবং সকলের সাথে হাসি মুখে কথা বলতেন এবং সকল প্রকার ভয়ভীতি উপেক্ষা করে তিনি মহান আল্লাহর দ্বীনের কাজ চালিয়ে ছিলেন। মহান আল্লাহ তায়ালা তাকে উত্তম পুরস্কার দান করুন।
শিক্ষকদের মতামত
শহীদ শাহারুল ইসলাম আমাদের মাদরাসায় নিয়মিত ছাত্র সে আমাদের সকলের সাথে ভালো আচরণ করতো। এবং আমার দেখা সে পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ার জন্য তার ক্লাসের অন্যান্য ছাত্রদের তাগিদ দিতো। সে অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও মেধাবী। আমরা শহীদ শাহারুল ইসলামকে হারিয়ে অত্যন্ত শোকাহত। আল্লাহ তুমি আমাদের ছাত্র শহীদ শাহারুলকে জান্নাত দান করুন।
শহীদের ভাইয়ের উক্তি
শাহারুল ইসলামের ছোট ভাই বলেন- আমরা তিন ভাই। শহীদ শাহারুল ইসলাম আমার বড় ভাই। আমার ছোট ভাই মাহিন মিয়া আমরা আমাদের পরিবারের ছোট তখন বড় ভাই শহীদ শাহারুল ইসলাম ভাই পড়ালেখার বিষয়ে আমাকে সার্বক্ষণিক দিক নিদের্শনা দিতেন এবং তিনি আমাদের পরিবারের অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করতেন। তিনি আমাদের পড়ালেখার কোনো অভাব বুঝতে দেননি। সবসময় আমাদের আদর করতেন এবং উৎসাহ যোগাতেন। আজ আমরা সেই স্নেহের বড় ভাইয়ের আদর সোহাগ থেকে বঞ্চিত হলাম। হে আল্লাহ যারা অন্যায়ভাবে আমার ভাইকে শহীদ করেছে তুমি তাদের বিচার করো।
এলাকাবাসীর উক্তি
পাড়াপ্রতিবেশি শহীদের দাদা মোঃ মোহাম্মদ আলী বলেন, আমার দেখা জীবনে শহীদ শাহারুল ইসলাম ছিলো একজন সহজ-সরল ও আদর্শবান। আমি তাকে কোনোদিন অন্যায় কাজ করতে দেখিনি। সে ছিল মিশুক এবং সর্বদা আমাদের খোঁজ খবর রাখতো। সে আমাকেও নামাযের জন্য অনেকবার দাওয়াত দিয়েছিলো। মহান আল্লাহ তাকে যেনো শহীদের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেন। আমি তার পরিবারের উত্তরোত্তর কল্যাণ কামনা করছি।
বন্ধুদের বক্তব্য ও মতামত
শহীদ শাহারুল ইসলামের প্রাণপ্রিয় বন্ধু মো: আহসান হাবীব বলেন, আমার বন্ধুর কথা মনে হলে আমি চোখের পানি ধরে রাখতে পারি না। আমার প্রাণ প্রিয় স্কুলের ছোট বেলার বন্ধু শহীদ শাহারুল ইসলাম যতদিন পর্যন্ত আমরা দুই বন্ধু চলাফেরা করেছি ততদিন পর্যন্ত আমাদের মধ্যে কোন কটুক্তি কথা হয়নি। আমরা যখন দাখিল মাদরাসায় লেখাপড়া করতাম সব বন্ধুদের মধ্যে সে ছিল ভিন্ন। তার মনমানসিকতা ছিল আলাদা। কারণ তার আচার আচারণ ছিল খুব নম্র ও ভদ্র। সব শিক্ষকেরা তাকে সব সময় আদর স্নেহ করতন। সে ছোটবেলা থেকেই ইসলামী নিয়মনীতি মেনে চলত। সে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতো। আমি দেখেছি সে প্রত্যেকদিন ফজরের নামাজ শেষে যারা নামাজ পড়তেন না তাদের বাড়িতে গিয়ে ইসলামের দিক নিদের্শনা দিতো। আমি দীর্ঘ আট বছর তাঁর সাথে চলাফেরা করেছি। কিন্তু তার মধ্যে কোন অন্যায়ের দিক খুঁজে পাইনি। বন্ধু শাহারুল ইসলাম যখন গাইবান্ধা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি অবস্থায় ছিল আমি তখন তাকে দেখতে যাই। সে আমাকে দেখে উচ্চস্বরে কাঁদতে লাগল। ওর কান্না দেখে আমিও ঠিক থাকতে পারলাম না। সে আমাকে বলল তোর জন্য একটা চিঠি লিখেছি। আমি তার হাতের চিঠিটা দেখে গম্ভীর হলাম। চিঠির মধ্যে লেখা যে, ভাল করে লেখাপড়া করিস। আজ পর্যন্ত আমি এমন বন্ধু আর খুঁজে পাইনি। পরিশেষে আমি তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করি এবং তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাই।
এক নজরে শহীদ শাহারুল ইসলাম
নাম: শাহারুল ইসলাম
পিতার নাম: আবদুর রাজ্জাক
মাতার নাম: শামসুন নাহার
জন্ম তারিখ: ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৫
ঠিকানা: গ্রাম- রাঘবপুর, গোবিন্দগঞ্জ, গাইবান্ধা
সর্বশেষ পড়ালেখা: আলিম পরীক্ষার্থী
সাংগঠনিক মান: কর্মী, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির
গ্রেফতারের তারিখ: ৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৫, দুপুর ২টার সময় নিজ বাসা হতে গ্রেফতার হন
শাহাদাতের সময়: ৩রা এপ্রিল ২০১৫ রোজ শুক্রবার সুবহে সাদিকের সময়
শাহাদাতের স্থান:গাইবান্ধা কারাগারে
গাইবান্ধা
মেসে থাকা অবস্থায় মোবাইল এর মাধ্যমে আমাকে পাচ ওয়াক্ত নামাযের কথা বলতেন এবং পর্দা বিষয়েও উপদেশ দিতেন। মাদরাসা থেকে সে বাড়িতে আসলে বাড়ির সকল চাচা চাচী ও ছোট ভাইদের নামাযের তাকিদ দিতেন।
-শহীদ শাহারুল ইসলামের মা
শহীদের পরিচিতি
শহীদ শাহারুল ইসলাম ১৯৯৫ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ থানাধীন রাঘবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আব্দুর রাজ্জাক এবং মাতা শামসুন নাহারের বড় ছেলে তিনি। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কর্মী ছিলেন। শাহাদাতকালে তিনি আলিম পরীক্ষার্থী ছিলেন।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে যান
৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, বাসা থেকে গ্রেফতারের পর কারাগারে থেকেই আলিম পরীক্ষা দিচ্ছিলেন শহীদ শাহারুল ইসলাম। পরীক্ষা চলাকালে ৩ এপ্রিল ২০১৫ শুক্রবার কারাগারে শাহাদাত বরণ করেন।
শাহাদাতের পূর্বের বিভিন্ন ঘটনা
শহীদ শাহারুল ইসলাম মাঝে মাঝে বলতো- বাবা চিন্তা করার কিছু নেই। পড়ালেখা শেষ করে আমি সরকারী চাকরি করবো তখন আর আমাদের দুঃখ কষ্ট থাকবে না।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
শহীদ শাহারুল ইসলাম ছিলেন ২০১৫ সালে আলিম পরিক্ষার্থী। তার পরিক্ষার কেন্দ্র ছিল মহিমাগঞ্জ আলিয়া কামিল মাদরাসা। শাহারুল ভালোভাবে পরিক্ষা দেয়ার জন্য তার বন্ধুদের সাথে মহিমাগঞ্জ আলিয়া মাদরাসার পার্শ্বে একটি বাসা ভাড়া নিয়ে সেখানে থাকতেন। কিন্তু আওয়ামী পুলিশ বাহিনী তার পরিক্ষাটাও শেষ করতে দেয়নি। আলিম পরিক্ষা শুরু হওয়ার আগেই ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ দুপুর ২টার সময় তাকে বাসা হতে গ্রেফতার করে থানায় এনে তার উপর অমানুষিক নির্যাতন করে পুলিশ ও গোবিন্দগঞ্জ থানার ওসি নিজে। যার কারণে সে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় কোন চিকিৎসা ছাড়াই তাকে কোর্টের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়। কারাগারেই তার চিকিৎসা চলতে থাকে একই সাথে কারাগার থেকেই সে আলিম পরিক্ষা দেয়া শুরু করে। তার স্বপ্ন ছিল সরকারি চাকুরি করে পরিবারের সকল অভাব দূর করে পিতা মাতার মুখে হাসি ফোটাবে। কিন্তু তার উপর নির্যাতনের পরিমাণ এতবেশি ছিল যে তার স্বপ্ন আর পূর্ণ হল না। অবশেষে কারাগারে থাকা অবস্থায় ৩ এপ্রিল ২০১৫ রোজ শুক্রবার সুবহে সাদিকে ফজরের নামায আদায় শেষে যখন কারাগারের সকল মজলুম ভাইয়েরা দুহাত তুলে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করছিলেন ঠিক সে সময় শহীদ শাহারুল ইসলাম ভাই আল্লাহর কাছে প্রার্থনারত অবস্থায় তার সকল সাথীদের কাঁদিয়ে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
শহীদের মা-বাবার কথা
শহীদ শাহারুলের বাবা মোঃ আব্দুর রাজ্জাক বলেন- শহীদ শাহারুল ইসলাম আমার তিন সন্তানের ১ম সন্তান। আমাদের পরিবারের অবস্থা ভালো না থাকায় অত্যন্ত কষ্ট করে আমি আমার সন্তানেদর পড়ালেখায় কোন প্রকার কষ্ট দেইনি। আমি শহীদ শাহারুল ইসলামকে নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখতাম। শহীদ শাহারুল ইসলাম আমাকে মাঝে মাঝে বলতো- "বাবা চিন্তা করার কিছু নেই। পড়ালেখা শেষ করে আমি সরকারী চাকুরী করবো তখন আর আমাদের দুঃখ কষ্ট থাকবে না।" কিন্তু বাতিল শক্তি আমার সন্তানের সে স্বপ্নকে পূর্ণ করতে দিলো না। ইয়া আল্লাহ! আমি তোমার কাছে বিচার চাই, যারা আমার সন্তানকে অন্যায়ভাবে হত্যা করলো আল্লাহ তুমি তার সঠিক বিচার করো।
শহীদ শাহারুলের মার উক্তি
শহীদ শাহারুল ইসলামের মা বলেন- শাহারুল আমার গর্ভের প্রথম সন্তান। আমি তাকে অত্যন্ত কষ্ট করে গর্ভ ধারণ করেছি। তাকে নিয়ে আমি অনেক আশা-আকাঙ্খা করতাম। সে যখন স্কুলে যেত তখন আমি তার দিকে একপানে তাকিয়ে থাকতাম। সে মেসে থাকা অবস্থায় মোবাইল এর মাধ্যমে আমাকে পাচ ওয়াক্ত নামাযের কথা বলতো এবং পর্দা বিষয়েও উপদেশ দিতো। মাদরাসা থেকে সে বাড়িতে আসলে বাড়ীর সকল চাচা-চাচী ও ছোট ভাইদের নামাযের তাগিদ দিতো। আমি আমার সন্তানকে কোন দিন কষ্ট দেইনি। যারা আমার এই প্রাণের সহজ-সরল সন্তানকে অন্যায়ভাবে হত্যা করলো। হে আল্লাহ! তুমি তো উত্তম বিচারক, আমি তোমার কাছে বিচার চাই এবং আমার শহীদ সন্তান শাহারুলকে জান্নাতের উত্তম স্থান দান করো।
দায়িত্বশীলদের মতামত
শহীদ শাহারুল ইসলাম আমার একান্ত আত্মার পরম আত্মীয় রক্তের বাধনের দীনের সিপাহসালার ইসলামী ছাত্রশিবিরের কর্মী। তার সাথে আমার সাক্ষাতের সময় বেশি দিনের নয়। তিনি ইসলামী ছাত্রশিবিরের নতুন কর্মী শপথ নিয়ে ছিলেন। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে মহান আল্লাহ তায়ালা তাকে শহীদের মর্যাদা দান করেছেন। তার জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত ভদ্র ও মার্জিত। তিনি কখনো কাউকে কষ্ট দিতেন না এবং সকলের সাথে হাসি মুখে কথা বলতেন এবং সকল প্রকার ভয়ভীতি উপেক্ষা করে তিনি মহান আল্লাহর দ্বীনের কাজ চালিয়ে ছিলেন। মহান আল্লাহ তায়ালা তাকে উত্তম পুরস্কার দান করুন।
শিক্ষকদের মতামত
শহীদ শাহারুল ইসলাম আমাদের মাদরাসায় নিয়মিত ছাত্র সে আমাদের সকলের সাথে ভালো আচরণ করতো। এবং আমার দেখা সে পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ার জন্য তার ক্লাসের অন্যান্য ছাত্রদের তাগিদ দিতো। সে অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও মেধাবী। আমরা শহীদ শাহারুল ইসলামকে হারিয়ে অত্যন্ত শোকাহত। আল্লাহ তুমি আমাদের ছাত্র শহীদ শাহারুলকে জান্নাত দান করুন।
শহীদের ভাইয়ের উক্তি
শাহারুল ইসলামের ছোট ভাই বলেন- আমরা তিন ভাই। শহীদ শাহারুল ইসলাম আমার বড় ভাই। আমার ছোট ভাই মাহিন মিয়া আমরা আমাদের পরিবারের ছোট তখন বড় ভাই শহীদ শাহারুল ইসলাম ভাই পড়ালেখার বিষয়ে আমাকে সার্বক্ষণিক দিক নিদের্শনা দিতেন এবং তিনি আমাদের পরিবারের অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করতেন। তিনি আমাদের পড়ালেখার কোনো অভাব বুঝতে দেননি। সবসময় আমাদের আদর করতেন এবং উৎসাহ যোগাতেন। আজ আমরা সেই স্নেহের বড় ভাইয়ের আদর সোহাগ থেকে বঞ্চিত হলাম। হে আল্লাহ যারা অন্যায়ভাবে আমার ভাইকে শহীদ করেছে তুমি তাদের বিচার করো।
এলাকাবাসীর উক্তি
পাড়াপ্রতিবেশি শহীদের দাদা মোঃ মোহাম্মদ আলী বলেন, আমার দেখা জীবনে শহীদ শাহারুল ইসলাম ছিলো একজন সহজ-সরল ও আদর্শবান। আমি তাকে কোনোদিন অন্যায় কাজ করতে দেখিনি। সে ছিল মিশুক এবং সর্বদা আমাদের খোঁজ খবর রাখতো। সে আমাকেও নামাযের জন্য অনেকবার দাওয়াত দিয়েছিলো। মহান আল্লাহ তাকে যেনো শহীদের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেন। আমি তার পরিবারের উত্তরোত্তর কল্যাণ কামনা করছি।
বন্ধুদের বক্তব্য ও মতামত
শহীদ শাহারুল ইসলামের প্রাণপ্রিয় বন্ধু মো: আহসান হাবীব বলেন, আমার বন্ধুর কথা মনে হলে আমি চোখের পানি ধরে রাখতে পারি না। আমার প্রাণ প্রিয় স্কুলের ছোট বেলার বন্ধু শহীদ শাহারুল ইসলাম যতদিন পর্যন্ত আমরা দুই বন্ধু চলাফেরা করেছি ততদিন পর্যন্ত আমাদের মধ্যে কোন কটুক্তি কথা হয়নি। আমরা যখন দাখিল মাদরাসায় লেখাপড়া করতাম সব বন্ধুদের মধ্যে সে ছিল ভিন্ন। তার মনমানসিকতা ছিল আলাদা। কারণ তার আচার আচারণ ছিল খুব নম্র ও ভদ্র। সব শিক্ষকেরা তাকে সব সময় আদর স্নেহ করতন। সে ছোটবেলা থেকেই ইসলামী নিয়মনীতি মেনে চলত। সে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতো। আমি দেখেছি সে প্রত্যেকদিন ফজরের নামাজ শেষে যারা নামাজ পড়তেন না তাদের বাড়িতে গিয়ে ইসলামের দিক নিদের্শনা দিতো। আমি দীর্ঘ আট বছর তাঁর সাথে চলাফেরা করেছি। কিন্তু তার মধ্যে কোন অন্যায়ের দিক খুঁজে পাইনি। বন্ধু শাহারুল ইসলাম যখন গাইবান্ধা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি অবস্থায় ছিল আমি তখন তাকে দেখতে যাই। সে আমাকে দেখে উচ্চস্বরে কাঁদতে লাগল। ওর কান্না দেখে আমিও ঠিক থাকতে পারলাম না। সে আমাকে বলল তোর জন্য একটা চিঠি লিখেছি। আমি তার হাতের চিঠিটা দেখে গম্ভীর হলাম। চিঠির মধ্যে লেখা যে, ভাল করে লেখাপড়া করিস। আজ পর্যন্ত আমি এমন বন্ধু আর খুঁজে পাইনি। পরিশেষে আমি তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করি এবং তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাই।
এক নজরে শহীদ শাহারুল ইসলাম
নাম: শাহারুল ইসলাম
পিতার নাম: আবদুর রাজ্জাক
মাতার নাম: শামসুন নাহার
জন্ম তারিখ: ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৫
ঠিকানা: গ্রাম- রাঘবপুর, গোবিন্দগঞ্জ, গাইবান্ধা
সর্বশেষ পড়ালেখা: আলিম পরীক্ষার্থী
সাংগঠনিক মান: কর্মী, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির
গ্রেফতারের তারিখ: ৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৫, দুপুর ২টার সময় নিজ বাসা হতে গ্রেফতার হন
শাহাদাতের সময়: ৩রা এপ্রিল ২০১৫ রোজ শুক্রবার সুবহে সাদিকের সময়
শাহাদাতের স্থান:গাইবান্ধা কারাগারে