হোম / আওয়ামী দুঃশাসনে শহীদ / শহীদ মো: আফজাল আহমদ
শহীদ মো: আফজাল আহমদ

শহীদ মো: আফজাল আহমদ

আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

চট্টগ্রামের কাট্টলীর দরিদ্র এক ঘরে জন্ম নেওয়া মো. আফজাল আহমদ ছিলেন ছয় ভাইবোনের ভরসা রাখার একমাত্র উপার্জনকারী। যে ১৪ বছর বয়স থেকেই সংসারের হাল ধরেছিল। বছর দুয়েক আগে গড়া ছোট সংসার স্ত্রী আরিনা ও এক বছরের কন্যা ছিল তার স্বপ্নের কেন্দ্র। কিন্তু ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ অলংকার মোড়ে বিক্ষোভের দিন হঠাৎ পুলিশের গুলিতে ভেঙে যায় সেই স্বপ্ন। দোকানের কাজ থেকে বেরোতেই পরপর কয়েক রাউন্ড গুলিতে লুটিয়ে পড়েন আফজাল। দুইদিন আগেই যে ছেলে প্যারালাইসিস আক্রান্ত বাবাকে নিজ হাতে খাইয়েছিল, সেই হাতই নিথর হয়ে ফেরে চট্টগ্রাম মেডিকেলের মর্গে।
বোনের বিয়ের দাওয়াতপত্র ঠিক করেও যেতে না পারা এই তরুণের মৃত্যুতে স্তব্ধ হয়ে যায় পরিবার। মা আর মোবাইলে হাতও রাখেন না, আর বাবা শুধু প্রশ্ন করেন “আমার ছেলের অপরাধ কি ছিল? ” শান্ত স্বভাবের, ঝগড়া এড়িয়ে চলা এই শ্রমজীবী যুবকের মৃত্যু আজও পরিবারটির হৃদয়ে এক নীরব, গভীর রক্তক্ষরণ।

🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ

শহীদ মো: আফজাল আহমদ
চট্টগ্রাম মহানগরী।
"প্যারালাইসিস আক্রান্ত বাবা তার প্রিয় ছেলের স্মৃতিগুলো কোনভাবেই ভুলতে পারছেন না। ছেলের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, আফজালের শাহাদাতের দুইদিন আগেও সে আমার কাছে এসেছিল, আমার পাশে বসে নিজ হাতে আমাকে খাইয়ে দিত। যাবার সময় পকেটে দুই-এক'শ টাকা ঢুকিয়ে দিয়ে বলতো আব্বা এগুলো দিয়ে আপনি চা নাশতা খাবেন।"
১. শহীদের পরিচিতি
শহীদ মো: আফজাল আহমদ চট্টগ্রাম মহানগরীর কাট্টলী থানার শায়ের পাড়ায় ১৯৯৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন পিতা মোঃ আমির আহমদ ও মাতা আমেনা খাতুনের ছয় সন্তানের মধ্যে ১ম সন্তান। ৪ ভাই ২ বোনের সংসারে দরিদ্র পিতা-মাতা অর্থাভাবে ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখার তেমন কোন ভাল ব্যবস্থা করতে পারেননি। পারিবারিক অভাবের কারণে শহীদ মো: আফজাল আহমদও পড়ালেখায় তেমন একটা অগ্রসর হতে পারেননি। তাইতো মাত্র ১৪ বছর বয়সেই বাবার অভাবী সংসারে খাবারের যোগান দিতে মোটর পার্টস এর দোকানে কাজ নেন। তিনিই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি। তিনি বছর দুয়েক আগে বিয়ে করেছিলেন; রয়েছে আরিনা খাতুন নামে ১৮ মাসের একটি ফুটফুটে কন্যাসন্তান। এদের নিয়ে তিনি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখছিলেন। কিন্তু স্বৈরাচারের ঘাতক বুলেট তার সে স্বপ্ন অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দেয়। সকলের মায়াজাল ছিন্ন করে মহান রবের ডাকে সাড়া দিয়ে পাড়ি জমান পরপারে।

২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে জনাব আব্দুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় দেয়ার পর তৌহিদি জনতা এই রায়কে অবৈধ বলে প্রত্যাখ্যান করে বিকালে সারা দেশে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ মিছিল করে। তারই অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম অলংকার মোড়ে পুলিশ ফাঁড়ির সামনে তৌহিদি জনতা বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করে। শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশ অতর্কিতভাবে টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও গুলিবর্ষণ করে। তখন শহীদ আফজাল আহমদ দোকানে কর্মরত ছিলেন। পুলিশের গুলি এসে লাগে তার শরীরে। এরপরও মাথা এবং বুকে ৩-৪টি গুলি করা হয়। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর প্রায় ১ ঘন্টা মাটিতে পড়ে থাকেন। পরে তার বন্ধুরা চট্টগ্রাম মেডিক্যালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ৬ ফেব্রুয়ারি বাদ আসর সুপারি পাড়া মাঠে তার ১ম জানাজা হয়, এরপর ২য় জানাজা হয় ফকিরা মোড়া, উপস্থিতি প্রায় ৩০০০। ফকিরা মোড়া কর্নেলহাট বাজারের পূর্বপার্শ্বে রেললাইন সংলগ্ন কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

৩. সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে জনাব আব্দুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় দেয়ার পর তৌহিদি জনতা এই রায়কে অবৈধ বলে প্রত্যাখ্যান করে বিকালে সারা দেশে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ মিছিল করে। তারই অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম অলংকার মোড়ে পুলিশ ফাঁড়ির সামনে তৌহিদি জনতা বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করে। শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশ অতর্কিতভাবে টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও গুলিবর্ষণ করে। তখন শহীদ আফজাল আহমদ দোকানে কর্মরত ছিলেন। পুলিশের গুলি এসে তার শরীরে লাগে। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর প্রায় ১ ঘন্টা মাটিতে পড়ে থাকেন। পরে তার বন্ধুরা চট্টগ্রাম মেডিক্যালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরের দিনের জাতীয় দৈনিকসমূহে এ বিষয়ে বিস্তারিত নিউজ আসে। দৈনিক আমার দেশ ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ লিখে।
সর্বাতাক হরতাল: চট্টগ্রামে নিহত ৩। পুলিশের বেপরোয়া গুলি, আজও হরতাল, ঢাকা-চট্টগ্রামে বিজিবি মোতায়েন। আবু তাহের ইমরান, আগ্রাবাদে শফিক ও দেওয়ানহাট মোড়ে নিহত হন মো: আফজাল
ছবি: বাঁ থেকে-গতকাল হরতালের সময় সিলেটে শিবির কর্মীদের গুলি করছে পুলিশ। চট্টগ্রামে পুলিশের গুলিতে নিহত শরির কর্মী
চট্টগ্রামে শিবিরের মিছিলে পুলিশের নির্বিচার গুলি: নিহত ৩, আহত শতাধিক চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, চট্টগ্রামের জামায়াত-শিবিরের বিক্ষোভ মিছিলে নির্বিচারে গুলি করেছে পুলিশ। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের গুলিতে অন্তত ৩ জন নিহত হয়েছে। এদের মধ্যে নগরীর অলঙ্কার মোড়ে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবু তাহের ইমরান, আগ্রাবাদে শফিক ও দেওয়ানহাট মোড়ে নিহত হন মো: আফজাল (২৫)। এছাড়া ৩৫ জন গুলিবিদ্ধসহ শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। নিহতের মধ্যে আবু তাহের ইমরান ও আফজাল শিবিরকর্মী বলে জানা গেছে। আগ্রাবাদে নিহত শফিকের পুরো পরিচয় গত রাতে এ রিপোর্ট লেখার সময় জানা যায়নি। তবে তিনি একজন গার্মেন্টকর্মী বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
গতকাল দুপুরে নগরীর অলংকার মোড়ে পুলিশের সঙ্গে শিবিরকর্মীদের সংঘর্ষ চলাকালে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হন ইমরান। অন্যদিকে রাত সাড়ে ৭টার দিকে নগরীর আগ্রাবাদে পুলিশের গুলিতে শফিক ও দেওয়ানহাট মোড়ে পুলিশ-শিবির সংঘর্ষের সময় নিহত হন মো: আফজাল। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, নিহত আফজালের বাড়ি নগরীর পাহাড়তলী থানার কর্নেলহাটে।
ইমরান চট্টগ্রাম মহানগর দক্ষিণ শাখার সাথী পর্যায়ের নেতা। দুপুরে নগরীর অলঙ্কার মোড়ে পুলিশের সঙ্গে শিবিরকর্মীদের সংঘর্ষ চলাকালে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হন ইমরান। নগরজুড়ে দিনভর থেমে ঘেমে সংঘর্ষ চলাকালে প্রায় অর্ধশত যানবাহনে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এদিকে বিক্ষুদ্ধ শিবিরকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে আনতেই অসংখ্য গুলি ও টিয়ারশেল ছোড়া হয়েছে বলে জানান নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার বনজ কুমার মজুমদার। উচ্ছৃঙ্খল শিবিরের হামলায় ১৬ পুলিশ সদস্যও আহত হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি। এছাড়া অলঙ্কার ও মুরাদপুর এলাকা থেকে ১৫ শিবিরকর্মীকে আটক করা হয়েছে। পাঁচলাইশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার দাশ শিবিরের ৮ নেতাকর্মীকে হাতে-পায়ে গুলি করে।
হরতালে সকাল থেকেই নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পিকেটিং শুরু করে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা। এ সময় পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়াও হয়। দিনভর পিকেটিংয়ে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অন্তত অর্ধশত যানবাহন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। দুপুরে জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে। ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষণার পর বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল বের করে দলীয় নেতাকর্মীরা। জামায়াতের দাবি নগরীর বিভিন্ন এলাকায় শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশ অতর্কিত হামলা চালিয়ে মুহুর্মুহু গুলি ছুড়েছে।
বেলা ১টার দিকে অলঙ্কার এলাকায় অর্ধশতাধিক শিবিরকর্মী জড়ো হয়ে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে। মিছিলটি অলঙ্কার মোড়ের দিকে যেতে থাকলে বাদসাধে পুলিশ। এ সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে শিবিরকর্মীদের। মুহূর্তের মধ্যেই উপর্যুপরি গুলিবর্ষণ শুরু করে পুলিশ। পুলিশের অতর্কিত গুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হন শিবিরের সাথী ইমরান খান। একপর্যায়ে ইমরানের নিহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে কয়েকশ শিবিরকর্মী ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। এ সময় পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যানে আগুন ধরিয়ে দেয় ও বেশ কিছু গাড়িতে ভাঙচুর চালায়। একই সময় মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, পোর্ট কানেকটিং রোড, হালিশহর, চকবাজার, দুইনম্বর গেট, নিউমার্কেট, পুরনো স্টেশন, লালদীঘিসহ বিভিন্ন এলাকায় মিছিল বের করে শিবিরকর্মীরা। এসব এলাকায় অন্তত ২০টি যানবাহনে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। মুরাদপুর এলাকায় পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। প্রায় আধা ঘণ্টাব্যাপী এ সংঘর্ষে পুলিশ শিবিরকর্মীদের ওপর শতাধিক রাউন্ড গুলি ছোড়ে। শুধু মুরাদপুর এলাকায় ৩৫ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে মহানগর জামায়াতের পক্ষ থেকে। অনেক নেতাকর্মীকে আটকের পর শরীরে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে জামায়াত। আহতদের মধ্যে আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক সাব্বির আহমেদ, তানজিম উল হাসান, আবদুল ফাত্তাহ, মো: কবির, জিয়াউর রহমান জিয়া, ইসমাইল রাসেল ও হাসান তারেক নীরবকে গুরুতর আহত অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এছাড়া বেশ কয়েকজন নগরীর বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
গতকাল সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত চমেকের অপারেশন থিয়েটারে আশঙ্কাজনক অবস্থায় গুলিবিদ্ধ ৪ নেতাকর্মীর অস্ত্রোপচার চলছিল। এছাড়া উন্নত চিকিৎসার জন্য দুজনকে ঢাকায় নেয়ার প্রস্তুতি চলছিল। কাতালগঞ্জ এলাকায় সংঘর্ষ চলাকালে কাতালশাহ মসজিদের ভেতরেও তাণ্ডব চালিয়েছে পুলিশ। জোহরের নামাজ চলাকালে মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করে মুসল্লিদের বেধড়ক পেটানো হয়েছে।
৪. আফজালের সুখের সংসার
২১ বছর বয়সেই বিবাহ করেছিল আফজাল। বিয়ের ১বছর পরেই ফুটফুটে একটি কন্যাসন্তানের জন্য হয়। নিজের প্রিয়তমা স্ত্রী ও দেড় বছরের শিশুকন্যা আরিনাকে নিয়েই ছিল আফজালের সুখের সংসার। দরিদ্র পরিবারে স্থান সংকুলানের অভাবে নিজ কর্মস্থলের নিকটেই স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে ভাড়া ঘরে থাকতো শহীদ আফজাল। ভাড়া ঘরে থেকেই মা-বাবা ও ভাই-বোনদের নিয়মিত খোঁজ খবর রাখতো। নিজের সাধ্যের মধ্যে পরিবারের চাহিদা মেটাতে সর্বোচ্ছ চেষ্টা করতো আফজাল। সব কিছু মিলিয়ে স্ত্রী-সন্তান, মা-বাবা ও ভাই-বোনদের নিয়ে আফজালের ছোট্ট জীবনটা ছিল অনেক সুখের।
পরিবার দারিদ্র হলেও শহীদের স্বপ্নগুলো ছিল বিশালঃ
আফজালের হৃদয়ে লালন করা স্বপ্নগুলো ছিল অনেক বিশাল। ছোট বোনের বিয়ের দিন ধার্য হয়েছে। বোনের বিয়েটা ধুম-ধাম করে আয়োজনের স্বপ্ন ছিল আফজালের, বন্ধু-বান্ধব ও আত্মত্মীয় স্বজনকে দাওয়াত করতে Invitation কার্ডও ছাপতে দিয়েছিল আফজাল। দরিদ্রতার চিহ্নটাকে চাপা দিয়ে বোনের বিয়েটাকে আরো কিভাবে আকর্ষণীয় করা যায় সেই পেরেশানি ছিল তার।
৫. পরিবারের সাথে শহীদের শেষ স্মৃতি
বোনের বিয়েকে সামনে রেখে নিজের স্ত্রী ও একমাত্র সন্তান আরিনাকে নিয়ে কেনাকাটা করতে যায় আফজাল। নিজেদের পছন্দমত কিছু কেনা-কাটা করে দুপুরের দিকে বাসায় ফিরে আসে। দুপুরের খাওয়া-দাওয়া শেষ করে নিজ কর্মস্থলের দিকে বেরুবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো সে।
-দৌড়ে এসে আব্বুর গলা জড়িয়ে ধরে দেড় বছরের শিশুকন্যা আরিনা। নিজের আদরের সোনামণি আরিনাকে কোলে তুলে কপালে একটা চুমু খায় আফজাল। ইতোমধ্যে স্ত্রীও পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। স্বামীকে লক্ষ্য করে বলে উঠলেন...
-আজ কি কাজে না গেলে হয় না?
আজতো হরতাল, শুনতেছি চারিদিকে গন্ডগোল চলতেছে। আজ একটু বিশ্রাম নেন। স্ত্রী সন্তানের বাধা উপেক্ষা করে জীবিকার অন্বেষণে বেরিয়ে পড়েন আফজাল।
নিজের একমাত্র প্রিয় মানুষটির বেরিয়ে যাওয়া পথের দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে হতভাগা স্ত্রী। তখনো হয়তো সে জানতো না এই কথাগুলো ছিল তার প্রিয় মানুষটির সাথে শেষ কথা। এই বেরিয়ে যাওয়াটাই ছিল আর না ফেরার।
৬. বুলেটের আঘাতে ভেঙে গেল স্বপ্নগুলো
আর মাত্র ১৯দিন পরেই ছোট বোনের বিয়ে ছিল। বোনের বিয়েটা ধুম-ধাম করে আয়োজন করার অনেক স্বপ্ন ছিল শহীদ আফজালের। নিজে তেমন পড়ালেখা করতে না পারলেও নিজের আদরের সন্তান ও ছোট ভাই-বোনদেরকে মানুষের মত মানুষ করার স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু হায়।।
স্বৈরাচারের ঘাতক বুলেট শুধু আফজালের মাথাটা গুঁড়ো করে দেয়নি, গুঁড়ো করে দিয়েছে আফজালের স্ত্রী সন্তান নিয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্নগুলো। দেড় বছর বয়সে আরিনা হারিয়ে ফেললো তার প্রিয় আব্বুকে। একটি দরিদ্র পরিবার হারিয়ে ফেললো তাদের একমাত্র বেঁচে থাকার সম্বল। ছোট বোনের লাল বেনারসী শাড়িটি আরো লাল হয়ে উঠলো আফজালের তাজা রক্তে। সেই লাল বেনারসী শাড়ি পরে আদরের ছোট বোন শ্বশুর বাড়ি গেছে ঠিক, কিন্তু মনে ছিল প্রিয় ভাই হারানোর সীমাহীন দুঃখ।
৭. আফজালের শাহাদাতে স্বজনদের প্রতিক্রিয়া
আফজালের মা এখন সন্তান হারিয়ে প্রায় বাকরুদ্ধ। কারো সাথে মোবাইলে কথা বলা তো দূরে থাক ঘরের মোবাইলটি ছুঁয়েও দেখেন না তিনি। কারণ এই মোবাইলে নিয়মিত আফজাল তার মায়ের সাথে কথা বলতো। এখন যেহেতু আর এই মোবাইলে আফজালের ফোন আসবে না, তাই এই মোবাইলটি মায়ের কাছে অর্থহীন। আফজালের মায়ের সেই একটাই প্রশ্ন, কী অপরাধ ছিল তার সহজ-সরল ছেলেটির? কেন মায়ের বুক থেকে কেড়ে নেয়া হলো পরিবারের একমাত্রা সম্বল আফজালকে? মহান আল্লাহর কাছে ছেলের হত্যাকারীদের বিচার চান তিনি।
প্যারালাইসিস আক্রান্ত বাবা তার প্রিয় ছেলের স্মৃতিগুলো কোনভাবেই ভুলতে পারছেন না। ছেলের স্মৃতি-চারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন আফজালের শাহাদাতের দুইদিন আগেও সে আমার কাছে এসেছিল, আমার পাশে বসে নিজ হাতে আমাকে খাইয়ে দিত। যাবার সময় পকেটে দুই-এক'শ টাকা ঢুকিয়ে দিয়ে বলতো আব্বা এগুলো দিয়ে আপনি চা নাশতা খাবেন।
আফজালের পিতা কান্নাজড়িতকণ্ঠে বলেন, জানি না আমার মত আর কত পিতা এইভাবে তাদের সন্তান হারাবেন? আজ কেউ ঘর থেকে বের হয়ে আবার নিরাপদে ঘরে ফিরে আসবে তার কোন নিশ্চয়তা এই দেশে নেই। জীবন নিয়ে এই অনিশ্চয়তা আর কত দিন চলবে? ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ স্বদেশ কি আমরা দেখে যেতে পারবো না?
ভাই-বোনদের কাছেও বড় ভাই আফজাল ছিল অনুসরণীয়। প্রতিবেশীদের দৃষ্টিতে আফজাল ছিল একজন সহজ সরল প্রকৃতির ছেলে। তার মত এমন ভদ্র ও শান্তশিষ্ট ছেলে এলাকায় খুব কমই আছে। তার অনেকগুলো গুণের মধ্যে একটি বড় গুণ হলো সে কখনো কারো সাথে ঝগড়া করতো না কেউ যদি তার সাথে ঝগড়া করতে চাইতো সুকৌশলে তা সে এড়িয়ে যেত।


৮. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম: শহীদ মো: আফজাল আহমদ (০৮২)। পেশা: দোকান কর্মচারী।
জন্ম তারিখ ও বয়স: ১৯৯৩ সাল, ২০ বছর। আহত হওয়ার তারিখ: ৫ই ফেব্রুয়ারি ২০১৩।
শাহাদাতের তারিখ: ০৫ ফেব্রুয়ারি '১৩, বিকাল ৫টা। স্থান: চট্টগ্রাম অলঙ্কার মোড়। দাফন করা হয়: পারিবারিক কবরস্থান।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: শায়ের পাড়া, ডাকঘর: কর্নেলহাট, থানা: কাট্টলী, জেলা: চট্টগ্রাম।
পিতা: মোঃ আমির আহমদ, ৫৮ বছর মাছ ব্যবসয়ী ছিলেন এখন বেকার।
মাতা: আমেনা খাতুন, ৪৫ বছর, গৃহিণী।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা: বসবাসের নিজস্ব জায়গা ও বাড়ি-ঘর নেই, সবাই ভাড়া বাড়িতে থাকেন। নিজেদের কোন আবাদি জমি নেই। পিতা মাছ ব্যবসায়ী ছিলেন, এখন বেকার।
স্ত্রী ও সন্তানদের বিবরণ: স্ত্রী: লিমা আক্তার। একমাত্র কন্যাসন্তান আরিনা খাতুন, ১৮ মাস।
ভাই-বোনের বিবরণ: শহীদ আফজাল আহমদ। রাবেয়া খাতুন, বিবাহিতা। পারভেজ আহমেদ, ১৫ বছর, মাছ বাজারে কাজ করে। ফয়সাল, ১৩ বছর, মাছ বাজারে কাজ করে। সাইলা, ৭ বছর, শিশু শ্রেনী। ইয়াছিন, ৬ বছর।

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍