হোম / আওয়ামী দুঃশাসনে শহীদ / শহীদ মুহাম্মাদ কামারুজ্জামান
শহীদ মুহাম্মাদ কামারুজ্জামান

শহীদ মুহাম্মাদ কামারুজ্জামান

আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ছিলেন এমন এক ব্যক্তিত্ব, যার সাহস ও আদর্শ তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপে ছাপ রেখে গেছে।
ন্যায্যতার প্রতি অবিচল বিশ্বাস তাঁকে শিক্ষা, সাংবাদিকতা ও সংগঠনের নানা ক্ষেত্রে সক্রিয় ও অনুসন্ধানী ভূমিকায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।
দেশের সমাজ–রাজনীতি, সংস্কৃতি ও ইসলামী চিন্তাধারায় তিনি গবেষণা, লেখনী ও নেতৃত্বের মাধ্যমে ধারাবাহিক অবদান রেখেছেন।
জীবনের প্রতিকূল অধ্যায়গুলোতেও তাঁর সংগ্রামী মনোভাব তাঁকে অনুসারী ও পাঠকের নিকট এক দৃঢ়চরিত্র মানুষ হিসেবে পরিচিত করে।
সমৃদ্ধ সমাজগঠনের স্বপ্নে অনুপ্রাণিত এই নেতা জ্ঞান, শুদ্ধতা ও দায়িত্ববোধকে জীবনের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে ধারণ করেছেন।

🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ

শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামান: ক্ষণজন্মা একটি প্রতিভা
কামারুজ্জামান একটি নাম, একটি আন্দোলন ও একটি বিস্ময়কর প্রতিভা। যুগ নয়, শতাব্দীর ক্ষণজন্মা ইসলামী আন্দোলনের এক অগ্রসেনানী মুহাম্মদ কামারুজ্জামান। প্রাচ্যের অগ্রফোর্ড হিসেবে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সেরা মেধাবী ছাত্র তিনি। তিনি একাধারে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সমন্বয়ে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছেন। মেধাবীদের সাহসী ঠিকানা শহীদী কাফেলা ইসলামী ছাত্রশিবিরের মত একটি ছাত্র আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম হিসেবে ঐতিহাসিক অবদান রেখেছেন। নেতৃত্ব দিয়েছেন সে আন্দোলনের সিপাহসালারের। তাঁর ক্ষুরধার লেখনির মাধ্যমে এদেশের মানুষ সমাজ, সভ্যতা ও পাশ্চাত্যের নানা অসঙ্গতির ইতিহাস জানতে সক্ষম হয়েছে। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গুণগত পরিবর্তন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার লড়াইয়ে তিনি অন্যতম। দেশে-বিদেশে সভা-সেমিনারে তাঁর ব্যতিক্রমধর্মী উপস্থাপনা সেক্যুলার ও বামপন্থীদের ইসলামী আন্দোলনের ব্যাপারে জিঘাংসা বাড়িয়ে দিয়েছে। সেখান থেকেই শুরু হয় হত্যার পরিকল্পনা। রাজনীতিতে জনাব কামারুজ্জামান সাহচর্য লাভ করেছেন মরহুম অধ্যাপক গোলাম আযম সাহেবের। বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারদর্শীতা অর্জনে খুব অল্প সময়ে খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে তাঁর। মূলত যারা আদর্শের লড়াইয়ে পরাজিত তারাই ইসলামী আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে চায়। হত্যা, গুম, অপহরণ এবং বিচারের নামে রাষ্ট্রীয়ভাবে হত্যার ভিন্ন অপকৌশল চালিয়ে যাচ্ছে। জনাব মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মেধা, যোগ্যতা, নেতৃত্বের গুণাবলী ও নিজ নির্বাচনী এলাকায় জনপ্রিয়তায়
আতঙ্কিত হয়েই প্রতিপক্ষরা তৈরি করছে তাঁকে হত্যার গভীর নীল নকশা।
পৃথিবীর সকল নীতি-নৈতিকতা, মানবাধিকারকে উপেক্ষা করে আওয়ামী লীগ শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লাকে হত্যার পর আবার জনাব কামারুজ্জামানকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে। তিনি একাধারে একজন রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, লেখক, ইসলামী ব্যক্তিত্ব ও সদালাপী প্রাণপুরুষ। জনাব কামারুজ্জামান নিজেই তাঁর দীর্ঘ সাফল্যমণ্ডিত কর্ম, বুদ্ধিদীপ্ত পথের আবিষ্কারক। মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ১৯৫২ সালের ৪ জুলাই শেরপুর জেলার বাজিতখিলা ইউনিয়নের মুদিপাড়া গ্রামে এক ধর্মপ্রাণ মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। মাতা মরহুমা সালেহা খাতুন।
মুহাম্মদ কামারুজ্জামান যেমন একদিকে সফল রাজনীতিবিদ ও সংগঠক, অন্যদিকে একজন সফল সাংবাদিক ও সম্পাদক। তারই সফল সম্পাদনায় সাপ্তাহিক সোনার বাংলা পত্রিকা আজ পরিচিত নাম।
রাজনৈতিক ময়দানে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের পাশাপাশি মুহাম্মদ কামারুজ্জামান বাংলাদেশের রাজনীতি, ইসলামী সংগঠন ও আন্দোলন, গণতন্ত্র ও তার বিকাশ, নির্বাচন, গণমাধ্যম, সমাজ সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রচুর চিন্তা ও গবেষণা করেন। তিনি বাংলাদেশে অবাধ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাসহ ইসলামী আদর্শ প্রতিষ্ঠা ও তার কৌশল নিয়ে বেশ কয়েকটি মৌলিক গ্রন্থ রচনা করেছেন এবং সেই বইগুলো পাঠকমহলে বেশ সমাদৃত হয়েছে।
শিক্ষা জীবন:
তিনি কুমরী কালিতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ালেখার পর শেরপুর জিকেএম ইন্সটিটিউশনে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হন। তিনি প্রথম শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত বরাবরই প্রথমস্থান অধিকার করেছেন। অষ্টম শ্রেণীতে তিনি আবাসিক বৃত্তি পান। ১৯৬৭ সালে জিকেএম ইন্সটিটিউশন থেকে ৪টি বিষয়ে লেটারসহ এসএসসি পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন এবং আবাসিক বৃত্তি লাভ করেন। পুরো শেরপুরে একজন ভালছাত্র হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন। এছাড়াও তিনি ছাত্রজীবন হতেই একজন বিনয়ী ভদ্র অমায়িক মানুষ হিসেবে সর্বজনবিদিত। ১৯৬৭-৬৯ সেশনে জামালপুর আশেক মাহমুদ কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীতে অধ্যয়ন করেন। কিন্তু দেশে '৬৯-এর গণআন্দোলন শুরু হওয়ায় পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকেন। ১৯৭১ (১৯৭২ সালে অনুষ্ঠিত) সালে মোমেনশাহী নাসিরাবাদ কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৭৩ (১৯৭৪ সালে অনুষ্ঠিত) সালে ঢাকা আইডিয়াল কলেজ থেকে ডিস্ট্রিংশনসহ বিএ পাস করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে মাস্টার্সে ভর্তি হন। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক ছাত্র হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবৃত্তি লাভ করেন। ১৯৭৬ সালে কৃতিত্বের সাথে সাংবাদিকতায় এমএ পাস করেন।
জননেতা কামারুজ্জামান ১৯৭৭ সালে নুরুন্নাহারের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি ৫ সন্তানের জনক। তারা হলেন হাসান ইকবাল ওয়ামী, হাসান ইকরাম ওয়ালী, হাসান জামান ওয়াসী, হাসান ইমাম ওয়াফী, আহমদ হাসান সাফী।
ছাত্র রাজনীতি:
শেরপুরের বিশিষ্ট ইসলামী ব্যক্তিত্ব মরহুম কাজী ফজলুর রহমানের আহবানে জিকেএম ইন্সটিটিউটে নবম শ্রেণীর ছাত্র থাকাকালীন তিনি ইসলামী ছাত্র আন্দোলনে যোগ দেন। কলেজে পা দিয়েই তিনি ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি প্রথম ঢাকা মহানগরীর সভাপতি এবং পরে সেক্রেটারি জেনারেল মনোনীত হন।
বিশ্ব মুসলিম যুব সংস্থা (ওয়ামী) এবং বাংলাদেশ সরকারের যুব মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে ১৯৭৯ সালে মৌচাক স্কাউট ক্যাম্পে আন্তর্জাতিক ইসলামী যুব সম্মেলন আয়োজন করা হয়। এতে তিনি প্রধান সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় যুব মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন শেরপুরের আরেক কৃতী সন্তান মরহুম খন্দকার আব্দুল হামিদ।
উল্লেখ্য, এই সম্মেলনে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট শহীদ জিয়াউর রহমান উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন।
ছাত্রশিবির ও মুহাম্মদ কামারুজ্জামান:
বিশ্বের ছাত্র ইসলামী আন্দোলনে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির এক গৌরব গাঁথার নাম। কিন্তু এর সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের নামটি। ১৯৭৮ সালের ১৯ এপ্রিল ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং একমাস পরই নির্বাচনের মাধ্যমে সেশনের বাকী সময়ের জন্য কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭৮-৭৯ সালেও শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে পুনঃনির্বাচিত হন।
সাংবাদিকতা:
ছাত্রজীবন শেষে মুহাম্মদ কামারুজ্জামান সাংবাদিকতাকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। ১৯৮০ সালে তিনি বাংলা মাসিক 'ঢাকা ডাইজেস্ট' পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৮১ সালে তাকে সাপ্তাহিক 'সোনার বাংলা' পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। মাত্র ১ জন পিয়ন ও ১ জন কর্মচারী নিয়ে যাত্রা শুরু করে সোনার বাংলা। সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সোনার বাংলায় ক্ষুরধার লেখনীর কারণে এরশাদের শাসনামলে পত্রিকাটির প্রকাশনা নিষিদ্ধ হয়। 'সোনার বাংলা' রাজনৈতিক কলাম ও বিশ্লেষণ বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং পত্রিকাটি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক সাপ্তাহিকের মর্যাদা লাভ করে। কারাগারে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত মুহাম্মদ কামারুজ্জামান পত্রিকাটির সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে কতিপয় ব্যক্তির সহযোগিতায় একটি ব্যতিক্রমধর্মী সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন 'নতুন পত্র' প্রকাশ করেন। অবশ্য পত্রিকাটির প্রকাশনা বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ১৯৮৩ সাল থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত দশ বছর দৈনিক সংগ্রামের নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন। তিনি জাতীয় প্রেস ক্লাবের একজন সদস্য এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সদস্য ছিলেন। ১৯৮৫-৮৬ সাল পর্যন্ত তিনি অবিভক্ত বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন-বিএফইউজে'র কার্যনির্বাহী পরিষদের নির্বাচিত সদস্য ছিলেন।
জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান
পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ১৯৭৯ সালে মুহাম্মদ কামারুজ্জামান জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন এবং একই বছর তিনি জামায়াতের রুকন (সদস্য) হন। ১৯৮১-৮২ সালে তিনি কিছুদিনের জন্য ঢাকা মহানগরী জামায়াতের জয়েন্ট সেক্রেটারি ছিলেন। ১৯৮২ সাল থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯২ সালে তাকে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। জামায়াতের কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক কমিটি ও লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য হিসেবে বিগত স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ১৯৮৩-৯০ পর্যন্ত তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯৩-৯৫ সাল পর্যন্ত তত্ত্ববাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
জামায়াতে ইসলামীর সিনিয়র সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান জামায়াতের নির্বাহী কমিটি, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ ও বিভিন্ন কমিটির সদস্য এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ক সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসায় পর গঠিত চারদলের কেন্দ্রীয় লিয়াজোঁ কমিটির অন্যতম শীর্ষ নেতা হিসেবে তার অবদান উল্লেখযোগ্য। ইসলামী ও জাতীয়তাবাদী শক্তির ঐক্য প্রচেষ্টায় তিনি অক্লান্ত পরিশ্রেম করে গেছেন। এজন্য দলীয় রাজনীতি ছাড়াও বিভিন্ন ফোরামে সভা-সমাবেশ, সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে তার সক্রিয় উপস্থিতি বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়।
বিদেশ ভ্রমণ:
জননেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামান বহু দেশে ভ্রমণ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, ইরান, নেপাল, ভারত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, হংকং, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, ফ্রান্স, সুইডেন, জাপান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, আস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইতালী, জার্মানী, তুরস্ক, ইয়ামেন, ব্রুনাই, বাহরাইন ও কুয়েত।
লেখক কামারুজ্জামান:
মুহাম্মদ কামারুজ্জামান দেশী বিদেশী বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে কলাম লিখতেন। পত্র-পত্রিকা ও বিভিন্ন জার্নালে তার লেখা প্রকাশিত হয়েছে। তার লিখিত বইগুলো পাঠক সমাদৃত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আধুনিক যুগে ইসলামী বিপ্লব, পশ্চিমা চ্যালেঞ্জ ও ইসলাম, বিশ্ব পরিস্থিতি ও ইসলামী আন্দোলন, সংগ্রামী জননেতা অধ্যাপক গোলাম আযম, সাঈদ বদিউজ্জামান নূরসী ইত্যাদি।
শেরপুরের জনগণের ম্যান্ডেট:
১৯৮৬ সাল থেকে শেরপুর সদর তথা শেরপুর-১ আসনে জনাব মুহাম্মদ কামারুজ্জামান প্রতিদ্বন্তিতা করে উল্লেখযোগ্য ভোট পেয়ে আসছেন। সর্বশেষ দুটি সাধারণ নির্বাচনে (২০০১ ও ২০০৮) তিনি খুব অল্প ভোটের ব্যাবধানে হেরে গেলেও ধারণা করা হয় তিনিই প্রকৃত বিজয়ী। কারণ, ঐ দুই নির্বাচনেই আওয়ামীলীগ প্রার্থী তার নিয়ন্ত্রনাধীন এলাকার ভোট কেন্দ্রগুলো দখল করে ব্যাপক কারচুপির মাধ্যমে বিজয় ছিনিয়ে নেন। এত কিছুর পরও ২০০১ এর নির্বাচনে কামারুজ্জামান ৬৫,৪৯০ ভোট (বিজয়ী আওয়ামী প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোট ৮৬,১০১)এবং ২০০৮ এর ডিজিটাল নির্বাচনে ১,১০,০৭০ ভোট পান (বিজয়ী আওয়ামী প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোট ১,৩৬,১২৭)। ১৯৭১ সালে শেরপুরের নারকীয় ঘটনাগুলোর প্রত্যক্ষদর্শী মানুষগুলো বেঁচে থাকতে শহীদ কামারুজ্জামানকে এত বিপুল ম্যান্ডেট দেয়া কি কোন অর্থ বহন করে না?
চার্জে আনীত অভিযোগের ঘটনাস্থলসমূহ শেরপুর-এখানকার মানুষগুলো দেখে-শুনে- বিগত ৪০ বৎসর ধরে যা জেনে এসেছে; সেখানে যদি কামারুজ্জামানের সংশ্লিষ্টতা থাকত, তাহলে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার এমন গণরায় কি সম্ভব?
মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের মেয়ের জামাই
মুক্তিযুদ্ধের সময় গৌরবময় ভূমিকা পালনকারী পরিবারের মেয়েজামাই মুহাম্মদ কামারুজ্জামান। শেরপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নির্বাচিত বর্তমান জেলা কমান্ডার-অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক এ জি এম '৭১ এর রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম হিরুর ছোট বোন মিসেস নুরুন্নাহার জনাব কামারুজ্জামানের সহধর্মিণী। আনোয়ার হোসেন মঞ্জু তাঁর সম্বন্ধী। জনাব মঞ্জু একজন স্বনামধন্য অনুবাদক, বাসসের সাবেক চিফ রিপোর্টার, সাবেক বার্তা সম্পাদক: দৈনিক বাংলার বাণী (শেখ ফজলুল হক মনি প্রতিষ্ঠিত ও শেখ ফজলুল করিম সেলিম এমপি সম্পাদিত-এক সময়ে আওয়ামী লীগের মুখপাত্র হিসেবে পরিচিত)। তিনি বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী। তাঁর শ্যালক জনাব আবুল কালাম আযাদ (শ্যালক) ২ বারের ইউপি চেয়ারম্যান, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। ছোট শ্যালক মনোয়ার হোসেন বাবুল একজন কৃষিবিদ ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। শ্বশুর জনাব আজিজুর রহমান ১৯৭১ সালে কৃষি অধিদপ্তরে চাকরি করতেন। তিনি যুদ্ধের সময় অনেক মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিতেন, খাবার দিতেন এবং সবরকমের সহযোগিতা করতেন। শেরপুরের সাধারণ মানুষের প্রশ্ন কামারুজ্জামান যদি সত্যি সত্যি মুক্তিযুদ্ধের সময় গুরুতর অপরাধে অপরাধী হতেন, তাহলে কি ১৯৭৮ সালে এমন একটি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারে বিয়ে করতে পারতেন?
বিচারিক কার্যক্রম:
২০১৩ সালের ৯ মে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে বিচারপতি মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারক মো. শাহিনুর ইসলাম মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়। ওই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ৬ জুন আপিল করেন মুহাম্মদ কামারুজ্জামান। গত বছরের ৫ জুন এ বিষয়ে শুনানি শুরু হয়। ১৭ সেপ্টেম্বর মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের পক্ষে আপিলের যুক্তি উপস্থাপন শেষ করেন তার আইনজীবীরা। এরপর ৩ নভেম্বর আপিল বিভাগের তৎকালীন জ্যেষ্ঠ বিচারপতি ও তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে চার বিচারপতির বেঞ্চ মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে সংক্ষিপ্ত আদেশে রায় ঘোষণা করেন।
২০১১ সালের ৫ ডিসেম্বর কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) ট্রাইব্যুনালে দাখিল করে প্রসিকিউশন। ২০১২ সালের ১২ জানুয়ারি প্রসিকিউশন কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে পুনরায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেন। ৩১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল-১। এরপর ১৬ এপ্রিল কামারুজ্জামানের মামলাটি ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে ট্রাইব্যুনাল-২ এ স্থানান্তর করা হয়। ১৬ মে ডিফেন্সপক্ষ এবং ২০ মে প্রসিকিউশনের আইনজীবীরা কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি শেষ করেন। এরপর ২০১২ সালের ৪ জুন কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
তার বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে হত্যা, নির্যাতন ও দেশত্যাগে বাধ্য করাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের সাতটি ঘটনায় অভিযোগ গঠন করা হয়। ২০১২ সালের ১৫ জুলাই থেকে ২০১৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) আব্দুর রাজ্জাক খানসহ প্রসিকিউশনের ১৮ জন সাক্ষ্য দেন। অন্যদিকে কামারুজ্জামানের পক্ষে ২০১৩ সালের ৬ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত ৫ জন ডিফেন্স সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। তারা হচ্ছেন মোঃ আরশেদ আলী, আশকর আলী, কামারুজ্জামানের বড় ছেলে হাসান ইকবাল, বড় ভাই কফিল উদ্দিন এবং আব্দুর রহিম।
২০১০ সালের ১৩ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের ফটক থেকে কামারুজ্জামানকে গ্রেফতার করা হয়। ওই বছরের ২ আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতার দেখানো হয়।
রিভিউ আবেদন খারিজ:
৬ এপ্রিল ২০১৫ মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে করা রিভিউ (পুনর্বিবেচনার) আবেদন খারিজ করেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। সংক্ষিপ্ত আদেশে আপিল বিভাগ বলেছেন 'ডিসমিসড'। এর ফলে ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে আপিল বিভাগ আগে যে রায় দিয়েছিল তা বহাল থাকে। পাশাপাশি শেষ হয় মামলার বিচার কার্যক্রমও। সংবিধান অনুসারে প্রেসিডেন্টের কাছে ক্ষমা চাওয়ার জন্য অন্তত সাত দিনের সুযোগ থাকলেও ওইদিনই আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানান ক্ষমা প্রার্থনার বিষয়টি কয়েক ঘণ্টার মাত্র। অথচ অন্যান্য মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করার ক্ষেত্রে কারা আইনে '৭ দিনের আগে না, আবার ২১ দিনের পরে না'-এমন বিধান আছে। এ মামলার ক্ষেত্রে এই আইন প্রযোজ্য হবে না বলে মন্তব্য করেন আইনমন্ত্রী। আগেরদিন রিভিউ আবেদনের ওপর শুনানি গ্রহণ শেষে আদালত সোমবার (৬ এপ্রিল ২০১৫) আদেশের জন্য নির্ধারণ করেছিলেন।
প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার (এস কে সিনহা) নেতৃত্বে আপিল বিভাগের চার বিচারপতির বেঞ্চ আদেশ দিয়ে বলেন, রিভিউ আবেদন 'ডিসমিসড'।
মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের পক্ষে রিভিউ আবেদনের শুনানি করেন বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের সভাপতি সিনিয়র এডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন। তাকে সহায়তা করেন এডভোকেট মুহাম্মদ শিশির মনির।
মৃত্যু পরোয়ানা জারি:
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের চার বিচারপতির বেঞ্চ কামারুজ্জামানের আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায়ে স্বাক্ষর করেন। পরদিন ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ মুহম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যু পরোয়ানা কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠায়। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ফরমান আলীসহ চারজন কামারুজামানকে পরোয়ানা পড়ে শোনান। আপিল বিভাগে আবদুল কাদের মোল্লার রিভিউ আবেদনের রায় অনুযায়ী, দণ্ডিতদের জন্য আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের ১৫ দিনের মধ্যে রিভিউ আবেদন করার সুযোগ পান। এই রায়ের ভিত্তিতে ৫ মার্চ আপিল বিভাগের দেয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন করেন মুহাম্মদ কামারুজ্জামান। তার আইনজীবীরা ৪৪টি যুক্তি দেখিয়ে রিভিউ আবেদনটি দায়ের করেন। ৪৫ পৃষ্ঠার রিভিউ আবেদনে মোট ৭০৪ পৃষ্ঠার ডকুমেন্ট ছিল।
যে কারনে মৃত্যুদন্ডাশের বিরোধীতা করলেন এক বিচারপতি
১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় সাড়ে তিনমাস পর প্রকাশ হয়। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের চার বিচারপতির স্বাক্ষর শেষে রায়টি প্রকাশ করা হয়। এর মধ্যে জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মোঃ আবদুল ওয়াহহাব মিঞা রায়ে ভিন্নমত পোষণ করেন। পূর্ণাঙ্গ রায়টি ৫৭৭ পৃষ্ঠার। রায়ের ৫৭৬ পৃষ্ঠায় ছিল সংক্ষিপ্ত আদেশ। পূর্ণাঙ্গ রায়ের সংক্ষিপ্ত আদেশে বলা হয়েছে- আপিল আংশিকভাবে মঞ্জুর হলো। আপিলকারী মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে প্রথম অভিযোগ থেকে খালাস দেয়া হলো। ২.ও ৭ নম্বর অভিযোগে তার দণ্ড সংখ্যারিষষ্ঠতার ভিত্তিতে বহাল থাকলো। ৩ নম্বর অভিযোগে তাকে সর্বসম্মতভাবে দোষী সাব্যস্ত করা হলো তবে মৃত্যুদন্ড দেয়া হলো সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে। ৪ নম্বর অভিযোগে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে তার সাজা মৃত্যুদণ্ড থেকে কমিয়ে যাবজ্জীবন করা হলো।
আপিলের রায়ে জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মোঃ আবদুল ওয়াহহাব মিঞা রায়ে বলেন, আপিল আংশিকভাবে মঞ্জুর হলো। ২. ৪ এবং ৭ নম্বর অভিযোগে আপিলকারী দোষী না হওয়ায় (মুহাম্মদ কামারুজ্জামান) খালাস দেয়া হলো। ৪ নম্বর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদণ্ডের স্থলে যাবজ্জীবন সাজা দেয়া হলো। ২ নম্বর অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রসিকিউশন সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণে ব্যর্থ। কারণ দোষী প্রমাণিত না হওয়ায় অভিযুক্তকে খালাস দেয়া হলো। ৩ নম্বর অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদণ্ডের আদেশ সংশোধন করে যাবজ্জীবন সাজা দেয়াই যুক্তিযুক্ত। কারণ ঘটনাস্থলে অভিযুক্তের উপস্থিতি নিয়ে কিছুটা সন্দেহ রয়েছে। ৪ নম্বর অভিযোগের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, প্রসিকিউশন অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। ৭ নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে, এই অভিযোগটিও প্রসিকিউশন সন্দেহাতীত প্রমাণ করতে পারেনি। তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন 'কামারুজ্জামান কোন কোন দিন সকালে, কোন কোন দিন দুপুরে আবার কোন কোন দিন সন্ধ্যার পর ডাক বাংলোর ক্যাম্পে আসতো। যদি তাই হয় তাহলে কিভাবে অভিযুক্ত প্রণিধানযোগ্য আল বদর নেতা হলেন? কিভাবে সাক্ষীরা তাকে দেখেছে এবং ঘটনায় তার সম্পৃক্ততা রয়েছে তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। এ বিষয়গুলো আরো বিস্তারিত ট্রাইব্যুনাল বিবেচনা নিতে পারতো। তাই অভিযুক্তকে খালাস দেয়া হলো।
রাষ্ট্রপতি জীবন দেয়ার ও নেয়ার মালিক নন যে তার কাছে প্রাণভিক্ষা চাইবো:
মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের সাথে ১১ এপ্রিল ২০১৫ শনিবার বিকেল ৪টা ১০ মিনিটে পরিবারের সদস্যরা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সাক্ষাত করেন। সাক্ষাৎ শেষে তার ছেলে হাসান ইকবাল ওয়ামী বলেন, প্রাণভিক্ষা চাওয়া প্রসঙ্গে বাবা বলেছেন, প্রাণের মালিক আল্লাহ। রাষ্ট্রপতি জীবন দেয়ারও মালিক নন নেয়ারও মালিক নন যে তার কাছে প্রাণভিক্ষা চাইবো। তিনি বলেন, বাবা বিচলিত নন, আমরা হাসিমুখে বিদায় দিয়ে গেলাম। তার সাথে কোন ম্যাজিস্ট্রেট দেখা করেননি বলেও জানান মুহাম্মদ কামারুজ্জামান।
বের হওয়ার সময় বড় ভাই কফিল উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, আমার ভাই বলেছেন, তাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। তিনি দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন।
বড় ছেলে হাসান ইকবাল ওয়ামী বলেন, রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চওয়ার প্রশ্নই উঠে না। ক্ষমা চাইবেনতো শুধু আল্লাহর কাছে। তিনি বলেন, আমার বাবার স্বপ্ন ছিল এদেশে ইসলামী শাসন কায়েম হবে। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বেই এদেশে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। তিনি বলেন, তার বাবা বলেছেন, তার সাথে বিচারের নামে প্রহসন করা হয়েছে। ১৮ বছরের একজন কিশোরকে মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসিয়ে দেয়া হয়েছে। এর বিচারের ভার তিনি আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, বাবার মনোবল দৃঢ় আছে। তিনি দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন। বাবা বিচলিত নন, আমরা হাসিমুখে বিদায় দিয়ে গেলাম।
উপেক্ষিত জাতিসংঘসহ আর্ন্তজাতিক সংস্থা ও ব্যক্তিদের আহবান
মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের বিচার ও মৃত্যুদণ্ড সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা মানবাধিকার সংগঠন, আন্তর্জাতিক আইন ও যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক বিশেষজ্ঞগণ। ত্রুটিপূর্ণ বিচার প্রক্রিয়ার কারণে মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর না করতে আহবান জানিয়েছিল। কিন্তু সরকার তা উপেক্ষা করে শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে হত্যা করে।
জাতিসংঘ
জাতিসংঘ মুহাম্মাদ কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর স্থগিত রাখতে আহবান জানিয়েছিল। ১০ এপ্রিল ২০১৫ জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের পক্ষে স্পোকসম্যান রাভিনা সামদানী এ আহ্বান জানান। জেনেভা থেকে দেয়া বিবৃতিতে তিনি বলেন, জামায়াত নেতা মুহাম্মাদ কামারুজ্জামানের ফাঁসির দণ্ড স্থগিত করতে আমরা বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। কামারুজ্জামান বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। তার বিচার প্রক্রিয়ায় নানা অনিয়ম ছিল এবং ন্যায্য বিচার প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী হয়নি।
বিবৃতিতে বলা হয়, জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিস দীর্ঘদিন যাবত বিচারের স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিল, তাই বাংলাদেশ সরকারের উচিত হবে না মৃত্যুদন্ডাদেশ কার্যকর করা। ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক ১৬টি রায় দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৪ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়, যার অধিকাংশই বিরোধী রাজনৈতিক দল-জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির নেতা। তারা সবাই ১৯৭১ সালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধে দণ্ডিত হয়েছেন। এর মধ্যে ২০১৩ সালে আবদুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করা হয়। বাংলাদেশ কর্তৃক অনুস্বাক্ষরিত ইন্টারন্যাশনাল কভোন্যান্ট অন সিভিল এন্ড পলিটিক্যাল রাইট্স এর উদ্ধৃতি দিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়া বিচারের ক্ষেত্রে বিবেকী ন্যায্য বিচারের নিশ্চয়তা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। যদি অন্যায্য বিচার প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়, তা হবে মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা।
বিবৃতিতে বলা হয়, জাতিসংঘ সব সময়ই মৃত্যুদণ্ডের বিরোধী, এমনকি যেখানে কঠোরভাবে ন্যায্য বিচারের মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে এবং অধিকাংশ গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধ সংঘটিত হয়েছে সে ক্ষেত্রেও। বিবৃতিতে অমানবিক মৃত্যুদন্ডাদেশ বিলোপকারী দেশের কাতারে শামিল হতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
ইইউ
মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকায় প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ঢাকায় অবস্থিত সংস্থাটির কার্যালয় থেকে গণমাধ্যমে বার্তা পাঠিয়ে ওই প্রতিক্রিয়া জানানো হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, সাজা হিসেবে মৃত্যুদণ্ড কখনোই অপরাধ দমন করতে পারে না। বরং এতে বিচারের উদ্দেশ্য সফল হয় না। আর ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) যে কোন ধরনের মৃত্যুদণ্ডের বিপক্ষে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিবৃতিতে জানায়, এ ধরনের সাজা বৈশ্বিকভাবে বিলুপ্তির জন্য ইইউ ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে ইইউ বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষকে আহ্বান জানাচ্ছে, মৃত্যুদণ্ডের মতো সাজা স্থগিত করা হোক।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) 'ত্রুটিপূর্ণ বিচার প্রক্রিয়ায়' যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামীর সিনিয়র সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড স্থগিতের আহ্বান জানায়। এইচআরডব্লিউ'র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অবিলম্বে কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ডের রায় স্থগিত করা এবং মামলাটি স্বাধীনভাবে পুনর্বিবেচনা না করা পর্যন্ত তা কর্তৃপক্ষের মুলতবি রাখা উচিত।
এতে বলা হয়, ২০১৫ সালের ৬ এপ্রিল বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ডের রায়। পুনর্বিবেচনার আবেদন খারিজ করে দেয়, যার অর্থ তিনি আসন্ন মৃত্যুদণ্ডের সম্মুখীন। এইচআরডব্লিউ'র এশিয়া বিষয়ক পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস বলেন, মৃত্যুদণ্ড একটি অপরিবর্তনযোগ্য ও নিষ্ঠুর শাস্তি। বিচার বিভাগ যখন এ ধরনের শাস্তি যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গরূপে পুনর্বিবেচনা করতে ব্যর্থ হন, তখন সেটি আরও গর্হিত পর্যায়ে উপনীত হয়। তিনি আরও বলেছেন, বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ বিচার কাজ নিরপেক্ষ বিচার প্রক্রিয়া লঙ্ঘনের পুনঃপুনঃ ও বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগের মহামারীতে বিপর্যস্ত, যেখানে পক্ষপাতহীন বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনা আবশ্যক।
১০ এপ্রিল ২০১৫ হিউম্যান রাইটস ওয়াচের নিজস্ব ওয়েবসাইটে 'বাংলাদেশ: সাসপেন্ড ডেথ সেনটেন্স অব ওয়ার ক্রাইমস অ্যাকিউজড' শিরোনামে একটি প্রতিবেদনে এ আহবান জানানো হয়।
ব্র্যাড অ্যাডামস বলেন, ১৯৭১ সালে ভয়াবহ যেসব যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয়েছিল, তার ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতার ব্যাপারে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ দীর্ঘকাল থেকে সমর্থন জানিয়ে আসছে। কিন্তু, এ বিচারসমূহ আন্তর্জাতিক নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থার মানদণ্ডে হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, ন্যায়বিচার প্রদানের জন্য সর্বোচ্চ মানদণ্ডের নীতিতে অবিচল থাকা আবশ্যক, বিশেষ করে জীবন যখন বিপন্নপ্রায়। তিনি বলেন, কামারুজ্জামানের বিচার প্রক্রিয়া যেভাবে পরিচালিত হয়েছে, তাতে সে মানদণ্ডসমূহ অনুসরণ করা হয়েছে, তেমনটা বলা যায় না।
একই সঙ্গে বাংলাদেশে অবিলম্বে মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করার দীর্ঘদিনের আহবান পুনর্ব্যক্ত করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংগঠনের মতে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সঙ্গে মৃত্যুদণ্ড সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ব্র্যাড অ্যাডামস আরও বলেন, বাংলাদেশ সরকারের উচিত আইন কার্যকরের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করা এবং যে রাষ্ট্রগুলো ইতোমধ্যেই এ ধরনের বর্বরোচিত রেওয়াজের বিলোপ ঘটিয়েছে, অচিরেই তাদের সঙ্গে যোগ দেয়া।
লর্ড কারলাইল
যুক্তরাজ্যের হাউস অব লর্ড এর সদস্য লর্ড কারলাইল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের ফাঁসির দণ্ড স্থগিত করাসহ সরকারের প্রতি ৫ দফা সুপারিশ করেন। তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে স্বাধীন তদন্ত করা, তা সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ায় সকল কার্যক্রম স্থগিত, সর্বোচ্চ দণ্ড হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান স্থগিত রাখাসহ আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ অনুযায়ী সত্যিকার অর্থেই একটি আন্তর্জাতিকমানের ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বিবৃতিতে তিনি বলেন, কামারুজ্জামানের বিচারিক প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছ বিচারিক প্রক্রিয়া ছিল না। আশা করা হয়েছিল রিভিউ গ্রহণ করে ত্রুটিগুলো দূর করা হবে এবং পুনঃবিচারের আদেশ দেয়া হবে। তিনি বলেন, বিচারিক কার্যক্রম নিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, নো পিস উইদাউট বর্ডার, জাতিসংঘের ওয়ার্কিং গ্রুপ অন অরবিটারী ডিটেনশন, যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক বিচার বিষয়ক বিশেষ দূত স্টিফেন জে র‍্যাপসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা সমালোচনা করেছে। এই বিশেষজ্ঞদের কোন রাজনৈতিক এজেন্ডা নেই। তারা আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে চায়।
কমনওয়েলথ ল'য়ার এসোসিয়েশন
মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের ফাঁসির দণ্ড নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে কমনওয়েলথ ল'ইয়ার্স এসোসিয়েশন-সিএলএ। এ সংস্থা সরকারের প্রতি ৪ দফা সুপারিশ করেছে। সুপারিশগুলো হলো-
ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক দেয়া সকল সাজা ও বিচার কার্যক্রম অবিলম্বে স্থগিত করা
অনতিবিলম্বে ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়া রিভিউ এবং তদন্ত করা
সর্বোচ্চ সাজা হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান স্থগিত রাখা
আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ অনুযায়ী সত্যিকার অর্থেই একটি আন্তর্জাতিকমানের ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-আইসিটি এর কার্যক্রম দেশীয় আইন যেমন নয়, তেমনি আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ীও হচ্ছে না, যেসব আন্তর্জাতিক চুক্তি ও বিধিতে বাংলাদেশ স্বাক্ষর করেছে। পুরো বিচার প্রক্রিয়াতেই তা রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
লর্ড এভিব্যুরির চিঠি
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমামের কাছে চিঠি দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের হাউজ অব লর্ড-এর সদস্য লর্ড এভিব্যুরি। ১০ এপ্রিল ২০১৫ দেয়া চিঠিতে তিনি বলেন, আমি জানি বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে করা রিভিউ পিটিশন খারিজ করে দিয়েছে এবং তা কার্যকর করা হবে।
চিঠিতে তিনি আরো বলেন, আমি কি মৃত্যুদণ্ডকে আমৃত্যু কারাদণ্ডে পরিবর্তন করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে সুপারিশ করতে আপনাকে অনুরোধ করতে পারি? আপনি নিশ্চয়ই অবগত আছেন, এর আইনী প্রক্রিয়ায় ত্রুটি নিয়ে, বিশেষ করে মি. কামারুজ্জামান যে অপরাধে অভিযুক্ত হয়েছেন, তার প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীর অনুপস্থিতি। যদি তার মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করা হয়, তা আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের ভাবমার্যাদা ক্ষুন্ন করবে।
জান্নাতের পথে
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্বাহী আদেশে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নামে জামায়াতে ইসলামীর সিনিয়র সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল বিশিষ্ট সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে ১০ এপ্রিল ২০১৫ রাত ১০টা ৩০ মিনিটে হত্যা করা হয়। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
শেরপুরে চির নিদ্রায় শায়িত শহীদ কামারুজ্জামান
মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তার নিজের গড়া শেরপুর সদর উপজেলার কুমরী বাজিতখিলা এতিমখানার পাশেই তার লাশ দাফন করা হয়। ১১ এপ্রিল ২০১৫ ভোর ৫টা ২০ মিনিটে দাফন সম্পন্ন হয়। এর আগে ভোর ৪টা ৫০ মিনিটে এতিমখানা মাঠে তার নামাযে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। এতে কামারুজ্জামানের আত্মীয়সহ স্থানীয়রা অংশগ্রহণ করেন। আশেপাশে হাজার হাজার মানুষ উপস্থিত থাকলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়াকড়ির কারণে তারা অংশগ্রহণ করতে পারেনি। দাফনস্থলে গণমাধ্যম কর্মীসহ স্থানীয় এলাকাবাসীর প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ ছিল।
দাফনের পর বেলা বাড়ার সাথে সাথেই হাজার হাজার মানুষ তার কবর জিয়ারত করতে আসেন। দূর-দূরান্ত থেকে আসা লোকজন কামারুজ্জামানের রূহের মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাত করেন। এ সময় অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়ছেন।
গায়েবানা জানাযায় জনতার ঢল-
শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের জন্য জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমসহ দেশে বিদেশে গায়েবানা জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। ১১ এপ্রিল ২০১৫ রাজধানীর বিভিন্ন মসজিদ, ময়দান, বিভাগীয় শহরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হাজার হাজার জনতার উপস্থিতিতে এ জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে অনুষ্ঠিত গায়েবানা জানাযার পূর্বে মুসল্লিদের উদ্দেশে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ডা. রেদওয়ান উল্লাহ শাহেদী বলেন, শহীদ কামারুজ্জামানের প্রতি ফোঁটা রক্ত এদেশের মাটিকে ইসলামী আন্দোলনের জন্য উর্বর করবে। তার হত্যা ষড়যন্ত্রে জড়িতদের জনগণের কাঠগড়ায় একদিন দাঁড়াতে হবে। তিনি বলেন, জামায়াত কর্মীরা মহান আল্লাহ ব্যতীত কখনো কারো কাছে মাথা নত করেনি, ভবিষ্যতেও করবে না ইনশাআল্লাহ। হত্যাকাণ্ড, গুম, মামলা ও গ্রেফতার চালিয়ে শহীদী কাফেলার কাজ কেউ বন্ধ করতে পারবে না। সত্যের নিকট মিথ্যার পতন অবশ্যম্ভাবী। মিথ্যা সব সময়ই পরাভূত এবং পরাজিত।
বিভিন্ন দেশে গায়েবানা জানায্য-
শহীদ কামারুজ্জামানের জন্য দোয়া করার উদ্দেশ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সৌদি আরবের জেদ্দা, তুরস্ক, দক্ষিণ আফ্রিকা,পর্তুগালসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গায়েবানা নামাযে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়।
আন্তর্জাতিক মিডিয়া
মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের বিচারের রায় সমগ্র পৃথিবীতে ব্যাপকভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করে। অনেকে মনে করেন, সরকার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইসলামী রাজনৈতিক দলের প্রথম সারির নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে ফাঁসি দিয়েছে। অনেক মিডিয়ায় এই ইসলামিক স্কলারের হত্যার ষড়যন্ত্রকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বলে প্রতিবেদন ছেপেছে। বিশ্ববিখ্যাত সংবাদ সংস্থা বিবিসির হেডলাইনটি হলো 'ইসলামিস্ট লিডার কামারুজ্জামানস এপিল রিজেকটেড'। যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত গার্ডিয়ান পত্রিকার অনলাইনেও পরিবেশিত খবরে মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে একজন ইসলামিস্ট লিডার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আলজাজিরা পরিবেশিত খবরে কামারুজ্জামানকে জামায়াত নেতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বার্তা সংস্থা এএফপি'র, অনলাইন ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্টও এ বিচার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। রিভিউ আবেদন খারিজ করে রায় ঘোষণার সাথে সাথেই বিশ্বের বিভিন্ন টিভি, অনলাইন পোর্টাল এবং সংবাদপত্রের অনলাইন ভার্সনে বিশেষ গুরুত্বের সাথে খবরটি পরিবেশন করা হয়।
তুরস্কের দুঃখ ও উদ্বেগ প্রকাশ-
জামায়াত নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করায় দুঃখ ও উদ্বেগ প্রকাশ করে তুরস্ক। দেশটির সরকারি বার্তা সংস্থা আনাডোলু এজেন্সি এ খবর প্রদান করে। এতে বলা হয়, তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ১১ এপ্রিল ২০১৫ এ ব্যাপারে একটি বিবৃতি দেয়া হয়।
ওই বিবৃতিতে বলা হয়, ফাঁসি কার্যকর না করতে বাংলাদেশের কাছে আহ্বান জানিয়েছিল তুরস্ক। একই সঙ্গে সামাজিক সম্প্রীতি ও দেশে শান্তি ধরে রাখার জন্য একই রকম অন্য মৃত্যুদণ্ডগুলো স্থগিত রাখারও আহ্বান জানিয়েছে। মৃত্যুদণ্ড বাতিল করা হয়েছে এমন একটি দেশ হিসেবে এই শাস্তি কার্যকর করায় উদ্বেগ প্রকাশ করছে তুরস্ক। ফাঁসি কার্যকর করায় সমাজে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হতে পারে।
উল্লেখ্য, ২০০৪ সালে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে তুরস্ক। এর পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের শান্তি বর্ধিত করে। ওই বিবৃতিতে বলা হয়, ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের বিচার করতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ২০১৩ সালের মে মাসে শাস্তি হিসেবে কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। নভেম্বরে তার একটি আপিল খারিজ করে দেয় সুপ্রিম কোর্ট। যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ফাঁসি কার্যকর হওয়া দ্বিতীয় ব্যক্তি কামারুজ্জামান। এর আগে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে জামায়াতে ইসলামীর আরেক নেতা আবদুল কাদের মোল্লাকে ফাঁসি দেয়া হয়।
বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন
মুহাম্মদ কামারুজ্জামান এক ক্ষণজন্মা নেতা। তিনি বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্নের জন্য অপরিহার্য সততা, মেধা-যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, ক্লিন ইমেজ-জনপ্রিয়তায় সমৃদ্ধ অনন্য প্রতিভা। স্বাধীন- আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশের অস্তিত্বের বিরোধী সাম্রাজ্যবাদী চক্রের তাই তিনি চক্ষুশূল।
সাংবাদিক, লেখক, বুদ্ধিজীবি, সংগঠক, রাজনীতিবীদ পরিচয়ের বাইরেও শেরপুর জেলার বাজিতপুর গ্রামে। ১৯৫২ সলের ৪ জুলাই জন্ম নেয়া মুহাম্মদ কামারুজ্জামান এ মাটির সন্তান। জামায়াতে ইসলামীর অন্যতম নীতিনির্ধারক হলেও পিতা-মাতার আদরের দুলাল, সন্তানদের পিতা, মিসেস নুরুন্নাহারের স্বামী।
শেষ কথা:
যে কথিত অভিযোগে কামারুজ্জামানকে হত্যা করা হয়েছে সে অভিযোগের কোন রকম সত্যতা নেই। তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামী ও আদর্শিক চেতনার সমন্বয় ঘটিয়ে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গঠনের প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। তিনি ছিলেন একজন জাতীয় রাজনীতিবিদ ও ইসলামী চিন্তাবিদ। রাজনৈতিক ময়দানে তাঁর অবদান দেশের ইসলাম বিরোধী শক্তি সহ্য করতে পারেনি। তাই তাঁর বিরুদ্ধে তারা প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় এবং যুদ্ধাপরাধের কথিত অভিযোগে তাঁকে অভিযুক্ত করে।
এমন প্রতিভাসম্পন্ন একজন মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। মানবসমাজে আজ মনে হচ্ছে সত্য পন্থীরাই যেন অপরাধী। প্রকৃত অপরাধীরা যেন সাধু! জালেমের বিষাক্ত হুংকার মানবসমাজকে কাঁপিয়ে তুলছে। খোদাদ্রোহী দুনিয়া আজ অত্যাচার, নিপীড়ন, প্রতারণা, হঠকারিতা ও দুর্ধষতা ও অপরাজনীতির সীমানা ছেড়ে গেছে। নির্যাতিতের করুণ ফরিয়াদে আকাশ বাতাস দলিত মথিত ও তিক্ত-বিষাক্ত। কিন্তু তারপরও কি সত্য পথের সৈনিকেরা কি ভিত? না, বরং প্রতিটি মুমিন এই বিপদ সংকুল পথ পাড়ি দেয়াকে নিজের ঈমানী দায়িত্বের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেই এগিয়ে চলছে। এই রকম কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়েছে সকল নবী রাসুল (সাঃ) কে। যুগে-যুগে যারাই সেই পদাংক অনুসরণ করবে, তাদের প্রত্যেককেই একই পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হবে এটাই স্বাভাবিক।

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍