হোম / আওয়ামী দুঃশাসনে শহীদ / শহীদ মোহাম্মদ মোশারফ হোসাইন
শহীদ মোহাম্মদ মোশারফ হোসাইন

শহীদ মোহাম্মদ মোশারফ হোসাইন

আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড আলিয়া মাদ্রাসার আলিম দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মোহাম্মদ মোশারফ হোসাইন। তিনি সহজ-সরল জীবন, মিষ্টি আচরণ আর নিঃশব্দে কাজ করার মনোভাবেই ছিলেন সবার প্রিয়। দাওয়াতি কাজ ও সামাজিক দায়িত্ববোধ তাকে খুব অল্প বয়সেই সকলের কাছে পরিচিত করে তুলে।
দীন প্রতিষ্ঠার পথে অবিরাম সংগ্রামে তিনি ২০১৩ সালে ছাত্রলীগের হামলায় গুরুতর আহত হন এবং চার মাস কারাবরণ করেন, তবু থামেননি। আর সেই দৃঢ়তাকেই থামিয়ে দেয় ২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারির ভোরের নির্মমতা অপহরণ, নির্যাতন, ইটের আঘাতে থেঁতলে দেওয়া মাথা, বুকে-পিঠে গুলিবিদ্ধ দেহ। ১৯ জানুয়ারি লাশ শনাক্তের পর বাবার ইমামতিতে জানাযা সম্পন্ন হয়। মোশারফ হয়ে ওঠেন এক অমর আত্মত্যাগের প্রতীক।

🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ

শহীদ মোহাম্মদ মোশারফ হোসাইন
চট্টগ্রাম
২৪

শহীদের পরিচিতি
শহীদ মোহাম্মাদ মোশারফ হোসাইন ১৯৯২ সালের ২ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড থানধীন ১নং সৈয়দপুর ইউনিয়নের দক্ষিন কেদারখিল গ্রামের দরজি বাড়ির মৌলভী মাহমুদুল হক ও সালেহা বেগম এর পুত্র। পাঁচ ভাই এক বোনের সংসারে পিতা মৌলভী মোঃ মাহবুবুল হক দীর্ঘ দিন মসজিদে ইমামতি এবং কিছু আবাদি জমি চাষাবাদ করে সংসার চালাতেন। এবং ছেলে মেয়েদের বড় করে তুলেন, বড় দুই ছেলে অর্থের অভাবে খুব বেশি পড়ালেখা করতে পারে নাই। বাবার স্বপ্ন ছিল ছোট দুই ছেলে পড়ালেখা করে পরিবার এবং সমাজের মুখ উজ্জল করবে। ছোট ছেলে আলতাফকে মাদরাসায় ভর্তি করান, বর্তমানে আলিম ১ম বর্ষে এবং শহীদ মোঃ মোশারফ হোসাইন পন্থিছিলা ইসলামিয়া দাখিল মাদরাসা থেকে ২০০২ সালে ইবতেদায়ী, ০৭' সালে দাখিল পাশ করেন। ২০১২ সালে নিজামপুর সরাকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে করে সর্বশেষ সীতাকুণ্ড ডিগ্রী কলেজে ডিগ্রী ১ম বর্ষে অধ্যয়নরত ছিলেন। পড়ালেখার পাশাপাশি খুব ছোট থেকে তিনি দীনি কাজের মাধ্যমে এলাকার মানুষের নিকট প্রিয়পাত্র ছিলেন। সর্বদা হাসিখুশি থাকতেন সামাজের সকলস্তরের লোকদের কাছে ভাল ছেলে হিসেবে পরিচিত ছিলেন। জীবনের স্বপ্ন ছিল ইঞ্জিনিয়ার হয়ে সমাজ এবং জাতির কল্যাণে ভূমিকা রাখবেন।

যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে যান
দীর্ঘদিন ধরে শহীদ মোহাম্মদ মোশারফ হোসাইন পুলিশ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রসের কারণে এলাকা ছাড়া। সম্প্রতি বোনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েও বাঁচতে পারেনি শহীদ মো: মোশারফ হোসাইন। ২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি সকালে নিজ বাড়ি থেকে ১২ কি.মি দূরে মিঠাছড়া বোনের বাড়ীতে গিয়েছিলেন। স্থনীয় ছাত্রলীগ বোনের বাড়িতে তাঁর উপস্থিতি টের পেয়ে পুলিশ ও ব‍্যারে সহায়তায় ভোর ৪টায় অপহরণ করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়, দুইদিন ধরে অভুক্ত রেখে নির্মম নির্যাতন করে। ইট দিয়ে মাথা থেঁতলে দেয়া হয়। পরবর্তিতে মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য বুকে ও পিঠে গুলি করে, মৃত্যু নিশ্চত হওয়ার পর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের গুলগুলা বাজার রাস্তার মাথায় লাশ ফেলে যায়। ১৯ জানুয়ারি ২০১৪ সকাল ১১ টা দিকে স্থানীয়রা তার লাশ দেখে পরিবারকে খবর দেয়। কিছু সময় পরে পুলিশ এসে লাশ নিয়ে যায় এবং পোষ্টমার্টেম করে ফেরত দেয়ার পর শহীদের বাবার ইমামতিতে জানাযা শেষ করে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

শাহাদাতের পূর্বের বিভিন্ন ঘটনা
একজন সাধারণ ছাত্র শহীদ মোহাম্মদ মোশারফ হোসাইন সহজ-সরল জীবনযাপন করতেন, কম কথা বলে বেশি কাজ করা পছন্দ করতেন। ছোটদের সাথে খুব মিষ্টি আচরণ করতেন। দীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিরলস কাজ করতে গিয়ে ২০১৩ সালের ১৫ জানুয়ারি ছাত্রলীগের আক্রমণ প্রতিহত করতে গিয়ে শহীদের একটি আঙ্গুল প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। পরে আঙ্গুলটি ছিল অসাড়। ২০১৩ সালের ৪ এপ্রিল থেকে দীর্ঘ চার মাস কারানিবাসে ছিলেন।

সামগ্রীক ঘটনার বিবরণ
সীতাকুণ্ড আলিয়া মাদরাসায় আলিম (২য়) বর্ষের ছাত্র শহীদ মোশারফ হোসাইন সংগঠনের দাওয়াতী দশক উপলক্ষ্যে পরিচালিত দাওয়াতি কার্যক্রমের সময় সংগঠনের সমর্থক হন। এরপর সর্বশেষ ২০১১ সালে সাথী শপথ গ্রহণ করেন। তিনি অত্যন্ত বিনয়ী, আনুগত্যশীল, সংগঠনের কর্মসূচী বাস্তবায়নে তার সাহসী ভূমিকা ছিল। জাতীয় নেতাদের মুক্তি আন্দোলনে সীতাকুন্ডে শহীদ মোশারফ হোসাইনের অগ্রণী ভূমিকা ছিল। মূলত এ জন্যই তিনি যৌথবাহিনীর টার্গেটে পরিণত হন।
২৮শে ফ্রেব্রুয়ারি ২০১৩ প্রখ্যাত মোফাসসিরে কুরআন মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর কথিত মামলার রায় এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবীতে প্রায় ১বছর সফলভাবে সকল কর্মসূচী (হরতাল, অবরোধ) পালন করে আসছিল স্থানীয় জামায়াত। এতে সরকার দলীয় সন্ত্রাসী বাহিনী ক্ষুব্ধ হয়ে পুলিশের সহায়তায় আমীন ভাই, আবু বকর সিদ্দিক বাবু, পারভেজ ভাই ও রাসেলসহ একে একে ৫জনকে নির্মমভাবে হত্যা করে। বিশেষ করে আবু বকর সিদ্দিক বাবু শাহাদাতের পর থেকে সীতাকুণ্ডে পুলিশের পাশাপাশি র‍্যাব, বিজিবি'র অস্থায়ী ক্যাম্প বসিয়ে প্রায় প্রতিটি বাড়িতে চালানো হয় নির্যাতন। ফলে কোন পুরুষ/ দায়িত্বশীল ব্যক্তি এলাকায় থাকতে পারেনি। এমনকি ছোট শিশুরা পর্যন্ত হামলা-মামলার শিকার হয়েছে।
এ রকম পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন ধরে শহীদ মোহাম্মদ মোশারফ হোসাইন পুলিশ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রসের কারণে এলাকা ছাড়া। অনেকদিন যাবত তিনি ঘরে ঘুমাতে পারতেন না। শীতের রাতে সিম ক্ষেতে রাত কাটাতেন। পাহাড়ে ও বন-বাদাড়ে রাত কাটাতে হয়েছে দীর্ঘদিন। ২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি সকালে নিজ বাড়ি থেকে ১২ কি.মি দূরে মিঠাছড়া বোনের বাড়িতে আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে গিয়েছিলেন। স্থানীয় ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা বোনের বাড়ীতে তাঁর উপস্থিতি টের পেয়ে পুলিশ ও র‍্যাবের সহায়তায় ভোর ৪টায় অপহরণ করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। দুইদিন ধরে অভুক্ত রেখে নির্মম নির্যাতন করে এবং এক পর্যায়ে ইট দিয়ে মাথা থেঁতলে দেয়। পরবর্তিতে মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য বুকে ও পিঠে গুলি করে, মৃত্যু নিশ্চত হওয়ার পর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের গুলগুলা বাজার রাস্তার মাথায় লাশ ফেলে যায়। ১৯ জানুয়ারি সকাল ১১ টা দিকে স্থানীয়রা তার লাশ দেখে পরিবারকে খবর দেয়। কিছু সময় পরে পুলিশ এসে লাশ নিয়ে যায় এবং পোষ্টমার্টেম করে ফেরত দেওয়ার পর শহীদের বাবার ইমামতিতে জানাযা শেষ করে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

আপনজনদের কথা
শহীদের মা সালেহা বেগম বলেন- আমার ছেলে কোন দোষ করেনি। তার দোষ শুধু একটাই আল্লাহর জমিনে আল্লাহর আইনকে নিজ চোখে দেখার ইচ্ছা। সমস্ত গ্রামের মানুষ সাক্ষী দেবে আমার ছেলে কেমন ছিল। সে সবসময় সবাইকে একসাথে নিয়ে থাকতে ভালবাসতো, তাই অনেকবার বলা সত্ত্বেও সে গ্রাম ছেড়ে চলে যায়নি। আমার ছেলের খুনিরা দুনিয়া ও আখিরাতে কোথাও শান্তি পাবে না। আমার ছেলেকে আল্লাহ শহীদ হিসেবে কবুল করেছেন।
শহীদ মোশারফের চাচা নজরুল ইসলাম জানান, আটক করে নেয়ার পর থেকে র‍্যাব পুলিশের সাথে বার বার যোগাযোগ করা হলেও তারা কেউ মোশারফকে আটকের কথা স্বীকার করেনি। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় এনিয়ে খবর প্রকাশ হয়েছে। দুইদিন পর গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া গেছে। তার মাথায় এবং বুকে একাধিক গুলির চিহ্ন ছিল।
মোশারফ হোসাইনের পিতা মাহমুদুল হক কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, মোশারফ শুক্রবার মিঠাছড়া এলাকায় বোনের বাড়িতে বেড়াতে গেলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে গভীর রাতে তাকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর সীতাকুণ্ড, মিরসরাই থানা ও র‍্যাব অফিস গ্রেফতারের বিষয় অস্বীকার করে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী পরিচয়ে ছেলেকে তুলে নেয়ার পর নৃশংসভাবে হত্যা করেছে।
চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি রবিউল হোসেন জানায়, বাকশালী সরকার মেধাবী শিবির নেতাদেরকে হত্যা অব্যাহত রেখেছে। এভাবে হত্যা করে ইসলামী আন্দোলন স্তব্ধ করা যাবে না। নিহত মোশররফ হোসেন শিবিরের সাথী ছিলেন এবং ওয়ার্ড ছাত্রশিবিরের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।
তৎকালীন চট্টগ্রাম উত্তর জেলার শিবির সভাপতি মেছবাহুল আলম রাসেল বলেন- ২০১১ সালে আমার নিজ টার্গেটে শহিদ মোশারফ হোসাইন সাথী শপথ গ্রহণ করে। সে অত্যন্ত বিনয়ী ও আনুগত্যশীল এবং অগাধ সাহসী ছিলেন। চলমান সংগ্রামে শাহাদাতের তামান্না নিয়ে সীতাকুণ্ড রাজপথে প্রত্যেকটি কর্মসূচীতে সক্রিয় ছিলেন।

চট্টগ্রাম মহানগর উত্তর শিবিরের বিক্ষোভ সমাবেশ
ছাত্রনেতা মোশারফ হোসেনকে হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে চট্টগ্রাম মহানগরী উত্তর শাখা শিবির। মিছিল পরবর্তী সমাবেশে নেতৃবন্দ বলেন, বর্তমান অবৈধ সরকার জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছে না। তাদের জনগণের প্রতি কোন দায়বদ্ধতা নেই। এ জন্য তারা কথায় কথায় যৌথবাহিনী দিয়ে অভিযানের নামে বিরোধী দলের নিরীহ নেতাকর্মীদের গ্রেফতার ও আ ইন বহির্ভূতভাবে হত্যা করছে।

শহীদের পরিবার
বর্তমানে শহীদের পিতামাতা দুইজনই অসুস্থ। কর্মক্ষম নন। তাঁর অপরাপর ভাইয়েরা সকলেই আলাদা সংসারে থাকায় নিদারুণ কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। শহীদের পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা হলেন-
১. বিধবা বোন লায়লা বেগম: তার ১ ছেলে ও ২ মেয়ে রয়েছে
২. ইসমাইল হোসেন (ভাই)। পেশায় কৃষি কাজ। ২ ছেলে ও ১ মেয়ে নিয়ে তার সংসার।
৩. ইদরিস হোসেন (ভাই)। পেশায় কৃষি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছে ন। তাঁর ১ মেয়ে রয়েছে।
৪. জাহাঙ্গীর আলম (ভাই)। পেশায় প্রবাসী
৫. আলতাফ হোসেন (শহীদের ছোট ভাই): পেশায় রাজমিস্ত্রী। অবিবাহিত।


এক নজরে শহীদ মোহাম্মদ মোশারফ হোসাইন
নাম: মোহাম্মদ মোশারফ হোসাইন
পিতার নাম: মৌলভী মাহমুদুল হক, পেশা: অসুস্থ, কর্মক্ষম নন
মাতার নাম: সালেহা বেগম, মাতার পেশা: গৃহিণী
জন্ম তারিখ: ২ জানুয়ারী ১৯৯২

স্থায়ী ঠিকানা: চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড উপজেলার জাফরনগর ইউনিয়নের দক্ষিণ দেদারখীল গ্রাম
ভাই-বোন: ৫ ভাই, ১ বোন (পঞ্চম)
সাংগঠনিক মান: বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাথী
দায়িত্ব: সীতাকুণ্ড পৌর শাখার সভাপতি।
সর্বশেষ লেখাপড়া: আলিম (২য় বর্ষ)
সর্বশেষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: সীতাকুণ্ড আলিয়া মাদরাসা
শহীদ হওয়ার স্থান: যৌথবাহিনীর হাতে অজ্ঞাত স্থানে
আঘাতের ধরন: বুকে ও পিঠে গুলি
যাদের আঘাতে শহীদ: যৌথবাহিনী
শাহাদাতের তারিখ: ১৯ জানুয়ারী ২০১৪

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍