হোম / আওয়ামী দুঃশাসনে শহীদ / শহীদ মোঃ খলিলুর রহমান মল্লিক
শহীদ মোঃ খলিলুর রহমান মল্লিক

শহীদ মোঃ খলিলুর রহমান মল্লিক

আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

শহীদ মোঃ খলিলুর রহমান মল্লিক ছিলেন ন্যায়ের পথে অবিচল এক যুবক, যিনি ছোটবেলা থেকেই সেবা ও আত্মত্যাগকে জীবনের মূল আদর্শ মানতেন।
অধ্যয়ন, দীনদায়িত্ব ও সমাজসেবায় সমান নিবেদিত তিনি অন্যায়ের মুখে কখনো মাথা নত করেননি।
সাহসিক নেতৃত্বে তিনি তরুণদের শিখিয়েছেন নিজের উন্নতির সাথে সমাজের কল্যাণই প্রকৃত সফলতা।
হরতালের দিনে অন্যায়ের প্রতিবাদে এগিয়ে গিয়ে অন্যদের রক্ষা করতে গিয়েই তিনি জীবন উৎসর্গ করেন।
তার সংগ্রামী চরিত্র আজো স্মরণ করায় মানুষ বাঁচে তার নীতিতে, আর অমর হয় তার সাহসে।

🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ

শহীদ মো: খলিলুর রহমান মল্লিক
ঢাকা-৩
"ছোটবেলা থেকেই খলিল ছিলেন প্রখর মেধাবী। মানবসেবা ছিলো তার নেশা। নিজে না খেয়ে অপরকে খাইয়ে তিনি তৃপ্তি পেতেন। ছোট বেলায় ১৮ পাড়া কুরআন হেফজ করেছেন তিনি।নিয়মিত তাহাযযুদের নামায আদায় করতেন। তার ছোট ভাই আব্দুল্লাহ খোকন একই সাথে ঢাকার বাসায় থাকতেন। খোকন বলেন, আমি আমার ভাইকে মাঝে মধ্যে বলতাম ভাই, আমি আগে শহীদ হবো নাকি তুমি? ভাই উত্তরে বলতেন, তোর চেয়ে আমি বেশি আমল করি তাই আমিই আগে শহীদ হবো।এই কথা বলে খোকন কান্নায় ভেঙে পড়েন।খোকনের ভাষায় আমার ভাইয়ের দোয়া আল্লাহ কবুল করেছেন। আমার ভাই আমাকে বলেছিলেন আমি ব্যারিস্টার হয়ে সমাজের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে বিনা পয়সায় মানুষের সেবা করবো। শেষ বারের মতো আমার ভাই আমার সাথে মোবাইলে বলেছেন, হরতাল শেষ হলে আমি বাড়ি আসবো।তুই গরিব মানুষের একটা লিস্ট করে রাখিস।এসে তাদের জন্য কিছু সহযোগিতা করবো।ভগ্নিপতি আব্দুল হালিম জানিয়েছেন,খলিল ঢাকায় রাজনীতি করলেও পুলিশ এখানে তার জানাযা পড়তে দেয়নি।একটি মুসলিম দেশে এ অবস্থা মেনে নেয়া যায় না। তাই আমরা তার কফিন গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছি।"
১. শহীদের পরিচিতি
শহীদ খলিলুর রহমান মল্লিক পাবনা জেলার সাঁথিয়া থানার করমজা গ্রামে ১৯৯৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ৬০ বছর বয়েসী কৃষক পিতা আঃ বাতেন মল্লিক ও মাতা: মোছা: জোমেলা বেগম-এর পাঁচ সন্তানের দ্বিতীয় সন্তান ছিলেন। বড় সন্তান হিসাবে পরিবারের অতি প্রিয় খলিলুর রহমান ইসলামী ছাত্রশিবিরের সদস্য ছিলেন এবং যাত্রাবাড়ী থানার ৮৮ নং ওয়ার্ড সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করতেন। তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসায় ফাজিল ১ম বর্ষ এবং বাংলাদেশ ইসলামী ইউনিভার্সিটিতে ইসলামিক স্টাডিস বিভাগে অনার্স ১ম বর্ষে লেখাপড়া করতেন। একজন বড় আলেম হওয়ার স্বপ্ন ছিল তার।নিজ উদ্যোগে তিনি পবিত্র কুরআনের ১৮ পারা পর্যন্ত হিফজ করেছিলেন। দ্বীনি দায়িত্ব পালনে তিনি সদা তৎপর থাকতেন।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিলের প্রতিবাদে ১৩ ও ১৪ আগস্ট'১৩ হরতালের ডাক দিলে ১৪ আগস্ট'১৩ তারিখ সকাল বেলা পিকেটিং করতে গেলে ঢাকা যাত্রাবাড়ীর দনিয়াতের পুলিশ পিছন দিক থেকে গুলি করে তাকে শহীদ করে দেয়।
৩. শাহাদাতের পূর্বের বিভিন্ন ঘটনা
শহীদ খলিল মল্লিক শিবিরের কেন্দ্র ঘোষিত প্রোগ্রাম বৃক্ষ রোপণ কর্মসূচিতে সকলের উদ্দেশে বলেছিলেন আমরা যারা ছাত্র আছি তাদের উচিত লেখা-পড়ার পাশাপাশি সমাজের কল্যাণমূলক কাজ করা। নিজেকে সৎ দক্ষ হিসাবে গড়ে তোলা। এতে নিজে লাভবান হওয়া যায়। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে কিছু দেওয়া যায়।
৪. সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
ধর্মনিরপেক্ষ আওয়ামী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ইসলামী আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের উপর সীমাহীন জুলুম নির্যাতন চালিয়ে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় তথাকথিত যুদ্ধাপরাধ মামলাসহ অন্যান্য বিষয়কে সামনে এনে ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীদের উপর সীমাহীন জুলুম নির্যাতন শুরু হয়। এক পর্যায়ে তারা জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করে দেয় এর প্রতিবাদে ১৩ ও ১৪ আগস্ট ২০১৩ হরতালের ডাক দেয় জামায়াত ইসলামী। ঢাকা মহানগরীর যাত্রাবাড়ী খানা এই হরতাল সফল করতে ১৪ আগস্ট ফজর নামায শেষ করে মিছিল শুরু করে। এই মিছিলেই সামনে ছিলেন শহীদ খলিল মল্লিক। মিছিলের পূর্বে তিনি তার সাথীদের বলেন, অনেক মিছিল করেছি আমার কিছু মনে হয়নি। কিন্তু আজ আমার কেমন যেন লাগছে। মিছিলের শেষ পর্যায়ে আওয়ামী গুন্ডা বাহিনী ও পুলিশ পিছন থেকে গুলিবর্ষণ করলে অনেকের সাথে খলিলুর রহমান মল্লিক গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং শাহাদাত বরণ করেন। পরের দিনের জাতীয় দৈনিক সমূহে এ বিষয়ে বিস্তারিত রিপোর্ট আসে। ১৫ আগস্ট ২০১৩ দৈনিক সংগ্রাম লিখে;
পুলিশি হামলায় নিহত শিবির নেতা শহীদ খলিলুর রহমান
সারা দেশে গুলিবিদ্ধ ৩৫ আহত ৬৫
হরতালের দ্বিতীয় দিনে রাজধানীতে পুলিশের গুলিতে শিবির নেতা নিহত পুলিশি হামলায় নিহত শিবির নেতা শহীদি খলিলুর রহমান
স্টাফ রিপোর্টার: জামায়াতের ডাকা ৪৮ ঘণ্টা হরতালের দ্বিতীয় দিন রাজধানীতে বিনা উস্কানিতে পুলিশ সরাসরি গুলি চালিয়ে হত্যা করেছে ইসলামী ছাত্রশিবির নেতা খলিলুর রহমানকে। দনিয়ায় মিছিলের শেষ দিকে অতর্কিত হামলা চালিয়ে গুলি করে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যায় শিবিরের ৮৮ নম্বর ওয়ার্ড সভাপতি খলিলুর রহমান। সাংবাদিকসহ আহত হন ১৫ জন। পুলিশ শহীদ খলিলুর রহমানের নামাযে জানাযা পর্যন্ত রাজধানীতে করতে দেয়নি। শুধু রাজধানীই নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে গুলিবিদ্ধ হয়েছে ৩৫ জন, আহত হয়েছে ৬৫ জন, এর মধ্যে ১ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এছাড়া ভ্রাম্যমাণ আদালত ৪ জনকে ৬ মাস করে এবং ১ জনকে ৪ মাসের কারাদন্ড দিয়েছে।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ করে পিকেটিং করে হরতাল সমর্থকরা। বিভিন্ন স্থানে হরতালের সমর্থনে রাস্তায় নেমে আসে জনতা। সর্বাত্মক হরতালে অচল হয়ে পড়ে গোটা দেশ। স্বতঃস্ফূর্ত হরতালে স্থবির হয়ে পড়ে জনজীবন। চলেনি গণপরিবহন।
জামায়াতে ইসলামীর ডাকে গত মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে দেশব্যাপী লাগাতার ৪৮ ঘণ্টার হরতাল শুরু হয়। আজ সকাল ৬টা পর্যন্ত হরতাল চলবে। সারা দেশে অব্যাহত গ্রেফতার ও জুলুম, নির্যাতন এবং জামায়াতে ইসলামীকে নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে এ হরতাল আহ্বান করা হয়। গতকাল বুধবার সকালে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর দনিয়ায় পুলিশের গুলিতে খলিলুর রহমান নামে এক শিবির নেতা নিহত হয়েছেন। নিহত খলিলুর রহমান শিবিরের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের ৮৮ নম্বর ওয়ার্ড সভাপতি ছিলেন। নিহত খলিল বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি পাবনার সাঁথীয়া উপজেলার মল্লিক পাড়ায়। এদিকে যাত্রাবাড়িতে খলিলের জানাযা পড়তে দেয়নি পুলিশ। পরে লাশ তার গ্রামের বাড়ি পাবনায় নিয়ে যাওয়া হয়। পাবনার সাঁথিয়ার করমাজা মাঠে আজ সকাল ৯টায় তার নামাযে জানাযা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, গতকাল সকাল সাতটার দিকে স্থানীয় জামায়াত শিবির নেতা-কর্মীরা হরতালের সমর্থনে দনিয়া এ কে স্কুলের সামনে থেকে একটি মিছিল বের করেন। এ সময় যাত্রাবাড়ী এবং কদমতলী পুলিশ খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায়। ইতোমধ্যে মিছিলটি দনিয়া ইউনিয়ন অফিসের সামনে পৌঁছে। এসময় এই দুই থানার পুলিশ সামনে এবং পিছনের দিক থেকে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে থাকে। এতে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশই ছিল বেশি উৎসাহী। এসময় গোটা এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মিছিলকারীসহ এলাকার মানুষ ছুটাছুটি করতে থাকে। পুলিশের গুলিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন শিবির নেতা খলিল। জীবন বাঁচাতে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন তিনি। এ সময় পিছনের দিক থেকে পুলিশের একটি গাড়ি তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। এ সময় তিনি মাথায় আঘাত পান। প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র আরও জানায়, ঘটনাস্থলেই খলিল মারা যান। এ সময় মিছিলকারীরা চলে গেলে পুলিশ তার মৃতদেহ মিটফোর্ড হাসপাতালে নিয়ে যায়। পুলিশের গুলিতে সাংবাদিক পথচারীসহ আরও ১৫ জন আহত হন।
প্রত্যক্ষদর্শী এক মহিলা জানিয়েছেন, প্রথমে পুলিশ এলোপাতাড়ি গুলি করলে খলিল রাস্তায় পড়ে যান। পরে পুলিশ তাকে ধরে ওঠায়। এ সময় তিনি জীবিত ছিলেন। পরে পুলিশ তার মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করে। এতে তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান। কদমতলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাযহারুল ইসলাম জানান, মৃতদেহটি জামায়াত-শিবির কর্মীর। পুলিশ ধাওয়ায় জামায়াত-শিবির কর্মীরা পালানোর সময় গাড়ির সঙ্গে ওই ছেলেটির ধাক্কা লাগে। এতে তার মাথা থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান বলে দাবি করেন তিনি।
মিটফোর্ড হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক আব্দুর রশিদ সাংবাদিকদের বলেন, সকাল সোয়া ৭টার দিকে পুলিশ ওই যুবককে হাসপাতালে আনে। তবে সে আগেই মারা যায়। নিহত যুবকের মাথায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে রাবার বুলেটের জখমের চিহ্নও রয়েছে।
শিবিরের প্রচার বিভাগের নেতা জামাল উদ্দিন দাবি করেন পুলিশের গুলিতে খলিল নিহত হয়েছেন। তিনি জানান, খলিলের বাড়ি পাবনার সাঁথিয়ায়। তার বাবার নাম আব্দুল বাতেন। তিনি একজন কৃষক।
এদিকে তার ভগ্নিপতি আব্দুল হালিম দৈনিক সংগ্রামকে জানিয়েছেন, খলিল তা'মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসা থেকে দাখিল এবং আলিম পাস করেন। তিনি বাংলাদেশ ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স প্রথম বর্ষের ইসলামিক স্টাডিজের ছাত্র। একই সাথে তিনি তা'মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসায় ফাযিলে অধ্যয়ন করছেন। চার ভাই বোনের মধ্যে দ্বিতীয় সন্তান খলিল।
তিনি আরও জানান, খলিল ঢাকায় রাজনীতি করলেও পুলিশ এখানে তার জানাযা পড়তে দেয়নি। একটি মুসলিম দেশে এ অবস্থা মেনে নেয়া যায় না। তাই আমরা তার কফিন গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছি।
এদিকে তার জানাযায় পুলিশি বাধার নিন্দা জানিয়েছেন যাত্রাবাড়ী জামায়াতের আমীর আব্দুস সবুর এবং সেক্রেটারি আব্দুল মান্নান। এক বিবৃতিতে তারা বলেন, একটি গণতান্ত্রিক দেশে এ অবস্থা মেনে নেয়া যায় না। গণতান্ত্রিক দেশে মিছিল-মিটিং করার অধিকার সবার রয়েছে। কিন্তু সরকার তা করতে দিচ্ছে না। ঘর থেকে বের হলেই পুলিশ নির্বিচারে গুলি করছে। পুলিশ জানাযার নামায পর্যন্ত পড়তে দিচ্ছে না। জনগণ এ অন্যায়ের জবাব দিতে প্রস্তুত। ১৬ আগস্ট ২০১৩ দৈনিক সংগ্রাম লিখে।
হরতালে শিবির নেতাকে গুলি করে হত্যা পুলিশের নৃশংসতা ও মিথ্যাচার
তোফাজ্জল হোসেন কামাল: জামায়াত মার বিচার হবে না, এমনতর নির্দেশনা সরকারের সংশ্লিষ্ট তরফ থেকে দেয়া হয়েছে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী পুলিশকে। এই নির্দেশ গত রোববার পাওয়ার পরই পুলিশ জামায়াতের ডাকা দু'দিনের হরতাল নিয়ে নতুন করে চিন্তা ভাবনা শুরু করে। এই চিন্তা ভাবনার ফসল ফলেছে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে গত বুধবার। দেশবাসীর সাথে বিশ্বও দেখেছে বাংলাদেশের জানমালের নিরাপত্তা সুদৃঢ় করার দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনী পুলিশ কতটা নৃশংস, কতটা নির্মম। তার সাথে তাদের জঘন্য মিথ্যাচার বিস্মিত করেছে, হতবাক করেছে। লজ্জাবনত করেছে পুলিশের গুলিতে নিহত খলিলের পরিবারের কাছে জাতীর বিবেককে। পুলিশ দায় এড়াতে একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেয়। এটি ছিল পুলিশের নির্লজ্জ মিথ্যাচারের সর্বশেষ প্রচেষ্টা। যা পরিণত হয়েছিল শহীদ খলিল ও তার পরিবারের সাথে চরম প্রহসনে।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে সেদিন যা ঘটেছিল
একটি জাতীয় দৈনিক ঘটনার বর্ণনা এভাবে দেয়, হতভম্ব এলাকাবাসী। আতঙ্কিত প্রত্যক্ষদর্শীরা। দিনেদুপুরে পুলিশ এভাবে কাউকে গুলি করে মারতে পারে- একথা যেনো বিশ্বাস করতে তাদের কষ্ট হচ্ছে। গত (বুধবার) সাতসকালে দনিয়া ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় ও ব্রাইট স্কুলের সামনে পুলিশের নির্মমতা দেখে অনেকেই হতবিহ্বল হয়ে পড়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনানুযায়ী শিবিরকর্মীরা তখন ব্যানার নিয়ে মিছিলের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে পুলিশের গাড়ি আসে। এতে মিছিলকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পালাতে থাকলে পুলিশ পেছন থেকে গুলি করে। তাতেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন খলিল। মৃত্যু নিশ্চিত জেনে পুলিশ হত্যার দায় এড়ানোর জন্য গুলিবিদ্ধ খলিলের নিথর দেহের মাথার অংশে গাড়ি চাপা দেয়। কী মর্মান্তিক দৃশ্য। দৃশ্যটি দেখে অনেকেই হতবিহ্বল হয়ে পড়েন। প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় এক দোকানদার বলেন, ওই ভয়ানক দৃশ্য দেখার পর থেকে আমি স্বাভাবিকভাবে থাকতে পারছি না। চোখের সামনে শুধুই দৃশ্যটি ভাসছে।
আরেক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, চোখের সামনে দারোগা দীপকে গুলি করতে দেখলাম। পরে টিভিতে শুনলাম শিবির নেতা নাকি গাড়ি চাপায় মারা গেছেন। পুলিশ এহেন মিথ্যা কথা বললো কিভাবে। রাতে ডিএমপির মিডিয়া সেল থেকেও দাবি করা হয়েছে শিবির নেতা গাড়ি চাপায় মারা গেছে। পুলিশের গুলিতে নয়। মিটফোর্ড হাসপাতালের ডাক্তারও জানিয়েছেন নিহত খলিলের দেহে বেশ কয়েকটি গুলি পাওয়া গেছে। তবে তার মাথায় কোন গুলি লাগেনি। প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় শিবির নেতা খলিলকে গুলি করার সময় যাত্রাবাড়ী থানার ওসি (তদন্ত) অবণী, এসি মিনহাজ, এসআই প্রদীপ কুমার দীপসহ বেশ কয়েকজন ছিলেন। খবর পেয়ে কদমতলী থানা পুলিশের একটি গাড়িও আসে সেখানে। হত্যার দায় এড়াতে নিহত খলিলের লাশ গছিয়ে দেয়া হয় কদমতলী থানা পুলিশকে।
পুলিশ দাবি করেছে, খলিল বাস চাপায় মারা গেছে। দনিয়া একে স্কুল রোডে বাস এলো কোত্থেকে? প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ওই সময় দনিয়ার রাস্তায় দু'একটি রিকশা ছাড়া কোন গাড়ি ছিল না। সকালে পুলিশের গাড়ির আগে ওই রাস্তার অন্য কোন গাড়ি চলতে দেখেনি কেউ। একেতো হরতাল। রাজপথ ফাঁকা। সকালে দু'একটি বাস চলতে দেখা গেছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে। সেখানে দনিয়া এলাকায় গাড়ি আসলো কোথেকে? শিবিরকর্মীরা মিছিল থেকে কোন গাড়িই বা ভাঙচুর করলো? প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গুলি করে মারার পর পুলিশ ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য পুরো এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করে। এ বিষয়ে যাতে কেউ মুখ না খোলে সেজন্যই শাসানো হয় স্থানীয়দের। প্রত্যক্ষদর্শীরা এজন্যই তাদের নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, হরতাল এলেই আমরা টিভিতে দেখি দেশের বিভিন্ন এলাকায় মিছিল-মিটিং হচ্ছে। কিন্তু যাত্রাবাড়ীতে মিছিল বের করতে না করতেই পুলিশ গুলি করে। এর আগে বহুবার এমন ঘটনা ঘটেছে। এলাকার মধ্যে মিছিল হলে কি এতো বড় ক্ষতি হতো। ঈদের পর দিন সাবেক এমপি সালাহউদ্দিনের নেতৃত্বে বিশাল মিছিল হলো। আওয়ামী লীগও মিছিল করে। তাতে কি এমন ক্ষতি হয়। আর হরতালে এখানে মিছিল করলেও ভাঙচুর করার কোন সুযোগ ছিল না। পুলিশ মিছিলকারীদের গ্রেফতার করতে পারতো।
যাত্রাবাড়ী থানার দুই ওসির সমালোচনা করে এলাকাবাসীর অনেকেই বলেছেন, পাড়ায় পাড়ায় দেদার মাদক। ব্যবসা চলছে। চলছে দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি। নকল কারখানায় ছেয়ে গেছে পুরো এলাকা। রাত হলেই পুলিশকে অলিতে-গলিতে ঘুরে ঘুরে টাকা তুলতে দেখা যায়। ওসির ফি'র অত্যাচারে অনেকেই অতিষ্ঠ। তার বিরুদ্ধে নির্যাতন করে টাকা আদায়ের অভিযোগও আছে। লাখ লাখ টাকার অবৈধ বাণিজ্যকে আড়াল করতেই দুই ওসি সাংবাদিক দেখলেই চটে যান। আর দুর্নীতিবাজ এই দুই ওসিকে শেল্টার দিয়ে যাচ্ছেন এসি মিনহাজ। গত বুধবার তার নির্দেশেই খলিলকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে এসআই দীপ। এলাকাবাসী এ ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করে বলেছেন, একজন মানুষকে এভাবে গুলি করে হত্যা করার কোন অধিকার পুলিশের নেই। এটা যদি রাজপথে হতো তাও একটা কথা ছিল। এলাকার মধ্যে দুটো স্কুলের সামনে এই ঘটনা যেকোন পৈশাচিকতাকে হার মানায়। এর বিচার হওয়া উচিত। তা না হলে এর দায়-দায়িত্ব সরকারকেই বহন করতে হবে। প্রত্যক্ষদর্শী একজন অভিভাবক বলেন, আমি তখন আমার বাচ্চাকে নিয়ে ব্রাইট স্কুলের সামনে দাঁড়ানো। কোন গাড়ি বা বাস কিছুই ছিল না রাস্তায়। হঠাৎ দেখলাম দৌড়াদৌড়ি শুরু হলো। এরপর গুলির আওয়াজ শুনলাম। আমার বাচ্চা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে চিৎকার করাতে আমি তাকে নিয়ে পাশের এক গলির দিকে দৌড় দেই।
শিবির নেতার মৃত্যুতে ডিএমপি যে ব্যাখ্যা দেয় জামায়াতের ডাকা টানা ৪৮ ঘণ্টার হরতালের দ্বিতীয় দিন। মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর কদমতলী থানাধীন দনিয়ায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে শিবিরের ঢাকা মহানগর ৮৮ নম্বর ওয়ার্ড সভাপতি খলিলুল রহমান নিহত হয়।
পুলিশের গুলিতে শিবির নেতার নিহতের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এর ব্যাখ্যা দেয়। ব্যাখ্যায় দাবি করা হয়েছে পুলিশের গুলিতে নয়, গাড়ির ধাক্কায় খলিলুরের মৃত্যু হয়েছে।
ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, মঙ্গলবার সকাল ৭টায় কদমতলী থানাধীন একে স্কুলের সামনে জামায়াত শিবিরের ৪০-৫০ জন পিকেটার জঙ্গি মিছিল বের করে। মিছিলটি ৬২১ ধনিয়া ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের সামনে রাস্তার ওপর পৌঁছায়। তৎক্ষণাৎ সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার মোঃ মিনহাজুল ইসলামের নেতৃত্বে কদমতলী থানার টহল পুলিশ ও যাত্রাবাড়ী থানার টহল পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পুলিশকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি ককটেল ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ও জান-মাল রক্ষার্থে পুলিশ পাল্টা রাবার বুলেট ছুড়ে। তখন ঘটনাস্থলে অনেক সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন।
এমতাবস্থায় পিকেটাররা ছত্রভঙ্গ হয়ে দৌড়ে পালাতে শুরু করে। দৌড়ে পলায়নকালে ৮৮নং ওয়ার্ড শিবির। সভাপতি মোঃ খলিলুর রহমান (২০) তার অসতর্কতাবশত চলন্ত গাড়ির সাথে ধাক্কা খেয়ে রাস্তায় পড়ে গিয়ে মাথায় গুরুতর জখমপ্রাপ্ত হয়। পুলিশের টহল টিমের এসআই রূপ কুমার তাকে চিকিৎসার জন্য দ্রুত মিডফোর্ড হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
"জামায়াত মার, বিচার হবে না"
সরকারের সংশ্লিষ্ট তরফ থেকে জামায়াতের ডাকা মঙ্গল ও বুধবারের হরতালের আগে গত রোববার পুলিশকে নির্দেশনা দেয়া হয় "জামায়াত মার, বিচার হবে না"। এই নির্দেশ পুলিশের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতনদের মাধ্যমে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে দেয়া হয়। পুলিশ হয়ে পড়ে ঔদ্ধত্য। নৃশংস আচরণের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পুলিশ গত ২ দিনের হরতালে ছিল মারমুখী। বাহিনীটির ঐতিহ্য রক্ষায় পুলিশ সদস্যরা সদা সর্বদা জিরো টলারেন্স বজায় রাখলেও কতিপয় অতিউৎসাহী দফায় দফায় বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে পুলিশকে। বিতর্কের নতুন মাত্রায় ফেলেছে গত বুধবার রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে শিবির নেতা খলিলের ওপর নির্মমতা চালিয়ে। এই নির্মমতায় যারা জড়িত তাদের ৩ জনই বিশেষ গোষ্ঠীর করিৎকর্মা পুলিশ কর্মকর্তা। যাত্রাবাড়ী অঞ্চলে তাদের কর্মকান্ডের সুখ্যাতি ও ফিরিস্তি জনগণের মুখে মুখে।
যাত্রাবাড়ীর দনিয়া এলাকায় পুলিশের নির্মম বুলেট ও গাড়ি চাপার নাটকে শহীদ খলিলের ঘটনাটি মিডিয়ার কল্যাণে মুহূর্তের মধ্যেই দেশবাসীর সাথে বিশ্ববাসী জেনে যায়। এ ঘটনার পর পুলিশ সদর দফতরে 'খলিল' বিষয়ক আলোচনা জমে ওঠে। এতে অনেকের মধ্যে কয়েকজন উপস্থিত পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলে ওঠেন যেভাবে নির্দেশ দিচ্ছে সেভাবে পুলিশ জামায়াত-শিবিরকে না মেরে কি পারে! এর ব্যাখ্যা জানতে চাইলে আড্ডায় উঠে আসে সরকারের তরফ থেকে পুলিশের ওপর নির্দেশনার চিত্রটি। এতে বলা হয়, পুলিশকে অভয় দিয়ে বলা হয়েছে জামায়াত মার বিচার হবে না। এটা কেউ মানবে, কেউ মানবে না। যারা মানবে তারাই মারমুখী হবে, তাদের হাতেই নেতা-কর্মীর মৃত্যু ঘটবে।
এই নির্দেশনার সত্যতা পাওয়া যায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সেক্রটারিয়েটে। সেখানে গিয়েও বিভিন্ন কর্মকর্তাদের রুমে খলিল ও তাদের আলোচনা শোনা যায়। পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ভাই বাংলাদেশ ব্যাংকের জিএম পদে কর্মরত। তার রুমে আলাপ হয়েছে সরকারের একটি নির্দেশনা নিয়ে। আলোচনায় ঐ জিএম বলেন, আমার ভাই আমাকে গত ২ দিন আগে জানায়, সরকার বলছে হরতালে কিংবা কোনো প্রকার আন্দোলন হলেই জামায়াত-শিবির মার, বিচার হবে না। এমন নির্দেশনা পুলিশ পেয়ে তারাও হতভম্ব হয়ে পড়েছে। তারা কিংকর্তব্যবিমূঢ়।
পর্যবেক্ষক মহলের মতে, সরকারের এহেন নির্দেশনা অগণতান্ত্রিক এবং স্বৈরাচার আচরণের বহিঃপ্রকাশ। এই নির্দেশনার মাধ্যমে পুলিশ বাহিনীকে উস্কে দেয়া হলো। এখন তাদের ভাবা উচিত তারা জানমাল রক্ষায় কী ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে।
শাহাদাতের তামান্না ছিল হৃদয়ে
খলিলের ব্যারিস্টার হওয়ার স্বপ্ন কেড়ে নিল পুলিশের নির্মম বুলেট
এসএম আলাউদ্দিন,আবুল কালাম আজাদ, আরিফুল ইসলাম সাঁথিয়া (পাবনা) থেকে: পুলিশের গুলিতে নিহত খলিলুর রহমানের (২২) ব্যারিস্টার হবার স্বপ্ন চিরতরে নিভে গেল। নিভে গেল সমাজের দরিদ ছেলে-মেয়েদের নিজ খরচে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করার স্বপ্ন। ঈদের পর বাড়ি এসে দরিদ্র মানুষের সাহায্য সহযোগিতা করার ভাবনাটাও বাস্তবায়ন হলো না। খলিলের চির বিদায়ে সমাজ হারালো এক মানব দরদিকে। জাতি হারালো সম্ভাবনাময় একজন দেশপ্রেমিককে।
গতকাল জামায়াতে ইসলামীর ৪৮ ঘণ্টা হরতালের দ্বিতীয় দিনে ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে মিছিল করার চেষ্টা করলে পুলিশের নির্মম বুলেটে প্রাণ হারায় খলিল। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে বন্ধু মহল ও এলাকার মানুষ হতভম্ব হয়ে যায়। মুহূর্তে নেমে আসে শোকের মাতম। খলিলের বাড়ি পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার করমজা মল্লিক পাড়ায়। পিতা আব্দুল বাতেন মল্লিক একজন কৃষক, মাতা জামেলা খাতুন গৃহিণী, ৪ ভাই, ১ বোন। ভাই বোনের মধ্যে খলিল দ্বিতীয়। পিতা দরিদ্র হওয়ায় ঢাকায় একটি ম্যাচ ভাড়া করে তা থেকে টাকা বাঁচিয়ে পড়ালেখা করতেন তিনি। ঢাকা ৮৮নং ওয়ার্ডের ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি ছিলেন খলিল। সাংগঠনিক মান ছিল সদস্য। তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসায় ফাযিল দ্বিতীয় বর্ষে লেখাপড়া করতেন। এছাড়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক স্টাডিজে ১ম বর্ষেও অধ্যয়নরত ছিলেন তিনি। দাখিল পাস করেছেন তামিরুল মিল্লাত থেকেই। আলিম পাস করেছেন যাত্রাবাড়ী মুরাদপুর ইসলামিয়া মাদরাসা থেকে। ছোটবেলা থেকেই খলিল ছিলেন প্রখর মেধাবী। মানবসেবা ছিলো তার নেশা। নিজে না খেয়ে অপরকে খাইয়ে তিনি তৃপ্তি পেতেন। ছোট বেলায় ১৮ পাড়া কুরআন হেফজ করেছেন তিনি। পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের পাশাপাশি নিয়মিত তাহাযযুদের নামায আদায় করতেন। তার ছোট ভাই আব্দুল্লাহ খোকন একই সাথে ঢাকার বাসায় থাকতেন। খোকনের সাংগঠনিক মান সাথী। খোকন বলেন, আমি আমার ভাইকে মাঝে মধ্যে বলতাম ভাই, আমি আগে শহীদ হবো নাকি তুমি? ভাই উত্তরে বলতেন, তোর চেয়ে আমি বেশি আমল করি তাই আমিই আগে শহীদ হবো। এই কথা বলে খোকন কান্নায় ভেঙে পড়েন। খোকনের ভাষায় আমার ভাইয়ের দোয়া আল্লাহ কবুল করেছেন। আমি এজন্য কোন দুঃখ করি না। আমিও আমার ভাইয়ের পথে যেতে চাই। আমার ভাই লেখাপড়া শেষ করে ব্যারিস্টারি পড়ার আশা ব্যক্ত করেছিল। তিনি আমাকে বলেছিলেন আমি ব্যারিস্টার হয়ে সমাজের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে বিনা পয়সায় মানুষের সেবা করবো। আমার জন্য দোয়া করিস। গত মঙ্গলবার শেষ বারের মতো আমার ভাই আমার সাথে মোবাইলে বলেছেন, হরতাল শেষ হলে আমি বাড়ি আসবো। তুই গরিব মানুষের একটা লিস্ট করে রাখিস। এসে তাদের জন্য কিছু সহযোগিতা করবো।
খলিলের জন্মদাতা পিতা আব্দুল বাতেন বলেন, আপনারা আমার ছেলের জন্য দোয়া করবেন। আমার ছেলে আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হয়েছেন। আমি এজন্য খুশি। আমার ছেলে কোন খারাপ কাজ কোনদিন করেনি। আমি বাপ হিসেবে সাক্ষী দিচ্ছি। সমাজের কেউ কোন দিন বলতে পারবে না আমার ছেলে কারো মনে কোন দিন কষ্ট দিছে। সব সময় মানুষকে ভাল কাজের কথা বলতো। ভাল উপদেশ দিতো। আল্লাহ আমার ছেলেকে শহীদ হিসেবে কবুল করছেন এতে আমি খুশি। আল্লাহ চাইলে আমার অন্য ছেলেদের নিলেও আমার মনে কোন কষ্ট লাগবে না।
নিজ গ্রামের তার নিকটতম বন্ধু রাশেদুল ইসলাম বলেন, আমার পড়া লেখা যখন বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল তখন খলিল ভাই আমাকে ঢাকা নিয়ে গিয়ে ভর্তি করে দেন। পড়ার খরচ দিয়ে কাছে রেখে পড়া লেখা করায়। খলিল ভাইয়ের মতো এতো ভাল মানুষ এ সমাজে দ্বিতীয় জন পাওয়া মুশকিল। অনেক দিন খলিল ভাইয়ের খাবার দুজনে ভাগ করে খেয়েছি এ কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
আরেক বন্ধু সাদ্দাম হোসেন বলেন, খলিল ভাই আর আমি দীর্ঘদিন একই রুমে থাকতাম। তিনি সব সময় আমার পড়ালেখার খোঁজ নিতেন। একদিন তিনি নতুন একটি ডায়েরি কিনে তাতে কী যেন বসে লিখছে আর হিসেব করছেন। আমি তাকে বললাম ভাই কিসের এতো হিসেব করেন? এই বলে আমি ডায়রি নিয়ে দেখি কার কাছে কত টাকা ঋণ নিয়েছেন তাই হিসেব করছেন। মোট ১৭ হাজার টাকা বিভিন্ন সময় ঋণ নিয়েছেন তিনি। তা পরিশোধ করে দিয়েছেন ঈদের আগেই। তিনি হয়তো শাহাদত বরণ করবেন আগে থেকেই জানতেন। তাই বাড়ি থেকে টাকা নিয়ে দ্রুত তিনি তার ঋণ নিজ হাতে পরিশোধ করে দিয়েছেন।
খলিলের ছোট মামা আবুল কাশেম মোল্লা বলেন, খলিলের মতো ছেলে বর্তমান সমাজে পাওয়া দায়। আমাকে সব সময় বলতো মামা আপনি নামায রোজা করে হক পথে চলেন। দেখবেন আপনার আর কোন দুঃখ রইবে না।
বড় মামা আলহাজ্ব আপিল উদ্দিন বলেন, খলিল ছিলো একটি চাঁদের মতো ছেলে। তার মুখের কথা শুনলে মন ভরে যেতো। সব সময় নামায রোজার কথা বলতো মানুষকে। তার মতো ছেলেকে পুলিশ গুলি করে মারলো আমরা ভাবতেও পারছি না।
৫. শহীদের আপনজনদের কথা
পিতা বলেন: "আমার ছেলে শহীদ হয়েছে এর জন্য আমার কোন দুঃখ নেই। আপনারা তার জন্য দোয়া করবেন, আল্লাহ যেন তাকে জান্নাতবাসী করেন।"
মাতা বলেন: "কুরআনের পথে চলতে গিয়ে যারা আমার সন্তানকে শহীদ করে দিয়েছে তাদের বিচার আমি আল্লাহর কাছে দিলাম। দুনিয়ার মানুষের কাছে চাই না। কারণ দুনিয়ার বিচার প্রশ্নবিদ্ধ।"
৬. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
 নাম: শহীদ মোঃ খলিলুর রহমান মল্লিক (১৩৭)।
 পেশা: ছাত্র।
 জন্ম তারিখ ও বয়স: ০১.০১.১৯৯৬ ইং, ১৭ বছর।
 আহত হওয়ার তারিখ: ১৪.০৮,২০১৩, পুলিশের গুলিতে স্পটেই শাহাদাত বরণ করেন।
 শাহাদাতের তারিখ: ১৪.০৮.২০১৩, সকাল ৭.৩০ টা।
 স্থান: দনিয়া, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা।
 দাফন করা হয়: পারিবারিক কবরস্থান।
 স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: করমজা, ডাকঘর: পুন্ডুরিয়া, থানা: সাঁথিয়া, জেলা: পাবনা।
 পিতা: মো: আ: বাতেন মল্লিক, ৬০ বছর, কৃষক।
 মাতা: মোছা: জোমেলা বেগম, ৫০ বছর, গৃহিণী।
 বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা: দুইটি টিনের ঘর আছে। একটি আধা পাকা বসবাসের জন্য এবং অপরটি কাঁচা। পিতার কিছু জমি আছে যার মাধ্যমে পরিবার চলে।
 ভাই-বোনের বিবরণ: মো: আব্দুদ দাইয়ান, কৃষক। খলিলুর রহমান মল্লিক, শহীদ। মোছা: রোজিনা আক্তার, বিবাহিতা। মো: আব্দুল্লাহ মল্লিক, ছাত্র। মো: আব্দুল আউয়াল, ছাত্র।

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍