হোম / আওয়ামী দুঃশাসনে শহীদ / শহীদ হারুন-অর-রশীদ কায়সার
শহীদ হারুন-অর-রশীদ কায়সার

শহীদ হারুন-অর-রশীদ কায়সার

আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের রাঘবপুরের মেধাবী ও শান্ত স্বভাবের তরুণ হারুন-অর-রশিদ কায়সার। শৈশব থেকেই পড়ালেখা, চরিত্র ও ভদ্রতায় সবার প্রিয় ছিলেন; স্কুল-কলেজে সবসময় প্রথম হওয়া এই ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগেও দ্বিতীয় হয়ে সুনাম কুড়িয়েছিলেন। নিয়মিত নামাজ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জীবন আর মানুষের প্রতি অগাধ মায়ার জন্য সহপাঠী-শিক্ষক-প্রতিবেশী সবাই তাকে “অন্যরকম ভালো ছেলে” হিসেবে চিনত।
কিন্তু ২৮ মার্চ ২০১০ ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষের পর রাতের শাটল ট্রেনে ফেরার পথে কায়সারকে বগিতেই তুলে নির্মমভাবে প্রহার করা হয়; পরে তাকে জবাই করে চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দেয়া হয়। পরদিন চৌধুরীহাট রেললাইনের পাশে মিলল তার নিথর দেহ। খবরটি শুনে হতবাক হয়ে যায় পরিবার, গ্রাম আর বিশ্ববিদ্যালয়।
শত শত মানুষের ঢলে অনুষ্ঠিত জানাজায় বাবা বলেছিলেন, “এই ছেলের নামে কোনোদিন অভিযোগ শুনিনি” আর মা বারবার ভেঙে পড়েছিলেন এই বলে যে, “ফুলের মতো ছেলেটাকে কেন মারল, সে তো কাউকে কোনোদিন কষ্ট দেয়নি।”
শিক্ষক, সহপাঠী ও প্রতিবেশীদের হৃদয়ে কায়সার আজো এক অপূরণীয় শূন্যতা। মেধা, সৌম্য চরিত্র আর স্বপ্নে ভরা এক তরুণের অকালবিলীন হয়ে যাওয়ার নীরব স্মারক।

🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ

শহীদ হারুন-অর-রশীদ কায়সার
চট্টগ্রাম মহানগরী
৫

শহীদের পরিচিতি
ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত নম্র, ভদ্র, স্বল্পভাষী ও অত্যন্ত শান্ত মেজাজের অধিকারী ছিলেন। সাক্ষাতে সবার
সাথে হাসিমুখে সালাম বিনিময় ও কুশল জিজ্ঞেস করতেন। নিজ বাড়ীর আঙ্গিনায় রাঘবপুর সরকারী প্রাথমিক
বিদ্যালয়ে তাঁর পড়ালেখা শুরু হয়। পড়ালেখায় প্রধান সহকারী ছিলেন শ্রদ্ধেয় পিতা। নিয়মিত ক্লাসের
পড়ালেখা আদায় করে প্রথম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রথম স্থান অর্জন করেছিলেন তিনি। সুশৃঙ্খল,
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জীবনযাপনে অভ্যন্ত ছিলেন। প্রতিদিনের কাজ ডায়েরিতে লিখে রাখতেন। ভাল ফলাফল ও
আকর্ষণীয় চরিত্রের কারণে পরিবার, প্রতিবেশী, সহপাঠী আর শিক্ষকদের অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন।
মেধার স্বাক্ষর রেখে উচ্চ শিক্ষার আশায় ভর্তি হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগে। সেখানেও অসাধারণ মেধার স্বাক্ষর রেখে বিভাগে দ্বিতীয় স্থান লাভ করেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাহচর্যে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীও হয়েছিলেন। নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়, কোরআন তেলাওয়াত ও পড়ালেখার পাশাপাশি তিনি নিজের সাধ্যমত অন্যকে সহযোগিতাও করতেন। সকল আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য সব সময় খোঁজ খবর নিতেন। পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, শিক্ষক আর সহপাঠীদের হৃদয়ে তিনি তার মজবুত অবস্থান তৈরি করে নিয়েছেন।

শাহাদাতের ঘটনা
২৮ মার্চ ২০১০ তারিখে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ নং গেইটে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের তুমুল সংঘর্ষ বাধে। থমথমে একটি পরিবেশ সৃষ্টি হয়। ছাত্রলীগ তাদের মধ্যকার এই দ্বন্দ্বকে ধামাচাপা দেয়ার উদ্দেশ্যে আরেকটি অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করার উদ্যোগ নেয়। রাতের ট্রেনে ক্যাম্পাসে ফেরার পথে মার্কেটিং বিভাগে অধ্যায়নরত বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কর্মী হারুন-অর-রশীদ কায়সারকে ট্রেনের বগিতে নির্মমভাবে প্রহার করে। এক পর্যায়ে হায়েনারা কায়সারকে নিষ্ঠুরভাবে জবাই করে তার লাশ চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দেয়। ঘটনাটি যাতে প্রকাশ না পায় সে জন্য বগিতে অবস্থানরত সবাইকে হত্যার হুমকি দেয়। পরদিন হারুনুর রশিদ কায়সারের লাশ চৌধুরীহাট এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়।

জানাযা ও দাফন
শাহাদাতের খবর ছড়িয়ে পড়লে প্রথমে কেউ বিশ্বাসই করতে পারেনি এমন ছেলেকে কেউ কোনদিন মারবে। শহীদের লাশ বাড়িতে পৌঁছালে শত শত মানুষের ঢল নামে। জানাযায় উপস্থিতির সংখ্যা সম্পর্কে শহীদের বাবা বলেন, আমাদের এলাকায় এর আগে এত বড় জানাযা কারও হয়নি। তার জানাযার নামাজের ইমামতি করেন তার ভুল শিক্ষক মাওলানা গোলাম কিবরিয়া। জানাযার নামাজ শেষে পারিবারিক কবস্থানে দাদা-দাদীর পাশে তাকে কবরস্থ করা হয়।

মায়ের প্রতিক্রিয়া
সন্তান হারানোর বেদনা সন্তান গর্ভে ধারণ করে তিল তিল করে গড়ে তোলা প্রিয় মায়ের চেয়ে বেশি দুনিয়ার আর কারও হতে পারে না। তার উপর কায়সারের মত ছেলে হলে তো কথাই নেই। মা বলেন- কায়সার যখন গর্ভে তখন স্বপ্ন দেখেছিলাম, পুরুষ খেজুর গাছে (যে গাছে কখনও খেজুর ধরে না) পাকা খেজুর ধরেছে। কায়সারের দাদী ব্যাখ্যা করলেন তোমার কোলে এমন শিশু আসবে যার জন্য তুমি গর্বিত হবে। প্রিয় মা কি কখনো কল্পনা করেছেন এইভাবে মহান আল্লাহ তার সন্তানকে কবুল করে তাকে গর্বিত করবেন। কিন্তু, মা বলে কথা। সংসারের বড় ছেলে, তারপর আবার ফুলের মত, যেমন সুন্দর তার চেহারা তেমনি অসাধারণ চরিত্র। সন্তান হারানোর বেদনায় তিনি মাঝে মাঝে খুব বেশি অসুস্থ হয়ে যান। মা বলেন- আমার স্বপ্ন বলতে আর কিছুই নেই, আমার হাতে গড়া এত বড় ফুলের মতো ছেলেকে হারানোর ব্যথা কাউকে বুঝাতে পারছি না, শত্রুরা কেন আমার সোনামণিকে মারল, সে তো কোনদিন কারো ক্ষতি করেনি। আজ ছাত্রশিবিরের ছেলেদের বুক ভরা ভালবাসাই আমাকে বেঁচে থাকার উপায় যুগিয়েছে।

বাবার প্রতিক্রিয়া
শহীদের বাবা বলেন- আমার স্কুলের ছাত্র ছিল কায়সার। কোনদিন কেউ তার নামে আমাকে কোন অভিযোগ করেনি। সে এমনভাবে মাটিতে দৃষ্টি রেখে আলতোভাবে পথ চলতো যে, তার অনুভূতি এমন যে, মাটি বুঝি ব্যাথা পাচ্ছে। কারও সাথে রাগ করে ধমক দিয়ে কোনদিন কথা বলেনি কায়সার। তাকে হারিয়ে আমার যে আর কোন স্বপ্ন নেই। আজ আমার ছেলে শহীদ হওয়ায় যে সম্মান আমি পেলাম তা আগে কখনো পাইনি। শিবিরের ছেলেদের আন্তরিকতা আর ছোট ছেলেটিকে আগলে রেখে কায়সারকে হারানোর দুঃখ আমি ভুলে গেছি। জানি না শত্রুদের বিচার এই জমিনে হবে কি না? যদি হতো তবে মনে বড় শান্তি পেতাম। এখন একমাত্র আল্লাহর কাছেই বিচার চাই।

বোনের প্রতিক্রিয়া
কায়সারের একমাত্র ছোট বোন তার ভাই সম্পর্কে বলেন- আমার ভাইয়ার মত ছেলে আমাদের গ্রামে একজনও খুঁজে পাওয়া যাবে না। শত্রুরা কেন আমার ভাইকে মেরেছে তা এখনও আমার বুঝে আসে না। মাঝে মাঝে মনকে বুঝাতে পারি না যে, ভাইয়া নেই। আমার প্রথম কন্যাসন্তানটির জন্মের সুখবরটুকুও আমার ভাইয়াকে দিতে পারিনি।

শিক্ষকদের প্রতিক্রিয়া
কায়সার সম্পর্কে তার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা জাহানারা বেগম বলেন, কায়সার খুব শান্ত মেজাজের অন্য রকম ছেলে ছিল। নিয়মিত পড়া শিখে আসতো। কারও সাথে ঝগড়া করতো না। নিয়মিত স্কুলে আসতে রাস্তার পাশে তার কবর যখন চোখে পড়ে তখন তার স্মৃতি মনে পড়ে যায়, আল্লাহর কাছে তার মর্যাদার জন্য দোয়া করি। তার অন্য এক স্কুল শিক্ষক জানান, পরীক্ষার রেজাল্ট হলে সবাই যখন আনন্দে উল্লসিত তখন মসজিদের দিকে কায়সারকে যেতে দেখে অবাক হয়ে যেতাম। হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক সাধন চন্দ্র শীলসহ অন্যান্য শিক্ষক-শিক্ষিকাদেরও একই কথা- এমন ছেলেকে কেউ মারবে তা আমরা ভাবতেও পারি না। মেধাবী ছাত্র হওয়াতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও সুনজরে ছিলেন হারুন অর রশীদ কায়সার।

প্রতিবেশীদের প্রতিক্রিয়া
প্রতিবেশীদেরও একই মন্তব্য, কায়সারের মতো ভাল ছেলে শুধু রাঘবপুর কেন সারা বাংলায়ও খুঁজলে খুব বেশি পাওয়া যাবে না। এই ছেলেকে মারার মতো কোন কারণ আমরা খুঁজে পাই না।

গণমাধ্যমে শাহাদাতের খবর
অনলাইন পত্রিকা আরটিএনএন ৩০ মার্চ ২০১০ "চবিতে এক শিবিরকর্মী হারুন-অর রশীদ কায়সারের লাশ উদ্ধার" শিরোনামে নিম্মোক্ত খবর প্রচার করে-
rtnn ঢাকা, ৩০ মার্চ (আরটিএনএন ডটনেট): চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) হারুন-অর রশীদ কায়সার নামে আরো এক শিবিরকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। কায়সার মার্কেটিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। এই নিয়ে গত দুই মাসে তিন শিবির নেতা-কর্মী নিহত হয়েছে।
সোমবার সকালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন চৌধুরী হাট এলাকায় রেল লাইনের উপর থেকে কায়সারের লাশ উদ্ধার করা হয়। ওইদিন তার লাশ সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, রবিবার সন্ধ্যার পরে কোন এক সময় তাকে হত্যা করা হয়েছে।
এদিকে শিবিরকর্মী কায়সার হত্যার জন্য ছাত্রলীগকে দায়ী করে অবিলম্বে জড়িতদের গ্রেপ্তার ও শান্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছে।
কায়সার হত্যার প্রতিবাদে সংগঠনটি তিনদিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- ভিসি বরাবর স্মারকলিপি পেশ এবং মহানগর ও জেলা সদরে মানববন্ধন।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কায়সার হত্যার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
কায়সারের সহপাঠীরা জানায়, কায়সার একজন মেধাবী ছাত্র। সে দ্বিতীয় বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষায় ২য় স্থান অধিকার করেছিল। কায়সার শাহজালাল হলের ১/১ (এক্সটেনশন) নম্বর কক্ষের আবাসিক শিক্ষার্থী। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রাম জেলার মিরসরাই থানাধীন রসুলপুরে।
উল্লেখ্য, গত ১১ ফেব্রুয়ারি শিবিরকর্মী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র মহিউদ্দিন মাসুমকে এলোপাথাড়ি কুপিয়ে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এর কয়েকঘন্টা আগেই চাঁপাইনবাবগঞ্জে পুলিশের গুলিতে নিহত হয় শিবির নেতা শাহীন।

এক নজরে শহীদ হারুন-অর-রশিদ কায়সার
নাম: হারুন-অর-রশিদ কায়সার
পিতা: দিদারুল হক, পেশা: শিক্ষকতা
মাতা: কামরুন নাহার, পেশা: গৃহিণী
ভাইবোন: ২ ভাই, ১ বোন (সবার বড়)
ঠিকানা: রাঘবপুর, বরঘার হাট, মীরসরাই, চট্টগ্রাম
সাংগঠনিক মান: কর্মী
সাংগঠনিক দায়িত্ব: উপশাখার প্রকাশনা সম্পাদক, ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ, চবি
আহত হওয়ার স্থান ও ধরন: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাটল ট্রেন থেকে অপহৃত এবং জবাই করে হত্যা করা হয়
শিক্ষাগত যোগ্যতা: মার্কেটিং ৩য় বর্ষ (সম্মান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়)
শাহাদাতের তারিখ: ২৮ মার্চ ২০১০
শাহাদাতের স্থান: চৌধুরী হাট রেলস্টেশন, হাটহাজারি
যাদের আঘাতে শহীদ: ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীবাহিনী
যে শাখার শহীদ: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
জীবনের লক্ষ্য: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍