শহীদ আবিদ বিন ইসলাম
আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের নম্র-হৃদয়ের তরুণ আবিদ বিন ইসলাম ছিলেন একাধারে দাওয়াতি কাজে নিবেদিত, স্বপ্নবাজ ও সবার প্রিয় বন্ধু। এলাকার শিশু থেকে বৃদ্ধ সবার কাছে তার সাইকেলের ঘণ্টা আর হাসির উচ্ছ্বাস ছিল চেনা দৃশ্য। নিজের কম্পিউটারও তিনি রেখেছিলেন সবার জন্য উন্মুক্ত।
কিন্তু ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ রাতে, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের পথে বের হলে নির্মম নির্যাতন ও গুলিতে তার জীবন শেষ করে দেওয়া হয়, উপড়ে নেওয়া হয় সেই মায়াময় চোখ, যেগুলো দেখে বাবার রাগও গলে যেত।
পরদিন ভ্যানে পড়ে থাকা ক্ষতবিক্ষত দেহ দেখে বাবার পৃথিবী ভেঙে পড়ে; আর জানাজায় ভিড় করে প্রায় পনেরো হাজার মানুষ। প্রমাণ করে আবিদের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, এক পুরো সমাজের বেদনা।
ডায়েরিতে লেখা তার শেষ লাইন যেন নিজের নিয়তির পূর্বাভাস:
“আমার মনের সকল আশা পূরণ হবে না
এমন করে চলে যাবো, কেউতো বুঝবে না।”
কিন্তু ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ রাতে, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের পথে বের হলে নির্মম নির্যাতন ও গুলিতে তার জীবন শেষ করে দেওয়া হয়, উপড়ে নেওয়া হয় সেই মায়াময় চোখ, যেগুলো দেখে বাবার রাগও গলে যেত।
পরদিন ভ্যানে পড়ে থাকা ক্ষতবিক্ষত দেহ দেখে বাবার পৃথিবী ভেঙে পড়ে; আর জানাজায় ভিড় করে প্রায় পনেরো হাজার মানুষ। প্রমাণ করে আবিদের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, এক পুরো সমাজের বেদনা।
ডায়েরিতে লেখা তার শেষ লাইন যেন নিজের নিয়তির পূর্বাভাস:
“আমার মনের সকল আশা পূরণ হবে না
এমন করে চলে যাবো, কেউতো বুঝবে না।”
🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ
শহীদ আবিদ বিন ইসলাম
চট্টগ্রাম মহানগরী
২
বাবা বলেন: "আমার ছেলে আরো ৫ বছর বেঁচে থাকলে হয়তো এই এলাকায় ইসলামের আলোমুক্ত কেউ থাকতো না। ছেলে-বুড়ো সবার সাথে তার সুসম্পর্ক ছিল। তার সাইকেলে চড়েনি এমন ছেলে এলাকায় কমই ছিল। তার কম্পিউটার ছিল সকলের জন্যে উন্মুক্ত।... সে অনেক স্বপ্ন দেখতো। কিন্তু এতো কিছুর পরও আবিদ হয়তো অনুভব করতো খুব শীঘ্রই সে মহান প্রভুর সান্নিধ্যে চলে যাবে। আর তাইতো ২০১২ সালের ২১ এ ডিসেম্বর আবিদ তার ডয়েরিতে লিখেছিল; 'আমার মনের সকল আশা পূরণ হবে না / এমন করে চলে যাবো কেউতো বুঝবে না।"
১. শহীদের পরিচিতি
শহীদ আবিদ বিন ইসলাম চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার রহমতপুর গ্রামে ১৯৯৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন পিতা মোঃ মনিরুল ইসলাম ও মাতা উম্মে ছালমার দুই সন্তানের মধ্যে ছোট সন্তান। তার বাবা চট্টগ্রাম বারের একজন আইনজীবী। বড় ভাই আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম এ ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ পড়েন। এই দুই সন্তানকে নিয়ে মা-বাবার অনেক স্বপ্ন ছিল। তিনি ছিলেন অত্যন্ত কোমল প্রকৃতির এবং ইসলামের রীতি-নীতির ওপর পূর্ণ আস্থাশীল। ইসলামী আন্দোলনের কাজে তিনি ছিলেন খুবই নিবেদিতপ্রাণ। ছেলে বুড়ো সবার কাছে তিনি এক ডাকে আবিদ নামে পরিচিত ছিলেন। দাওয়াতী কাজ করতে গিয়ে তিনি এলাকার সকল ছাত্রের হৃদয় জয় করেছিলেন খুবই অল্প সময়ে। তিনি ছিলেন খুবই সাহসী এবং কৌশলী।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে জনাব আব্দুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় দেয়ার পর তৌহিদী জনতা এই রায়কে অবৈধ বলে প্রত্যাখ্যান করে বিকালে সারা দেশে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ মিছিল করে। তারই অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম আগ্রাবাদ দেওয়ানহাট মোড়ে তৌহিদী জনতা বিক্ষোভ মিছিল করে। রাত ০৮.৩০ মিনিটে শহীদ আবিদ বাসা থেকে বের হলে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে অমানবিক নির্যাতন করে এবং পুলিশ স্বহস্তে কাছ থেকে গুলি করে, তার দুইটি চোখ উপড়ে ফেলে পুরো শরীর ক্ষতবিক্ষত করে ফেলে। বেশ রাত পর্যন্ত শহীদ আবিদ ভাই বাসায় না ফেরায় তার বাবা হাসপাতালে খুঁজতে যান। সেখানে না পেয়ে ফিরার পথে একটি ভ্যানে তার মৃতদেহ দেখে হতভম্ব হয়ে পড়েন।
৬ই ফেব্রুয়ারি বিকাল ৪টায় পোস্টমর্টেম করে লাশ হস্তান্তর করার পর বাদ মাগরিব হালিশহর বিডিআর মাঠে জানাযা শেষে বি ব্লক কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়। তার জানাযার নামাজে ইমামতি করেন মাওলানা আব্দুল করীম। জানাযায় উপস্থিতি ছিল প্রায় ১৫ হাজার লোক।
৩. সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে জনাব আব্দুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদন্ডের রায় দেয়ার পর তৌহিদী জনতা এই রায়কে অবৈধ বলে প্রত্যাখ্যান করে। পরের দিন সারাদেশ হরতাল কর্মসূচি দেয়া হয়। পরের দিনের হরতালের সমর্থনে রাতে মিছিল হয়। রাত ০৮.৩০ মিনিটে শহীদ আবিদ বিন ইসলাম মিছিলের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হলে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে অমানবিক নির্যাতন করে। এমনকি পুলিশ স্বহস্তে কাছ থেকে গুলি করে এবং তার দুইটি চোখ উপড়ে ফেলে পুরো শরীর ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। এতে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। রাত ৯টা পর্যন্ত শহীদ আবিদ ভাই বাসায় না ফেরায় তার বাবা হাসপাতালে খুঁজতে যান। সেখানে না পেয়ে ফিরার পথে একটি ভ্যানে তার মৃতদেহ দেখে হতভম্ব হয়ে পড়েন। একদিন পরে জাতীয় দৈনিকসমূহে এ বিষয়ে বিস্তারিত নিউজ আসে, দৈনিক আমার দেশ ৭ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ তারিখে লিখে;
চট্টগ্রাম পুলিশের নির্মমতা: চোখ তুলে আরও এক শিবির নেতাকে নৃশংসভাবে হত্যা:
গুলিবিদ্ধ ও চোখ উৎপাটন করা লাশ মিললো চট্টগ্রামের ইসলামী ছাত্রশিবির নেতা আবিদ বিন ইসলামের। পরিবারের অভিযোগ পুলিশ হেফাজতে নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করা হয় চট্টগ্রাম সিটি কলেজের এইচএসসি পড়ুয়া মেধাবী এই শিক্ষার্থীকে। তার দুটি চোখই তুলে নেয়া হয়। শরীরে ছিল দুটি গুলির চিহ্ন।
শিবির নেতা আবিদকে পেটাচ্ছে পুলিশ, তার চোখ উপড়ানো লাশ
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নগরীর দেওয়ানহাট এলাকায় পুলিশের সঙ্গে হরতাল সমর্থক জামায়াত শিবিরের সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় জামায়াত-শিবিরের তিন নেতাকর্মী মারা যান। সন্ধ্যা নাগাদ শফিক ও আফজালের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়। মধ্যরাতে উদ্ধার হয় আবিদ বিন ইসলামের লাশ। সংঘর্ষস্থলের অদূরে মিস্ত্রিপাড়া এলাকা থেকে পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করে।
আবিদের মৃত্যুর পর পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। তার বাবা অ্যাডভোকেট মনিরুল ইসলাম ও মা স্কুল শিক্ষিকা নার্গিস ছেলেকে হারিয়ে এখন অনেকটাই নির্বাক। পারিবারিক সূত্র জানায়, আবিদ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাথী পর্যায়ের নেতা ছিলেন। তার এবার চট্টগ্রাম সিটি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দেয়ার কথা। তাদের গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলায়। বাবা-মার সঙ্গে আবিদ থাকতেন নগরীর হালিশহরে। তার বাবা অ্যাডভোকেট মনিরুল ইসলাম কান্নাজড়িত কণ্ঠে আমার দেশ-কে বলেন, "ঘটনার সময় অনেক মানুষ দেখেছে আমার ছেলেকে আরও কয়েকজনের সঙ্গে পুলিশ দেওয়ানহাট মোড় থেকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। যে ছেলে পুলিশের হাতে ছিল সে লাশ হয়ে হাসপাতালে গেল কিভাবে?"
অ্যাডভোকেট মনিরুল ইসলাম আরও বলেন, "পুলিশ আমার ছেলেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর নির্মম নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে লাশ ফেলে দিয়ে উদ্ধারের নাটক সাজিয়েছে। এর বিচার আমি কার কাছে চাইবো।"
আবিদের পরিবারের সদস্যরা জানান, হত্যার আগে তার ওপর নির্মম নির্ঘাতন চালানো হয়েছে। তার দুটি চোখই তুলে নেয়া হয়েছে। এছাড়া দুটি গুলির চিহ্ন রয়েছে তার বুকে। গুলির আগে বা পরে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়। একটি ক্ষত-বিক্ষত দেহ তারা পেয়েছেন হাসপাতাল থেকে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নগর পুলিশের ডবলমুরিং জোনের সহকারী কমিশনার হাসান মোল্লা শিবির নেতা আবিদকে আটকের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সংঘর্ষের সময় ছাত্রলীগ মাঠে ছিল। শিবিরও দুই-তিন দিক থেকে হামলা করে। এর মধ্যে সে আহত হতে পারে। আমরা ঘটনাস্থল থেকে ফোর্স প্রত্যাহার করে নেয়ার পর রাত ১০টার দিকে এলাকার লোকজন খবর দেয় মিস্ত্রিপাড়ায় একটি লাশ পড়ে আছে। খবর পেয়ে আমরা লাশটি উদ্ধার করি। পুলিশ হেফাজতে আবিদকে নির্যাতনের অভিযোগ সত্য নয় বলে জানান তিনি।
৪. শাহাদাতের পূর্বের বিভিন্ন ঘটনা
তিনি খুব ছোট বেলা থেকেই ইসলামী আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন, SSC পরীক্ষার পূর্বেই বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাথী শপথ গ্রহণ করেন এবং নতুন পাড়া উপশাখা সভাপতির দয়িত্ব পালন করেন। ২ অক্টোবর তার ডায়েরিতে লেখা: আল্লাহর সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি করা সম্পর্কিত
নিজের লেখা কবিতা:
"আমার মনের সকল আশা পূরণ হবে না এমন করে চলে যাবো কেউ তা বুঝবে না।"
দুচোখ যেন ভালাবাসার দ্বীপশিখা
শহীদ আবিদের মায়াময় চোখগুলোই ছিল আকৃষ্ট করার মত। যে কেউ একবার তাকাবে সে কখনোই তার ওপর রাগ ধরে রাখতে পরতো না। আবিদের আব্বু বলছেন। আমি যতোবারই তার ওপর বিভিন্ন কারণে রাগ করে তাকে বকা দিতে গিয়েছি যখনই তার দুচোখে আমার চোখ পড়েছে তখনই আমার রাগ গলে পানি হয়ে গিয়েছে। তার চোখ ছিল মায়া আর ভালবাসার প্রদীপ। ওই দু'চোখে যার চোখ একবার পড়বে সে কখনোই তার শত্রু হতে পারবে না। মা বললেন এজন্যেই পুলিশ আর ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে তার চোখ উপড়ে ফেলে। কারণ তারা তার চোখের জ্যোতিকে সহ্য করতে পারতো না। দুচোখ দিয়ে সে একবার যাকে একটি মুহূর্তের জন্য দেখেছে তাকে কখনোই ভুলতো না। চোখতো নয় যেন হরিণের দৃষ্টি।
রাত জাগা পাখি
সারা দিন টই টই করে ঘুরলেও রাতে বাসায় ফিরে পড়তে বসতে চাইতো না। মা সারাক্ষণ পাহারা দিয়ে রাখতো যেন পড়ার টেবিলে থাকে। কিন্তু মা একটু আড়াল হলেই দু ভাই আড্ডা জুড়ে দিতো। মাঝে মাঝে ঝগড়া বাধাতো। রাত জেগে গল্পের বই পড়া। শিবিরের সাথী হবার পর কুরআন-হাদীস ও ইসলামী সাহিত্য পড়েই সময় কেটে যেতো। তার সংগ্রহে বইয়ের সংখ্যা অগণিত। মাঝে মাঝে মনের ভাবনাগুলোকে সাজিয়ে কবিতা বানাতো। শাহাদাতবরণের কয়েকদিন আগে তার লেখা কবিতার নাম " মানবতা"
মানবতা শুধু তোমাদের জন্য নয়
মানবতা সবসময় নিরপেক্ষ হয়।
মানবতা কোনো গোষ্ঠীর জন্য নয়
বরং মানবতা মজলুমের কথা কয়।
আজ দেশে দেশে শুনি মুসলমানদের প্রতি নির্যাতন
আর মানবতা হয়ে গেল তাদের জন্য অসহায় অবচেতন
তোমরাই বল মানবতা। তোমরাই বলো মানবাধিকার।
অথচ দেখো ফিলিস্তিনের শিশুরা করে হাহাকার।
যুদ্ধের পর যুদ্ধ করো তোমরা
আর জঙ্গি হয় মুসলমানেরা।
একি মানবতা। একি মানবতা।
আবিদের স্বপ্ন ও সখ
শহীদ আবিদ বিন ইসলামের স্বপ্ন ছিল অনেক বড় ব্যারিস্টার হওয়া। মাঝে মাঝে আবিদ তার আব্বুকে বলতো, আব্বু আমি তোমার থেকে অনেক বড় আইনজীবী হবো ইনশাআল্লাহ। বন্ধুদের সাথে ভ্রমণ করা, ছবি তোলা, গান শুনা, গান গাওয়া ও চিত্রশিল্পী হওয়া ছিল শহীদের অনেক গুলো সখের মধ্যে অন্যতম।
৫. আদর্শ সংগঠক
১০ম শ্রেণিতে থাকাবস্থায় আবিদ শিবিরের সাথী হল। বেড়ে গেল কাজ, কাজের পরিধি। সারাদিন টই টই করে ঘুরে বেড়ানো আবিদ আর বর্তমানের আবিদের মাঝে বিরাট পার্থক্য দেখা দিল। ২০১৩ সালের রিপোর্ট বইয়ের শুরুতে আবিদ লিখলো নতুন বছর নতুন প্রাণ: উপশাখায় কাজ হবে আর খুশি হবেন আল্লাহ মহান "উপশাখার কাজ নিয়ে কতো কি যে ভাবতো, তার নিয়মিত ডায়েরি তার সাক্ষী। নিয়মিত কর্মী বৃদ্ধি, উপশাখার প্রোগ্রামাদি বাস্তবায়নে আবিদ ছিল অনেক পারদর্শী দায়িত্বশীল। উপশাখার একজন দায়িত্বশীলের নিয়মিত কাজ কিভাবে আঞ্জাম দিতে হয় আবিদ তার জ্বলন্ত উদাহরণ।
সংগ্রামী পথিক
চলমান আন্দোলন সংগ্রামে আবিদ ছিল অগ্রসেনানীদের অন্যতম একজন। আন্দোলন সংগ্রামে আবিদকে দেখা যেতো সবসময় সম্মুখভাগে। মিছিল মিটিং, পিকেটিং সবকিছুতেই তার অংশগ্রহণ ছিল অগ্রগণ্য। নিজের রিপোর্ট বইয়ের কভার পেইজে তার হস্তাক্ষরে লেখা উক্তিগুলো (সংগ্রামী ২০১৩, আন্দোলনের ২০১৩, আন্দোলনের চূড়ান্ত সময়, আন্দোলনবিমুখ জনশক্তিদের জন্যে হেদায়েতের আলো এবং যারা আন্দোলনে চলমান তাদের ঈমানি শক্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। নিজের নামের স্থানে লিখতো "সংগ্রামী পথিক"। কেন্দ্রীয় জামায়াত নেতৃবৃন্দের মুক্তির জন্যে সবসময় আব্বু আম্মুকে দোয়া করতে বলতো। আর এসময়ে যারা আন্দোলনে যাবে না তাদেরকে সে মোনাফেক ভাবতো। আব্বু-আম্মু কখনো মিছিলে যেতে বারণ করলে তাদেরকে একথা সরাসরি স্মরণ করিয়ে দিতো।
এভাবে আবিদ অনেক কিছু ভাবতো। অনেক স্বপ্ন দেখতো। কিন্তু এতো কিছুর পরও আবিদ জানতো খুব শীঘ্রই সে মহান প্রভুর সান্নিধ্যে চলে যাবে। আর তাইতো ২০১২ সালের ০২ অক্টোবর আবিদ তার ডায়েরিতে লিখলো।
"আমার মনের সকল আশা পূরণ হবে না
এমন করে চলে যাবো কেউতো বুঝবে না।"
৬. শহীদের আপনজনদের কথা
শহীদ আবিদ বিন ইসলাম ছিল একটি সম্ভাবনাময় ফুলের কুঁড়ি। বাতিলেরা চেয়েছিল এই ফুলের কুঁড়িকে সুবাস ছড়ানোর পূর্বেই নিঃশেষ করে দিতে।
বাবার উক্তি: আমার ছেলে আরো ৫ বছর বেঁচে থাকলে হয়তো এই এলাকায় ইসলামের আলোমুক্ত কেউ থাকতো না। ছেলে-বুড়ো সবার সাথে তার সুসম্পর্ক ছিল। তার সাইকেলে চড়েনি এমন ছেলে এলাকায় কমই ছিল। তার কম্পিউটার ছিল সকলের জন্যে উন্মুক্ত।
বন্ধুর পিতা: সে ছিল খুবই নম্র, ভদ্র, বিনয়ী ও সৎ চরিত্রের অধিকারী। এলাকার সকলের কাছে সে পরিচিত ছিল। সবার সুখে-দুঃখে সে সবার আগে থাকতো। সে খুবই সাহসী ছেলে ছিল। নেতৃত্ব ও দাওয়াতী কাজের সকল গুণাবলী তার মধ্যে বিদ্যমান ছিল।
আল্লাহ তায়া'লা তাকে তাঁর দ্বীনের জন্য কবুল করে নিয়ে গেছেন। তার শাহাদাতের পর এলাকার সাধারণ পরিবারের অসংখ্য ছেলেরা বন্ধু শোকে কয়েকদিন পর্যন্ত না খেয়ে ছিল।
৭. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম: শহীদ আবিদ বিন ইসলাম (০৮১)। পেশাঃ ছাত্র।
জন্ম তারিখ ও বয়স: ৩১.৩.১৯৯৫ ইং, ১৮ বছর।
আহত হওয়ার তারিখ: ৫ই ফেব্রুয়ারি ২০১৩ ইং, গুলিবিদ্ধ ও দুই চোখ উপড়ে ফেলা হয়েছে।
শাহাদাতের তারিখ: ৫ই ফেব্রুয়ারি ২০১৩ ইং রাত ১০টা।
স্থান: আগ্রাবাদ দেওয়ানহাট মোড়।
দাফন করা হয়: পারিবারিক কবরস্থান।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: ইজ্জতপুর/ রহমতপুর, ডাকঘর: রহমতপুর, থানা: সন্দ্বীপ, জেলা: চট্টগ্রাম।
পিতা: মোঃ মনিরুল ইসলাম, ৪৫+ বছর, আইনজীবী চট্টগ্রাম বার।
মাতা: উম্মে সালমা, ৩৮ বছর, বাগমনিরাম সিটি কর্পোরেশন উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা: ভাড়া বাড়িতে থাকেন। আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী।
ভাই-বোনের বিবরণ: জিহাদ বিন ইসলাম, EEE, 1st semester (IIUC)। শহীদ আবিদ বিন ইসলাম, এইচএসসি পরীক্ষার্থী ২০১৩।
চট্টগ্রাম মহানগরী
২
বাবা বলেন: "আমার ছেলে আরো ৫ বছর বেঁচে থাকলে হয়তো এই এলাকায় ইসলামের আলোমুক্ত কেউ থাকতো না। ছেলে-বুড়ো সবার সাথে তার সুসম্পর্ক ছিল। তার সাইকেলে চড়েনি এমন ছেলে এলাকায় কমই ছিল। তার কম্পিউটার ছিল সকলের জন্যে উন্মুক্ত।... সে অনেক স্বপ্ন দেখতো। কিন্তু এতো কিছুর পরও আবিদ হয়তো অনুভব করতো খুব শীঘ্রই সে মহান প্রভুর সান্নিধ্যে চলে যাবে। আর তাইতো ২০১২ সালের ২১ এ ডিসেম্বর আবিদ তার ডয়েরিতে লিখেছিল; 'আমার মনের সকল আশা পূরণ হবে না / এমন করে চলে যাবো কেউতো বুঝবে না।"
১. শহীদের পরিচিতি
শহীদ আবিদ বিন ইসলাম চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার রহমতপুর গ্রামে ১৯৯৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন পিতা মোঃ মনিরুল ইসলাম ও মাতা উম্মে ছালমার দুই সন্তানের মধ্যে ছোট সন্তান। তার বাবা চট্টগ্রাম বারের একজন আইনজীবী। বড় ভাই আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম এ ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ পড়েন। এই দুই সন্তানকে নিয়ে মা-বাবার অনেক স্বপ্ন ছিল। তিনি ছিলেন অত্যন্ত কোমল প্রকৃতির এবং ইসলামের রীতি-নীতির ওপর পূর্ণ আস্থাশীল। ইসলামী আন্দোলনের কাজে তিনি ছিলেন খুবই নিবেদিতপ্রাণ। ছেলে বুড়ো সবার কাছে তিনি এক ডাকে আবিদ নামে পরিচিত ছিলেন। দাওয়াতী কাজ করতে গিয়ে তিনি এলাকার সকল ছাত্রের হৃদয় জয় করেছিলেন খুবই অল্প সময়ে। তিনি ছিলেন খুবই সাহসী এবং কৌশলী।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে জনাব আব্দুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় দেয়ার পর তৌহিদী জনতা এই রায়কে অবৈধ বলে প্রত্যাখ্যান করে বিকালে সারা দেশে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ মিছিল করে। তারই অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম আগ্রাবাদ দেওয়ানহাট মোড়ে তৌহিদী জনতা বিক্ষোভ মিছিল করে। রাত ০৮.৩০ মিনিটে শহীদ আবিদ বাসা থেকে বের হলে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে অমানবিক নির্যাতন করে এবং পুলিশ স্বহস্তে কাছ থেকে গুলি করে, তার দুইটি চোখ উপড়ে ফেলে পুরো শরীর ক্ষতবিক্ষত করে ফেলে। বেশ রাত পর্যন্ত শহীদ আবিদ ভাই বাসায় না ফেরায় তার বাবা হাসপাতালে খুঁজতে যান। সেখানে না পেয়ে ফিরার পথে একটি ভ্যানে তার মৃতদেহ দেখে হতভম্ব হয়ে পড়েন।
৬ই ফেব্রুয়ারি বিকাল ৪টায় পোস্টমর্টেম করে লাশ হস্তান্তর করার পর বাদ মাগরিব হালিশহর বিডিআর মাঠে জানাযা শেষে বি ব্লক কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়। তার জানাযার নামাজে ইমামতি করেন মাওলানা আব্দুল করীম। জানাযায় উপস্থিতি ছিল প্রায় ১৫ হাজার লোক।
৩. সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে জনাব আব্দুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদন্ডের রায় দেয়ার পর তৌহিদী জনতা এই রায়কে অবৈধ বলে প্রত্যাখ্যান করে। পরের দিন সারাদেশ হরতাল কর্মসূচি দেয়া হয়। পরের দিনের হরতালের সমর্থনে রাতে মিছিল হয়। রাত ০৮.৩০ মিনিটে শহীদ আবিদ বিন ইসলাম মিছিলের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হলে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে অমানবিক নির্যাতন করে। এমনকি পুলিশ স্বহস্তে কাছ থেকে গুলি করে এবং তার দুইটি চোখ উপড়ে ফেলে পুরো শরীর ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। এতে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। রাত ৯টা পর্যন্ত শহীদ আবিদ ভাই বাসায় না ফেরায় তার বাবা হাসপাতালে খুঁজতে যান। সেখানে না পেয়ে ফিরার পথে একটি ভ্যানে তার মৃতদেহ দেখে হতভম্ব হয়ে পড়েন। একদিন পরে জাতীয় দৈনিকসমূহে এ বিষয়ে বিস্তারিত নিউজ আসে, দৈনিক আমার দেশ ৭ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ তারিখে লিখে;
চট্টগ্রাম পুলিশের নির্মমতা: চোখ তুলে আরও এক শিবির নেতাকে নৃশংসভাবে হত্যা:
গুলিবিদ্ধ ও চোখ উৎপাটন করা লাশ মিললো চট্টগ্রামের ইসলামী ছাত্রশিবির নেতা আবিদ বিন ইসলামের। পরিবারের অভিযোগ পুলিশ হেফাজতে নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করা হয় চট্টগ্রাম সিটি কলেজের এইচএসসি পড়ুয়া মেধাবী এই শিক্ষার্থীকে। তার দুটি চোখই তুলে নেয়া হয়। শরীরে ছিল দুটি গুলির চিহ্ন।
শিবির নেতা আবিদকে পেটাচ্ছে পুলিশ, তার চোখ উপড়ানো লাশ
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নগরীর দেওয়ানহাট এলাকায় পুলিশের সঙ্গে হরতাল সমর্থক জামায়াত শিবিরের সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় জামায়াত-শিবিরের তিন নেতাকর্মী মারা যান। সন্ধ্যা নাগাদ শফিক ও আফজালের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়। মধ্যরাতে উদ্ধার হয় আবিদ বিন ইসলামের লাশ। সংঘর্ষস্থলের অদূরে মিস্ত্রিপাড়া এলাকা থেকে পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করে।
আবিদের মৃত্যুর পর পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। তার বাবা অ্যাডভোকেট মনিরুল ইসলাম ও মা স্কুল শিক্ষিকা নার্গিস ছেলেকে হারিয়ে এখন অনেকটাই নির্বাক। পারিবারিক সূত্র জানায়, আবিদ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাথী পর্যায়ের নেতা ছিলেন। তার এবার চট্টগ্রাম সিটি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দেয়ার কথা। তাদের গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলায়। বাবা-মার সঙ্গে আবিদ থাকতেন নগরীর হালিশহরে। তার বাবা অ্যাডভোকেট মনিরুল ইসলাম কান্নাজড়িত কণ্ঠে আমার দেশ-কে বলেন, "ঘটনার সময় অনেক মানুষ দেখেছে আমার ছেলেকে আরও কয়েকজনের সঙ্গে পুলিশ দেওয়ানহাট মোড় থেকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। যে ছেলে পুলিশের হাতে ছিল সে লাশ হয়ে হাসপাতালে গেল কিভাবে?"
অ্যাডভোকেট মনিরুল ইসলাম আরও বলেন, "পুলিশ আমার ছেলেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর নির্মম নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে লাশ ফেলে দিয়ে উদ্ধারের নাটক সাজিয়েছে। এর বিচার আমি কার কাছে চাইবো।"
আবিদের পরিবারের সদস্যরা জানান, হত্যার আগে তার ওপর নির্মম নির্ঘাতন চালানো হয়েছে। তার দুটি চোখই তুলে নেয়া হয়েছে। এছাড়া দুটি গুলির চিহ্ন রয়েছে তার বুকে। গুলির আগে বা পরে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়। একটি ক্ষত-বিক্ষত দেহ তারা পেয়েছেন হাসপাতাল থেকে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নগর পুলিশের ডবলমুরিং জোনের সহকারী কমিশনার হাসান মোল্লা শিবির নেতা আবিদকে আটকের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সংঘর্ষের সময় ছাত্রলীগ মাঠে ছিল। শিবিরও দুই-তিন দিক থেকে হামলা করে। এর মধ্যে সে আহত হতে পারে। আমরা ঘটনাস্থল থেকে ফোর্স প্রত্যাহার করে নেয়ার পর রাত ১০টার দিকে এলাকার লোকজন খবর দেয় মিস্ত্রিপাড়ায় একটি লাশ পড়ে আছে। খবর পেয়ে আমরা লাশটি উদ্ধার করি। পুলিশ হেফাজতে আবিদকে নির্যাতনের অভিযোগ সত্য নয় বলে জানান তিনি।
৪. শাহাদাতের পূর্বের বিভিন্ন ঘটনা
তিনি খুব ছোট বেলা থেকেই ইসলামী আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন, SSC পরীক্ষার পূর্বেই বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাথী শপথ গ্রহণ করেন এবং নতুন পাড়া উপশাখা সভাপতির দয়িত্ব পালন করেন। ২ অক্টোবর তার ডায়েরিতে লেখা: আল্লাহর সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি করা সম্পর্কিত
নিজের লেখা কবিতা:
"আমার মনের সকল আশা পূরণ হবে না এমন করে চলে যাবো কেউ তা বুঝবে না।"
দুচোখ যেন ভালাবাসার দ্বীপশিখা
শহীদ আবিদের মায়াময় চোখগুলোই ছিল আকৃষ্ট করার মত। যে কেউ একবার তাকাবে সে কখনোই তার ওপর রাগ ধরে রাখতে পরতো না। আবিদের আব্বু বলছেন। আমি যতোবারই তার ওপর বিভিন্ন কারণে রাগ করে তাকে বকা দিতে গিয়েছি যখনই তার দুচোখে আমার চোখ পড়েছে তখনই আমার রাগ গলে পানি হয়ে গিয়েছে। তার চোখ ছিল মায়া আর ভালবাসার প্রদীপ। ওই দু'চোখে যার চোখ একবার পড়বে সে কখনোই তার শত্রু হতে পারবে না। মা বললেন এজন্যেই পুলিশ আর ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে তার চোখ উপড়ে ফেলে। কারণ তারা তার চোখের জ্যোতিকে সহ্য করতে পারতো না। দুচোখ দিয়ে সে একবার যাকে একটি মুহূর্তের জন্য দেখেছে তাকে কখনোই ভুলতো না। চোখতো নয় যেন হরিণের দৃষ্টি।
রাত জাগা পাখি
সারা দিন টই টই করে ঘুরলেও রাতে বাসায় ফিরে পড়তে বসতে চাইতো না। মা সারাক্ষণ পাহারা দিয়ে রাখতো যেন পড়ার টেবিলে থাকে। কিন্তু মা একটু আড়াল হলেই দু ভাই আড্ডা জুড়ে দিতো। মাঝে মাঝে ঝগড়া বাধাতো। রাত জেগে গল্পের বই পড়া। শিবিরের সাথী হবার পর কুরআন-হাদীস ও ইসলামী সাহিত্য পড়েই সময় কেটে যেতো। তার সংগ্রহে বইয়ের সংখ্যা অগণিত। মাঝে মাঝে মনের ভাবনাগুলোকে সাজিয়ে কবিতা বানাতো। শাহাদাতবরণের কয়েকদিন আগে তার লেখা কবিতার নাম " মানবতা"
মানবতা শুধু তোমাদের জন্য নয়
মানবতা সবসময় নিরপেক্ষ হয়।
মানবতা কোনো গোষ্ঠীর জন্য নয়
বরং মানবতা মজলুমের কথা কয়।
আজ দেশে দেশে শুনি মুসলমানদের প্রতি নির্যাতন
আর মানবতা হয়ে গেল তাদের জন্য অসহায় অবচেতন
তোমরাই বল মানবতা। তোমরাই বলো মানবাধিকার।
অথচ দেখো ফিলিস্তিনের শিশুরা করে হাহাকার।
যুদ্ধের পর যুদ্ধ করো তোমরা
আর জঙ্গি হয় মুসলমানেরা।
একি মানবতা। একি মানবতা।
আবিদের স্বপ্ন ও সখ
শহীদ আবিদ বিন ইসলামের স্বপ্ন ছিল অনেক বড় ব্যারিস্টার হওয়া। মাঝে মাঝে আবিদ তার আব্বুকে বলতো, আব্বু আমি তোমার থেকে অনেক বড় আইনজীবী হবো ইনশাআল্লাহ। বন্ধুদের সাথে ভ্রমণ করা, ছবি তোলা, গান শুনা, গান গাওয়া ও চিত্রশিল্পী হওয়া ছিল শহীদের অনেক গুলো সখের মধ্যে অন্যতম।
৫. আদর্শ সংগঠক
১০ম শ্রেণিতে থাকাবস্থায় আবিদ শিবিরের সাথী হল। বেড়ে গেল কাজ, কাজের পরিধি। সারাদিন টই টই করে ঘুরে বেড়ানো আবিদ আর বর্তমানের আবিদের মাঝে বিরাট পার্থক্য দেখা দিল। ২০১৩ সালের রিপোর্ট বইয়ের শুরুতে আবিদ লিখলো নতুন বছর নতুন প্রাণ: উপশাখায় কাজ হবে আর খুশি হবেন আল্লাহ মহান "উপশাখার কাজ নিয়ে কতো কি যে ভাবতো, তার নিয়মিত ডায়েরি তার সাক্ষী। নিয়মিত কর্মী বৃদ্ধি, উপশাখার প্রোগ্রামাদি বাস্তবায়নে আবিদ ছিল অনেক পারদর্শী দায়িত্বশীল। উপশাখার একজন দায়িত্বশীলের নিয়মিত কাজ কিভাবে আঞ্জাম দিতে হয় আবিদ তার জ্বলন্ত উদাহরণ।
সংগ্রামী পথিক
চলমান আন্দোলন সংগ্রামে আবিদ ছিল অগ্রসেনানীদের অন্যতম একজন। আন্দোলন সংগ্রামে আবিদকে দেখা যেতো সবসময় সম্মুখভাগে। মিছিল মিটিং, পিকেটিং সবকিছুতেই তার অংশগ্রহণ ছিল অগ্রগণ্য। নিজের রিপোর্ট বইয়ের কভার পেইজে তার হস্তাক্ষরে লেখা উক্তিগুলো (সংগ্রামী ২০১৩, আন্দোলনের ২০১৩, আন্দোলনের চূড়ান্ত সময়, আন্দোলনবিমুখ জনশক্তিদের জন্যে হেদায়েতের আলো এবং যারা আন্দোলনে চলমান তাদের ঈমানি শক্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। নিজের নামের স্থানে লিখতো "সংগ্রামী পথিক"। কেন্দ্রীয় জামায়াত নেতৃবৃন্দের মুক্তির জন্যে সবসময় আব্বু আম্মুকে দোয়া করতে বলতো। আর এসময়ে যারা আন্দোলনে যাবে না তাদেরকে সে মোনাফেক ভাবতো। আব্বু-আম্মু কখনো মিছিলে যেতে বারণ করলে তাদেরকে একথা সরাসরি স্মরণ করিয়ে দিতো।
এভাবে আবিদ অনেক কিছু ভাবতো। অনেক স্বপ্ন দেখতো। কিন্তু এতো কিছুর পরও আবিদ জানতো খুব শীঘ্রই সে মহান প্রভুর সান্নিধ্যে চলে যাবে। আর তাইতো ২০১২ সালের ০২ অক্টোবর আবিদ তার ডায়েরিতে লিখলো।
"আমার মনের সকল আশা পূরণ হবে না
এমন করে চলে যাবো কেউতো বুঝবে না।"
৬. শহীদের আপনজনদের কথা
শহীদ আবিদ বিন ইসলাম ছিল একটি সম্ভাবনাময় ফুলের কুঁড়ি। বাতিলেরা চেয়েছিল এই ফুলের কুঁড়িকে সুবাস ছড়ানোর পূর্বেই নিঃশেষ করে দিতে।
বাবার উক্তি: আমার ছেলে আরো ৫ বছর বেঁচে থাকলে হয়তো এই এলাকায় ইসলামের আলোমুক্ত কেউ থাকতো না। ছেলে-বুড়ো সবার সাথে তার সুসম্পর্ক ছিল। তার সাইকেলে চড়েনি এমন ছেলে এলাকায় কমই ছিল। তার কম্পিউটার ছিল সকলের জন্যে উন্মুক্ত।
বন্ধুর পিতা: সে ছিল খুবই নম্র, ভদ্র, বিনয়ী ও সৎ চরিত্রের অধিকারী। এলাকার সকলের কাছে সে পরিচিত ছিল। সবার সুখে-দুঃখে সে সবার আগে থাকতো। সে খুবই সাহসী ছেলে ছিল। নেতৃত্ব ও দাওয়াতী কাজের সকল গুণাবলী তার মধ্যে বিদ্যমান ছিল।
আল্লাহ তায়া'লা তাকে তাঁর দ্বীনের জন্য কবুল করে নিয়ে গেছেন। তার শাহাদাতের পর এলাকার সাধারণ পরিবারের অসংখ্য ছেলেরা বন্ধু শোকে কয়েকদিন পর্যন্ত না খেয়ে ছিল।
৭. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম: শহীদ আবিদ বিন ইসলাম (০৮১)। পেশাঃ ছাত্র।
জন্ম তারিখ ও বয়স: ৩১.৩.১৯৯৫ ইং, ১৮ বছর।
আহত হওয়ার তারিখ: ৫ই ফেব্রুয়ারি ২০১৩ ইং, গুলিবিদ্ধ ও দুই চোখ উপড়ে ফেলা হয়েছে।
শাহাদাতের তারিখ: ৫ই ফেব্রুয়ারি ২০১৩ ইং রাত ১০টা।
স্থান: আগ্রাবাদ দেওয়ানহাট মোড়।
দাফন করা হয়: পারিবারিক কবরস্থান।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: ইজ্জতপুর/ রহমতপুর, ডাকঘর: রহমতপুর, থানা: সন্দ্বীপ, জেলা: চট্টগ্রাম।
পিতা: মোঃ মনিরুল ইসলাম, ৪৫+ বছর, আইনজীবী চট্টগ্রাম বার।
মাতা: উম্মে সালমা, ৩৮ বছর, বাগমনিরাম সিটি কর্পোরেশন উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা: ভাড়া বাড়িতে থাকেন। আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী।
ভাই-বোনের বিবরণ: জিহাদ বিন ইসলাম, EEE, 1st semester (IIUC)। শহীদ আবিদ বিন ইসলাম, এইচএসসি পরীক্ষার্থী ২০১৩।
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍