হোম / আওয়ামী দুঃশাসনে শহীদ / শহীদ মো: আব্দুল্লাহ আল রাসেল বাবু
শহীদ মো: আব্দুল্লাহ আল রাসেল বাবু

শহীদ মো: আব্দুল্লাহ আল রাসেল বাবু

আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের উত্তর ফেদাইনগরে জন্ম নেওয়া শহীদ মো. আব্দুল্লাহ আল রাসেল বাবু ছিলেন স্বভাবতই ন্যায়নিষ্ঠ, সাহসী ও ইসলামী আদর্শে দৃঢ়প্রাণ এক তরুণ কর্মী। যিনি চাকরির পাশাপাশি দাওয়াতি কাজে ছিলেন অগ্রণী মুখ। চার বছর পর এলাকায় ফিরে তিনি যুবকদের নিয়ে ইফতার মাহফিল আয়োজন করেন, যার পর থেকেই তাকে কেন্দ্র করে শুরু হয় লাগাতার হুমকি ও নজরদারি। ২৮ রমজান বাজারের পথে ওঁৎ পেতে থাকা সন্ত্রাসীরা রড, চাপাতি ও কুঠারের আঘাতে তাকে নির্মমভাবে ক্ষতবিক্ষত করে। মৃত্যুপূর্ব শেষ মুহূর্তে তিনি বন্ধুকে বলেন “আমি শহীদ হয়ে যাবো, আমার কানের কাছে কালিমা পড়” এবং অল্প কিছুক্ষণ পরেই চট্টগ্রাম মেডিকেলে শাহাদাত লাভ করেন। তার মৃত্যু এলাকায় ন্যায়বোধ, ঈমানি সাহস ও ত্যাগের প্রতীক হয়ে আজও মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় অসত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানুষ কখনোই পরাজিত হয় না।

🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ

শহীদ মো: আব্দুল্লাহ আল রাসেল বাবু
চট্টগ্রাম
১৩

"তার মুমূর্ষু দেহ চট্টগ্রাম মেডিকেলে আনার পর তার বন্ধু দেলোয়ার ভূইয়াকে বললেন, আমি শহীদ হয়ে যাবো আমার কানের কাছে কালিমা পড়। এটাই বাবুর শেষ কথা। তার আধা ঘন্টা পর শাহাদাতের সুধা পান করলেন।"

১. শহীদের পরিচিতি
শহীদ মো: আব্দুল্লাহ আল রাসেল বাবু চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুন্ড থানার উত্তর ফেদাইনগর গ্রামে ১৯৮৭সালে জন্মগ্রহণ করে। পিতা সামছুল আলম ও মাতা জাহানারা বেগমের পাঁচ সন্তানের ভিতর সবচেয়ে বড় সন্তান আব্দুল্লাহ আল রাসেল বাবু। পরিবারের প্রয়োজনে এসএসসি পাসের পর কোম্পানির চাকুরী নিয়ে ঢাকায় থাকতেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি সব সময় প্রতিবাদী ছিলেন। ছাত্রজীবনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কর্মী এবং পরবর্তীতে তিনি জামায়াতে ইসলামীর কর্মী ছিলেন। এলাকায় ইসলামের দাওয়াত সম্প্রসারণে তিনি সব সময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করতেন।

২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
২৮ রমজান ইফতারের পূর্বে বাড়িতে আগত মেহমানদের জন্য ইফতারসামগ্রী ক্রয়ের জন্য বাড়ির পাশে বড়। দারোগার বাজারে গেলে পূর্ব থেকে ওঁৎ পেতে থাকা আওয়ামী সন্ত্রাসীরা সর্বপ্রথম রড দিয়ে মাথায় আঘাত করে। আহত হওয়ার পর সীতাকুন্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এ আনলে কর্তব্যরত ডাক্তারগণ প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখলে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করেন। রাত ৮ টায় ন্যাশনাল হাসপাতাল চট্টগ্রাম ভর্তির জন্য নিলে কর্তব্যরত ডাক্তার প্রাথমিক পরীক্ষার পর মৃত বলে ঘোষণা করেন।

৩. শাহাদাতের পূর্বের বিভিন্ন ঘটনা
২৮ রমজান ইফতারের পূর্বে বাড়িতে আগত মেহমানদের জন্য ইফতারসামগ্রী ক্রয়ের জন্য বাড়ির পাশে বড় দারোগার বাজারে গেলে পূর্ব থেকে ওঁৎ পেতে থাকা আওয়ামী সন্ত্রাসীরা সর্বপ্রথম রড দিয়ে মাথায় আঘাত করে এবং ধারালো তলোয়ার দিয়ে উভয় পায়ে কোপাতে থাকে। মাটিতে লুটিয়ে পড়লে সন্ত্রাশীরা গুমের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়ার সময় রাস্তার গর্তে সি এন জি আটকে গেলে রাস্তার উপর নামিয়ে চাপাতি, চাইনিজ কুঠার দিয়ে ২৫-৩০ জনের সন্ত্রাসী চক্র এলোপাতাড়ী কুপিয়ে হাত ও পায়ের কব্জি ও গোড়ালি কেটে ফেলে। বুক ও মাথায় আঘাত করে। লোমহর্ষক ঘটনা দেখে সাধারণ লোকজন দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করতে থাকে। এমতাবস্থায় তার ছোট ভাই-বোনেরা আসলে সন্ত্রাসীরা তাদেরও হুমকি দেয়।

৪. সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
আব্দুল্লাহ আল রাসেল বাবু তার এলাকার বাতিলের চরম আতঙ্ক ছিল। বাবুর নাম শুনলেই সন্ত্রাসীরা আঁতকে উঠত। দীর্ঘ ৪ বছর পর বাবু এলাকায় আসছে একথা শুনার পর শুরু হয় বাবুর বিরুদ্ধে কঠিন চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র। আওয়ামী সন্ত্রাসীরা সর্বদা তার গতিবিধি লক্ষ্য করতে থাকে। একদিকে মামলার আসামি করে পুলিশি হয়রাণী অন্য দিকে সন্ত্রাসীরা সশস্ত্র অবস্থায় তাকে আক্রমণের চেষ্টা করতো। মা বলতেন বাবা ধৈর্য্য ধর বাতিল স্তব্ধ হোক তার পর ময়দানে যাবি। বাবু বলতো মা শহীদ হলেও দুঃখ নাই। ইসলামের বিজয় হবেই। তারই ধারাবাহিকতায় গত ৯ই রমজান তার নিজ বাড়ির সামনের মসজিদে প্রায় ২৫০ জন তরুণ যুবক রোজাদারদেরকে নিয়ে নিজ উদ্যোগে ১টি ইফতার মাহফিলের আয়োজন করে। গত সাড়ে ৪ বছরের মধ্যে দারোগার হাট গ্রামে এটাই ছিল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্র শিবিরের দলীয় প্রোগ্রাম। আওয়ামী সন্ত্রাসীদের লাগাতার হুমকি ইফতার মাহফিল করতে দেবে না। বাবু বলেছে আল্লাহর বিধান সারাদিন রোজা রেখে রোজাদারদের জন্য ইফতার মাহফিলের আয়োজন করেছি। ইনশাআল্লাহ কেউ ঠেকাতে পারবে না। ইফতার মাহফিল সফল হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ। আওয়ামী সন্ত্রাসীরা আরো ক্ষেপে গেল। আব্দুল্লাহ আল রাসেল বাবুকে হত্যার জন্য পাগল হয়ে গেল। ২৮ রমজান ইফতারের পূর্বে বাড়ির পার্শ্বে একাকী পেয়ে লোমহর্ষক নির্যাতনের মাধ্যমে বাবুকে ক্ষতবিক্ষত করল। মেডিকেলে আনার পর তার বন্ধু দেলোয়ার ভূঁইয়াকে বললো, আমি শহীদ হয়ে যাবো আমার কানের কাছে কালিমা পড়। এটাই বাবুর শেষ কথা। তার আধা ঘন্টা পর শাহাদাতের সুধা পান করলেন।
পরের দিনের জাতীয় দৈনিক সমূহে এ বিষয়ে বিস্তারিত রিপোর্ট আসে। ৮ আগস্ট ২০১৩ দৈনিক সংগ্রাম লিখে;
সীতাকুন্ডে যুবলীগের হামলা ও পুলিশের গুলিতে দুই জামায়াত কর্মী নিহত
সংগ্রাম ডেস্ক: গতকাল বুধবার চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড উপজেলায় যুবলীগ সন্ত্রাসীদের হামলায় এবং পুলিশের গুলিতে দু'জন জামায়াত নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। তারা হলেন আব্দুল্লাহ আল রাসেল (৩০) ও মুহাম্মদ পারভেজ (২৮)। এই ঘটনার প্রতিবাদে স্থানীয় জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা দক্ষিণ বাইপাস এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়ক অবরোধ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মহাসড়কে দুই প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়।
উপজেলার বড়দারোগাহাট এলাকায় যুবলীগের সন্ত্রাসীরা আব্দুল্লাহ আল রাসেল বাবুকে কুপিয়ে হত্যা করে। গতকাল ইফতারের আগ মুহূর্তে যুবলীগের সন্ত্রাসীরা তাকে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করলে স্থানীয়রা বাবুকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। নিহত বাবু বড়দারোগাহাট ফেদায় নগর এলাকার মোহাম্মদ নুরুল ইসলামের ছেলে। জামায়াত এই ঘটনার জন্য যুবলীগ সন্ত্রাসী হারুন বাহিনীকে দায়ী করেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জামায়াত কর্মী বাবু বড়দারোগাহাট বাজার মসজিদে আসরের নামাজ পড়ে তার প্রয়োজনীয় কাজ সেরে মায়ের জন্য ইফতার সামগ্রী নিয়ে বাড়ির দিকে রওয়ানা হন। এসময় স্থানীয় যুবলীগের হারুন ও ইসলাম বাহিনীর সন্ত্রাসীরা তাকে ঘিরে ধরে ধারালো কিরিচ ও চাপাতি দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে বাজারে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। স্থানীয়রা বাবুকে উদ্ধার করে চমেক হাসপাতালে নেয়ার পথে রাত ৮টায় কর্নেলহাট এলাকায় তার মৃত্যু হয়। ঘটনার খবর পেয়ে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা বাবু হত্যার প্রতিবাদে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে। ফলে মহাসড়কের উভয় পাশে ৬০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে যানজটের সৃষ্টি হয়। এসময় পুলিশের সাথে জামায়াত কর্মীদের সংঘর্ষ হয় এবং পুলিশের গুলিতে সোহাগ ও দিদারসহ ৬ জন জামায়াত কর্মী আহত হন। এছাড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ-যুবলীগ ও জামায়াত কর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ ঘটে।
সীতাকুন্ড উপজেলার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে অবরোধ পরিস্থিতি সামাল দিতে বুধবার রাত ১১টার দুই প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয় বলে সীতাকুন্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহম্মদ শাহীন ইমরান জানান।

ওদিকে আহত ৬ জামায়াত কর্মীর মধ্যে আরো একজনের মৃত্যু হয়েছে। রাত ১১টার দিকে সীতাকুন্ড থেকে চমেক হাসপাতালে নেয়ার পথে মুহাম্মদ পারভেজ নামক জামায়াত কর্মীর মৃত্যু হয়। নিহত পারভেজের বাড়ি আমিরাবাদ ইউনিয়নে বলে জানা গেছে।

৫. শহীদের আপনজনদের কথা
সীতাকুন্ড উপজেলার ২নং বারৈয়াঢালা ইউনিয়ন আওয়ামী চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের ঘাঁটি। বর্তমান আওয়ামী সন্ত্রাসীদের অত্যাচারে দীর্ঘ চার বছর ঐ ইউনিয়নের ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা প্রায় বাড়িঘর ছাড়া। শহীদ আব্দুল্লাহ আল রাসেল বাবু দীর্ঘ ৪ বছর মংলা থাকার পর রমজানের এক মাস আগে নিজ বাড়িতে আসে এবং ইসলামী আন্দোলনের ভাইদেরকে নিয়ে সক্রিয় হতে থাকে। গত ৯ ই রমজান তার এলাকার মসজিদে একটি ইফতার মাহফিলের আয়োজন করে। আওয়ামী সন্ত্রাসীরা ইফতার মাহফিল করতে দেবে না বলে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। শহীদ বাবু যেকোন মূল্যে ইফতার মাহফিল সফল করার ঘোষণা দেয় এবং অসংখ্য হুমকির মুখে প্রায় ২৫০ জন যুবককে নিয়ে ইফতার মাহফিল সফল করে।

৬. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম: শহীদ মো: আব্দুল্লাহ আল রাসেল বাবু (১৩৬)।
পেশা: চাকুরী।
জন্ম তারিখ ও বয়স: ১০ ডিসেম্বর ১৯৮৭ ইং, ২৬ বছর। আহত হওয়ার তারিখ: ০৭ আগস্ট ২০১৩ ইং, ২৮ রমজান, দুই হাতের কব্জি ও দুই পায়ের গোড়ালি সম্পূর্ণ কর্তন করে এবং বুক ও মাথায় ধারালো অস্ত্রের কোপ।
শাহাদাতের তারিখ: ০৭ আগস্ট ২০১৩, রাত ৮ট। স্থান: চট্টগাম মেডিক্যাল। দাফন করা হয়: পারিবারিক কবরস্থান।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: উত্তর ফেদাইনগর, ডাকঘর: বারৈয়াঢালা, থানা: সীতাকুন্ড, জেলা: চট্টগ্রাম।
পিতা: সামছুল আলম, বয়স প্রায় ৫৫ বছর, চাকুরীজীবী।
মাতা: জাহানারা বেগম, ৪৫ বছর, অসুস্থ।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা: পিতা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বসত ভিটার উপর টিন ও কাঠ দ্বারা নির্মিত একটি ঘরে তাঁর পিতামাতা ও ভাইবোনদের বসবাস।
ভাই-বোনের বিবরণ: আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল, এইচ.এস.সি (১ম বর্ষ) সীতাকুন্ড ডিগ্রি কলেজ। আব্দুল্লাহ আল খালেদ, ৮ম শ্রেণী। বড় দারোগারহাট মেমোরিয়াল উচ্চবিদ্যালয়। আব্দুল্লাহ আল বাকী, ৪র্থ শ্রেণী, বড় দারোগারহাট মেমোরিয়াল উচ্চবিদ্যালয়। জান্নাতুল ফেরদৌস নাহিদা, ৫ম শ্রেণী, বড় দারোগারহাট মেমোরিয়াল উচ্চবিদ্যালয়।

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍