শহীদ এনামুল হক লালু
আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার একটি ধর্মভীরু পরিবারে জন্ম নেওয়া শহীদ এনামুল হক লালু ছিলেন মেধাবী আলিম পরীক্ষার্থী ও বড়হাতিয়া শিবির শাখার তরুণ সভাপতি। নীরব স্বভাব, ভদ্র আচরণ আর সংগীতপ্রিয় মন তাকে সহপাঠী ও শিক্ষকদের কাছে এক আলোকিত চরিত্রে পরিণত করেছিল। অন্যায়ের সামনে আপোষহীন এই কিশোর আন্দোলনের দিনে বলতেন “জন্মের সিরিয়াল আছে, মৃত্যুর নেই” আর সেই বিশ্বাসেই দাঁড়িয়েছিলেন নির্যাতিত মানুষের পাশে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি প্রহসনের নির্বাচন প্রতিরোধে গিয়ে পুলিশের গুলি ও সন্ত্রাসীদের হামলায় রক্তাক্ত ভূমিতে তিনি শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করেন। তাঁর মৃত্যু লোহাগাড়ার জনপদে শোকের ঢেউ তোলে, আর রেখে যায় আদর্শে অটল এক তরুণ সংগ্রামীর অনন্ত স্মৃতি।
🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ
শহীদ এনামুল হক লালু
চট্টগ্রাম
২০
শহীদের পরিচিতি
চট্টগ্রামের লোহাগাড়া থানার অন্তর্গত বড়হাতিয়া ইউনিয়নের হাদুরপাড়ার এক ইসলামী পরিবারে ১২ অক্টোবর ১৯৯৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন শহীদ এনামুল হক লালু। চুয়ান্ন বছর বয়সী পিতা কামাল উদ্দীন কাপড়ের ব্যবসা করেন। মাতা হাবীবা বেগম গৃহিণী। এনামুল হকের মা-বাবা বড় আশা নিয়ে তাকে মাদরাসায় পড়ার ব্যবস্থা করেন। বড়হাতিয়া এশাতুল উলুম ফাজিল মাদরাসা থেকে দাখিল পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে পাশ করেন এবং সর্বশেষ ২০১৪ সালে আলিম পরীক্ষার্থী ছিলেন। কিন্তু দুনিয়ার পরীক্ষায় অবতীর্ণ হবার আগেই তিনি শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করে পাড়ি জমান আখিরতের পথে।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি বাকশালের নবরূপ প্রহসনের নির্বাচনী ভোট জালিয়াতি প্রতিরোধ করতে গেলে প্রথমে পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে লুটিয়ে পড়েন। পরে এজিদের উত্তরসূরী আওয়ামী নরপিশাচরা আক্রমণে এগিয়ে আসে। রক্তাক্ত এনামুলের শরীরে বর্বরোচিত কায়দায় পুলিশ বিজিবির সামনে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা লাঠি, হকিস্টিক দিয়ে সারা শরীরে এলোপাতাড়ি আঘাত করে স্পটেই মৃত্যু নিশ্চিত করে। আওয়ামী ক্যাডার খোকন, নেজাম, শামসু ও রুনা বড়ুয়ার নেতৃত্বে শহীদ এনামের রক্তাক্ত দেহের উপর ঝাপিয়ে পড়ে একদল মানুষরূপী নরপিশাচ। বিকেল পৌনে চারটায় উন্মুক্ত আকাশের নিচের বিস্তৃত জমিনের উপর শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করেন শহীদ এনামুল হক লালু।
শাহাদাতের পূর্বের বিভিন্ন ঘটনা
আন্দোলন সংগ্রামের কঠিন পরিস্থিতিতে মা-বাবা তাকে একটু সতর্কভাবে চলতে বললে, সে অভয় দিয়ে সাহসী কন্ঠে বলতো- "নিরপরাধ মজলুম আলেমে দীনদের মুক্তি আন্দোলনে আমরা যুবকরা শরিক না হলে আল্লাহর দরবারে আমাদেরকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে, জেনে রাখবেন, জন্মের সিরিয়াল আছে কিন্তু মৃত্যুর কোন সিরিয়াল নেই।"
ঘটনার সামগ্রিক বিবরণ:
৫ জানুয়ারি ২০১৪, বাকশালের নবরূপ প্রহসনের নির্বাচন। সাতকানিয়া লোহাগাড়ার সাধারণ জনগণ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে কথিত নির্বাচনকে। বড়হাতিয়া ইউনিয়নের ভবানীপুর স্কুল কেন্দ্রে নির্বাচনী দায়িত্বরত শিক্ষকদের উপর বিকেল ৩টার দিকে সশস্ত্র আক্রমণে এগিয়ে আসে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা। শিক্ষকদের নিরাপত্তায় এগিয়ে যায় স্থানীয় জনগণসহ শিবির কর্মীরা। আওয়ামী সন্ত্রাসীদের প্রত্যক্ষ মদদে পুলিশ, বিজিবি হঠাৎ মুহুর্মুহু গুলি বর্ষণ করে শান্তিপূর্ণ অবস্থানরত নিরীহ শিবির কর্মীদের উপর। অসংখ্য গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যায় এনামুল হক লালু, তার চাচাত ভাই বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সদস্য প্রার্থী গিয়াস উদ্দীন, ছাত্রশিবিরের কর্মী ইমরানের পবিত্র দেহ। সাথে সাথেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এনামুল। বাঁচার জন্য সর্বশেষ আকুতি জানাতে থাকে। এ বার এজিদের উত্তরসূরী আওয়ামী নরপিশাচরা আক্রমণে এগিয়ে আসে। রক্তাক্ত এনামুলের শরীরে বর্বরোচিত কায়দায় পুলিশ বিজিবির সামনে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা লাঠি, হকিস্টিক দিয়ে সারা শরীরে এলোপাতাড়ি আঘাত করে স্পটেই মৃত্যু নিশ্চিত করে। আওয়ামী ক্যাডার খোকন, নেজাম, শামসু ও রুনা বড়ুয়ার নেতৃত্বে শহীদ এনামের রক্তাক্ত দেহের উপর ঝাপিয়ে পড়ে একদল মানুষরূপী নরপিশাচ। বিকেল পৌনে চারটায় উন্মুক্ত আকাশের নিচের বিস্তৃত জমিনের উপর শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করেন শহীদ এনামুল হক লালু।
প্রেরণার মিনার স্মারক উন্মোচন
শাহাদাতের খবর মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে পুরো জনপদে। শোকের ছায়া নামে পুরো জেলায়, কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে শহীদের সাথীরা। পিতামাতা ও ভাইবোনদের আহাজারিতে আকাশ বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। চুনতি পুলিশ ফাঁড়ি শহীদের লাশ উদ্ধার করে মর্গে পাঠিয়ে পোস্টমর্টেম করে। ৬ জানুয়ারি ২০১৪ বাদ আসর হাদুরপাড়া মসজিদের পার্শ্ববর্তী মাঠে জানাযার স্থান ঘোষণা করা হয়। বাদ জোহর থেকে হাজার হাজার শোকাহত জনতা শহীদের জানাযায় শরীক হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হয়। হরতালের মাঝেও বিশাল জনতার উপস্থিতি। চোখে পড়ার মতো। জানাযায় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের তৎকালীন চট্টগ্রাম মহানগরী দক্ষিণের সভাপতি ছাত্রনেতা এম, এইচ, সোহেল, জেলা সভাপতি মুহাম্মদ তারেক হোছাইন ও জেলা নেতৃবৃন্দসহ হাজার হাজার শোকাহত জনতা। বড়হাতিয়ার ইতিহাসে সম্ভবত এটিই ছিল সর্ববৃহৎ জানাযা।
শহীদের আপন জনদের কথা
শহীদ এনামুল হক লালুর পিতা জনাব মুহাম্মদ কামাল উদ্দীন বলেন- লালু পড়ালেখা করে যোগ্য মানুষ হবে, আল্লাহর গোলাম হবে, এটাই আমার প্রত্যাশা ছিল। তারা আমার সেই আশা পূরণ হতে দেয়নি। কিন্তু রাব্বুল আলামিনের প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার দীনের জন্য তাকে কবুল করেছেন, তাই আমি এবং আমার পরিবার খুবই সন্তুষ্ট। লালু এখন শুধু আমার নয়, নয় শুধু বন্ধু বান্ধব ও শিক্ষকদের, সে এখন অনেক মানুষের প্রিয়।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের তৎকালীন জেলা সেক্রেটারি মুহাম্মদ আসাদ উল্লাহ আদিল বলেন- আজ বার বার মনে পড়ে যখন ২০১৩ সালে ঈদুল ফিতর উপলক্ষে শহীদ পরিবারের জন্য কাপড় ক্রয় করেছিলাম শহীদ এনামের বাবার দোকান থেকে, সেদিন এনামের ব্যাপারে অনেক কথাবার্তা হয় তার বাবার সাথে, পরামর্শ চান ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে। ২০১৪ সালে এসে সেই মানুষটি আজ শহীদের একজন গর্বিত পিতা। দায়িত্বশীলের নির্দেশ পালনে আপোষহীন শহীদ এনাম সামনে কাতারে থেকে শাহাদাত বরণ করেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ আল্লামা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী হুজুরের রায়ের দিন এবং রায় পরবর্তী সকল আন্দোলন সংগ্রাম ও মিছিলে সে সামনের কাতারে থাকতো। তার নেতৃত্বেই ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ অসংখ্য জনশক্তি বটতলি মোটর স্টেশনে উপস্থিত হয়।"
শাহাদাতের আগের দিন বাদ মাগরিব পড়ালেখা করার ফাঁকে সে তার ছোট বোনকে জিজ্ঞেস করে- আচ্ছা বলতো, কবরে মুনকার নাকির কী প্রশ্ন করবেন? তখন ছোটবোন বললো- মান রাব্বুকা, মান নাবিয়্যুকা, ওয়ামা দীনুকা- এই প্রশ্নগুলো করবে। এরপর সে এই প্রশ্নগুলো ও তার জবাব বারবার উচ্চারণ করছিল।
শাহাদাতের দিন জোহরের নামাজের পর তার চাচাতো ভাই গিয়াসুদ্দীনকে মসজিদের পার্শ্ববর্তী কবরস্থানের দিকে ইশারা করে বলল- ভাই আমাদের সবাইকে একদিন এ কবরে চলে যেতে হবে।
বাংলাদেশ ইসলামি ছাত্র শিবিরের তৎকালীন বড়হাতিয়া সাথী শাখার সভাপতি মুহাম্মদ কামাল উদ্দীন বলেন-শহীদ এনামুল হক লালু একজন সংগীত প্রিয় ও সংস্কৃতিমনা মানুষ ছিলেন। তিনি সংগীত লিখতেন এবং নিজে কণ্ঠ দিয়ে গাইতেন। তিনি সময় নিম্মোক্ত সংগীতটি পরিবেশন করতেন- মুক্তি চাই মুক্তি চাই মুক্তি চাই, আল্লামা সাঈদীর মুক্তি চাই।" চান্দির পাড়া এক সমাবেশে এই সংগীতটি পরিবেশন করলে উপস্থিত সকলে তাঁর সাথে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে।
শহীদের শিক্ষক ও বড়হাতিয়া হযরত আয়েশা ছিদ্দিকা (রা.) মহিলা মাদরাসার সহ-সুপার জনাব মাওলানা আব্দুল হাকিম বলেন- এনামুল ছিলো উজ্জ্বল, সুন্দর চেহারার অধিকারী, সুমিষ্ট ভাষী, বিনয়ী ব্যবহারে অমায়িক ও চরিত্রবান ছাত্র। সহপাঠিদের সাথে সুন্দর সম্পর্ক, শিক্ষকদের আনুগত্যশীল, পড়ালেখায় মনোযোগী, সংস্কৃতিমনা ও ভদ্র ছাত্র হিসেবে আমি তাকে দেখেছি। ঝগড়া-বিবাদ সে পছন্দ করতো না বটে অন্যায়ের প্রতিবাদে সে ছিলো আপোষহীন।
শহীদের আপন চাচাতো ভাই বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের বড়হাতিয়া সাথী শাখার অর্থ সম্পাদক জনাব মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দীন বলেন- প্রিয় ভাই লালু আগে থেকে শাহাদাতের জন্য প্রস্তুত ছিল, কারণ তাকে যখন কর্মী করলাম তখন সে আমাকে দুষ্টুমী করে বলতো- গিয়াস ভাই আমাকে প্রশিক্ষণমূলক প্রোগ্রামের চেয়ে প্রতিবাদী কর্মসূচীতে বেশি বলবেন, বাতিলের বিরুদ্ধে যেন খালিদ বিন ওয়ালিদের মতো ভূমিকা রেখে চূড়ান্ত পর্যায়ে সফলতা অর্জন করতে পারি।"
শহীদের সহপাঠী মুহাম্মদ জমির উদ্দীন বলেন- ২০১১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি সোমবার শহীদ আব্দুর রহিম ভাইয়ের কবর জিয়ারত করতে যাই আমরা। সাথে আমাদের জেলা সেক্রেটারি আদিল ভাইও ছিলেন।
জিয়ারত শেষে শহীদ আব্দুর রহিম ভাইয়ের পরিবারের সাথে দেখা করেন দায়িত্বশীলরা। সেদিন বাড়ি ফেরার পথে লালু ভাইয়ের সাথে অনেক কথা হয়। যা আমার হৃদয়ে এখনো গেঁথে আছে। লালু ভাই আমাকে বললেন- "আচ্ছা আপনারা সবাই শহীদ আব্দুর রহিম ভাইয়ের মৃত্যুর এতোদিন পরেও ওনার পরিবারের খবর। নিচ্ছেন। তাছাড়া তিনিতো বায়তুশ শরফের পীর শাহ সুফী আব্দুল জব্বার (র.) এর ছেলে। কিন্তু আমি তো একজন সামান্য গরীব ঘরের ছেলে, আমি যদি শহীদ হই তাহলে আপনারা কি আমার খবর নিবেন?" শহীদ লালু ভাই তার প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এবং প্রতিটি মুহূর্তে শহীদি মৃত্যু আকাঙ্খা করতেন আর বলতেন, বড়হাতিয়ার জমীনে যদি আল্লাহ আব্দুর রহিম ভাইয়ের পর কোন শহীদ কবুল করে থাকেন তাহলে সেই সৌভাগ্য যাতে আমার হয়।
শহীদী পরিবার
শহীদ এনুমুল হক ছিলেন পরিবারের ৪ ভাই ও ১ বোনের মধ্যে দ্বিতীয়। বড়হাতিয়া এশায়াতুল উলূম ফাযিল মাদরাসার আলিম পরীক্ষার্থী এবং হাদুর পাড়া আবাসিক শাখার বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি ছিলেন তিনি। বড় ভাই অল্প পড়ালেখা করে বিদেশে পাড়ি জমান। শহীদ এনামুলকে ঘিরেই পরিবারের অনেক স্বপ্ন, অনেক আকাঙ্খা ছিল।
পিতার ইচ্ছা ছিল ছেলে শিক্ষক হয়ে মানুষ গড়ার মহান পেশায় ব্রতী হবেন। কিন্তু এনামুল হক লালুর স্বপ্ন ছিল সেনাবাহিনীর অফিসার হওয়া। সে বাবাকে বুঝাতো- সেনাবাহিনীর অফিসার হতে পারলে ইসলাম, ইসলামী আন্দোলন ও দেশের অনেক খেদমত করা যাবে। পিতার ইচ্ছা ছিল শহীদ এনামুল তার জানাযার নামাজের ইমামতি করবেন। কিন্তু রক্তাক্ত ছেলের কফিন পিতাকেই বহন করতে হলো।
এক নজরে শহীদ এনামুল হক লালু
নাম: মুহাম্মদ এনামুল হক লালু
পিতার নাম: মুহাম্মদ কামাল উদ্দীন
পিতার পেশা: কাপড়ের ব্যাবসা
মাতার নাম: হাবিবা বেগম
মাতার পেশা: গৃহিণী
স্থায়ী ঠিকানা: হাদুর পাড়া, বড়হাতিয়া, লোহাগাড়া, চট্টগ্রাম
জন্ম তারিখ: ১২ অক্টোবর ১৯৯৭
সর্বশেষ পড়ালেখা: আলিম পরীক্ষার্থী
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: বড়হাতিয়া এশায়াতুল উলুম ফাযিল মাদরাসা
শাহাদাতের তারিখ ও স্থান: ০৫ জানুয়ারি ২০১৪, ভবানিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
শাহাদাতের ঘটনা: আওয়ামী সরকারের প্রহসনের নির্বাচনে গণহারে জালভোট দিচ্ছে জেনে সাধারণ জনতাসহ প্রতিহত করতে গিয়ে আওয়ামী সন্ত্রাসী ও পুলিশের গুলিতে শাহাদাত বরণ করেন।
ভাই-বোন: ৪ ভাই ১ বোনের মধ্যে ২য়
সাংগঠনিক মান: কর্মী
দায়িত্ব: উপশাখা সভাপতি
চট্টগ্রাম
২০
শহীদের পরিচিতি
চট্টগ্রামের লোহাগাড়া থানার অন্তর্গত বড়হাতিয়া ইউনিয়নের হাদুরপাড়ার এক ইসলামী পরিবারে ১২ অক্টোবর ১৯৯৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন শহীদ এনামুল হক লালু। চুয়ান্ন বছর বয়সী পিতা কামাল উদ্দীন কাপড়ের ব্যবসা করেন। মাতা হাবীবা বেগম গৃহিণী। এনামুল হকের মা-বাবা বড় আশা নিয়ে তাকে মাদরাসায় পড়ার ব্যবস্থা করেন। বড়হাতিয়া এশাতুল উলুম ফাজিল মাদরাসা থেকে দাখিল পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে পাশ করেন এবং সর্বশেষ ২০১৪ সালে আলিম পরীক্ষার্থী ছিলেন। কিন্তু দুনিয়ার পরীক্ষায় অবতীর্ণ হবার আগেই তিনি শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করে পাড়ি জমান আখিরতের পথে।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি বাকশালের নবরূপ প্রহসনের নির্বাচনী ভোট জালিয়াতি প্রতিরোধ করতে গেলে প্রথমে পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে লুটিয়ে পড়েন। পরে এজিদের উত্তরসূরী আওয়ামী নরপিশাচরা আক্রমণে এগিয়ে আসে। রক্তাক্ত এনামুলের শরীরে বর্বরোচিত কায়দায় পুলিশ বিজিবির সামনে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা লাঠি, হকিস্টিক দিয়ে সারা শরীরে এলোপাতাড়ি আঘাত করে স্পটেই মৃত্যু নিশ্চিত করে। আওয়ামী ক্যাডার খোকন, নেজাম, শামসু ও রুনা বড়ুয়ার নেতৃত্বে শহীদ এনামের রক্তাক্ত দেহের উপর ঝাপিয়ে পড়ে একদল মানুষরূপী নরপিশাচ। বিকেল পৌনে চারটায় উন্মুক্ত আকাশের নিচের বিস্তৃত জমিনের উপর শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করেন শহীদ এনামুল হক লালু।
শাহাদাতের পূর্বের বিভিন্ন ঘটনা
আন্দোলন সংগ্রামের কঠিন পরিস্থিতিতে মা-বাবা তাকে একটু সতর্কভাবে চলতে বললে, সে অভয় দিয়ে সাহসী কন্ঠে বলতো- "নিরপরাধ মজলুম আলেমে দীনদের মুক্তি আন্দোলনে আমরা যুবকরা শরিক না হলে আল্লাহর দরবারে আমাদেরকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে, জেনে রাখবেন, জন্মের সিরিয়াল আছে কিন্তু মৃত্যুর কোন সিরিয়াল নেই।"
ঘটনার সামগ্রিক বিবরণ:
৫ জানুয়ারি ২০১৪, বাকশালের নবরূপ প্রহসনের নির্বাচন। সাতকানিয়া লোহাগাড়ার সাধারণ জনগণ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে কথিত নির্বাচনকে। বড়হাতিয়া ইউনিয়নের ভবানীপুর স্কুল কেন্দ্রে নির্বাচনী দায়িত্বরত শিক্ষকদের উপর বিকেল ৩টার দিকে সশস্ত্র আক্রমণে এগিয়ে আসে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা। শিক্ষকদের নিরাপত্তায় এগিয়ে যায় স্থানীয় জনগণসহ শিবির কর্মীরা। আওয়ামী সন্ত্রাসীদের প্রত্যক্ষ মদদে পুলিশ, বিজিবি হঠাৎ মুহুর্মুহু গুলি বর্ষণ করে শান্তিপূর্ণ অবস্থানরত নিরীহ শিবির কর্মীদের উপর। অসংখ্য গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যায় এনামুল হক লালু, তার চাচাত ভাই বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সদস্য প্রার্থী গিয়াস উদ্দীন, ছাত্রশিবিরের কর্মী ইমরানের পবিত্র দেহ। সাথে সাথেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এনামুল। বাঁচার জন্য সর্বশেষ আকুতি জানাতে থাকে। এ বার এজিদের উত্তরসূরী আওয়ামী নরপিশাচরা আক্রমণে এগিয়ে আসে। রক্তাক্ত এনামুলের শরীরে বর্বরোচিত কায়দায় পুলিশ বিজিবির সামনে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা লাঠি, হকিস্টিক দিয়ে সারা শরীরে এলোপাতাড়ি আঘাত করে স্পটেই মৃত্যু নিশ্চিত করে। আওয়ামী ক্যাডার খোকন, নেজাম, শামসু ও রুনা বড়ুয়ার নেতৃত্বে শহীদ এনামের রক্তাক্ত দেহের উপর ঝাপিয়ে পড়ে একদল মানুষরূপী নরপিশাচ। বিকেল পৌনে চারটায় উন্মুক্ত আকাশের নিচের বিস্তৃত জমিনের উপর শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করেন শহীদ এনামুল হক লালু।
প্রেরণার মিনার স্মারক উন্মোচন
শাহাদাতের খবর মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে পুরো জনপদে। শোকের ছায়া নামে পুরো জেলায়, কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে শহীদের সাথীরা। পিতামাতা ও ভাইবোনদের আহাজারিতে আকাশ বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। চুনতি পুলিশ ফাঁড়ি শহীদের লাশ উদ্ধার করে মর্গে পাঠিয়ে পোস্টমর্টেম করে। ৬ জানুয়ারি ২০১৪ বাদ আসর হাদুরপাড়া মসজিদের পার্শ্ববর্তী মাঠে জানাযার স্থান ঘোষণা করা হয়। বাদ জোহর থেকে হাজার হাজার শোকাহত জনতা শহীদের জানাযায় শরীক হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হয়। হরতালের মাঝেও বিশাল জনতার উপস্থিতি। চোখে পড়ার মতো। জানাযায় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের তৎকালীন চট্টগ্রাম মহানগরী দক্ষিণের সভাপতি ছাত্রনেতা এম, এইচ, সোহেল, জেলা সভাপতি মুহাম্মদ তারেক হোছাইন ও জেলা নেতৃবৃন্দসহ হাজার হাজার শোকাহত জনতা। বড়হাতিয়ার ইতিহাসে সম্ভবত এটিই ছিল সর্ববৃহৎ জানাযা।
শহীদের আপন জনদের কথা
শহীদ এনামুল হক লালুর পিতা জনাব মুহাম্মদ কামাল উদ্দীন বলেন- লালু পড়ালেখা করে যোগ্য মানুষ হবে, আল্লাহর গোলাম হবে, এটাই আমার প্রত্যাশা ছিল। তারা আমার সেই আশা পূরণ হতে দেয়নি। কিন্তু রাব্বুল আলামিনের প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার দীনের জন্য তাকে কবুল করেছেন, তাই আমি এবং আমার পরিবার খুবই সন্তুষ্ট। লালু এখন শুধু আমার নয়, নয় শুধু বন্ধু বান্ধব ও শিক্ষকদের, সে এখন অনেক মানুষের প্রিয়।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের তৎকালীন জেলা সেক্রেটারি মুহাম্মদ আসাদ উল্লাহ আদিল বলেন- আজ বার বার মনে পড়ে যখন ২০১৩ সালে ঈদুল ফিতর উপলক্ষে শহীদ পরিবারের জন্য কাপড় ক্রয় করেছিলাম শহীদ এনামের বাবার দোকান থেকে, সেদিন এনামের ব্যাপারে অনেক কথাবার্তা হয় তার বাবার সাথে, পরামর্শ চান ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে। ২০১৪ সালে এসে সেই মানুষটি আজ শহীদের একজন গর্বিত পিতা। দায়িত্বশীলের নির্দেশ পালনে আপোষহীন শহীদ এনাম সামনে কাতারে থেকে শাহাদাত বরণ করেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ আল্লামা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী হুজুরের রায়ের দিন এবং রায় পরবর্তী সকল আন্দোলন সংগ্রাম ও মিছিলে সে সামনের কাতারে থাকতো। তার নেতৃত্বেই ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ অসংখ্য জনশক্তি বটতলি মোটর স্টেশনে উপস্থিত হয়।"
শাহাদাতের আগের দিন বাদ মাগরিব পড়ালেখা করার ফাঁকে সে তার ছোট বোনকে জিজ্ঞেস করে- আচ্ছা বলতো, কবরে মুনকার নাকির কী প্রশ্ন করবেন? তখন ছোটবোন বললো- মান রাব্বুকা, মান নাবিয়্যুকা, ওয়ামা দীনুকা- এই প্রশ্নগুলো করবে। এরপর সে এই প্রশ্নগুলো ও তার জবাব বারবার উচ্চারণ করছিল।
শাহাদাতের দিন জোহরের নামাজের পর তার চাচাতো ভাই গিয়াসুদ্দীনকে মসজিদের পার্শ্ববর্তী কবরস্থানের দিকে ইশারা করে বলল- ভাই আমাদের সবাইকে একদিন এ কবরে চলে যেতে হবে।
বাংলাদেশ ইসলামি ছাত্র শিবিরের তৎকালীন বড়হাতিয়া সাথী শাখার সভাপতি মুহাম্মদ কামাল উদ্দীন বলেন-শহীদ এনামুল হক লালু একজন সংগীত প্রিয় ও সংস্কৃতিমনা মানুষ ছিলেন। তিনি সংগীত লিখতেন এবং নিজে কণ্ঠ দিয়ে গাইতেন। তিনি সময় নিম্মোক্ত সংগীতটি পরিবেশন করতেন- মুক্তি চাই মুক্তি চাই মুক্তি চাই, আল্লামা সাঈদীর মুক্তি চাই।" চান্দির পাড়া এক সমাবেশে এই সংগীতটি পরিবেশন করলে উপস্থিত সকলে তাঁর সাথে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে।
শহীদের শিক্ষক ও বড়হাতিয়া হযরত আয়েশা ছিদ্দিকা (রা.) মহিলা মাদরাসার সহ-সুপার জনাব মাওলানা আব্দুল হাকিম বলেন- এনামুল ছিলো উজ্জ্বল, সুন্দর চেহারার অধিকারী, সুমিষ্ট ভাষী, বিনয়ী ব্যবহারে অমায়িক ও চরিত্রবান ছাত্র। সহপাঠিদের সাথে সুন্দর সম্পর্ক, শিক্ষকদের আনুগত্যশীল, পড়ালেখায় মনোযোগী, সংস্কৃতিমনা ও ভদ্র ছাত্র হিসেবে আমি তাকে দেখেছি। ঝগড়া-বিবাদ সে পছন্দ করতো না বটে অন্যায়ের প্রতিবাদে সে ছিলো আপোষহীন।
শহীদের আপন চাচাতো ভাই বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের বড়হাতিয়া সাথী শাখার অর্থ সম্পাদক জনাব মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দীন বলেন- প্রিয় ভাই লালু আগে থেকে শাহাদাতের জন্য প্রস্তুত ছিল, কারণ তাকে যখন কর্মী করলাম তখন সে আমাকে দুষ্টুমী করে বলতো- গিয়াস ভাই আমাকে প্রশিক্ষণমূলক প্রোগ্রামের চেয়ে প্রতিবাদী কর্মসূচীতে বেশি বলবেন, বাতিলের বিরুদ্ধে যেন খালিদ বিন ওয়ালিদের মতো ভূমিকা রেখে চূড়ান্ত পর্যায়ে সফলতা অর্জন করতে পারি।"
শহীদের সহপাঠী মুহাম্মদ জমির উদ্দীন বলেন- ২০১১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি সোমবার শহীদ আব্দুর রহিম ভাইয়ের কবর জিয়ারত করতে যাই আমরা। সাথে আমাদের জেলা সেক্রেটারি আদিল ভাইও ছিলেন।
জিয়ারত শেষে শহীদ আব্দুর রহিম ভাইয়ের পরিবারের সাথে দেখা করেন দায়িত্বশীলরা। সেদিন বাড়ি ফেরার পথে লালু ভাইয়ের সাথে অনেক কথা হয়। যা আমার হৃদয়ে এখনো গেঁথে আছে। লালু ভাই আমাকে বললেন- "আচ্ছা আপনারা সবাই শহীদ আব্দুর রহিম ভাইয়ের মৃত্যুর এতোদিন পরেও ওনার পরিবারের খবর। নিচ্ছেন। তাছাড়া তিনিতো বায়তুশ শরফের পীর শাহ সুফী আব্দুল জব্বার (র.) এর ছেলে। কিন্তু আমি তো একজন সামান্য গরীব ঘরের ছেলে, আমি যদি শহীদ হই তাহলে আপনারা কি আমার খবর নিবেন?" শহীদ লালু ভাই তার প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এবং প্রতিটি মুহূর্তে শহীদি মৃত্যু আকাঙ্খা করতেন আর বলতেন, বড়হাতিয়ার জমীনে যদি আল্লাহ আব্দুর রহিম ভাইয়ের পর কোন শহীদ কবুল করে থাকেন তাহলে সেই সৌভাগ্য যাতে আমার হয়।
শহীদী পরিবার
শহীদ এনুমুল হক ছিলেন পরিবারের ৪ ভাই ও ১ বোনের মধ্যে দ্বিতীয়। বড়হাতিয়া এশায়াতুল উলূম ফাযিল মাদরাসার আলিম পরীক্ষার্থী এবং হাদুর পাড়া আবাসিক শাখার বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি ছিলেন তিনি। বড় ভাই অল্প পড়ালেখা করে বিদেশে পাড়ি জমান। শহীদ এনামুলকে ঘিরেই পরিবারের অনেক স্বপ্ন, অনেক আকাঙ্খা ছিল।
পিতার ইচ্ছা ছিল ছেলে শিক্ষক হয়ে মানুষ গড়ার মহান পেশায় ব্রতী হবেন। কিন্তু এনামুল হক লালুর স্বপ্ন ছিল সেনাবাহিনীর অফিসার হওয়া। সে বাবাকে বুঝাতো- সেনাবাহিনীর অফিসার হতে পারলে ইসলাম, ইসলামী আন্দোলন ও দেশের অনেক খেদমত করা যাবে। পিতার ইচ্ছা ছিল শহীদ এনামুল তার জানাযার নামাজের ইমামতি করবেন। কিন্তু রক্তাক্ত ছেলের কফিন পিতাকেই বহন করতে হলো।
এক নজরে শহীদ এনামুল হক লালু
নাম: মুহাম্মদ এনামুল হক লালু
পিতার নাম: মুহাম্মদ কামাল উদ্দীন
পিতার পেশা: কাপড়ের ব্যাবসা
মাতার নাম: হাবিবা বেগম
মাতার পেশা: গৃহিণী
স্থায়ী ঠিকানা: হাদুর পাড়া, বড়হাতিয়া, লোহাগাড়া, চট্টগ্রাম
জন্ম তারিখ: ১২ অক্টোবর ১৯৯৭
সর্বশেষ পড়ালেখা: আলিম পরীক্ষার্থী
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: বড়হাতিয়া এশায়াতুল উলুম ফাযিল মাদরাসা
শাহাদাতের তারিখ ও স্থান: ০৫ জানুয়ারি ২০১৪, ভবানিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
শাহাদাতের ঘটনা: আওয়ামী সরকারের প্রহসনের নির্বাচনে গণহারে জালভোট দিচ্ছে জেনে সাধারণ জনতাসহ প্রতিহত করতে গিয়ে আওয়ামী সন্ত্রাসী ও পুলিশের গুলিতে শাহাদাত বরণ করেন।
ভাই-বোন: ৪ ভাই ১ বোনের মধ্যে ২য়
সাংগঠনিক মান: কর্মী
দায়িত্ব: উপশাখা সভাপতি
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍