হোম / আওয়ামী দুঃশাসনে শহীদ / শহীদ মো: ওসমান গনি
শহীদ মো: ওসমান গনি

শহীদ মো: ওসমান গনি

আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার পূর্ব আফজাল নগর থেকে উঠে আসা মো: ওসমান গনি ছিলেন এক দরিদ্র পরিবারের প্রধান ভরসা—পেশায় ড্রাইভার, চরিত্রে সংযমী ও নামাজী। সংসারের হাল ধরে তিনি স্বপ্ন দেখতেন দারিদ্র্য ভাঙার, মা–বাবার মুখে হাসি ফোটানোর। ২ মার্চ ২০১৩—সাঈদীর মুক্তির দাবিতে সাতকানিয়ায় শান্তিপূর্ণ ব্যারিকেডের মুহূর্তে পুলিশের অতর্কিত গুলিতে তিনি প্রাণ হারান, হার্টে আটকে থাকা সেই বুলেটেই শেষ হয় তাঁর পথচলা। সহযোদ্ধারা বলেন, “ইসলামের সম্মান রক্ষায় তিনি জীবন দিয়েছেন”—আর বাবা সেই দিন রাস্তায় পাওয়া সংবাদকে বিশ্বাসই করতে পারেননি। ওসমান গনির মৃত্যু শুধু এক পরিবারের অবলম্বনকে শেষ করেনি, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক সাধারণ মানুষের সাহসকে ইতিহাসের দিকে তুলে দিয়েছে।

🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ

শহীদ মো: ওসমান গনি
চট্টগ্রাম
৫

শহীদের বাবা বলেন, "আমি ঐ দিন বাড়িতে ছিলাম না। আমরা সবাই আত্মীয়ের বাসায় বেড়াতে যাই। পথে সে গুলিবিদ্ধ হওয়ার সংবাদ পাই।... কান্নাজড়িত কণ্ঠে তাঁর সাথীরা বলেন, "আল্লাহর দ্বীনকে ভালোবেসে ইসলামের সম্মান রক্ষা করতে গিয়ে ওসমান শাহাদাৎ বরণ করেছেন। দরকার হলে আমরাও জীবন দিতে প্রস্তুত, তবুও শহীদের রক্তে ভেজা এই বাংলাদেশে ইসলাম ও ইসলামী ব্যক্তিত্বদের সামান্য অসম্মান আমরা মেনে নেবো না।"

১. শহীদের পরিচিতি
শহীদ ওসমান গনি চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া থানার পূর্ব আফজাল নগর গ্রামে ১৯৭৬ সালে জন্মন্মগহণ করেন। পিতা মো: আবু সৈয়দ ও মাতা আমেনা বেগমের সাত সন্তানের মধ্যে ১ম সন্তান ছিলেন তিনি। ৪ ভাই ও ৩ বোনের সংসারে পিতা-মাতার একমাত্র কর্মক্ষম সন্তান ছিলেন তিনি। দরিদ্র পিতা-মাতা কোন রকমে সন্তানদের বড় করে তোলেন। পারেননি পড়ালেখার ভাল কোন ব্যবস্থা করতে। এক বোন বিবাহিত, ছোট দুই বোন স্কুলে পড়ালেখা করে। এক ভাই কাঠমিস্ত্রী, বাকি ২ ভাই ছাত্র। চরম দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত পরিবারটিতে একটু সচ্ছলতার মুখ দেখাতে বেছে নেন গাড়ি চালানোর পেশা। বাবা বৃদ্ধ হওয়ায় পুরো পরিবারটিই চেয়ে থাকতো তাঁর উপার্জনের দিকে। তাঁর স্বপ্ন ছিল পরিবারকে দারিদ্রমুক্ত করার। ইচ্ছা ছিল মা-বাবার মুখে হাসি ফোটাবার। বাসনা ছিল ভবিষ্যৎ গড়ার। কিন্তু তাঁর লালিত স্বপ্নকে ভেঙ্গে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিল হৃদয়হীন-পাষণ্ড হায়েনাদের একটি বুলেট। তিনি স্ত্রী, ছোট ভাই-বোন ও পিতামাতার দেখাশুনা করতেন। গাড়ি চালালেও তিনি ছিলেন নামাজী এবং অন্যান্য গাড়িচালকদের থেকে ব্যতিক্রম।

২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মুক্তির দাবিতে সাতকানিয়ার সাধারণ লোকজন রাস্তায় গাছ ফেলে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ২ মার্চ ২০১৩ তারিখ সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে সাতকানিয়া থানা পুলিশ সাতকানিয়া হাসমত আলীর দোকানের সামনে আরাকান সড়কে শান্তিপূর্ণ ব্যারিকেডের মধ্যে অতর্কিত গুলি চালায়। তখন অনেকেই সেখানে গুলিবিদ্ধ হয়। শহীদ মোঃ ওসমান গনিও সেখানে গুলিবিদ্ধ হন। তার বাম কাঁধে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুলি শরীরের ভেতরে হার্টের দিকে গিয়ে আটকে যায়। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তাকে হাসপাতালে নেয়ার পথে নতুন ব্রিজের কাছে পৌঁছলে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। মাওলানা মো: নুরুল হক তার জানাযার নামাজে ইমামতি করেন। জানাযায় প্রায় ৮ হাজার লোক উপস্থিত ছিলেন।

৩. সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মুক্তির দাবিতে সাতকানিয়ার সাধারণ লোকজন রাস্তায় গাছ ফেলে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ২ মার্চ ২০১৩ তারিখ সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে সাতকানিয়া থানা পুলিশ সাতকানিয়া হাসমত আলীর দোকানের সামনে আরাকান সড়কে শান্তিপূর্ণ ব্যারিকেডের মধ্যে অতর্কিত গুলি চালায়। তখন অনেকেই সেখানে গুলিবিদ্ধ হয়। একই স্থানে তিনজন শহীদ হন। পরের দিনের জাতীয় পত্রিকাসমূহে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য আসে। দৈনিক আমার দেশ, ৩ মার্চ, ২০১৩ নিউজ করে;
সাতকানিয়ায় নিহত ৩। দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় জামায়াত-শিবির কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষে দুই জামায়াত কর্মী ও এক এলডিপি কর্মী নিহত হয়েছে। এতে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন কমপক্ষে ২০ জন। শনিবার সকাল দশটার সময় সাতকানিয়ায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের হাসমত আলী সিকদারের দোকান এলাকায় পুলিশি ও বিজিবির যৌথ হামলায় তিনজন নিহত হন। নিহতরা হচ্ছেন- ছদাহা আজিমপুর গ্রামের আবু তাহেরের ছেলে জামায়াতকর্মী শহীদুল ইসলাম (১৮), একই ইউনিয়নের ছোট ঢেমশা গ্রামের আবদুর রশিদের ছেলে আবু তাহের (৩০) ও সিকদারপাড়ার সৈয়দ আহমদের ছেলে এলডিপি কর্মী ওসমান গনি (৩৩)। একই ঘটনায় আরও অন্তত ২০ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের গ্রেফতারের জন্য পুলিশ হাসপাতালেও অভিযান চালিয়েছে। পুলিশের গুলিতে তিন ব্যক্তি নিহত হওয়ার ঘটনায় সাতকানিয়ার সবকটি ইউনিয়নে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে জামায়াত-শিবির।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, জামায়াতকর্মীরা বৃহস্পতিবার থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক অবরোধ করে রেখেছে। অবরোধ তুলে দেয়ার চেষ্টা করলে জামায়াতকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। গতকাল সকাল দশটার সময় বিপুলসংখ্যক পুলিশ আবদুল মালেক মেম্বারের ব্রিকফিল্ড এলাকায় গিয়ে অবরোধ সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। আন্দোলনকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এ সময় পুলিশ এলোপাতাড়ি গুলি বর্ষণ করলে বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই শহীদুল ইসলাম নিহত হয়। একই সময় গুলিতে গুরুতর আহত হয়ে আবু তাহের (৩০), কেরানীহাটস্থ আশ শেফা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ও ওসমান গনিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামে নেয়ার পথে মারা যায়। একই ঘটনায় মোহাম্মদ রফিক (৩২) সহ আরও অন্তত ১৫-১৮ জন গুলিবিদ্ধ হয়। সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসনের সাবেক এমপি শাহজাহান চৌধুরী বলেন, এই আন্দোলনে স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরাও যুক্ত হয়েছে। ফলে আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণ এখন আর জামায়াত-শিবিরের হাতে নেই। নির্বিচারে গুলি করে মানুষ হত্যা বন্ধ করার জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান। এদিকে সাতকানিয়ার কেরানীহাট থেকে লোহাগাড়ার চুনতি পর্যন্ত প্রায় বিশ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিদ্যুতের খুঁটি, অহরহ গাছের গুঁড়ি ফেলে সড়ক অবরোধ করে রাখে জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীরা। পুলিশ, র‍্যাব ও বিজিবি সদস্যরা রাত্রের বেলায় বুলডোজার দিয়ে গাছের গুঁড়ি সরিয়ে নিলেও ভোরে আবার তা রাস্তায় তুলে দেয় জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীরা। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় স্থানীয় গ্রামবাসীও।
বিকাল পাঁচটায় সাতকানিয়ায় অবস্থানরত চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার একেএম হাফিজ আক্তার বলেন, পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সড়ক অবরোধ তুলে নেয়ার কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। বিপুলসংখ্যক পুলিশ, র‍্যাব ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানান তিনি। এদিকে ময়নাতদন্ত ছাড়াই নিহত শহীদুল ইসলাম ও আবু তাহেরের লাশ দাফন করা হয়েছে। ওছমানের লাশ ময়নাতদন্ত শেষে দাফন করার কথা রয়েছে। এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। যে কোনো মুহূর্তে পুলিশের সঙ্গে জামায়াত-শিবির ও এলাকাবাসীর ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটতে পারে এমনটাই ধারণা সচেতন মহলের।

৪. শহীদের আপনজনদের কথা
শহীদের বাবার কথা: শহীদের বাবা বলেন, আমি ঐ দিন বাড়িতে ছিলাম না। আমরা সবাই আত্মত্মীয়ের বাসায় বেড়াতে যাই। পথে সে গুলিবিদ্ধ হওয়ার সংবাদ পাই। প্রথমে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। কেননা
সে কোন অন্যায় করবে আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আসলে সে কোন অন্যায় করেনি। বরং অন্যায়ের প্রতিবাদী লোকদের সাথে ছিল। আল্লাহ ভাল জানেন কেন তারা আমার নিরপরাধ ছেলেকে গুলি করে হত্যা করল। আল্লাহ যেন এই অন্যায়ের বিচার করেন।
শহীদের সাথীদের কথা: কান্নাজড়িতকণ্ঠে তাঁর সাথীরা বলেন, "আল্লাহর দ্বীনকে ভালোবেসে ইসলামের সম্মান রক্ষা করতে গিয়ে ওসমান শাহাদাত বরণ করেছেন। দরকার হলে আমরাও জীবন দিতে প্রস্তুত, তবুও শহীদের রক্তে ভেজা এই বাংলাদেশে ইসলাম ও ইসলামী ব্যক্তিত্বদের সামান্য অসম্মান আমরা মেনে নেবো না।"

৫. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম: শহীদ মোঃ ওসমান গনি। পেশা: ড্রাইভার।
জন্ম তারিখ ও বয়স: ৩০.০৩.১৯৭৬ ইং, ৩৭ বছর। আহত হওয়ার তারিখ: ০২ মার্চ'১৩, বুকে গুলি বিদ্ধ।
শাহাদাতের তারিখ:, ০২ মার্চ'১৩, ১১টা। স্থান: সাতকানিয়া। দাফন করা হয়: নিজ কবরস্থান।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: পূর্ব আফজাল নগর, ডাকঘর: ফকিরহাট, থানা: সাতকানিয়া, জেলা: চট্টগ্রাম।
পিতা: মো: আবু সৈয়দ, ৬০ বছর, বয়সের কারণে কাজ করতে অক্ষম।
মাতা: আমেনা বেগম, ৫০ বছর গৃহিণী।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা: মাটির দেয়াল দিয়ে তৈরি ছোট ঘর একটি ও একটি আধাপাকা ঘর। নিজেদের কোন চাষাবাদের জমি নেই। বর্তমানে অন্য ছেলের কাঠমিস্ত্রীর পয়সায় কোনরকমে সংসার চলছে।
স্ত্রী ও সন্তানদের বিবরণ: স্ত্রী: মরিয়ম বেগম।
ভাই-বোনের বিবরণ: আবুল কালাম, কাঠমিস্ত্রী। নার্গিছ আক্তার, বিবাহিতা। কামরুন্নেছা, বিবাহিতা। জেবুন্নেছা, দশম শ্রেণী। আব্দুল্লাহ আল নোমান, ৬ষ্ঠ শ্রেণী। তৌহিদুল ইসলাম, ৩য় শ্রেণী।

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍