শহীদ মুহাম্মদ সাকিবুল ইসলাম
আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
শহীদ মুহাম্মদ সাকিবুল ইসলাম পিতৃহারা শৈশব পেরিয়ে স্বপ্ন বুকে নিয়ে বড় হওয়া এক মেধাবী তরুণ। যিনি মাদরাসা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় সবখানেই ছিলেন উজ্জ্বল, শান্ত স্বভাবের ও আদর্শবান। ২০১৫ সালের ২০ জানুয়ারি কদমতলীতে দুর্বৃত্তদের বোমা হামলায় আহত হওয়ার পর পুলিশি নির্যাতন ও প্রশাসনিক গড়িমসির শিকার হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়েছিলেন তিনি। পরিবারের আর্ত অনুরোধ উপেক্ষা করে চিকিৎসায় প্রতিনিয়ত বাধা সৃষ্টি করা হয়। অবশেষে ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতালে ২৮ জানুয়ারি রাত ৩টায় তিনি পাড়ি জমান চিরন্তন প্রতিফলের পথে। সাত বোনের শেষ আশ্রয়, শত মানুষের প্রিয়মুখ এই তরুণের বিদায় আজও তার মায়ের হৃদয়ের ক্ষতকে জাগ্রত রেখেছে “আমার ছেলের দোষ কী ছিল?” তবুও মানুষের হৃদয়ে সাকিব বেঁচে আছেন সাহস, নিষ্ঠা ও সত্যের জয়গানের প্রতীক হয়ে।
🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ
শহীদ মুহাম্মদ সাকিবুল ইসলাম
চট্টগ্রাম
২৬
শহীদের পরিচিতি
শহীদ মুহাম্মদ সাকিবুল ইসলাম ১৯৯৪ সালের ২৫ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার ভোর চারটায় চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়া থানার পুটিবিলা ইউনিয়নের গোলাম মোহাম্মদ সিকদারপাড়ার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের দুই বছরের মাথায় ১৯৯৬ সালে তার পিতা মাওলানা ওসমানুল হক ইন্তেকাল করেন। পিতৃবিয়োগের পর সাত বোনের আদরের একমাত্র ছোট ভাই ও মায়ের সর্বশেষ সন্তান সাকিবুল ইসলাম নিজ গ্রামের পুটিবিলা হামেদিয়া ফাযিল মাদরাসায় ভর্তি হয়ে ১ম শ্রেণি হতে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। তারপর দক্ষিণ চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী দীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চুনতি হাকিমিয়া আলিয়া মাদরাসায় আউয়াল সাহেব হুজুরের কোর্সে ভর্তি হয়ে কোর্স সম্পন্ন করেন। এরপর গারাঙ্গীয়া আলিয়া মাদরাসায় ভর্তি হয়ে ষষ্ঠ হতে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। তারপর আধুনগর ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসায় ৯ম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে ২০১১ সালে গোল্ডেন এ+ পেয়ে দাখিল পাশ করেন। চট্টগ্রামে বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল মাদরাসায় আলিমে ভর্তি হয়ে ২০১৩ সালে গোল্ডেন এ+ পেয়ে আলিম পাশ করেন। ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে রাজনীতি বিজ্ঞান বিষয়ে ভর্তি হন।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে যান
২০ জানুয়ারি ২০১৫ সাকিবুল ইসলাম অন্যান্য দিনের মতো তার মেঝ আপার বাসা হতে রিক্সাযোগে তার প্রিয় ক্যাম্পাস বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল মাদরাসায় আসছিল। কদমতলী মোড়ে দুর্বৃত্তদের ছোড়া বোমার আঘাতে সাকিব ভাই রিক্সা থেকে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন। এরপর পুলিশ এসে সাকিবকে গ্রেফতার করে কতোয়ালি থানায় নিয়ে গিয়ে ঠান্ডা মাথায় বন্দুক দিয়ে মাথায় আঘাত করে, পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করায়।
উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় এ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৮ জানুয়ারি ২০১৫ রাত ৩টায় শাহাদাত বরণ করেন শহীদ মুহাম্মদ সাকিবুল ইসলাম।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ:
২০ জানুয়ারি ২০১৫ সাকিবুল ইসলাম অন্যান্য দিনের মতো তার মেঝ আপার বাসা হতে রিক্সাযোগে তার প্রিয় ক্যাম্পাস বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল মাদরাসায় আসছিল। কদমতলী মোড়ে দুর্বৃত্তদের ছোড়া বোমার আঘাতে সাকিব ভাই রিক্সা থেকে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন। এরপর পুলিশ এসে সাকিবকে গ্রেফতার করে কোতয়ালি থানায় নিয়ে গিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় বন্দুক দিয়ে মাথায় আঘাত করে, পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ
হাসপাতালে ভর্তি করায়। পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় যোগাযোগ করা হলে তখন পুলিশ তাকে গ্রেফতারের কথা অস্বীকার করে। ২১ জানুয়ারি ২০১৫৪ ভোর ৪ টায় সাকিবের আম্মুর মোবাইলে ফোন আসে সাকিব আহত হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৮নং ওয়ার্ডে আছে। পরিবার ও সংগঠনের পক্ষ থেকে হাসপাতাল গিয়ে দেখতে পায় সাকিবের ব্রেইনে প্রচণ্ড আঘাত করার কারনে রক্ত বমি হচ্ছে। তাৎক্ষণিক সাকিবকে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ করে দেয়ার জন্য প্রশাসনের কাছে অনুরোধ করা হলেও প্রসাশন ওই অনুরোধে কোন সাড়া দেয়নি। ২৪ জানুয়ারি ২০১৫ অবস্থার আরো অবনতি হলে আবারও অনুরোধ করার পর জি.ই.সি মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসার অনুমতি দেয়া হয়। কিন্তু জি.ই.সি মেডিকেল সেন্টারে সিটি স্ক্যান করার মতো মেশিন নেই। জি.ই.সি মেডিকেল সেন্টারের আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে রাখা অবস্থায় অবস্থার আরো অবনতি হলে প্রশাসনের কাছে ঢাকায় নেয়ার অনুমতি চাওয়া হয়। অবশেষে অনেক দেন-দরবারের পরে ২৬ জানুয়ারি ২০১৫ রাতে ঢাকায় নেওয়ার অনুমতি দেয় প্রশাসন। ২৭ জানুয়ারি ২০১৫ ভোর ৫টায় ঢাকায় পৌঁছার পরও প্রশাসনের গড়িমসির কারণে সঠিক সময়ে হাসপাতালে ভর্তি করা যায়নি। এভাবে প্রতিটি পদক্ষেপে পুলিশ প্রশাসন হয়রানি করার পর ২৭ জানুয়ারি সকাল ১০টায় ঢাকার এ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। উক্ত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৮ জানুয়ারি ২০১৫ রাত ৩টায় শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করেন শহিদ মুহাম্মদ সাকিবুল ইসলাম।
প্রথম জানাযা
২৯ জানুয়ারি ২০১৫ বিকাল ৪.৩০টায় চট্টগ্রাম ঐতিহাসিক প্যারেড মাঠে শহীদ সাকিবুল ইসলামের প্রথম জানাযা অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো শহীদের মরদেহ নিয়ে প্যারেড মাঠে যেতে দেয়নি পুলিশ। প্যারেড মাঠে চারদিকে পুলিশ, বিজিবি ও র্যাব রায়টকার নিয়ে পুরো মাঠ ঘিরে রাখে। অবশেষে হাজার হাজার শোকাহত তৌহিদী জনতার উপস্থিতি নির্ধারিত সময়ে বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ মহোদয়ের ইমামতিতে শহীদের গায়েবানা জানাযা অনুষ্ঠিত হয় প্যারেড মাঠে।
দ্বিতীয় জানাযা
পরের দিন ৩০ জানুয়ারি ২০১৫ জুমাবার সকাল সাড়ে দশটায় শহীদ সাকিবুল ইসলামের বাড়ির উত্তর পাশের মাঠে প্রায় দশ হাজার শোকাহত জনতা ও স্থানীয় জনগণের উপস্থিতিতে তার একমাত্র মামা মাওলানা জাফর সাদেকের ইমামতিতে দ্বিতীয় জানাযা অনুষ্ঠিত হয়।
আপনজনদের কথা
শহিদের মা: ৭০ বছর বয়সী সালেহা বেগম তাঁর একমাত্র ছেলে সাকিবুল ইসলামের শাহাদাতের ঘটনায় অনুভূতি ব্যক্ত করেন এভাবে- আমার কোন চিন্তা নেই। যদি একটি গাছের ডাল কেটে ফেলা হয় শুধু গাছটিকে চিরতরে নিধন করার জন্যে। দেখা যায়, কর্তিত গাছটির মধ্য দিয়ে গজিয়ে উঠে আরো দশটি ডাল। ওরা আমার একটি সন্তান কেড়ে নিল, পক্ষান্তরে পেলাম শত শত সন্তান যাদের মুখে শুনি আমার ছেলের মতো সত্যের জয়গান।
আমার ছেলে বিছানায় গড়িয়ে মরেনি। জন সমক্ষে নিন্দিত মৃত্যু তার হয়নি। বরং সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য বিড়ালের একশ বছর জীবনযাপনের চেয়ে সিংহের মতো একদিন বেঁচে থাকাই ছিল তার মূল উদ্দেশ্য। আল্লাহর জমিনে তাঁর দ্বীন কায়েমের শপথ নিয়ে শহিদী জীবন বেছে নিল। আমি মা হিসেবে বলতে পারি আমার ছোলে কোনদিন মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করেনি। কোনদিন কারো ক্ষতি সাধন করেনি। বরং ক্ষতিগ্রস্থ ও বিপদগামী মানুষকে হাতে ধরে সঠিক নির্দেশনা দেয়াই ছিল তার চিন্তাধারা। আমি তো সে শহীদের মা। যে শহীদ কিয়ামতের ময়দানে রক্ত মাখা জামা পরে আমাকে মা বলে জড়িয়ে ধরবে। ইনশাআল্লাহ।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় প্রকাশনা ও পাঠাগার সম্পাদক জনাব মুহাম্মদ ইসমাঈল বালেন- শহীদ মুহাম্মদ সাকিবুল ইসলাম সবার প্রিয় মুখ, একজন উদীয়মান তরুণ, জীবনে তার অনেক আশা-আকাঙ্খা ছিল। কিন্তু সব আশা-আকাঙ্খা পায়ের নিচে দিয়ে আল্লাহর দীনের জন্য শাহাদাত বরণ করেন। শহীদ মুহাম্মদ সাকিবুল ইসলাম সদা সর্বদা শাহাদাতের তামান্না পোষণ করতেন।
মুহাম্মদ ইসমাঈল আরো বলেন- ছাত্র হিসেবে খুবই মেধাবী ছিলেন, সাত বোন এক ভাইয়ের মধ্যে শহীদ মুহাম্মদ সাকিবুল ইসলাম ছিলেন সবার ছোট। তাঁর শিক্ষকদের ভাষ্যমতে শহীদ মুহাম্মদ সাকিবুল ইসলাম ছিলেন ভাল ছাত্র, মেধাবী, চৌকস, চরিত্রবান অমায়িক ও আদর্শবান তরুণ। তার সহপাঠিদের সাথে ছিলেন অত্যন্ত হাসিমুখে সদা হাস্যোজ্জ্বল চেহারা।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের চট্টগ্রাম জেলা দক্ষিণের সাবেক বায়তুল মাল সম্পাদক জনাব মুহাম্মদ জালাল উদ্দিন বলেন- শহীদ সাকিবের রেখে যাওয়া স্মৃতি আমাদের ইসলামী আন্দোলনের কাজের ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা যোগায়, সাহস বাড়িয়ে দেয় এবং নতুনভাবে কাজ করতে উজ্জিবীত করে। পাহাড়ের অজপাড়া গাঁয়ে, যে গোলাপ ফুল ফুটে স্মৃতিময় সূরভী ছড়াতে পারে সেটা শহীদ সাকিব ভাইয়ের শাহাদাতের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হল।
শহীদ সাকিবুল ইসলাম স্মৃতি সংসদের সভাপতি মুহাম্মদ হামি উদ্দীন বলেন- সাত বোনের সবার ছোট স্নেহের ভাই সে। মা ও বোনদের স্নেহ পরশে বেড়ে উঠা ছেলেটির পরিবার ছিল সম্ভ্রান্ত। সে ছিল খুবই চঞ্চল ও দুষ্ট প্রকৃতির। সে এলাকার তার সমবয়সী ও ছোটদের নিয়ে খেলাধূলা, ঘুরাঘুরিতে মেতে থাকতো। এলাকার যেখানে মেলা চলতো সেখানে তার উপস্থিতি দৃশ্যমান। ম্যাচ বা টিমের যে দলে সে থাকতো, সে দলকে বিজয়ী করে আনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করত। সে জন্যই তাকে দলে রাখার প্রতিযোগিতা চলত রীতিমত।
শহীদের বন্ধু ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের তামীরুল মিল্লাত আবাসিক থানা, ঢাকার সভাপতি জনাব মুহাম্মদ রিদওয়ানুর রহমান হেলালী বলেন- সাকিব ভাইয়ের সাথে পরিচিত হয়েছি ২০০৮ সালের ৫ জানুয়ারি ২০১৫ সকাল ১০টায়। তখন আমি অষ্টম শ্রেণির ছাত্র আধুনগর মাদরাসায় তিনি নতুন ভর্তি হয়েছেন। তার সাথে পরিচিত হওয়ার পর দেখলাম তিনি এমন একজন ব্যক্তি, যিনি সকল ছাত্র, শিক্ষক ও সাধারণ লোকের সাথে সহজে মিশতে পারেন। তিনি ছিলেন বুদ্ধিমান, কর্মঠ, সহজ-সরল ও দুষ্ট এমনকি অন্যতম মেধাবী। এক কথায় সবাইকে আপন করে নিতে পারে এটাই তার সবচেয়ে বড় গুণ। যে কেউ তার ভালোবাসার সাগরে হারিয়ে যেত খুব সহজে।
জনাব হেলালী আরো বলেন- সাকিব ভাই ছিল আমার একজন আপন বন্ধু। আমি ঢাকায় চলে আসার পর তার সাথে সপ্তাহে ৪/৫ বার মোবাইলে কথা না বললে আমাদের একে অপরের ভাল লাগত না। এমন কি সাকিব ভাই ঢাকা যে কোন কাজে আসলে (বেশি সময় আন্দোলনের কাজেই আসতেন) তখন আমার বাসা ছাড়া অন্য কোথাও থাকতেন না। সে আমাকে বলতো, ভাই আমার জন্য দোয়া করবেন, আমি যেন আল্লাহর দীনের জন্য শহীদ হতে পারি।"
শহীদ মুহাম্মদ সাকিবুল ইসলামের বড় বোন মনছুরা বেগম বলেন- তখন চুনতি সীরাতুন নবী (সা.) মাহফিল চলাকালীন সময়। আমি মাগরিবের নামাজ পড়ে আরো কিছুক্ষণ জায়নামাজে বসা ছিলাম। এমন সময় প্রাণপ্রিয় ভাই সাকিবের ফোন এলো। আমি তাড়াতাড়ি ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো সেই মধুর কণ্ঠটি, যে কণ্ঠটি শোনার জন্য আমার মন ব্যাকুল হয়ে থাকতো। সাকিব আমাকে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলো, বড় আপু কেমন আছেন? আমি সালামের জবাব দিলাম। বললাম, আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি।
আমার কণ্ঠ শুনে সাকিব একটু বিব্রত বোধ করে বললো, আপু আপনি কি অসুস্থ? ডাক্তার দেখিয়েছেন? আমি বললাম, একটু ঠান্ডা লেগেছিল এখন ভালো বোধ করছি। তারপর সাকিব আমাকে জিজ্ঞেস করলো, আপু
পিতামাতার জন্য সবচেয়ে বেশি হকদার কারা? আমি কোন কিছু চিন্তা না করে জবাব দিলাম- সন্তানগণ। তখন সাকিব একটু মিষ্টি হেসে বলল আপু তাহলে তো আমার বেহেস্তবাসী আব্বার মাগফিরাত কামনার জন্য আমরাই বেশি হকদার। সবার আগে আমাদের দোয়া পৌঁছাবে? আমি কিছু না বলে এরপর কি বলে তা শোনার জন্য অপেক্ষায় রইলাম। তারপর সাকিব বললো- আপু আমি একটা সিদ্ধান্ত নিচ্ছি। আমি ভাবছি আব্বার মাগফিরাত কামনার জন্য আমরা ভাই বোনেরা মিলে এক খতম কোরআন পড়ব। আপু আপনার মতামত জানতে চাচ্ছি? আমি বললাম, জই সাকিব। তোমার সিদ্ধান্তই উত্তম সিদ্ধান্ত। তুমি শুধু বল, কখন থেকে কোরআন তেলাওয়াত শুরু করব? আমার এমন জবাবে সাকিব অত্যন্ত খুশি হয়ে বলল, আপু আমরা আজ থেকে শুরু করে দেব। আপনাকে কোন কোন পারা দিব? মেজ আপু আর সেজ আপুকে প্রথম চার পারা দিচ্ছি। আমি বললাম, তোমার যেখান থেকে ইচ্ছা দিতে পার। তখন সাকিব আমাকে পাঁচ থেকে আটপারা পর্যন্ত দিল। ভাই-বোন আরো কিছুক্ষন কথা বললাম। এরপর আল্লাহ হাফেজ ব লে কথা শেষ করে দিলাম। কে জানতো, এই হবে আমাদের শেষ কথা? কিভাবে জানতাম, আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে এক ভয়াবহ রাত?
শহীদের ফুফাতো ভাই হাফেজ মুহাম্মদ শাহেদুল হক কাতেবী বলেন- ২০০৬ সালের কথা, যখন চুনতি মাদরাসায় মোহাদ্দেসে আউয়াল সাহেব হুজুরের পরিচালনাধীন কোর্সে সাকিবকে ভর্তি করা হয়েছিল। হুজুর একদিন আমাকে ডেকে বলেছিলেন, তোমরা সাকিবকে দেখে রাখিও আমার বিশ্বাস, তোমাদের যত্নে সে একদিন অনেক বড় আলেম হবে। তুখোড় মেধাসম্পন্ন সাকিব একদিন সবার মুখ উজ্জ্বল করবে। সেদিন থেকে সাকিবের প্রতি আমার দুর্বলতা বাড়তে থাকে।"
শহীদের পরিবার
শহীদ সাকিবুল ইসলামের মাতা তার একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে স্বাভাবিক হতে পারেননি। ভুলতে পারেননি। তার এ অস্বাভাবিক মৃত্যুকে। তার মায়ের একটাই প্রশ্ন- কী দোষ ছিল আমার সন্তানের?
বড় বোনদের মধ্যে হাহাকার- কাকে তারা ভাই বলে ডাকবে কাকে আদর করে ছোট ভাইয়ের আবদারগুলো পূরণ করবে।
যে মা তার একমাত্র পুত্র সন্তানকে হারিয়েছে তাকে সান্তনা দেয়ার ভাষা আমাদের নেই।
এক নজরে শহীদ মুহাম্মদ সাকিবুল ইসলাম
নাম: মুহাম্মদ সাকিবুল ইসলাম
পিতা: মরহুম মাওলানা ওসমানুল হক
মাতা: সালেহা বেগম, পেশা: গৃহিনী, বয়স: ৭০
ভাইবোন: সাতবোনের একমাত্র ভাই। সবার ছোট
জন্ম তারিখ: ২৪ জানুয়ারি ১৯৯৪ বৃহস্পতিবার ভোর ৪টা
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল মাদরাসা
সর্বশেষ পড়াশোনা: রাজনীতি বিজ্ঞান, সম্মান (১ম বর্ষ) ও ফাজিল (১ম বর্ষ)
স্থায়ী ঠিকানা: গোলাম মুহাম্মদ সিকদার পাড়া, পুটিবিলা, লোহাগাড়া, চট্টগ্রাম
সাংগঠনিক মান: সদস্যপ্রার্থী
সর্বশেষ দায়িত্ব: বায়তুশ শরফ ক্যাম্পাস ওয়ার্ড সেক্রেটারি
আহত হওয়ার তারিখ: ২০ জানুয়ারি ২০১৫
শহীদ হওয়ার স্থান ও তারিখ: ঢাকা এ্যাপোলো হাসপাতাল, ২৮ জানুয়ারি ২০১৫ রাত ৩টায়
যাদের আঘাতে শহীদ: ছাত্রলীগ ও পুলিশ
আঘাতের ধরন: ব্রেইনে রক্ত ক্ষরণ
প্রতিভা: কবিতা ও প্রবন্ধ লেখা
চট্টগ্রাম
২৬
শহীদের পরিচিতি
শহীদ মুহাম্মদ সাকিবুল ইসলাম ১৯৯৪ সালের ২৫ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার ভোর চারটায় চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়া থানার পুটিবিলা ইউনিয়নের গোলাম মোহাম্মদ সিকদারপাড়ার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের দুই বছরের মাথায় ১৯৯৬ সালে তার পিতা মাওলানা ওসমানুল হক ইন্তেকাল করেন। পিতৃবিয়োগের পর সাত বোনের আদরের একমাত্র ছোট ভাই ও মায়ের সর্বশেষ সন্তান সাকিবুল ইসলাম নিজ গ্রামের পুটিবিলা হামেদিয়া ফাযিল মাদরাসায় ভর্তি হয়ে ১ম শ্রেণি হতে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। তারপর দক্ষিণ চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী দীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চুনতি হাকিমিয়া আলিয়া মাদরাসায় আউয়াল সাহেব হুজুরের কোর্সে ভর্তি হয়ে কোর্স সম্পন্ন করেন। এরপর গারাঙ্গীয়া আলিয়া মাদরাসায় ভর্তি হয়ে ষষ্ঠ হতে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। তারপর আধুনগর ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসায় ৯ম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে ২০১১ সালে গোল্ডেন এ+ পেয়ে দাখিল পাশ করেন। চট্টগ্রামে বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল মাদরাসায় আলিমে ভর্তি হয়ে ২০১৩ সালে গোল্ডেন এ+ পেয়ে আলিম পাশ করেন। ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে রাজনীতি বিজ্ঞান বিষয়ে ভর্তি হন।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে যান
২০ জানুয়ারি ২০১৫ সাকিবুল ইসলাম অন্যান্য দিনের মতো তার মেঝ আপার বাসা হতে রিক্সাযোগে তার প্রিয় ক্যাম্পাস বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল মাদরাসায় আসছিল। কদমতলী মোড়ে দুর্বৃত্তদের ছোড়া বোমার আঘাতে সাকিব ভাই রিক্সা থেকে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন। এরপর পুলিশ এসে সাকিবকে গ্রেফতার করে কতোয়ালি থানায় নিয়ে গিয়ে ঠান্ডা মাথায় বন্দুক দিয়ে মাথায় আঘাত করে, পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করায়।
উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় এ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৮ জানুয়ারি ২০১৫ রাত ৩টায় শাহাদাত বরণ করেন শহীদ মুহাম্মদ সাকিবুল ইসলাম।
সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ:
২০ জানুয়ারি ২০১৫ সাকিবুল ইসলাম অন্যান্য দিনের মতো তার মেঝ আপার বাসা হতে রিক্সাযোগে তার প্রিয় ক্যাম্পাস বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল মাদরাসায় আসছিল। কদমতলী মোড়ে দুর্বৃত্তদের ছোড়া বোমার আঘাতে সাকিব ভাই রিক্সা থেকে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন। এরপর পুলিশ এসে সাকিবকে গ্রেফতার করে কোতয়ালি থানায় নিয়ে গিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় বন্দুক দিয়ে মাথায় আঘাত করে, পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ
হাসপাতালে ভর্তি করায়। পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় যোগাযোগ করা হলে তখন পুলিশ তাকে গ্রেফতারের কথা অস্বীকার করে। ২১ জানুয়ারি ২০১৫৪ ভোর ৪ টায় সাকিবের আম্মুর মোবাইলে ফোন আসে সাকিব আহত হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৮নং ওয়ার্ডে আছে। পরিবার ও সংগঠনের পক্ষ থেকে হাসপাতাল গিয়ে দেখতে পায় সাকিবের ব্রেইনে প্রচণ্ড আঘাত করার কারনে রক্ত বমি হচ্ছে। তাৎক্ষণিক সাকিবকে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ করে দেয়ার জন্য প্রশাসনের কাছে অনুরোধ করা হলেও প্রসাশন ওই অনুরোধে কোন সাড়া দেয়নি। ২৪ জানুয়ারি ২০১৫ অবস্থার আরো অবনতি হলে আবারও অনুরোধ করার পর জি.ই.সি মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসার অনুমতি দেয়া হয়। কিন্তু জি.ই.সি মেডিকেল সেন্টারে সিটি স্ক্যান করার মতো মেশিন নেই। জি.ই.সি মেডিকেল সেন্টারের আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে রাখা অবস্থায় অবস্থার আরো অবনতি হলে প্রশাসনের কাছে ঢাকায় নেয়ার অনুমতি চাওয়া হয়। অবশেষে অনেক দেন-দরবারের পরে ২৬ জানুয়ারি ২০১৫ রাতে ঢাকায় নেওয়ার অনুমতি দেয় প্রশাসন। ২৭ জানুয়ারি ২০১৫ ভোর ৫টায় ঢাকায় পৌঁছার পরও প্রশাসনের গড়িমসির কারণে সঠিক সময়ে হাসপাতালে ভর্তি করা যায়নি। এভাবে প্রতিটি পদক্ষেপে পুলিশ প্রশাসন হয়রানি করার পর ২৭ জানুয়ারি সকাল ১০টায় ঢাকার এ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। উক্ত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৮ জানুয়ারি ২০১৫ রাত ৩টায় শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করেন শহিদ মুহাম্মদ সাকিবুল ইসলাম।
প্রথম জানাযা
২৯ জানুয়ারি ২০১৫ বিকাল ৪.৩০টায় চট্টগ্রাম ঐতিহাসিক প্যারেড মাঠে শহীদ সাকিবুল ইসলামের প্রথম জানাযা অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো শহীদের মরদেহ নিয়ে প্যারেড মাঠে যেতে দেয়নি পুলিশ। প্যারেড মাঠে চারদিকে পুলিশ, বিজিবি ও র্যাব রায়টকার নিয়ে পুরো মাঠ ঘিরে রাখে। অবশেষে হাজার হাজার শোকাহত তৌহিদী জনতার উপস্থিতি নির্ধারিত সময়ে বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ মহোদয়ের ইমামতিতে শহীদের গায়েবানা জানাযা অনুষ্ঠিত হয় প্যারেড মাঠে।
দ্বিতীয় জানাযা
পরের দিন ৩০ জানুয়ারি ২০১৫ জুমাবার সকাল সাড়ে দশটায় শহীদ সাকিবুল ইসলামের বাড়ির উত্তর পাশের মাঠে প্রায় দশ হাজার শোকাহত জনতা ও স্থানীয় জনগণের উপস্থিতিতে তার একমাত্র মামা মাওলানা জাফর সাদেকের ইমামতিতে দ্বিতীয় জানাযা অনুষ্ঠিত হয়।
আপনজনদের কথা
শহিদের মা: ৭০ বছর বয়সী সালেহা বেগম তাঁর একমাত্র ছেলে সাকিবুল ইসলামের শাহাদাতের ঘটনায় অনুভূতি ব্যক্ত করেন এভাবে- আমার কোন চিন্তা নেই। যদি একটি গাছের ডাল কেটে ফেলা হয় শুধু গাছটিকে চিরতরে নিধন করার জন্যে। দেখা যায়, কর্তিত গাছটির মধ্য দিয়ে গজিয়ে উঠে আরো দশটি ডাল। ওরা আমার একটি সন্তান কেড়ে নিল, পক্ষান্তরে পেলাম শত শত সন্তান যাদের মুখে শুনি আমার ছেলের মতো সত্যের জয়গান।
আমার ছেলে বিছানায় গড়িয়ে মরেনি। জন সমক্ষে নিন্দিত মৃত্যু তার হয়নি। বরং সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য বিড়ালের একশ বছর জীবনযাপনের চেয়ে সিংহের মতো একদিন বেঁচে থাকাই ছিল তার মূল উদ্দেশ্য। আল্লাহর জমিনে তাঁর দ্বীন কায়েমের শপথ নিয়ে শহিদী জীবন বেছে নিল। আমি মা হিসেবে বলতে পারি আমার ছোলে কোনদিন মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করেনি। কোনদিন কারো ক্ষতি সাধন করেনি। বরং ক্ষতিগ্রস্থ ও বিপদগামী মানুষকে হাতে ধরে সঠিক নির্দেশনা দেয়াই ছিল তার চিন্তাধারা। আমি তো সে শহীদের মা। যে শহীদ কিয়ামতের ময়দানে রক্ত মাখা জামা পরে আমাকে মা বলে জড়িয়ে ধরবে। ইনশাআল্লাহ।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় প্রকাশনা ও পাঠাগার সম্পাদক জনাব মুহাম্মদ ইসমাঈল বালেন- শহীদ মুহাম্মদ সাকিবুল ইসলাম সবার প্রিয় মুখ, একজন উদীয়মান তরুণ, জীবনে তার অনেক আশা-আকাঙ্খা ছিল। কিন্তু সব আশা-আকাঙ্খা পায়ের নিচে দিয়ে আল্লাহর দীনের জন্য শাহাদাত বরণ করেন। শহীদ মুহাম্মদ সাকিবুল ইসলাম সদা সর্বদা শাহাদাতের তামান্না পোষণ করতেন।
মুহাম্মদ ইসমাঈল আরো বলেন- ছাত্র হিসেবে খুবই মেধাবী ছিলেন, সাত বোন এক ভাইয়ের মধ্যে শহীদ মুহাম্মদ সাকিবুল ইসলাম ছিলেন সবার ছোট। তাঁর শিক্ষকদের ভাষ্যমতে শহীদ মুহাম্মদ সাকিবুল ইসলাম ছিলেন ভাল ছাত্র, মেধাবী, চৌকস, চরিত্রবান অমায়িক ও আদর্শবান তরুণ। তার সহপাঠিদের সাথে ছিলেন অত্যন্ত হাসিমুখে সদা হাস্যোজ্জ্বল চেহারা।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের চট্টগ্রাম জেলা দক্ষিণের সাবেক বায়তুল মাল সম্পাদক জনাব মুহাম্মদ জালাল উদ্দিন বলেন- শহীদ সাকিবের রেখে যাওয়া স্মৃতি আমাদের ইসলামী আন্দোলনের কাজের ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা যোগায়, সাহস বাড়িয়ে দেয় এবং নতুনভাবে কাজ করতে উজ্জিবীত করে। পাহাড়ের অজপাড়া গাঁয়ে, যে গোলাপ ফুল ফুটে স্মৃতিময় সূরভী ছড়াতে পারে সেটা শহীদ সাকিব ভাইয়ের শাহাদাতের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হল।
শহীদ সাকিবুল ইসলাম স্মৃতি সংসদের সভাপতি মুহাম্মদ হামি উদ্দীন বলেন- সাত বোনের সবার ছোট স্নেহের ভাই সে। মা ও বোনদের স্নেহ পরশে বেড়ে উঠা ছেলেটির পরিবার ছিল সম্ভ্রান্ত। সে ছিল খুবই চঞ্চল ও দুষ্ট প্রকৃতির। সে এলাকার তার সমবয়সী ও ছোটদের নিয়ে খেলাধূলা, ঘুরাঘুরিতে মেতে থাকতো। এলাকার যেখানে মেলা চলতো সেখানে তার উপস্থিতি দৃশ্যমান। ম্যাচ বা টিমের যে দলে সে থাকতো, সে দলকে বিজয়ী করে আনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করত। সে জন্যই তাকে দলে রাখার প্রতিযোগিতা চলত রীতিমত।
শহীদের বন্ধু ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের তামীরুল মিল্লাত আবাসিক থানা, ঢাকার সভাপতি জনাব মুহাম্মদ রিদওয়ানুর রহমান হেলালী বলেন- সাকিব ভাইয়ের সাথে পরিচিত হয়েছি ২০০৮ সালের ৫ জানুয়ারি ২০১৫ সকাল ১০টায়। তখন আমি অষ্টম শ্রেণির ছাত্র আধুনগর মাদরাসায় তিনি নতুন ভর্তি হয়েছেন। তার সাথে পরিচিত হওয়ার পর দেখলাম তিনি এমন একজন ব্যক্তি, যিনি সকল ছাত্র, শিক্ষক ও সাধারণ লোকের সাথে সহজে মিশতে পারেন। তিনি ছিলেন বুদ্ধিমান, কর্মঠ, সহজ-সরল ও দুষ্ট এমনকি অন্যতম মেধাবী। এক কথায় সবাইকে আপন করে নিতে পারে এটাই তার সবচেয়ে বড় গুণ। যে কেউ তার ভালোবাসার সাগরে হারিয়ে যেত খুব সহজে।
জনাব হেলালী আরো বলেন- সাকিব ভাই ছিল আমার একজন আপন বন্ধু। আমি ঢাকায় চলে আসার পর তার সাথে সপ্তাহে ৪/৫ বার মোবাইলে কথা না বললে আমাদের একে অপরের ভাল লাগত না। এমন কি সাকিব ভাই ঢাকা যে কোন কাজে আসলে (বেশি সময় আন্দোলনের কাজেই আসতেন) তখন আমার বাসা ছাড়া অন্য কোথাও থাকতেন না। সে আমাকে বলতো, ভাই আমার জন্য দোয়া করবেন, আমি যেন আল্লাহর দীনের জন্য শহীদ হতে পারি।"
শহীদ মুহাম্মদ সাকিবুল ইসলামের বড় বোন মনছুরা বেগম বলেন- তখন চুনতি সীরাতুন নবী (সা.) মাহফিল চলাকালীন সময়। আমি মাগরিবের নামাজ পড়ে আরো কিছুক্ষণ জায়নামাজে বসা ছিলাম। এমন সময় প্রাণপ্রিয় ভাই সাকিবের ফোন এলো। আমি তাড়াতাড়ি ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো সেই মধুর কণ্ঠটি, যে কণ্ঠটি শোনার জন্য আমার মন ব্যাকুল হয়ে থাকতো। সাকিব আমাকে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলো, বড় আপু কেমন আছেন? আমি সালামের জবাব দিলাম। বললাম, আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি।
আমার কণ্ঠ শুনে সাকিব একটু বিব্রত বোধ করে বললো, আপু আপনি কি অসুস্থ? ডাক্তার দেখিয়েছেন? আমি বললাম, একটু ঠান্ডা লেগেছিল এখন ভালো বোধ করছি। তারপর সাকিব আমাকে জিজ্ঞেস করলো, আপু
পিতামাতার জন্য সবচেয়ে বেশি হকদার কারা? আমি কোন কিছু চিন্তা না করে জবাব দিলাম- সন্তানগণ। তখন সাকিব একটু মিষ্টি হেসে বলল আপু তাহলে তো আমার বেহেস্তবাসী আব্বার মাগফিরাত কামনার জন্য আমরাই বেশি হকদার। সবার আগে আমাদের দোয়া পৌঁছাবে? আমি কিছু না বলে এরপর কি বলে তা শোনার জন্য অপেক্ষায় রইলাম। তারপর সাকিব বললো- আপু আমি একটা সিদ্ধান্ত নিচ্ছি। আমি ভাবছি আব্বার মাগফিরাত কামনার জন্য আমরা ভাই বোনেরা মিলে এক খতম কোরআন পড়ব। আপু আপনার মতামত জানতে চাচ্ছি? আমি বললাম, জই সাকিব। তোমার সিদ্ধান্তই উত্তম সিদ্ধান্ত। তুমি শুধু বল, কখন থেকে কোরআন তেলাওয়াত শুরু করব? আমার এমন জবাবে সাকিব অত্যন্ত খুশি হয়ে বলল, আপু আমরা আজ থেকে শুরু করে দেব। আপনাকে কোন কোন পারা দিব? মেজ আপু আর সেজ আপুকে প্রথম চার পারা দিচ্ছি। আমি বললাম, তোমার যেখান থেকে ইচ্ছা দিতে পার। তখন সাকিব আমাকে পাঁচ থেকে আটপারা পর্যন্ত দিল। ভাই-বোন আরো কিছুক্ষন কথা বললাম। এরপর আল্লাহ হাফেজ ব লে কথা শেষ করে দিলাম। কে জানতো, এই হবে আমাদের শেষ কথা? কিভাবে জানতাম, আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে এক ভয়াবহ রাত?
শহীদের ফুফাতো ভাই হাফেজ মুহাম্মদ শাহেদুল হক কাতেবী বলেন- ২০০৬ সালের কথা, যখন চুনতি মাদরাসায় মোহাদ্দেসে আউয়াল সাহেব হুজুরের পরিচালনাধীন কোর্সে সাকিবকে ভর্তি করা হয়েছিল। হুজুর একদিন আমাকে ডেকে বলেছিলেন, তোমরা সাকিবকে দেখে রাখিও আমার বিশ্বাস, তোমাদের যত্নে সে একদিন অনেক বড় আলেম হবে। তুখোড় মেধাসম্পন্ন সাকিব একদিন সবার মুখ উজ্জ্বল করবে। সেদিন থেকে সাকিবের প্রতি আমার দুর্বলতা বাড়তে থাকে।"
শহীদের পরিবার
শহীদ সাকিবুল ইসলামের মাতা তার একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে স্বাভাবিক হতে পারেননি। ভুলতে পারেননি। তার এ অস্বাভাবিক মৃত্যুকে। তার মায়ের একটাই প্রশ্ন- কী দোষ ছিল আমার সন্তানের?
বড় বোনদের মধ্যে হাহাকার- কাকে তারা ভাই বলে ডাকবে কাকে আদর করে ছোট ভাইয়ের আবদারগুলো পূরণ করবে।
যে মা তার একমাত্র পুত্র সন্তানকে হারিয়েছে তাকে সান্তনা দেয়ার ভাষা আমাদের নেই।
এক নজরে শহীদ মুহাম্মদ সাকিবুল ইসলাম
নাম: মুহাম্মদ সাকিবুল ইসলাম
পিতা: মরহুম মাওলানা ওসমানুল হক
মাতা: সালেহা বেগম, পেশা: গৃহিনী, বয়স: ৭০
ভাইবোন: সাতবোনের একমাত্র ভাই। সবার ছোট
জন্ম তারিখ: ২৪ জানুয়ারি ১৯৯৪ বৃহস্পতিবার ভোর ৪টা
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল মাদরাসা
সর্বশেষ পড়াশোনা: রাজনীতি বিজ্ঞান, সম্মান (১ম বর্ষ) ও ফাজিল (১ম বর্ষ)
স্থায়ী ঠিকানা: গোলাম মুহাম্মদ সিকদার পাড়া, পুটিবিলা, লোহাগাড়া, চট্টগ্রাম
সাংগঠনিক মান: সদস্যপ্রার্থী
সর্বশেষ দায়িত্ব: বায়তুশ শরফ ক্যাম্পাস ওয়ার্ড সেক্রেটারি
আহত হওয়ার তারিখ: ২০ জানুয়ারি ২০১৫
শহীদ হওয়ার স্থান ও তারিখ: ঢাকা এ্যাপোলো হাসপাতাল, ২৮ জানুয়ারি ২০১৫ রাত ৩টায়
যাদের আঘাতে শহীদ: ছাত্রলীগ ও পুলিশ
আঘাতের ধরন: ব্রেইনে রক্ত ক্ষরণ
প্রতিভা: কবিতা ও প্রবন্ধ লেখা
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍