হোম / আওয়ামী দুঃশাসনে শহীদ / শহীদ আবদুল হাকিম
শহীদ আবদুল হাকিম

শহীদ আবদুল হাকিম

আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

১৯৭৪ সালে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার তুলাতলীতে জন্ম নেওয়া শহীদ আবদুল হাকিম ছিলেন আলিম-পাস শিক্ষিত। ফকির মাওলা একাডেমির প্রিন্সিপাল ও ইসলামী আদর্শে দৃঢ়প্রাণ জামায়াতের একনিষ্ঠ কর্মী। ন্যায়, আদর্শ ও ত্যাগকে জীবনের মাপকাঠি বানানো এই নিরহংকারী মানুষটি বিয়ে পর্যন্ত না করে আন্দোলনের ঝুঁকিপূর্ণ পথেই নিজেকে সঁপে দেন। ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর রাতে বাড়ি ফেরার পথে বশির বাহিনীর হাতে অপহৃত হয়ে তিনি নির্মমভাবে জবাই হয়ে শাহাদাত বরণ করেন। পরদিন স্থানীয়রা গাছের বাগান এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে, যা মুহূর্তেই জনজাগরণে পরিণত হয়। তার মৃত্যু সাতকানিয়ার জনপদে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস, আদর্শনিষ্ঠার মূল্য ও সত্যের পথে অটল থাকার এক অমর প্রতীক হয়ে রয়ে গেছে।

🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ

শহীদ আবদুল হাকিম
চট্টগ্রাম
১৪

শহীদের পরিচিতি
২৫ জানুয়ারি ১৯৭৪ তারিখে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার তুলাতলী গ্রামে শহীদ আবদুল হাকিম জন্ম গ্রহণ করেন। পিতা- মৃত আবদুল খালেক ও মাতা মৃত হাজেরা খাতুনের সাত সন্তানের মধ্যে আবদুল হাকিম চতুর্থ। তিনি গারাংগিয়া মাদরাসা থেকে আলিম পাস করে সাতকানিয়া কলেজ থেকে ডিগ্রী পাস করেন। তিনি ছিলেন দক্ষিণ মাদার্শা ফকির মাওলা একাডেমির প্রিন্সিপাল এবং সাংগঠনিকভাবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর একনিষ্ঠ কর্মী।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
পবিত্র ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা বিনিময় শেষে রাতে বাড়ি ফেরার পথে রূপকানিয়া গাছের বাগান এলাকা থেকে দুই বন্ধু আবদুল হাকিম ও কামাল উদ্দীনকে অপহরণের পর আবদুল হাকিমকে জবাই করে হত্যা করে বশির বাহিনীর প্রধান বশির ও তার ভাগিনা নেজাইম্যা ডাকাত।

শাহাদাতের পূর্বের বিভিন্ন ঘটনা
শহীদ আবদুল হাকিম ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর একনিষ্ঠ কর্মী। ইসলামী আন্দোলনের জন্য নিবেদিত প্রাণ আবদুল হাকিম বিয়ে করেননি। পরিবার থেকে বার বার বিয়ের কথা উঠলে তিনি বলতেন, ইসলামী আন্দোলনের এই পথে আমাদের জীবনের নিশ্চয়তা নেই। যে কোন দিন শহীদ হয়ে যেতে পারি। এই অনিশ্চয়তায় বিয়ে করে আরেকটা মেয়ের জীবন নষ্ট করার অর্থ হয় না।

ঘটনার সামগ্রীক বিবরণ
২ সেপ্টেম্বর ২০১১ শুক্রবার। ঈদুল ফিতরের ৩য় দিন। সাতকানিয়ায় ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় শেষে ফেরার পথে রূপকানিয়া গাছের বাগান এলাকা থেকে জামায়াতের দু'জন কর্মী আব্দুল হাকিম ও কামাল উদ্দিনকে অপহরণ করে পৈশাচিকভাবে হত্যা করে। হত্যার পর লাশ গুম করে বশির বাহিনীর প্রধান বশির আহমদ ও তার ভাগিনা ডাকাত নেজাইম্যাসহ কয়েকজন। ৩ সেপ্টেম্বর ২০১১ তারিখে দক্ষিণ রূপকানিয়া গাছের বাগান এলাকা থেকে আবদুল হাকিমের মরদেহ উদ্ধার করে স্থানীয় জনতা। এ ব্যাপারে দৈনিক প্রথম আলো ৪ সেপ্টেম্বর ২০১১ নিম্মোক্ত খবর প্রচার করে- চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায় গতকাল ৩ সেপ্টেম্বর ২০১১ শনিবার আবদুল হাকিম (৪২) ওরফে পান হাকিম নামের এক কাঠ ব্যবসায়ীর গলাকাটা লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। পাশাপাশি কামাল উদ্দিন (৩৬) নামের তাঁর একজন ব্যবসায়িক অংশীদার নিখোঁজ রয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, কামালকেও হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।
সাতকানিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খালেদ হোসেন জানান, সকাল ১০টার দিকে হাকিমের লাশ স্থানীয় হাতিয়ারকুল খালে ভাসতে দেখে লোকজন পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।
খালেদ হোসেন বলেন, হাকিম ও কামাল স্থানীয় জামায়াত নেতা এবং এলাকার সাবেক সাংসদ শাহজাহান চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত।
৫ সেপ্টেম্বর ২০১১ দৈনিক সংগ্রামের খবর
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায় দুই জামায়াতকর্মী অপহরণের পর এক জনের লাশ উদ্ধার করার ঘটনায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছে নিহতের ছোট ভাই আব্দুল জলিল। গতকাল দায়েরকৃত এ মামলায় আওয়ামী লীগের ক্যাডার বশির বাহিনীর প্রধান বশির আহমদ ও তার ভাগিনা ডাকাত নেজাইম্যাসহ ১৮জনকে আসামী করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোন আসামীকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। সাতকানিয়া উপজেলার দক্ষিণ রূপকানিয়ায় আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত শহীদ জামায়াত কর্মী আব্দুল হাকিমের জানাযা ৪ সেপ্টেম্বর ২০১১ তারিখ, সকাল সাড়ে সাতটায় চট্টগ্রাম কলেজ রোডস্থ কাজেম আলী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত জানাযায় ইমামতি করেন বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মফিজুর রহমান। জানাজাপূর্ব সমাবেশে বক্তব্য রাখেন, সাতকানিয়া-লোহাগাড়ার জাতীয় সংসদ সদস্য, চট্টগ্রাম মহানগরীর জামায়াত আমীর মাওলানা মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম। তিনি বলেন, সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ পরিবেশকে ধ্বংস করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই হত্যাকাণ্ড করা হয়েছে। তিনি বলেন, প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের কর্মীদের হত্যা করে রাজনীতি ধ্বংস করা যায় না।
জামায়াত কর্মী শহীদ আব্দুল হাকিমের ২য় নামাজে জানাযা সকাল-সাড়ে নয়টায় সাতকানিয়া হাই স্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত জানাযায় ইমামতি করেন মাওলানা আ.ন.ম. শামসুল ইসলাম এমপি। সাতকানিয়া হাইস্কুল মাঠে জানাজাপূর্ব সমাবেশে বক্তব্য রাখেন, চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের আমীর আ ন ম শামসুল ইসলাম এমপি, সাবেক সংসদ সদস্য আলহাজ শাহজাহান চৌধুরী, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আমীর অধ্যাপক জাফর সাদেক, বান্দরবান জেলা আমীর মাওলানা আব্দুস সালাম আজাদ, চট্টগ্রাম মহানগর শিবিরের সভাপতি মোহাম্মদ ইসমাইল, জামায়াত নেতা মুহাম্মদ ইসহাক, মাওলানা আবুল ফয়েজ, ডাঃ নুরুল হক, ইঞ্জিনিয়ার শামসুল আলম, ডা. আব্দুল জলিল ও কলিম উল্লাহ। সমাবেশে মাওলানা শামসুল ইসলাম এমপি বলেন, জামায়াত কর্মী হাকিমের খুনী কারা তাদের সাতকানিয়ার মানুষ ভাল করেই চিনে।

সাবেক এমপি শাহজাহান চৌধুরী বলেন, দুই জন মানুষ অপহরণের ঘটনা ঘটলেও প্রশাসন তাদের উদ্ধারের জন্য চেষ্টা করেনি। পরের দিন সকালে একজনের লাশ উদ্ধার সম্ভব হলেও কামালের লাশটি পর্যন্ত এখনো উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। তিনি খুনী বশির, তার ভাগিনা নেজাইম্যা ডাকাত ও বশির বাহিনীর সদস্যদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা ও অপর জামায়াত কর্মী কামালের লাশ উদ্ধার করার জন্য প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানান।
আব্দুল হাকিমের ৩য় নামাজে জানাযা সাতকানিয়া চরতি ইউনিয়নে মরহুমের বাড়ির পাশেই চরতি স্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। জানাযাপূর্ব সমাবেশে বক্তব্য রাখেন, সাতকানিয়া উপজেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা আবুল ফয়েজ, নায়েবে আমীর ডাক্তার মুহাম্মদ নুরুল হক, সেক্রেটারি ও চেয়ারম্যান মাওলানা মোজাফফর আহমদ, চরতি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ডাক্তার মুহাম্মদ রেজাউল করিম, ছাত্রশিবির চট্টগ্রাম মহানগরী উত্তর সভাপতি মুহাম্মদ ইসমাইল, ছাত্রশিবির চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা সভাপতি মুহাম্মদ নুরুল হক। জানাযা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। এ তিনটি জানাযায় অন্তত ৩০ হাজারেরও অধিক মানুষ অংশ নেয়।

গারাংগিয়ায় জামায়াতের প্রতিবাদ সমাবেশ
সাতকানিয়ায় আওয়ামী সন্ত্রাসী কর্তৃক ২জন জামায়াত কর্মীকে অপহরণ করে হত্যার প্রতিবাদে ও অবিলম্বে খুনীদের গ্রেফতারের দাবীতে জামায়াতে ইসলামী গারাংগিয়া শাখার উদ্যোগে এক প্রতিবাদ সমাবেশ মাওলানা ফৌজুল কবিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন, জামায়াতে ইসলামী চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার নায়েবে আমীর মোহাম্মদ ইসহাক। উক্ত প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তব্য রাখেন, ইউনিয়ন সভাপতি অধ্যাপক আবু তাহের, ইউনিয়ন সেক্রেটারি মুহাম্মদ আবুল কালাম প্রমুখ।

এদিকে সাতকানিয়া হাইস্কুল মাঠে নামাজে জানাযা শেষে হাজার হাজার লোকের মিছিল সহকারে লাশ নিয়ে যাওয়া হয় চরতির তুলাতলিস্থ প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে। সেখানে আগে থেকেই জড়ো হওয়া জামায়াত শিবির নেতা কর্মী ও সাধারণ মানুষ লাশবাহী মিছিল দেখেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন এবং মিছিলে শোকাহতরা খুনী বশির ও তার সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারের দাবি জানান।
জানাযা শেষে শহীদ আবদুল হাকিমকে পারিবারিক কবরে সমাহিত করা হয়।

এক নজরে শহীদ আবদুল হাকিম
নাম: মোঃ আবদুল হাকিম
পিতার নাম: মৃত আব্দুল খালেক
মাতার নাম: মৃত হাজেরা খাতুন
ঠিকানা: গ্রাম- তুলাতলী (চরতি), ডাকঘর- তুলাতলী উপজেলা- সাতকানিয়া, জেলা- চট্টগ্রাম
শাহাদাতের তারিখ ও স্থান: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১১ হাতিয়া দক্ষিণ রূপকানিয়া গাছের বাগান
যে ঘটনায় শহীদ: অতর্কিতে হামলার পর জবাই করে হত্যা
কাদের দ্বারা আক্রান্ত: আওয়ামী লীগ
পারিবারিক অবস্থা: অস্বচ্ছল
ভাই বোন: ছয় ভাই ও এক বোনের মধ্যে আবদুল হাকিম চতুর্থ
শিক্ষাগত যোগ্যতা: সাতকানিয়া কলেজ থেকে ডিগ্রী পাশ
জন্ম তারিখ: ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৪
সাংগঠনিক মান: জামায়াত কর্মী
সংগঠনের আসার ইতিহাস: গারাংগিয়া কামিল মাদরাসায় অধ্যায়নকালে ছাত্র সংগঠনের দাওয়াত পান এবং শাহাদাতের পূর্ব পর্যন্ত সংগঠনে সক্রিয় ছিলেন।

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍