শহীদ সোহানুর রহমান সোহাগ
আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
শহীদ সোহানুর রহমান সোহাগ, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের দরিদ্র কৃষক পরিবারের দ্বিতীয় সন্তান। তিনি খানাবাড়ি দাখিল মাদরাসার অষ্টম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। ২০১৪ সালের ১৮ জানুয়ারির রাতে যৌথবাহিনীর অভিযানে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি গুরুতর আহত হন এবং দুই দিন পর বগুড়া মেডিকেলে মৃত্যুবরণ করেন। ধর্মপ্রাণ ও দায়িত্বশীল এই কিশোর সহপাঠীদের মাঝে ইসলামী মূল্যবোধ ছড়িয়ে দিতে আগ্রহী ছিলেন। তাঁর শাহাদাত সুন্দরগঞ্জের স্থানীয় আন্দোলন-সংগ্রামে প্রতিরোধের এক প্রতীক হয়ে আছে।
🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ
শহীদ সোহানুর রহমান সোহাগ
গাইবান্ধা-৮
জানাযাপূর্ব সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে কাজী শফিকুল ইসলাম (শফিক) জীবিত তিন ছেলের মাথায় হাত দিয়ে বলেন-আমার এক 'সোহান' শহীদ হয়েছে রাতে কোন আফসোস নাই। বাকী তিন ছেলেকেও আল্লাহর রাস্তায় ছেড়ে দিলাম শহীদ হবার জন্য।
শহীদের পরিচিতি
শহীদ সোহানুর রহমান সোহাগ ১৯৯৮ সালে সুন্দরগঞ্জ থানার রামভদ্র গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতামাতার ৪ সন্তানের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। পিতামাতার আশা ছিল সে বড় হয়ে লেখাপড়া করে বড় আলেম হবে ও সংসারের হাল ধরবে। দরিদ্রতার কারণে শহীদ সোহাগ অত্যন্ত কষ্ট করে পড়ালেখা করতেন। পারিবারিক বিভিন্ন কাজে পিতামাতাকে সহযোগিতা করতেন। খানাবাড়ি দারুল আমান মাদরাসার ৮ম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন তিনি।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে যান
১৮ জানুয়ারী ২০১৪ তারিখ রাত ১২.৩০টায় আওয়ামী সন্ত্রাসীদের সহযোগিতায় যৌথবাহিনী কয়েকশত গাড়ী ও প্রায় ২০০০ পুলিশ নিয়ে সুন্দরগঞ্জের ১নং বামনডাংগা ও ৬নং সরবানন্দ ইউনিয়নের খানাবাড়ি এবং রামভদ্র গ্রাম ঘিরে ফেলে এবং হামলা চালায়। তাদের মুহুর্মুহু গুলিবর্ষণে এলাকায় আতংক ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ জনতা আত্মরক্ষার্থে ছোটাছুটি করে দৌড়াতে থাকে। শহীদ সোহাগসহ প্রায় ৩০ জন লোক গুলিবিদ্ধ হয়ে মারাত্মক আহত হন। গুরুতর আহত সোহাগকে দ্রুত বগুড়া মেডিকেল কলেজে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০ জানুয়ারি ২০১৪ শাহাদাত বরণ করেন শহীদ সোহানুর রহমান সোহাগ।
শাহাদাতের পূর্বের বিভিন্ন ঘটনা
তিনি সহপাঠিদের কাছে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার আকাংখা ব্যক্ত করতেন।
পিতার আকুতি- কি অপরাধ ছিল তার ছেলের? সে তো কোন সমাজবিরোধী বা সন্ত্রাসী বা অন্য কোন ছেলের মতো নয়। সে সময়মতো নামায পড়তো। ইসলামের কথা ছাত্রদেরকে বলতো, এটাই কি তার অপরাধ। তার পিতা ডুকড়ে কেঁদে বলেন, পুলিশ চোর ডাকাত, খুনিদেরকে গুলি করতে পারছে না।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
শহীদ সোহানুর রহমান সোহাগ কাজী সুন্দরগঞ্জের ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের প্রেরণা। শহীদ সোহাগদের রক্তের বিনিময়ে সুন্দরগঞ্জের মাটি ইসলামী আন্দোলনের জন্যে উর্বর ময়দানে পরিণত হয়েছে। শহীদ জুয়েল রানা এই ময়দানের প্রথম ও সোহানুর রহমান সোহাগ কাজী সর্বশেষ শহীদ। শহীদ সোহাগ ইসলামী আন্দোলনকে প্রতিষ্ঠার জন্য মহান আল্লাহর রাহে জীবনকে কুরবান করে দিয়ে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের অন্তরের মণি কোঠায় জায়গা করে নিয়েছেন।আওয়ামী সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বামনডাঙ্গা এলাকার বর্তমান
আওয়ামী লীগ সভাপতি লিটনের সন্ত্রাসী বাহিনী এবং বাদশা সরকারের গুণ্ডা এবং ছাত্রলীগের নেতা জোবায়দুলের সহযোগিতায় যৌথবাহিনী ঐ লোমহর্ষক ঘটনা ঘটায়। মিথ্যা মামলায় আসামী করে সেই আসামী ধরার নামে যে তাণ্ডব চালিয়েছে যৌথবাহিনী, তা ৭১ সালের পাক বাহিনীকেও হার মানিয়েছে। যৌথবাহিনী রাত ১২টায় গুলী করতে করতে সর্বানন্দ ইউনিয়নের খানাবাড়ি কদমতলী, রামভদ্র ও ছাইতানতলায় ঢুকে পড়ে। এ সময় তারা অর্ধশতাধিক বাড়িতে নজিরবিহীন ভাঙচুর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ এমনকি নারী ও শিশুদের মারধর করে। অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করে, হুমকি দেয় গ্রাম তছনছ করে দেয়ার। বাদ যায়নি হিন্দু ও প্রতিবন্ধীর বাড়িও। হাজার হাজার রাউন্ড গুলীবর্ষণ করে ও বাড়িতে আগুন দিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে এলাকা জনশূন্য করে মধ্যযুগীয় কায়দায় ঠাণ্ডা মাথায় বাড়িঘর ভাংচুর, লুটপাট, নারী পুরুষদেরকে লাঠিপেটাসহ অকথ্য নির্যাতনের মাধ্যমে রাত থেকে পরদিন সকাল ৮টা পর্যন্ত ৮ ঘণ্টাব্যাপী চলে তাদের নারকীয় তাণ্ডব। এ সময় যৌথবাহিনী এবং তাদের সাথে লুঙ্গি, কালো গেঞ্জি ও চাদর পরিহিত একটি বাহিনী এলাকাবাসীকে লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়তে থাকে। ভাতের হাঁড়ি থেকে শুরু করে চুলো পর্যন্ত গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ঘরের ফ্রিজ, টিভি, শো-কেস, ড্রয়ার, আলমিরা, খাট-পালংসহ কিছুই বাদ দেয়া হয়নি। টুকরো টুকরো হয়ে সব পড়ে আছে মেঝেতে। গুলিবিদ্ধ গ্রামবাসীর রক্তের ছোপ ছোপ দাগ পড়ে আছে সড়কগুলোতে। টিনের বেড়ায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো হয়েছে। এসময় গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ সোহাগসহ প্রায় ৩০ জন লোক মারাত্মক আহত হন। গুরুতর আহত সোহাগকে দ্রুত বগুড়া মেডিকেল কলেজে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০ জানুয়ারি ২০১৪ তারিখ শাহাদাত বরণ করেন শহীদ সোহানুর রহমান সোহাগ। শহীদ সোহাগের লাশ বিকেল ৩টায় তার নিজস্ব বাড়িতে আনা হয়। জানাযা শেষে সন্ধা ৭ টায় তাকে পারিবারিক কবর স্থানে দাফন করা হয়।
পরিবারের আশা ছিল সন্তানদেরকে শিক্ষিত করে তুলবেন। এ জন্য প্রাথমিক সমাপনীর পর তাকে ভর্তি করিয়েছিলেন স্থানীয় খানাবাড়ি দ্বিমুখী দাখিল মাদরাসায়। শহীদ সোহানুর রহমান সোহগ কাজী পড়ালেখায় বেশ ভালো ছিলেন। তার স্বপ্ন ছিল বড় হলে সমাজের মানুষের সেবা করবেন। তিনি ছাত্রশিবিরের কর্মী ছিলেন। নিয়মিত নামাজ ও কুরআন হাদিস পড়তেন। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে মাত্র ১৩ বছর বয়সে চলে যান মহান প্রভুর একান্ত সান্নিধ্যে।
আপনজনদের কথা
তার পিতামাতা বাকরুদ্ধ হয়ে যান সন্তান হারানোর বেদনায়। ৪ ভাইয়ের মধ্যে সোহাগ ২য় সন্তান। সে খানাবাড়ি দাখিল মাদরাসার ৮ম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত ছিল। পিতামাতার আশা ছিল সে বড় হয়ে লেখাপড়া করে বড় আলেম হবে ও সংসারের হাল ধরবে। সে আশা গুড়ে বালিতে পরিণত হয়েছে। তার পিতার আকুতি "কি অপরাধ ছিল আমার ছেলের? সে তো কোন সমাজবিরোধী বা সন্ত্রাসী বা অন্য কোন ছেলের মতো নয়। সে সময়মতো নামায পড়তো। ইসলামের কথা ছাত্রদেরকে বলতো, এটাই কি তার অপরাধ?"
তার পিতা ডুকড়ে কেঁদে বলেন, "পুলিশ চোর ডাকাত, খুনিদেরকে গুলি করতে পারছে না।" তিনি প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে আক্ষেপ করে বলেন- "আর কত মায়ের বুক খালি করে আপনি ক্ষমতায় থাকতে চান?"
শহীদ সোহাগের এই মৃত্যুকে এলাকায় কেউ মেনে নিতে পারেনি। গোটা এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছিল। শহীদের সাথীরা ডুকড়ে ডুকড়ে কেঁদে বুক ভাসিয়ে গুমোট পরিবেশ তৈরি করেছিল।
জানাযা
শহীদ সোহাগের লাশ ২০ জানুয়ারি বিকাল ৩টায় তার নিজস্ব বাড়িতে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে আনা হয়। বাদ মাগরিব শহীদের জানাযা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে শহীদ শাহাবুল ইসলামের কবররের পাশে দাফন করা হয়। জানাযা নামাজের পূর্বে বক্তব্য রাখেন জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি অধ্যাপক মাজেদুর রহামান সরকার, জেলা ছাত্রশিবিরের তৎকালীন সভাপতি ছাত্রনেতা ফয়সাল কবির রানা, সেক্রেটারি ছাত্রনেতা হাশেমুজ্জামান, উপজেলা সভাপতি বক্তারা এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন।
সেদিন রাতে কী ঘটেছিল
সেদিনের রাতের ঘটনা বর্ণনা দিতে গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আওয়ামীলীগ নেতা জোবায়দুলের নেতৃত্বে সেদিন যৌথবাহিনী এই লোমহর্ষক ঘটনা ঘটায়। মিথ্যা মামলায় আসামী করে সেই আসামী ধরার কথা বলে যে তাণ্ডব চালিয়েছে যৌথবাহিনী তা ৭১ সালের পাক বাহিনীকেও হার মানিয়েছে। একটি স্বাধীন দেশে গণতান্ত্রিক সরকার থাকতে জনগণের উপর অন্যায়ভাবে এতো বড় বর্বরোচিত ঘটনা মেনে নেয়ার মতো নয়। হাজার হাজার রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে ও বাড়িতে আগুন দিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে এলাকা জনশূন্য করে মধ্যযুগীয় কায়দায় ঠাণ্ডা মাথায় বাড়িঘর ভাংচুর, লুটপাট, নারী পুরুষদেরকে লাঠিপেটাসহ অকথ্য নির্যাতনের মাধ্যমে ৯ ঘন্টাব্যাপী চলে পুলিশ, বিজিবি, র্যাব, আওয়ামীগুণ্ডাসহ যৌথবাহিনীর নারকীয় তাণ্ডব।
তাদের হাত থেকে এলাকার যুবতী মহিলারাও রেহাই পায়নি। অনেককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে। যা লজ্জায় কেহ বলতে পারেন না। যাদেরকে মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে এবং যাদের ওপর বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ হয়েছে তারা আবার কিভাবে সংগঠিত হতে পারে এবং পুলিশের ওপর হামলা করতে পারে এহেন পাগলের প্রলাপ ছাড়া কিছু হতে পারে না। খানাবাড়ি মসজিদ সেসময় বন্ধ ছিল। ইমাম ও মোয়াজ্জিন ছিলেন না। তাছাড়া এলাকায় ছিল ত্রাসের রাজত্ব। সেখানে কী করে মাইকে ঘোষণা করা সম্ভব? এটি সম্পূর্ণ বানোয়াট ও নাটকীয় কথা যা বিশ্বাসযোগ্য নয়। উল্লেখ্য, "গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে পুলিশ হত্যা ও নাশকতা মামলার আসামী ধরতে ১৮ জানুয়ারি ২০১৪ শনিবার রাতে পুলিশ রামভদ্র খানাবাড়ি গ্রামে যায়। এ সময় জামায়াত-শিবিরের কর্মিরা গ্রামে ডাকাত পড়েছে এমন মাইকে প্রচার চালালে গ্রামের লোকজন পুলিশের উপর হামলা করে।"- মর্মে সংবাদ প্রচারিত হয় বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে। প্রত্যক্ষদর্শীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে যে, সেদিনের ঘটনার ব্যাপারে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় বা বিভিন্ন চ্যানেলে যে খবর প্রকাশ বা প্রচার করা হয়েছে তার সাথে বাস্তবের কোন মিল নেই। পুরো খবরগুলো সিন্ডিকেট করে সরবরাহ হয়েছে। সেদিন মূলত, সুন্দরগঞ্জের ময়দান থেকে ইসলামী আন্দালনকে মুছে ফেলতে চেয়েছিলো আওয়ামীগুণ্ডা বাহিনীরা।
ভাই-বোনের বিবরণ
সুমন, বয়স- ১৭ বছর, ছাত্র
শিহাব, ছাত্র
জুয়েল, ছাত্র
এক নজরে শহীদ সোহানুর রহমান সোহাগ
পুরোনাম: শহীদ মো: সোহানুর রহমান সোহাগ কাজী
পিতার নাম
মাতার নাম: মোছা: জুলেখা বেগম, ৫০ বছর, গৃহিণী
জন্ম তারিখ: নভেম্বর ৩০, ১৯৯৮
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম- রাজবাড়ি, ইউনিয়ন- বামনডাঙ্গা, উপজেলা- সুন্দরগঞ্জ, জেলা- গাইবান্ধা
ভাই-বোন: চার ভাইয়ের মধ্যে দ্বিতীয়
সর্বশেষ পড়ালেখা: ৮ম শ্রেণি, খানাবাড়ি দ্বিমুখী দাখিল মাদরাসা
সাংগঠনিক মান: কর্মী
শাহাদাতের তারিখ ও সময়: ২০ জানুয়ারি ২০১৪, রাত ৩.৩০ টা
গাইবান্ধা-৮
জানাযাপূর্ব সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে কাজী শফিকুল ইসলাম (শফিক) জীবিত তিন ছেলের মাথায় হাত দিয়ে বলেন-আমার এক 'সোহান' শহীদ হয়েছে রাতে কোন আফসোস নাই। বাকী তিন ছেলেকেও আল্লাহর রাস্তায় ছেড়ে দিলাম শহীদ হবার জন্য।
শহীদের পরিচিতি
শহীদ সোহানুর রহমান সোহাগ ১৯৯৮ সালে সুন্দরগঞ্জ থানার রামভদ্র গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতামাতার ৪ সন্তানের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। পিতামাতার আশা ছিল সে বড় হয়ে লেখাপড়া করে বড় আলেম হবে ও সংসারের হাল ধরবে। দরিদ্রতার কারণে শহীদ সোহাগ অত্যন্ত কষ্ট করে পড়ালেখা করতেন। পারিবারিক বিভিন্ন কাজে পিতামাতাকে সহযোগিতা করতেন। খানাবাড়ি দারুল আমান মাদরাসার ৮ম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন তিনি।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে যান
১৮ জানুয়ারী ২০১৪ তারিখ রাত ১২.৩০টায় আওয়ামী সন্ত্রাসীদের সহযোগিতায় যৌথবাহিনী কয়েকশত গাড়ী ও প্রায় ২০০০ পুলিশ নিয়ে সুন্দরগঞ্জের ১নং বামনডাংগা ও ৬নং সরবানন্দ ইউনিয়নের খানাবাড়ি এবং রামভদ্র গ্রাম ঘিরে ফেলে এবং হামলা চালায়। তাদের মুহুর্মুহু গুলিবর্ষণে এলাকায় আতংক ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ জনতা আত্মরক্ষার্থে ছোটাছুটি করে দৌড়াতে থাকে। শহীদ সোহাগসহ প্রায় ৩০ জন লোক গুলিবিদ্ধ হয়ে মারাত্মক আহত হন। গুরুতর আহত সোহাগকে দ্রুত বগুড়া মেডিকেল কলেজে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০ জানুয়ারি ২০১৪ শাহাদাত বরণ করেন শহীদ সোহানুর রহমান সোহাগ।
শাহাদাতের পূর্বের বিভিন্ন ঘটনা
তিনি সহপাঠিদের কাছে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার আকাংখা ব্যক্ত করতেন।
পিতার আকুতি- কি অপরাধ ছিল তার ছেলের? সে তো কোন সমাজবিরোধী বা সন্ত্রাসী বা অন্য কোন ছেলের মতো নয়। সে সময়মতো নামায পড়তো। ইসলামের কথা ছাত্রদেরকে বলতো, এটাই কি তার অপরাধ। তার পিতা ডুকড়ে কেঁদে বলেন, পুলিশ চোর ডাকাত, খুনিদেরকে গুলি করতে পারছে না।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
শহীদ সোহানুর রহমান সোহাগ কাজী সুন্দরগঞ্জের ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের প্রেরণা। শহীদ সোহাগদের রক্তের বিনিময়ে সুন্দরগঞ্জের মাটি ইসলামী আন্দোলনের জন্যে উর্বর ময়দানে পরিণত হয়েছে। শহীদ জুয়েল রানা এই ময়দানের প্রথম ও সোহানুর রহমান সোহাগ কাজী সর্বশেষ শহীদ। শহীদ সোহাগ ইসলামী আন্দোলনকে প্রতিষ্ঠার জন্য মহান আল্লাহর রাহে জীবনকে কুরবান করে দিয়ে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের অন্তরের মণি কোঠায় জায়গা করে নিয়েছেন।আওয়ামী সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বামনডাঙ্গা এলাকার বর্তমান
আওয়ামী লীগ সভাপতি লিটনের সন্ত্রাসী বাহিনী এবং বাদশা সরকারের গুণ্ডা এবং ছাত্রলীগের নেতা জোবায়দুলের সহযোগিতায় যৌথবাহিনী ঐ লোমহর্ষক ঘটনা ঘটায়। মিথ্যা মামলায় আসামী করে সেই আসামী ধরার নামে যে তাণ্ডব চালিয়েছে যৌথবাহিনী, তা ৭১ সালের পাক বাহিনীকেও হার মানিয়েছে। যৌথবাহিনী রাত ১২টায় গুলী করতে করতে সর্বানন্দ ইউনিয়নের খানাবাড়ি কদমতলী, রামভদ্র ও ছাইতানতলায় ঢুকে পড়ে। এ সময় তারা অর্ধশতাধিক বাড়িতে নজিরবিহীন ভাঙচুর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ এমনকি নারী ও শিশুদের মারধর করে। অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করে, হুমকি দেয় গ্রাম তছনছ করে দেয়ার। বাদ যায়নি হিন্দু ও প্রতিবন্ধীর বাড়িও। হাজার হাজার রাউন্ড গুলীবর্ষণ করে ও বাড়িতে আগুন দিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে এলাকা জনশূন্য করে মধ্যযুগীয় কায়দায় ঠাণ্ডা মাথায় বাড়িঘর ভাংচুর, লুটপাট, নারী পুরুষদেরকে লাঠিপেটাসহ অকথ্য নির্যাতনের মাধ্যমে রাত থেকে পরদিন সকাল ৮টা পর্যন্ত ৮ ঘণ্টাব্যাপী চলে তাদের নারকীয় তাণ্ডব। এ সময় যৌথবাহিনী এবং তাদের সাথে লুঙ্গি, কালো গেঞ্জি ও চাদর পরিহিত একটি বাহিনী এলাকাবাসীকে লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়তে থাকে। ভাতের হাঁড়ি থেকে শুরু করে চুলো পর্যন্ত গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ঘরের ফ্রিজ, টিভি, শো-কেস, ড্রয়ার, আলমিরা, খাট-পালংসহ কিছুই বাদ দেয়া হয়নি। টুকরো টুকরো হয়ে সব পড়ে আছে মেঝেতে। গুলিবিদ্ধ গ্রামবাসীর রক্তের ছোপ ছোপ দাগ পড়ে আছে সড়কগুলোতে। টিনের বেড়ায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো হয়েছে। এসময় গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ সোহাগসহ প্রায় ৩০ জন লোক মারাত্মক আহত হন। গুরুতর আহত সোহাগকে দ্রুত বগুড়া মেডিকেল কলেজে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০ জানুয়ারি ২০১৪ তারিখ শাহাদাত বরণ করেন শহীদ সোহানুর রহমান সোহাগ। শহীদ সোহাগের লাশ বিকেল ৩টায় তার নিজস্ব বাড়িতে আনা হয়। জানাযা শেষে সন্ধা ৭ টায় তাকে পারিবারিক কবর স্থানে দাফন করা হয়।
পরিবারের আশা ছিল সন্তানদেরকে শিক্ষিত করে তুলবেন। এ জন্য প্রাথমিক সমাপনীর পর তাকে ভর্তি করিয়েছিলেন স্থানীয় খানাবাড়ি দ্বিমুখী দাখিল মাদরাসায়। শহীদ সোহানুর রহমান সোহগ কাজী পড়ালেখায় বেশ ভালো ছিলেন। তার স্বপ্ন ছিল বড় হলে সমাজের মানুষের সেবা করবেন। তিনি ছাত্রশিবিরের কর্মী ছিলেন। নিয়মিত নামাজ ও কুরআন হাদিস পড়তেন। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে মাত্র ১৩ বছর বয়সে চলে যান মহান প্রভুর একান্ত সান্নিধ্যে।
আপনজনদের কথা
তার পিতামাতা বাকরুদ্ধ হয়ে যান সন্তান হারানোর বেদনায়। ৪ ভাইয়ের মধ্যে সোহাগ ২য় সন্তান। সে খানাবাড়ি দাখিল মাদরাসার ৮ম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত ছিল। পিতামাতার আশা ছিল সে বড় হয়ে লেখাপড়া করে বড় আলেম হবে ও সংসারের হাল ধরবে। সে আশা গুড়ে বালিতে পরিণত হয়েছে। তার পিতার আকুতি "কি অপরাধ ছিল আমার ছেলের? সে তো কোন সমাজবিরোধী বা সন্ত্রাসী বা অন্য কোন ছেলের মতো নয়। সে সময়মতো নামায পড়তো। ইসলামের কথা ছাত্রদেরকে বলতো, এটাই কি তার অপরাধ?"
তার পিতা ডুকড়ে কেঁদে বলেন, "পুলিশ চোর ডাকাত, খুনিদেরকে গুলি করতে পারছে না।" তিনি প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে আক্ষেপ করে বলেন- "আর কত মায়ের বুক খালি করে আপনি ক্ষমতায় থাকতে চান?"
শহীদ সোহাগের এই মৃত্যুকে এলাকায় কেউ মেনে নিতে পারেনি। গোটা এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছিল। শহীদের সাথীরা ডুকড়ে ডুকড়ে কেঁদে বুক ভাসিয়ে গুমোট পরিবেশ তৈরি করেছিল।
জানাযা
শহীদ সোহাগের লাশ ২০ জানুয়ারি বিকাল ৩টায় তার নিজস্ব বাড়িতে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে আনা হয়। বাদ মাগরিব শহীদের জানাযা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে শহীদ শাহাবুল ইসলামের কবররের পাশে দাফন করা হয়। জানাযা নামাজের পূর্বে বক্তব্য রাখেন জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি অধ্যাপক মাজেদুর রহামান সরকার, জেলা ছাত্রশিবিরের তৎকালীন সভাপতি ছাত্রনেতা ফয়সাল কবির রানা, সেক্রেটারি ছাত্রনেতা হাশেমুজ্জামান, উপজেলা সভাপতি বক্তারা এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন।
সেদিন রাতে কী ঘটেছিল
সেদিনের রাতের ঘটনা বর্ণনা দিতে গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আওয়ামীলীগ নেতা জোবায়দুলের নেতৃত্বে সেদিন যৌথবাহিনী এই লোমহর্ষক ঘটনা ঘটায়। মিথ্যা মামলায় আসামী করে সেই আসামী ধরার কথা বলে যে তাণ্ডব চালিয়েছে যৌথবাহিনী তা ৭১ সালের পাক বাহিনীকেও হার মানিয়েছে। একটি স্বাধীন দেশে গণতান্ত্রিক সরকার থাকতে জনগণের উপর অন্যায়ভাবে এতো বড় বর্বরোচিত ঘটনা মেনে নেয়ার মতো নয়। হাজার হাজার রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে ও বাড়িতে আগুন দিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে এলাকা জনশূন্য করে মধ্যযুগীয় কায়দায় ঠাণ্ডা মাথায় বাড়িঘর ভাংচুর, লুটপাট, নারী পুরুষদেরকে লাঠিপেটাসহ অকথ্য নির্যাতনের মাধ্যমে ৯ ঘন্টাব্যাপী চলে পুলিশ, বিজিবি, র্যাব, আওয়ামীগুণ্ডাসহ যৌথবাহিনীর নারকীয় তাণ্ডব।
তাদের হাত থেকে এলাকার যুবতী মহিলারাও রেহাই পায়নি। অনেককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে। যা লজ্জায় কেহ বলতে পারেন না। যাদেরকে মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে এবং যাদের ওপর বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ হয়েছে তারা আবার কিভাবে সংগঠিত হতে পারে এবং পুলিশের ওপর হামলা করতে পারে এহেন পাগলের প্রলাপ ছাড়া কিছু হতে পারে না। খানাবাড়ি মসজিদ সেসময় বন্ধ ছিল। ইমাম ও মোয়াজ্জিন ছিলেন না। তাছাড়া এলাকায় ছিল ত্রাসের রাজত্ব। সেখানে কী করে মাইকে ঘোষণা করা সম্ভব? এটি সম্পূর্ণ বানোয়াট ও নাটকীয় কথা যা বিশ্বাসযোগ্য নয়। উল্লেখ্য, "গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে পুলিশ হত্যা ও নাশকতা মামলার আসামী ধরতে ১৮ জানুয়ারি ২০১৪ শনিবার রাতে পুলিশ রামভদ্র খানাবাড়ি গ্রামে যায়। এ সময় জামায়াত-শিবিরের কর্মিরা গ্রামে ডাকাত পড়েছে এমন মাইকে প্রচার চালালে গ্রামের লোকজন পুলিশের উপর হামলা করে।"- মর্মে সংবাদ প্রচারিত হয় বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে। প্রত্যক্ষদর্শীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে যে, সেদিনের ঘটনার ব্যাপারে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় বা বিভিন্ন চ্যানেলে যে খবর প্রকাশ বা প্রচার করা হয়েছে তার সাথে বাস্তবের কোন মিল নেই। পুরো খবরগুলো সিন্ডিকেট করে সরবরাহ হয়েছে। সেদিন মূলত, সুন্দরগঞ্জের ময়দান থেকে ইসলামী আন্দালনকে মুছে ফেলতে চেয়েছিলো আওয়ামীগুণ্ডা বাহিনীরা।
ভাই-বোনের বিবরণ
সুমন, বয়স- ১৭ বছর, ছাত্র
শিহাব, ছাত্র
জুয়েল, ছাত্র
এক নজরে শহীদ সোহানুর রহমান সোহাগ
পুরোনাম: শহীদ মো: সোহানুর রহমান সোহাগ কাজী
পিতার নাম
মাতার নাম: মোছা: জুলেখা বেগম, ৫০ বছর, গৃহিণী
জন্ম তারিখ: নভেম্বর ৩০, ১৯৯৮
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম- রাজবাড়ি, ইউনিয়ন- বামনডাঙ্গা, উপজেলা- সুন্দরগঞ্জ, জেলা- গাইবান্ধা
ভাই-বোন: চার ভাইয়ের মধ্যে দ্বিতীয়
সর্বশেষ পড়ালেখা: ৮ম শ্রেণি, খানাবাড়ি দ্বিমুখী দাখিল মাদরাসা
সাংগঠনিক মান: কর্মী
শাহাদাতের তারিখ ও সময়: ২০ জানুয়ারি ২০১৪, রাত ৩.৩০ টা
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍