শহীদ মো: ইমরান খান
আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
চট্টগ্রামের তরুণ ইমরান খান পাবনার এক সাধারণ পরিবারের বড় ছেলে ছিলেন ভদ্র, মৃদুভাষী ও দায়িত্বে নিবেদিত একটি প্রাণ। টিউশনের টাকা দিয়ে বাবা-মাকে সহযোগিতা করা থেকে শুরু করে ছোট ভাইবোনদের পড়াশোনায় হাত ধরে চলা সবকিছুতেই তিনি ছিলেন পরিবারের ভরসা। ডায়েরির পাতায় তিনি স্বপ্ন লিখতেন: নতুন বছরের সকালটা যেন মসজিদের ফজর নামাজ দিয়ে শুরু হয়।
৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, অলঙ্কার মোড়ে শান্তিপূর্ণ মিছিলে হঠাৎ পুলিশের গুলিতে সব স্বপ্ন থেমে যায়; বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকা ইমরান দুই ঘণ্টা পর নিথর হয়ে ওঠেন। বাবার ভাষায়, “আমার ব্যাংক ব্যালেন্স বলে যদি কিছু থাকে, তা ছিল আমার সন্তানরা” আর সেই ভরসার প্রথম সন্তানটি সেদিন রাষ্ট্রীয় বর্বরতার বলি হয়ে শাহাদাতের গৌরবময় মর্যাদা অর্জন করেন।
তার জানাজায় হাজারো মানুষের ভিড় প্রমাণ করে একটি ভালো, সরল, ন্যায়নিষ্ঠ হৃদয়ের চলে যাওয়া পুরো সমাজকেই শূন্য করে দিয়েছিল।
৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, অলঙ্কার মোড়ে শান্তিপূর্ণ মিছিলে হঠাৎ পুলিশের গুলিতে সব স্বপ্ন থেমে যায়; বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকা ইমরান দুই ঘণ্টা পর নিথর হয়ে ওঠেন। বাবার ভাষায়, “আমার ব্যাংক ব্যালেন্স বলে যদি কিছু থাকে, তা ছিল আমার সন্তানরা” আর সেই ভরসার প্রথম সন্তানটি সেদিন রাষ্ট্রীয় বর্বরতার বলি হয়ে শাহাদাতের গৌরবময় মর্যাদা অর্জন করেন।
তার জানাজায় হাজারো মানুষের ভিড় প্রমাণ করে একটি ভালো, সরল, ন্যায়নিষ্ঠ হৃদয়ের চলে যাওয়া পুরো সমাজকেই শূন্য করে দিয়েছিল।
🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ
শহীদ মো: ইমরান খান
চট্টগ্রাম মহানগরী
১
পিতার বক্তব্য: দ্বীনের কাজে পাগল ছিল আমার ছেলে। আমার সাথে বন্ধুর মত সব কিছু শেয়ার করতো। ছোট ভাই-বোনদের পড়া-লেখা ও অন্যান্য কাজে সহযোগিতা করতো এবং ভাই-বোন সবাই বন্ধুর মতো চলতো। আমার অনেক স্বপ্ন ছিল ছেলেকে নিয়ে। আমার কোন ব্যাংক ব্যালেন্স নেই, এই সন্তানরাই আমার একমাত্র ব্যাংক ব্যালেন্স। বছরের শেষদিন সে তার ডায়েরিতে লিখলো।
"আজ ঘুমানোর আগে আমার একটাই প্রার্থনা যেন আগামী ফজরের নামাজটা আমি জামায়াতে আদায় করতে পারি, নতুন বছরের সকালটা যেন মসজিদে নামাজের মাধ্যমে শুরু হয়।"
১. শহীদের পরিচিতি
শহীদ মো: ইমরান খান পাবনা জেলার ফরিদপুর উপজেলার কেনাই গ্রামে ১৯৯৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু পরিবারের সবাই মিলে থাকতেন চট্টগ্রামে। তিনি ছিলেন পিতা মোঃ বাবুল খান ও মাতা জান্নাতুল ফেরদৌসের চার সন্তানের মধ্যে ১ম সন্তান। শহীদ ইমরান ২ ভাই ২ বোনের মধ্যে সবার বড় হওয়ায় মা-বাবার অনেক স্বপ্ন ছিল তাকে ঘিরে। ছেলে বড় ইঞ্জিনিয়ার হবে, সংসারের হাল ধরবে, ছোট ভাই-বোনদের শিক্ষিত করে গড়ে তুলবে ইত্যাদি। বাবা একটি গার্মেন্টসে কাজ করেন। ছোটবেলা থেকে তিনি অত্যন্ত ভদ্র এবং মৃদুভাষী ছিলেন। ছোট ভাই-বোনদের সাথে খুব মিলে মিশে বন্ধুর মতো চলতেন। প্রতি মাসে টিউশনি করে পিতা-মাতাকে ২/৩ হাজার টাকা দিতেন। সততা, ন্যায়-নিষ্ঠা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা ছিল তার চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে জনাব আব্দুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় দেয়ার পর তৌহিদি জনতা এই রায়কে অবৈধ বলে প্রত্যাখ্যান করে বিকালে সারাদেশে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ মিছিল করে। তারই অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম অলঙ্কার মোড়ে পুলিশ ফাঁড়ির সামনে তৌহিদি জনতা বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করে। অলঙ্কার মোড় থেকে দেয়ানহাটের রাস্তায় দিকে যেতে থাকলে শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশ অতর্কিতভাবে টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও গুলি বর্ষণ করে। তখন শহীদ ইমরান খান বুকের বাম পাশে গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় প্রায় ২ ঘন্টা যাবৎ পুলিশ পরিবেষ্টিত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে ছিলেন শহীদ ইমরান, সে অবস্থায়ই তিনি শাহাদাত বরণ করেন। পুলিশ নিজেরা চিকিৎসার ব্যবস্থাও করেনি, কাউকে ব্যবস্থা করতেও দেয়নি। এমনকি পুলিশ কাউকে কাছে যেতে দেয়নি। পরে পুলিশ তাকে টেনে হিঁচড়ে পাহাড়তলী থানায় নিয়ে যায়। ১ ঘন্টা সেখানে রেখে চট্টগ্রাম মেডিক্যালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এভাবেই পুলিশি বর্বরতায় শহীদ হন শহীদ মো: ইমরান খান। তার পাচবার জানাজা অনুষ্ঠিত হয় ১ম জানাজা। প্যারেড ময়দানে গায়েবানা জানাজা পড়ান মাওলানা শামছুল ইসলাম এম.পি, উপস্থিতি প্রায় ৪০ হাজার। ৪র্থ জানাজা পাবনার দিঘুমিয়া মাদ্রাসা মাঠে উপস্থিতি: ২৫ হাজার। গ্রামের বাড়ি কেনাই কবরস্থানে দাফন করা হয়।
৩. সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে জনাব আব্দুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় দেয়ার পর তৌহিদি জনতা এই রায়কে অবৈধ বলে প্রত্যাখ্যান করে বিকালে সারাদেশে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ মিছিল করে। তারই। অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম অলঙ্কার মোড়ে পুলিশ ফাঁড়ির সামনে তৌহিদি জনতা বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করে। শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশ অতর্কিত ভাবে টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও গুলিবর্ষণ করে। তখন শহীদ ইমরান খান বুকের বাম পাশে গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এর বিস্তারিত খবর পরের দিনের জাতীয় দৈনিকে বিস্তারিতভাবে আসে দৈনিক আমার দেশ ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ রিপোর্ট করে।
সর্বাত্মক হরতাল: চট্টগ্রামে নিহত ৩: পুলিশের বেপরোয়া গুলি, আজও হরতাল, ঢাকা-চট্টগ্রামে বিজিবি মোতায়েন। আবু তাহের ইমরান, আগ্রাবাদে শফিক ও দেওয়ান হাট মোড়ে নিহত হন মোঃ আফজাল
বাঁ থেকে-গতকাল হরতালের সময় সিলেটে শিবির কর্মীদের গুলি করছে পুলিশ। হট্টগ্রামে পুলিশের গুলিতে নিহত শবির কর্মী
চট্টগ্রামে শিবিরের মিছিলে পুলিশের নির্বিচার গুলি: নিহত ৩, আহত শতাধিক: চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, চট্টগ্রামের জামায়াত-শিবিরের বিক্ষোভ মিছিলে নির্বিচারে গুলি করেছে পুলিশ। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের গুলিতে অন্তত ৩ জন নিহত হয়েছে। এদের মধ্যে নগরীর অলঙ্কার মোড়ে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবু তাহের ইমরান, আগ্রাবাদে শফিক ও দেওয়ান হাট মোড়ে নিহত হন মো: আফজাল (২৫)। এছাড়া ৩৫ জন গুলিবিদ্ধসহ শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। নিহতের মধ্যে আবু তাহের ইমরান ও আফজাল শিবির কর্মী বলে জানা গেছে। আগ্রাবাদে নিহত শফিকের পুরো পরিচয় গতরাতে এ রিপোর্ট লেখার সময় জানা যায়নি। তবে তিনি একজন গার্মেন্ট কর্মী বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
গতকাল দুপুরে নগরীর অলঙ্কার মোড়ে পুলিশের সঙ্গে শিবিরকর্মীদের সংঘর্ষ চলাকালে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হন ইমরান। অন্যদিকে রাত সাড়ে ৭টার দিকে নগরীর আগ্রাবাদে পুলিশের গুলিতে শফিক ও দেওয়ানহাট মোড়ে পুলিশ-শিবির সংঘর্ষের সময় নিহত হন মোঃ আফজাল। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, নিহত আফজালের বাড়ি নগরীর পাহাড়তলী থানার কর্নেলহাটে।
ইমরান চট্টগ্রাম মহানগর দক্ষিণ শাখার সাথী পর্যায়ের নেতা। দুপুরে নগরীর অলঙ্কার মোড়ে পুলিশের সঙ্গে শিবিরকর্মীদের সংঘর্ষ চলাকালে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হন ইমরান। নগরজুড়ে দিনভর থেমে থেমে সংঘর্ষ চলাকালে প্রায় অর্ধশত যানবাহনে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এদিকে বিক্ষুদ্ধ শিবিরকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে আনতেই অসংখ্য গুলি ও টিয়ারশেল ছোড়া হয়েছে বলে জানান নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার বনজ কুমার মজুমদার। উচ্ছৃঙ্খল শিবিরের হামলায় ১৬ পুলিশ সদস্যও আহত হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি। এছাড়া অলঙ্কার ও মুরাদপুর এলাকা থেকে ১৫ শিবিরকর্মীকে আটক করা হয়েছে। পাঁচলাইশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার দাশ শিবিরের ৮ নেতাকর্মীকে হাতে পায়ে গুলি করে।
হরতালে সকাল থেকেই নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পিকেটিং শুরু করে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা। এ সময় পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়াও হয়। দিনভর পিকেটিংয়ে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অন্তত অর্ধশত যানবাহন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। দুপুরে জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষণার পর বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল বের করে দলীয় নেতাকর্মীরা। জামায়াতের দাবি নগরীর বিভিন্ন এলাকায় শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশ অতর্কিত হামলা চালিয়ে মুহুর্মুহু গুলি ছুড়েছে।
দুপুর ১টার দিকে অলঙ্কার এলাকায় অর্ধশতাধিক শিবিরকর্মী জড়ো হয়ে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে। মিছিলটি অলঙ্কার মোড়ের দিকে যেতে থাকলে বাদসাবে পুলিশ। এ সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে শিবিরকর্মীদের। মুহূর্তের মধ্যেই উপর্যুপরি গুলিবর্ষণ শুরু করে পুলিশ। পুলিশের অতর্কিত গুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হন শিবিরের সাথী ইমরান খান। একপর্যায়ে ইমরানের নিহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে কয়েকশ শিবিরকর্মী ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। মুরাদপুর এলাকায় পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। প্রায় আধা ঘন্টাব্যাপী এ সংঘর্ষে পুলিশ শিবিরকর্মীদের ওপর শতাধিক রাউন্ড গুলি ছোড়ে। শুধু মুরাদপুর এলাকায় ৩৫ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে মহানগর জামায়াতের পক্ষ থেকে। অনেক নেতাকর্মীকে আটকের পর শরীরে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে জামায়াত। গতকাল সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত চমেকের অপারেশন থিয়েটারে আশঙ্কাজনক অবস্থায় গুলিবিদ্ধ ৪ নেতাকর্মীর অস্ত্রোপচার চলছিল। এছাড়া উন্নাত চিকিৎসার জন্য দুজনকে ঢাকায় নেয়ার প্রস্তুতি চলছিল। কাতালগঞ্জ এলাকায় সংঘর্ষ চলাকালে কাতালশাহ মসজিদের ভেতরেও তাণ্ডব চালিয়েছে পুলিশ। জোহরের নামাজ চলাকালে মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করে মুসল্লিদের বেধড়ক পেটানো হয়েছে।
মহানগর জামায়াতের প্রচার সম্পাদক মোহাম্মদ উল্লাহ জানান, পাঁচলাইশ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ নগর পুলিশের কিছু অতি-উৎসাহী পুলিশ কর্মকর্তা বিনা উসকানিতে জামায়াতের মিছিলে নির্বিচারে গুলি করেছে। পুলিশের গুলিতে মহানগর দক্ষিণের সাথী মো: ইমরান খান নিহত হয়েছেন। এছাড়া মুরাদপুর ও বহদ্দারহাট এলাকায় অন্তত ৩৫ নেতাকর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। অহতরা বেশিরভাগ চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াত ও শিবিরের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী বলে জানান তিনি।
দৈনিক সংগ্রাম ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ তারিখে লিখে;
চট্টগ্রাম অফিস: গতকাল মঙ্গলবার চট্টগ্রামে জামায়াতে ইসলামীর হরতাল চলাকালে নগরীর বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সাথে পিকেটারদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। এসময় পুলিশের গুলিতে এক ছাত্রশিবির কর্মী নিহত এবং জামায়াত-শিবির নেতা-কর্মী, পুলিশ, সাংবাদিকসহ অর্ধশতাধিক আহত হয়েছে। নিহত ছাত্রশিবির কর্মী হচ্ছেন-মোঃ ইমরান খান (১৯), পিতা-মো। বাবুল খান, গ্রাম তেনাই, পোস্ট- ইন্ডলিয়া, উপজেলা-ফরিদপুর, জেলা পাবনা। সে চট্টগ্রাম পলিটেকনিক্যাল ইন্সটিটিউটের মেকানিক্যাল বিভাগের ২য় বর্ষের ছাত্র ও আগ্রাবাদ বহুতলা কলোনীর বাসিন্দা বলে জানা গেছে। ছাত্রশিবির নেতারা জানান, নিহত ইমরান ছাত্রশিবিরের সাথী ছিল।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, গতকাল মঙ্গলবার বেলা ১টার দিকে পাহাড়তলী অলংকার এলাকায়। হরতালের সমর্থনে ছাত্রশিবির নেতা-কর্মীরা মিছিল বের করলে পুলিশ তাতে বাধা দেয়। এসময় পুলিশ মিছিলকারীদের ওপর চড়াও হলে সংঘর্ষ বাধে। এ সময় ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া, ইট-পাটকেল বিনিময় হয়। এ সময় পুলিশ ব্যাপক লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেট ছুঁড়ে। সংঘর্ষে পুরো এলাকাজুড়ে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। ঘণ্টাব্যাপী ব্যাপক সংঘর্ষ চলাকালে এক পর্যায়ে পুলিশ গুলি ছোড়ে। এতে ছাত্রশিবির কর্মী মোঃ ইমরান খান (১৯) এর বুকে গুলি লাগলে তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান। সংঘর্ষে আহত হন জামায়াত শিবির নেতা-কর্মী, পুলিশসহ আরো ৩০ জন। এরপর বিক্ষুব্ধ পিকেটাররা একটি পিকআপভ্যানে আগুন ধরিয়ে দেন। পুলিশ এসময় ২০ জনকে আটক করে। পুলিশ পরে নিহত ছাত্রশিবির কর্মীর লাশ চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করে। বিপুল সংখ্যক র্যাব, পুলিশ ঘটনাস্থলে এলে পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ছাত্র নিহত হওয়ার এ ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে আসে।
৪. শাহাদাতের পূর্বের বিভিন্ন ঘটনা
Imran Khan
1 January Via Mobile
Happy New Year. Notun Bosor Sobar Sundor Hok, Ai Doa Roilo Sobar Jonno. Amar
Jonno Sobai Doa Korben,
তিনি বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাথী ছিলেন। ঘটনার দিন সকালে সাথী বৈঠকে অংশগ্রহণ শেষে ১১টায় বাসায় গিয়ে মায়ের সাথে দেখা করে ১২.৩০ টায় বাসা থেকে বের হয়ে অলঙ্কার মোড়ে যান। দুপুরে বাসায় যাননি। সার্থী বৈঠকে সাথী ভাইদের সাথে নাস্তা করেন। সকালে বাসা থেকে যাওয়ার সময় বাবার কাছ থেকে ১৫০ টাকা নিয়েছিলেন বাইতুলমালের জন্য। আন্দোলনে যাওয়ার জন্য পিতা নিষেধ করেছেন কিন্তু কোন জবাব দেননি। তিনি কখনো মিথ্য কথা বলতেন না।
পিতার বক্তব্য: দ্বীনের কাজে পাগল ছিল আমার ছেলে। আমার সাথে বন্ধুর মত সব কিছু শেয়ার করতো। ছোট ভাই-বোনদের পড়া-লেখা ও অন্যান্য কাজে সহযোগিতা করতো এবং ভাই-বোন সবাই বন্ধুর মতো চলতো। আমার অনেক স্বপ্ন ছিল ছেলেকে নিয়ে। আমার কোন ব্যাংক ব্যালেন্স নেই, এই সন্তানরাই আমার একমাত্র ব্যাংক ব্যালেন্স।
৫. শহীদের ব্যক্তিগত ডায়েরি থেকে...
ইমরান ছিল পৃথিবীর বাগানে সেরা ফুলগুলোর একটি। বাগানের সবচেয়ে সুন্দর ফুলটি সবাইকে আকর্ষন করে। যার সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে মানুষ তাকে পেতে চায়। কিন্তু সুবাস ছড়ানোর আগেই নির্মমভাবে তাকে হত্যা করা হলো। শহীদ ইমরান যখন নবম শ্রেণীর ছাত্র তখন থেকেই সে তার জীবনের নানা ঘটনাগুলোকে প্রাঞ্জল ভাষায় ডায়েরির পাতায় তুলে রাখতো।
১৬.০৯.২০০৮ এ তার ব্যক্তিগত ডায়েরিতে সে লিখেছে, "আমার নাম মোঃ ইমরান খান রাজিব। নাসিরাবাদ সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের আমি নবম শ্রেণীর ছাত্র। আমরা দুইভাই দুইবোন। বাবা একজন চাকুরীজীবী। মা গৃহিণী। আমার বাবার আয়ে আমাদের সংসার ভালই চলে। তবে বাবার আয় কম হলেও আমার বাবা আমাদের সবার চাহিদা পুরণ করেন। কোনো কিছু অপূর্ণ রাখেন না। আমার বিদ্যালয়ের জন্যে বাবা প্রতিমাসে অনেক টাকা খরচ করেন। তবে আমাদের বাসায় কোনো টিচার নেই। তাই আমি একটি কোচিং সেন্টারে পড়ি। সেখানে লেখাপড়া মোটামুটি ভালই চলে। এখানে টিচাররা আমাদের খুবই বিশ্বাস করেন। আমরাও উনাদের বিশ্বাসের মর্যাদা রাখার চেষ্টা করি।"
আমরা বন্ধুরা সবাই সবাইকে খুব বিশ্বাস করি। বিশেষ করে রিয়াদ ও আশিক আমাকে খুব বিশ্বাস করে, আমিও তাদেরকে খুব বিশ্বাস করি। রিয়াদ মাদ্রাসায় পড়ে তাই সে বেশির ভাগ সময় ইসলামিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। আমরা কোচিং এ একটা সংগঠন করেছি। সংগঠনটি একটা ইসলামিক সংগঠন। সংগঠনের প্রধান (সভাপতি) হচ্ছে রিয়াদ কারণ ও খুব ভাল ছাত্র যেহেতু আমিও ওদের সাথে লেখাপড়ায় তাল মিলিয়ে চলতে পারি তাই আমি হলাম সহসভাপতি। এসব নির্বাচন করেছে ছাত্ররাই। ওদের অমতে কিছুই করা যায় না। সংগঠনে সবাই সবাইকে সম্মান করে।"
তার ভায়েরিতে নিজের ব্যাপারে ইমরান লিখেছে। আসলে সত্য কথা হল "আমি প্রেম করাকে খুবই ভয় পাই"। আমি চিন্তা করি আমি যদি প্রেম করি, তবে আমার মন সবসময় প্রেমিকার দিকে থাকবে। ঘরে, পড়া-লেখায়, কোনো কাজে তখন মন বসবে না। তখন পড়ালেখার বারোটা বাজবে। এবং সবার থেকে বকা শুনতে হবে। মেয়েদের ফান্দে না পড়ার জন্যে আমি সবসময় প্রথম বেঞ্চে বসি। আমার ওপর আমার বাবার রয়েছে অগাধ বিশ্বাস। আমি তাদের বিশ্বাসকে ভাঙতে চাই না। তাই প্রেমের সাথেও জড়াতে চাই না।"
০১.০১.২০১১ ইং তারিখে সে তার ডায়েরিতে লিখলো। "আজ ঘুমানোর আগে আমার একটাই প্রার্থনা যেন আগামী ফজরের নামাজটা আমি জামায়াতে আদায় করতে পারি, নতুন বছরের সকালটা যেন মসজিদে নামাজের মাধ্যমে শুরু হয়।
শহীদের অনেক স্বপ্ন ছিল নিজের জন্যে একটি কম্পিউটার কেনা, তাই সে ২২.১০.২০১১ ইং তারিখে তার ডায়েরিতে লিখলো। "চিন্তা করছি ঈদের পর আমি এক মাসের জন্যে চাকরিতে ঢুকবো। মূলত কম্পিউটার কেনার জন্যে। নিজের একটা কম্পিউটার কেনা আমার অনেক দিনের স্বপ্ন।"
জীবনের অন্যরকম পরিবর্তন শুরু। এরই মধ্যে শান্ত ইমরান ছাত্রশিবিরের বিপ্লবী দাওয়াত পায়। তার বাসার পাশেই থাকতো উপশাখার সভাপতি রাকীবুল হাসান। স্থানীয় ভাইদের দাওয়াতে সে বিভিন্ন প্রোগ্রামে যাওয়া শুরু হলো। সংগঠনের ভাইদের সাথে মেলামেশায় আস্তে আস্তে পরিবর্তন আসতে শুরু করলো তার জীবনে।
২৬.০৮.২০১১ তারিখে সে ডায়েরিতে লিখলো। "ইদানীং আমি ছাত্রশিবিরে যোগ দিয়েছি, এখনতো আমার।
ক্লাস আরম্ভ হয়নি তাই সেখানে মাঝে মাঝে সময় দিতে হয়। আমি বর্তমানে শিবিরের কর্মী এরপর আমি শিবিরের সাথী হতে চাই, শুনেছি শিবিরের সাথীদের অনেক সম্মান থাকে।"
২০১১ সালের জুলাই মাসে ইমরান শিবিরের সাথী প্রার্থী হয়। সাথীপ্রার্থী হবার পর নিজের জীবন নিয়ে ডায়েরিতে লিখলো: "আজ থেকে চিন্তা করলাম জীবনে একটা রুটিন বানাতে হবে। জীবনে অনেকটা সময়ই নষ্ট করলাম। এবার একটা পরিকল্পিত রাস্তায় আসতে হবে। এ রাস্তায় আসতে হলে একটা পরিকল্পনা নেয়া খুবই জরুরি আর সেটা করার জন্যই আজ বসলাম।"
৬. এমন দায়িত্বশীল খুঁজে পাওয়া যাবে না
২০১২ সালের অক্টোবর মাসে সংগঠনের সাথী হিসেবে শপথ নেয়ার পর সদা শান্ত এই ছেলেটির সময় কোটে যেত আন্দোলনের মাঠে। তার দায়িত্ব ছিল আগ্রাবাদের ছোট পুল এলাকার ইসলাম মিয়ার ব্রিকফিল্ড উপশাখার সেক্রেটারি। তাকে দেখা যেত কখনো কর্মীদের বাসায়, কখনো শুভাকাঙ্ক্ষীদের সাথে নম্র আলাপচারিতায়। কখনো কথায় বা আচরণে ভুল করে ফেললে মিষ্টি করে হেসে সেই ভুল স্বীকার করতো। সদা হাস্যোজ্জ্বল ও শান্ত হওয়ায় কর্মীরাও ভিড় করতো তার চারপাশে। এক দিনের ঘটনা, মাস শেষে বায়তুলমালের টাকা দায়িত্বশীল বৈঠকে জমা দিতে হবে। অথচ শুভাকাঙ্ক্ষীদের বাসায় পাওয়া যায়নি বলে সব টাকা তোলা হয়নি। আব্বুকে জানাল সমস্যাটা। বাবার থেকে ১৫০ টাকা ধার নিয়ে দায়িত্বশীল বৈঠকে জমা দিল। দ্বীনের বিপদে। অর্থনৈতিক বকেয়া করা যাবে না, হিসাব-নিকাশেও স্বচ্ছ হতে হবে... এই ছিল তার মনোভাব।
৭. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম। শহীদ মো: ইমরান খান (০৮০)। পেশা। ছাত্র।
জন্ম তারিখ ও বয়স। ৩০ আগস্ট ১৯৯৩ ইং, ২০ বছর।
আহত হওয়ার তারিখ। ৫ই ফেব্রুয়ারি ২০১৩, বুকের বাম পাশে গুলিবিদ্ধ।
শাহাদাতের তারিখ: ০৫ ফেব্রুয়ারি '১৩ বেলা ১ টা, স্থান: অলঙ্কার মোড়।
দাফন করা হয়: গ্রামের বাড়ির কবরস্থান।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: কেনাই, ডাকঘর: বেরুলিয়া, থানা: ফরিদপুর, জেলা: পাবনা।
পিতা: মোঃ বাবুল খান, ৪৮ বছর, গার্মেন্টস শ্রমিক।
মাতা: জান্নাতুল ফেরদৌস, ৩৬ বছর, গৃহিণী।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা: গ্রামে ২/৩ শতক ভিটা বাড়ি আছে, নিজেদের কোন আবাদি জমি নেই। ভাড়া বাড়িতে থাকে। পিতার চকরি থেকে সংসার ব্যয় নির্বাহ করা হয়।
ভাই-বোনের বিবরণ: মো ইমরান খান, শহীদ। আরমান খান, ছাত্র, এইচ.এস.সি, ছাত্রশিবিরের (কর্মী)। সানজিদা খানম, নার্সারি, সার্জন ক্যাডেট স্কুল। তানজিনা খানম, নার্সারি, সার্জন ক্যাডেট স্কুল।
চট্টগ্রাম মহানগরী
১
পিতার বক্তব্য: দ্বীনের কাজে পাগল ছিল আমার ছেলে। আমার সাথে বন্ধুর মত সব কিছু শেয়ার করতো। ছোট ভাই-বোনদের পড়া-লেখা ও অন্যান্য কাজে সহযোগিতা করতো এবং ভাই-বোন সবাই বন্ধুর মতো চলতো। আমার অনেক স্বপ্ন ছিল ছেলেকে নিয়ে। আমার কোন ব্যাংক ব্যালেন্স নেই, এই সন্তানরাই আমার একমাত্র ব্যাংক ব্যালেন্স। বছরের শেষদিন সে তার ডায়েরিতে লিখলো।
"আজ ঘুমানোর আগে আমার একটাই প্রার্থনা যেন আগামী ফজরের নামাজটা আমি জামায়াতে আদায় করতে পারি, নতুন বছরের সকালটা যেন মসজিদে নামাজের মাধ্যমে শুরু হয়।"
১. শহীদের পরিচিতি
শহীদ মো: ইমরান খান পাবনা জেলার ফরিদপুর উপজেলার কেনাই গ্রামে ১৯৯৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু পরিবারের সবাই মিলে থাকতেন চট্টগ্রামে। তিনি ছিলেন পিতা মোঃ বাবুল খান ও মাতা জান্নাতুল ফেরদৌসের চার সন্তানের মধ্যে ১ম সন্তান। শহীদ ইমরান ২ ভাই ২ বোনের মধ্যে সবার বড় হওয়ায় মা-বাবার অনেক স্বপ্ন ছিল তাকে ঘিরে। ছেলে বড় ইঞ্জিনিয়ার হবে, সংসারের হাল ধরবে, ছোট ভাই-বোনদের শিক্ষিত করে গড়ে তুলবে ইত্যাদি। বাবা একটি গার্মেন্টসে কাজ করেন। ছোটবেলা থেকে তিনি অত্যন্ত ভদ্র এবং মৃদুভাষী ছিলেন। ছোট ভাই-বোনদের সাথে খুব মিলে মিশে বন্ধুর মতো চলতেন। প্রতি মাসে টিউশনি করে পিতা-মাতাকে ২/৩ হাজার টাকা দিতেন। সততা, ন্যায়-নিষ্ঠা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা ছিল তার চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে জনাব আব্দুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় দেয়ার পর তৌহিদি জনতা এই রায়কে অবৈধ বলে প্রত্যাখ্যান করে বিকালে সারাদেশে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ মিছিল করে। তারই অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম অলঙ্কার মোড়ে পুলিশ ফাঁড়ির সামনে তৌহিদি জনতা বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করে। অলঙ্কার মোড় থেকে দেয়ানহাটের রাস্তায় দিকে যেতে থাকলে শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশ অতর্কিতভাবে টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও গুলি বর্ষণ করে। তখন শহীদ ইমরান খান বুকের বাম পাশে গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় প্রায় ২ ঘন্টা যাবৎ পুলিশ পরিবেষ্টিত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে ছিলেন শহীদ ইমরান, সে অবস্থায়ই তিনি শাহাদাত বরণ করেন। পুলিশ নিজেরা চিকিৎসার ব্যবস্থাও করেনি, কাউকে ব্যবস্থা করতেও দেয়নি। এমনকি পুলিশ কাউকে কাছে যেতে দেয়নি। পরে পুলিশ তাকে টেনে হিঁচড়ে পাহাড়তলী থানায় নিয়ে যায়। ১ ঘন্টা সেখানে রেখে চট্টগ্রাম মেডিক্যালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এভাবেই পুলিশি বর্বরতায় শহীদ হন শহীদ মো: ইমরান খান। তার পাচবার জানাজা অনুষ্ঠিত হয় ১ম জানাজা। প্যারেড ময়দানে গায়েবানা জানাজা পড়ান মাওলানা শামছুল ইসলাম এম.পি, উপস্থিতি প্রায় ৪০ হাজার। ৪র্থ জানাজা পাবনার দিঘুমিয়া মাদ্রাসা মাঠে উপস্থিতি: ২৫ হাজার। গ্রামের বাড়ি কেনাই কবরস্থানে দাফন করা হয়।
৩. সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে জনাব আব্দুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় দেয়ার পর তৌহিদি জনতা এই রায়কে অবৈধ বলে প্রত্যাখ্যান করে বিকালে সারাদেশে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ মিছিল করে। তারই। অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম অলঙ্কার মোড়ে পুলিশ ফাঁড়ির সামনে তৌহিদি জনতা বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করে। শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশ অতর্কিত ভাবে টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও গুলিবর্ষণ করে। তখন শহীদ ইমরান খান বুকের বাম পাশে গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এর বিস্তারিত খবর পরের দিনের জাতীয় দৈনিকে বিস্তারিতভাবে আসে দৈনিক আমার দেশ ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ রিপোর্ট করে।
সর্বাত্মক হরতাল: চট্টগ্রামে নিহত ৩: পুলিশের বেপরোয়া গুলি, আজও হরতাল, ঢাকা-চট্টগ্রামে বিজিবি মোতায়েন। আবু তাহের ইমরান, আগ্রাবাদে শফিক ও দেওয়ান হাট মোড়ে নিহত হন মোঃ আফজাল
বাঁ থেকে-গতকাল হরতালের সময় সিলেটে শিবির কর্মীদের গুলি করছে পুলিশ। হট্টগ্রামে পুলিশের গুলিতে নিহত শবির কর্মী
চট্টগ্রামে শিবিরের মিছিলে পুলিশের নির্বিচার গুলি: নিহত ৩, আহত শতাধিক: চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, চট্টগ্রামের জামায়াত-শিবিরের বিক্ষোভ মিছিলে নির্বিচারে গুলি করেছে পুলিশ। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের গুলিতে অন্তত ৩ জন নিহত হয়েছে। এদের মধ্যে নগরীর অলঙ্কার মোড়ে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবু তাহের ইমরান, আগ্রাবাদে শফিক ও দেওয়ান হাট মোড়ে নিহত হন মো: আফজাল (২৫)। এছাড়া ৩৫ জন গুলিবিদ্ধসহ শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। নিহতের মধ্যে আবু তাহের ইমরান ও আফজাল শিবির কর্মী বলে জানা গেছে। আগ্রাবাদে নিহত শফিকের পুরো পরিচয় গতরাতে এ রিপোর্ট লেখার সময় জানা যায়নি। তবে তিনি একজন গার্মেন্ট কর্মী বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
গতকাল দুপুরে নগরীর অলঙ্কার মোড়ে পুলিশের সঙ্গে শিবিরকর্মীদের সংঘর্ষ চলাকালে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হন ইমরান। অন্যদিকে রাত সাড়ে ৭টার দিকে নগরীর আগ্রাবাদে পুলিশের গুলিতে শফিক ও দেওয়ানহাট মোড়ে পুলিশ-শিবির সংঘর্ষের সময় নিহত হন মোঃ আফজাল। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, নিহত আফজালের বাড়ি নগরীর পাহাড়তলী থানার কর্নেলহাটে।
ইমরান চট্টগ্রাম মহানগর দক্ষিণ শাখার সাথী পর্যায়ের নেতা। দুপুরে নগরীর অলঙ্কার মোড়ে পুলিশের সঙ্গে শিবিরকর্মীদের সংঘর্ষ চলাকালে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হন ইমরান। নগরজুড়ে দিনভর থেমে থেমে সংঘর্ষ চলাকালে প্রায় অর্ধশত যানবাহনে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এদিকে বিক্ষুদ্ধ শিবিরকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে আনতেই অসংখ্য গুলি ও টিয়ারশেল ছোড়া হয়েছে বলে জানান নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার বনজ কুমার মজুমদার। উচ্ছৃঙ্খল শিবিরের হামলায় ১৬ পুলিশ সদস্যও আহত হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি। এছাড়া অলঙ্কার ও মুরাদপুর এলাকা থেকে ১৫ শিবিরকর্মীকে আটক করা হয়েছে। পাঁচলাইশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার দাশ শিবিরের ৮ নেতাকর্মীকে হাতে পায়ে গুলি করে।
হরতালে সকাল থেকেই নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পিকেটিং শুরু করে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা। এ সময় পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়াও হয়। দিনভর পিকেটিংয়ে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অন্তত অর্ধশত যানবাহন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। দুপুরে জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষণার পর বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল বের করে দলীয় নেতাকর্মীরা। জামায়াতের দাবি নগরীর বিভিন্ন এলাকায় শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশ অতর্কিত হামলা চালিয়ে মুহুর্মুহু গুলি ছুড়েছে।
দুপুর ১টার দিকে অলঙ্কার এলাকায় অর্ধশতাধিক শিবিরকর্মী জড়ো হয়ে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে। মিছিলটি অলঙ্কার মোড়ের দিকে যেতে থাকলে বাদসাবে পুলিশ। এ সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে শিবিরকর্মীদের। মুহূর্তের মধ্যেই উপর্যুপরি গুলিবর্ষণ শুরু করে পুলিশ। পুলিশের অতর্কিত গুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হন শিবিরের সাথী ইমরান খান। একপর্যায়ে ইমরানের নিহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে কয়েকশ শিবিরকর্মী ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। মুরাদপুর এলাকায় পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। প্রায় আধা ঘন্টাব্যাপী এ সংঘর্ষে পুলিশ শিবিরকর্মীদের ওপর শতাধিক রাউন্ড গুলি ছোড়ে। শুধু মুরাদপুর এলাকায় ৩৫ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে মহানগর জামায়াতের পক্ষ থেকে। অনেক নেতাকর্মীকে আটকের পর শরীরে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে জামায়াত। গতকাল সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত চমেকের অপারেশন থিয়েটারে আশঙ্কাজনক অবস্থায় গুলিবিদ্ধ ৪ নেতাকর্মীর অস্ত্রোপচার চলছিল। এছাড়া উন্নাত চিকিৎসার জন্য দুজনকে ঢাকায় নেয়ার প্রস্তুতি চলছিল। কাতালগঞ্জ এলাকায় সংঘর্ষ চলাকালে কাতালশাহ মসজিদের ভেতরেও তাণ্ডব চালিয়েছে পুলিশ। জোহরের নামাজ চলাকালে মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করে মুসল্লিদের বেধড়ক পেটানো হয়েছে।
মহানগর জামায়াতের প্রচার সম্পাদক মোহাম্মদ উল্লাহ জানান, পাঁচলাইশ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ নগর পুলিশের কিছু অতি-উৎসাহী পুলিশ কর্মকর্তা বিনা উসকানিতে জামায়াতের মিছিলে নির্বিচারে গুলি করেছে। পুলিশের গুলিতে মহানগর দক্ষিণের সাথী মো: ইমরান খান নিহত হয়েছেন। এছাড়া মুরাদপুর ও বহদ্দারহাট এলাকায় অন্তত ৩৫ নেতাকর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। অহতরা বেশিরভাগ চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াত ও শিবিরের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী বলে জানান তিনি।
দৈনিক সংগ্রাম ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ তারিখে লিখে;
চট্টগ্রাম অফিস: গতকাল মঙ্গলবার চট্টগ্রামে জামায়াতে ইসলামীর হরতাল চলাকালে নগরীর বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সাথে পিকেটারদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। এসময় পুলিশের গুলিতে এক ছাত্রশিবির কর্মী নিহত এবং জামায়াত-শিবির নেতা-কর্মী, পুলিশ, সাংবাদিকসহ অর্ধশতাধিক আহত হয়েছে। নিহত ছাত্রশিবির কর্মী হচ্ছেন-মোঃ ইমরান খান (১৯), পিতা-মো। বাবুল খান, গ্রাম তেনাই, পোস্ট- ইন্ডলিয়া, উপজেলা-ফরিদপুর, জেলা পাবনা। সে চট্টগ্রাম পলিটেকনিক্যাল ইন্সটিটিউটের মেকানিক্যাল বিভাগের ২য় বর্ষের ছাত্র ও আগ্রাবাদ বহুতলা কলোনীর বাসিন্দা বলে জানা গেছে। ছাত্রশিবির নেতারা জানান, নিহত ইমরান ছাত্রশিবিরের সাথী ছিল।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, গতকাল মঙ্গলবার বেলা ১টার দিকে পাহাড়তলী অলংকার এলাকায়। হরতালের সমর্থনে ছাত্রশিবির নেতা-কর্মীরা মিছিল বের করলে পুলিশ তাতে বাধা দেয়। এসময় পুলিশ মিছিলকারীদের ওপর চড়াও হলে সংঘর্ষ বাধে। এ সময় ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া, ইট-পাটকেল বিনিময় হয়। এ সময় পুলিশ ব্যাপক লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেট ছুঁড়ে। সংঘর্ষে পুরো এলাকাজুড়ে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। ঘণ্টাব্যাপী ব্যাপক সংঘর্ষ চলাকালে এক পর্যায়ে পুলিশ গুলি ছোড়ে। এতে ছাত্রশিবির কর্মী মোঃ ইমরান খান (১৯) এর বুকে গুলি লাগলে তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান। সংঘর্ষে আহত হন জামায়াত শিবির নেতা-কর্মী, পুলিশসহ আরো ৩০ জন। এরপর বিক্ষুব্ধ পিকেটাররা একটি পিকআপভ্যানে আগুন ধরিয়ে দেন। পুলিশ এসময় ২০ জনকে আটক করে। পুলিশ পরে নিহত ছাত্রশিবির কর্মীর লাশ চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করে। বিপুল সংখ্যক র্যাব, পুলিশ ঘটনাস্থলে এলে পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ছাত্র নিহত হওয়ার এ ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে আসে।
৪. শাহাদাতের পূর্বের বিভিন্ন ঘটনা
Imran Khan
1 January Via Mobile
Happy New Year. Notun Bosor Sobar Sundor Hok, Ai Doa Roilo Sobar Jonno. Amar
Jonno Sobai Doa Korben,
তিনি বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাথী ছিলেন। ঘটনার দিন সকালে সাথী বৈঠকে অংশগ্রহণ শেষে ১১টায় বাসায় গিয়ে মায়ের সাথে দেখা করে ১২.৩০ টায় বাসা থেকে বের হয়ে অলঙ্কার মোড়ে যান। দুপুরে বাসায় যাননি। সার্থী বৈঠকে সাথী ভাইদের সাথে নাস্তা করেন। সকালে বাসা থেকে যাওয়ার সময় বাবার কাছ থেকে ১৫০ টাকা নিয়েছিলেন বাইতুলমালের জন্য। আন্দোলনে যাওয়ার জন্য পিতা নিষেধ করেছেন কিন্তু কোন জবাব দেননি। তিনি কখনো মিথ্য কথা বলতেন না।
পিতার বক্তব্য: দ্বীনের কাজে পাগল ছিল আমার ছেলে। আমার সাথে বন্ধুর মত সব কিছু শেয়ার করতো। ছোট ভাই-বোনদের পড়া-লেখা ও অন্যান্য কাজে সহযোগিতা করতো এবং ভাই-বোন সবাই বন্ধুর মতো চলতো। আমার অনেক স্বপ্ন ছিল ছেলেকে নিয়ে। আমার কোন ব্যাংক ব্যালেন্স নেই, এই সন্তানরাই আমার একমাত্র ব্যাংক ব্যালেন্স।
৫. শহীদের ব্যক্তিগত ডায়েরি থেকে...
ইমরান ছিল পৃথিবীর বাগানে সেরা ফুলগুলোর একটি। বাগানের সবচেয়ে সুন্দর ফুলটি সবাইকে আকর্ষন করে। যার সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে মানুষ তাকে পেতে চায়। কিন্তু সুবাস ছড়ানোর আগেই নির্মমভাবে তাকে হত্যা করা হলো। শহীদ ইমরান যখন নবম শ্রেণীর ছাত্র তখন থেকেই সে তার জীবনের নানা ঘটনাগুলোকে প্রাঞ্জল ভাষায় ডায়েরির পাতায় তুলে রাখতো।
১৬.০৯.২০০৮ এ তার ব্যক্তিগত ডায়েরিতে সে লিখেছে, "আমার নাম মোঃ ইমরান খান রাজিব। নাসিরাবাদ সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের আমি নবম শ্রেণীর ছাত্র। আমরা দুইভাই দুইবোন। বাবা একজন চাকুরীজীবী। মা গৃহিণী। আমার বাবার আয়ে আমাদের সংসার ভালই চলে। তবে বাবার আয় কম হলেও আমার বাবা আমাদের সবার চাহিদা পুরণ করেন। কোনো কিছু অপূর্ণ রাখেন না। আমার বিদ্যালয়ের জন্যে বাবা প্রতিমাসে অনেক টাকা খরচ করেন। তবে আমাদের বাসায় কোনো টিচার নেই। তাই আমি একটি কোচিং সেন্টারে পড়ি। সেখানে লেখাপড়া মোটামুটি ভালই চলে। এখানে টিচাররা আমাদের খুবই বিশ্বাস করেন। আমরাও উনাদের বিশ্বাসের মর্যাদা রাখার চেষ্টা করি।"
আমরা বন্ধুরা সবাই সবাইকে খুব বিশ্বাস করি। বিশেষ করে রিয়াদ ও আশিক আমাকে খুব বিশ্বাস করে, আমিও তাদেরকে খুব বিশ্বাস করি। রিয়াদ মাদ্রাসায় পড়ে তাই সে বেশির ভাগ সময় ইসলামিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। আমরা কোচিং এ একটা সংগঠন করেছি। সংগঠনটি একটা ইসলামিক সংগঠন। সংগঠনের প্রধান (সভাপতি) হচ্ছে রিয়াদ কারণ ও খুব ভাল ছাত্র যেহেতু আমিও ওদের সাথে লেখাপড়ায় তাল মিলিয়ে চলতে পারি তাই আমি হলাম সহসভাপতি। এসব নির্বাচন করেছে ছাত্ররাই। ওদের অমতে কিছুই করা যায় না। সংগঠনে সবাই সবাইকে সম্মান করে।"
তার ভায়েরিতে নিজের ব্যাপারে ইমরান লিখেছে। আসলে সত্য কথা হল "আমি প্রেম করাকে খুবই ভয় পাই"। আমি চিন্তা করি আমি যদি প্রেম করি, তবে আমার মন সবসময় প্রেমিকার দিকে থাকবে। ঘরে, পড়া-লেখায়, কোনো কাজে তখন মন বসবে না। তখন পড়ালেখার বারোটা বাজবে। এবং সবার থেকে বকা শুনতে হবে। মেয়েদের ফান্দে না পড়ার জন্যে আমি সবসময় প্রথম বেঞ্চে বসি। আমার ওপর আমার বাবার রয়েছে অগাধ বিশ্বাস। আমি তাদের বিশ্বাসকে ভাঙতে চাই না। তাই প্রেমের সাথেও জড়াতে চাই না।"
০১.০১.২০১১ ইং তারিখে সে তার ডায়েরিতে লিখলো। "আজ ঘুমানোর আগে আমার একটাই প্রার্থনা যেন আগামী ফজরের নামাজটা আমি জামায়াতে আদায় করতে পারি, নতুন বছরের সকালটা যেন মসজিদে নামাজের মাধ্যমে শুরু হয়।
শহীদের অনেক স্বপ্ন ছিল নিজের জন্যে একটি কম্পিউটার কেনা, তাই সে ২২.১০.২০১১ ইং তারিখে তার ডায়েরিতে লিখলো। "চিন্তা করছি ঈদের পর আমি এক মাসের জন্যে চাকরিতে ঢুকবো। মূলত কম্পিউটার কেনার জন্যে। নিজের একটা কম্পিউটার কেনা আমার অনেক দিনের স্বপ্ন।"
জীবনের অন্যরকম পরিবর্তন শুরু। এরই মধ্যে শান্ত ইমরান ছাত্রশিবিরের বিপ্লবী দাওয়াত পায়। তার বাসার পাশেই থাকতো উপশাখার সভাপতি রাকীবুল হাসান। স্থানীয় ভাইদের দাওয়াতে সে বিভিন্ন প্রোগ্রামে যাওয়া শুরু হলো। সংগঠনের ভাইদের সাথে মেলামেশায় আস্তে আস্তে পরিবর্তন আসতে শুরু করলো তার জীবনে।
২৬.০৮.২০১১ তারিখে সে ডায়েরিতে লিখলো। "ইদানীং আমি ছাত্রশিবিরে যোগ দিয়েছি, এখনতো আমার।
ক্লাস আরম্ভ হয়নি তাই সেখানে মাঝে মাঝে সময় দিতে হয়। আমি বর্তমানে শিবিরের কর্মী এরপর আমি শিবিরের সাথী হতে চাই, শুনেছি শিবিরের সাথীদের অনেক সম্মান থাকে।"
২০১১ সালের জুলাই মাসে ইমরান শিবিরের সাথী প্রার্থী হয়। সাথীপ্রার্থী হবার পর নিজের জীবন নিয়ে ডায়েরিতে লিখলো: "আজ থেকে চিন্তা করলাম জীবনে একটা রুটিন বানাতে হবে। জীবনে অনেকটা সময়ই নষ্ট করলাম। এবার একটা পরিকল্পিত রাস্তায় আসতে হবে। এ রাস্তায় আসতে হলে একটা পরিকল্পনা নেয়া খুবই জরুরি আর সেটা করার জন্যই আজ বসলাম।"
৬. এমন দায়িত্বশীল খুঁজে পাওয়া যাবে না
২০১২ সালের অক্টোবর মাসে সংগঠনের সাথী হিসেবে শপথ নেয়ার পর সদা শান্ত এই ছেলেটির সময় কোটে যেত আন্দোলনের মাঠে। তার দায়িত্ব ছিল আগ্রাবাদের ছোট পুল এলাকার ইসলাম মিয়ার ব্রিকফিল্ড উপশাখার সেক্রেটারি। তাকে দেখা যেত কখনো কর্মীদের বাসায়, কখনো শুভাকাঙ্ক্ষীদের সাথে নম্র আলাপচারিতায়। কখনো কথায় বা আচরণে ভুল করে ফেললে মিষ্টি করে হেসে সেই ভুল স্বীকার করতো। সদা হাস্যোজ্জ্বল ও শান্ত হওয়ায় কর্মীরাও ভিড় করতো তার চারপাশে। এক দিনের ঘটনা, মাস শেষে বায়তুলমালের টাকা দায়িত্বশীল বৈঠকে জমা দিতে হবে। অথচ শুভাকাঙ্ক্ষীদের বাসায় পাওয়া যায়নি বলে সব টাকা তোলা হয়নি। আব্বুকে জানাল সমস্যাটা। বাবার থেকে ১৫০ টাকা ধার নিয়ে দায়িত্বশীল বৈঠকে জমা দিল। দ্বীনের বিপদে। অর্থনৈতিক বকেয়া করা যাবে না, হিসাব-নিকাশেও স্বচ্ছ হতে হবে... এই ছিল তার মনোভাব।
৭. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম। শহীদ মো: ইমরান খান (০৮০)। পেশা। ছাত্র।
জন্ম তারিখ ও বয়স। ৩০ আগস্ট ১৯৯৩ ইং, ২০ বছর।
আহত হওয়ার তারিখ। ৫ই ফেব্রুয়ারি ২০১৩, বুকের বাম পাশে গুলিবিদ্ধ।
শাহাদাতের তারিখ: ০৫ ফেব্রুয়ারি '১৩ বেলা ১ টা, স্থান: অলঙ্কার মোড়।
দাফন করা হয়: গ্রামের বাড়ির কবরস্থান।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: কেনাই, ডাকঘর: বেরুলিয়া, থানা: ফরিদপুর, জেলা: পাবনা।
পিতা: মোঃ বাবুল খান, ৪৮ বছর, গার্মেন্টস শ্রমিক।
মাতা: জান্নাতুল ফেরদৌস, ৩৬ বছর, গৃহিণী।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা: গ্রামে ২/৩ শতক ভিটা বাড়ি আছে, নিজেদের কোন আবাদি জমি নেই। ভাড়া বাড়িতে থাকে। পিতার চকরি থেকে সংসার ব্যয় নির্বাহ করা হয়।
ভাই-বোনের বিবরণ: মো ইমরান খান, শহীদ। আরমান খান, ছাত্র, এইচ.এস.সি, ছাত্রশিবিরের (কর্মী)। সানজিদা খানম, নার্সারি, সার্জন ক্যাডেট স্কুল। তানজিনা খানম, নার্সারি, সার্জন ক্যাডেট স্কুল।
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍