হোম / আওয়ামী দুঃশাসনে শহীদ / শহীদ মাসউদ বিন হাবীব
শহীদ মাসউদ বিন হাবীব

শহীদ মাসউদ বিন হাবীব

আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের মেধাবী ছাত্র ও সোহরাওয়ার্দী হলের সেক্রেটারি মাসউদ বিন হাবিব ছিলেন লেখক, চিত্রশিল্পী ও নীরব প্রতিভার এক উজ্জ্বল তরুণ। হবিগঞ্জের আজমেরীগঞ্জে জন্ম নেওয়া এই দায়িত্বশীল ছেলেটির ডায়েরিতে লেখা ছিল “হঠাৎ মৃত্যু নয়, চাই শহীদী মৃত্যু” আর পিতা বলেছিলেন, “আমিন।”
৮ ফেব্রুয়ারি ২০১২ ক্যাম্পাসে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়লে নিরস্ত্র সহপাঠীদের রক্ষা করতে এগিয়ে যান তিনি। জিরো পয়েন্টের ঢালে হামলাকারীদের রামদার কোপ ও গুলিতে লুটিয়ে পড়েন মাসউদ, সঙ্গী মুজাহিদও সেদিন প্রাণ হারান।
বন্ধুরা বলেন, তিনি ছিলেন হাসিমাখা মুখের, ইবাদতে অটল, দায়িত্বে নিবেদিত এক তরুণ। শিল্পী, অভিনয় ও লেখালেখিতে যার প্রতিভা সবাইকে বিস্মিত করত। নিজের চাওয়া মতোই শেষ নিঃশ্বাসে তিনি রেখে গেছেন এক নির্মল, অবিচল শহীদের গল্প। যা আজও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাতাসে ব্যথার মতো ভেসে থাকে।

🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ

শহীদ মাসউদ বিন হাবীব
চট্টগ্রাম মহানগরী
৭
ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে ঢাকায় একবার মারাত্মক জখমের পর ডায়েরিতে লিখেছিলেন-"আল্লাহ এভাবে হঠাৎ মৃত্যু চাই না, শহিদী মৃত্যু চাই।" ফেইসবুকে শহিদী বাসনার স্ট্যাটাস দিলে পরম ভাগ্যবান পিতা "আমিন" বলেছিলেন।"
শহীদের পরিচিতি
শহীদ মাসউদ বিন হাফিজ ২৬ জুলাই হবীগঞ্জ জেলার আজমেরীগঞ্জ থানাধীন সমিপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা হাবিবুর রহমান হাবীব ও মাতা হনুফা বেগমের আট সন্তানের মধ্যে মাসউদ ষষ্ঠ সন্তান। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র মাসউদ বিন হাবীব বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যাল-এর সোহরাওয়াদী হল সেক্রেটারি ছিলেন। তিনি একজন লেখক ছিলেন- তিনি রচনা করেছিলেন "অদৃশ্য শত্রুর মুখোশ উন্মোচন" এবং "মিনি সাইক্লোন" নামে দুইটি উপন্যাস। শাহাদাতকালে তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে যান
২০১২ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি। সামান্য কথাকাটি থেকে শুরু করে সারা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীরা মাসউদ বিন হাবিব, মুজাহিদুল ইসলাম ও আশিকুর রহমানকে এলোপাতাড়ি রামদা দিয়ে কোপাতে শুরু করে। এক পর্যায়ে মাসউদ বিন হাবীব ও মুজাহিদুল ইসলাম শহীদ হন।
শাহাদাতের পূর্বের বিভিন্ন ঘটনা
অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী ছিলেন প্রিয় ভাই মাসউদ। রং তুলিতে ছবি আঁকা ও অভিনয়ে তাক লাগানো পারদর্শিতা ছিল। লেখালেখিতেও ভাল হাত ছিল তাঁর। তাঁর অভিনয় মুগ্ধ করতো সকলকে। ঈমানের দৃঢ়তায় ছিলেন অটল অবিচল। শাহাদাৎ ছিল তাঁর জীবনের একান্ত চাওয়া। ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে ঢাকায় একবার মারাত্মক জখমের পর ডায়েরীতে লিখেছিলেন- "আল্লাহ! এভাবে হঠাৎ মৃত্যু চাই না, শহিদী মৃত্যু চাই।" ফেইসবুকে শহীদী বাসনার স্ট্যাটাস দিলে পরম ভাগ্যবান পিতা "আমিন" বলেছিলেন।"

সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
২০১২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। ঘটনার সূত্রপাত ক্লাসরুমে ১১.৩০ টার সময়, সামান্য কথা কাটাকাটি নিয়ে শুরু হলেও বিষয়টি সংঘর্ষের দিকে মোড় নেয়। প্রতিপক্ষ ছাত্রলীগ কর্মী শাহীন কথা কাটাকাটি করে রুম থেকে বের হয়ে তাদের ৩০ জনকে ডেকে নিয়ে আসে মারামারি করার জন্য। কলা অনুষদের সভাপতি আজাদ বিষয়টি অবহিত হয়ে প্রায় ১০/১৫ জন নিয়ে শ্রেণিকক্ষের সামনে আসে। প্রতিপক্ষরাও শ্রেণিকক্ষের বাইরে থেকে হুমকি ধমকি প্রদান করতে থাকে। এক পর্যায়ে কলা অনুষদ সভাপতিসহ কয়েকজন আহত হবার খবর ছড়িয়ে পড়লে সারা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।
বাইরে ছাত্রলীগের মিছিল চলছে। ঠিক তখনই ছাত্রশিবিরের একটা মিছিল রব হল থেকে প্রশাসনিক ভবনের দিকে এগিয়ে যায়। মিছিলটি সমাজবিজ্ঞান অনুষদের সামনে দিয়ে সোহরাওয়ার্দী হল মোড় অতিক্রম করে শাহজালাল হলের দিকে এগিয়ে যায়। ছাত্রলীগ সশস্ত্র অবস্থায় ছিল। এক সময় ছাত্রশিবির শাহজালাল হলের সামনে আর আর ছাত্রলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা জিরো পয়েন্টে গোল চত্বরে অবস্থান নেয়। ২.৩০ মিনিট পর্যন্ত সংঘর্ষ চলার পর এক পর্যায়ে প্রায় ৩.০০ টার কাছাকাছি সময়ে পিছন থেকে পুলিশ ছাত্রশিবিরকে লাঠিপেটা করলে শিবিরের জনশক্তিরা বিচ্ছিন্নভাবে এদিক ওদিক ছুটতে থাকে। কেউ কেউ পাহাড়ে উঠে যায় আর কেউ কেউ বাম দিকে কটেজের দিকে যাওয়া শুরু করে। ঠিক এই সময় পাহাড়ে উঠতে থাকা শিবিরকর্মীদের লক্ষ্য করে ছাত্রলীগ গুলি ছুড়তে থাকে ও তাদের পিছু ধাওয়া করে পাহাড়ে উঠে যায়।
মাসউদ বিন হাবিব, মুজাহিদুল ইসলাম ও আশিকুর রহমানকে তারা হাতের কাছে পেয়ে এলোপাতাড়ি রামদা দিয়ে কোপাতে শুরু করে। মাসউদ বিন হাবীব ও মুজাহিদুল ইসলামের নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। এক সময় ছাত্রলীগ এ দুজনকে তাদের কর্মী বলে পুলিশের কাছ থেকে লাশ নিয়ে যেতে চাইলে শিবিরকর্মীরা তাদের ধাওয়া দেয় এবং তখন ছাত্রলীগ পালিয়ে গেলে শিবির কর্মীরা সিএনজি যোগে চট্টগ্রাম মেডিকেল-এর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয় এবং সোহরাওয়ার্দী মোড় থেকে একটি ভ্যান যোগে মেডিকেল-এ নিয়ে যায়। চট্টগ্রাম মেডিকেল এর ডাক্তার তাকে চিকিৎসার জন্য অন্য মেডিকেল এ নিতে বলে। তখন এ্যাম্বুলেন্স যোগে হাটহাজারি আধুনিক হাসপাতালে নেয়া হয়। এখানেও ডাক্তার চিকিৎসা দিতে অস্বীকৃতি জানালে আবার ঐ এ্যাম্বুলেন্সেই মাসউদ বিন হাবীবকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে নেয়া হলে ডা ভার তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
আপনজনদের কথা
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সেক্রেটারি জনাব এমদাদ উল্লাহ লিখেছেন- "সবুজ ক্যাম্পাসে ভর্তি হই ২০০৭-০৮ সেশনে। অসংখ্য বন্ধুর মাঝে বন্ধু হিসেবে খুঁজে পাই এক "জান্নাতি ফুল", যার নাম মাসউদ বিন হাবিব। যে ফুলের সুবাস ছড়িয়ে পড়েছিল সমগ্র ক্যাম্পাসে। হাসি ভরা মুখ, মমতাময়ী চেহারা, কোমল ব্যবহার সবাইকে মুগ্ধ করেছি।"
এমদাদ উল্লাহ আরো বলেন- "তার অভিনয়, কৌতুক, গান ও ছড়া সবার মন কেড়ে নিত। 'ঐ দেখা যায় তাল গাছ' ছড়াটি বিভিন্ন রকম কন্ঠে আবৃত্তি করে দর্শকদের করতালি পেত। শুধু সাংগঠনিক কাজ ও পড়ালেখার মাঝে একটু সময় পেলে বসে পড়ত উপন্যাস লিখতে।"
সোহরাওয়াদী হলের তৎকালীন সভাপতি ও বর্তমানে চবির প্রশিক্ষণ ও পাঠাগার সম্পাদক জনাব নূর হোসাইন রিয়াজ বলেন- শহীদ মাসউদ বিন হাবিবের কথা মনে পড়তেই হৃদয় ভেঙ্গে যায়। চোখের পানি ধরে রাখতে পারি না। এক সাথে কাজ করার কথা মনে পড়তেই সবকিছু যেনো এলোমেলো হয়ে যায়। ছন্দ হারিয়ে ফেলি কাজের। তাঁর সাথে প্রায় তিনটি সেশন অতিক্রম করেছি, আমি সেক্রেটারী তিনি সাংগঠনিক সম্পাদক এক সেশন, আমি সভাপতি তিনি সেক্রেটারি দুই সেশন। দায়িত্বশীল হিসেবে তাঁকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। বুঝেছি, বুঝার সুযোগ পেয়েছি। কিন্তু এমন করে এতো অল্পে হারিয়ে ফেল েবা বুঝতে পারিনি।
দায়িত্বশীলের আনুগত্যে বরাবর সঠিক ছিলেন মাসউদ। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তাঁর ব্যাকুলতা ছিল অভাবনীয়। নির্দেশ পালনে তার তৎপরতায় মুগ্ধ হয়েছি। ঘটনার দিন সকালে একটি কাজে কয়েকজন ভাইকে নিয়ে যেতে বলেছি, অমনি বিনা বাক্য ব্যয়ে ছুটে চলেছে। সংঘর্ষের সময় আমাদের ভাইরা আহত হতে থাকলে মাসউদ ভাই এসে বললেন, আমি একটু হলে যাব। কিছু সেভলন আর ব্যান্ডেজের কাপড় নিয়ে আসতে হবে দ্রুত। আমি তাঁকে যেতে বারণ করে অন্য কাউকে পাঠাতে বললাম। তিনি তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে অন্য একজনকে হলে পাঠিয়ে নিজ জায়গায় গিয়ে দাঁড়ান। দায়িত্বশীলের আনুগত্যে এমনি আপোষহীন ছিলেন মাসউদ।
আল্লাহর প্রিয় বান্দা হতে কী লাগে, আল্লাহ কাকে তাঁর রাহে একান্তভাবে কবুল করে নেন, মাসউদকে না দেখলে হয়তো এমন করে বুঝা হতো না আমার। ইবাদতে এতটা একাগ্র ছিলেন যে অন্যরা ঈর্ষা করতেন। সামনাসামনি রুম হওয়ায় মাসউদের প্রায় সকল কর্মতৎপরতাই চোখে পড়তো আমার। বিশেষ করে রাতে সেন্ট্রি দেয়ার সময় গভীর রাতে যখনি খেয়াল করতাম প্রায় তাকে নামাজে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখতে পেতাম। রাতে কোন কাজ দিলে কাজের ফাঁকে ফাঁকে তিনি নামাজ আদায় করে নিতেন। গত বছরের রমজানে।
ইতেকাফও আদায় করেন ক্যাম্পাসে।
অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী ছিলেন প্রিয় ভাই মাসউদ। রং তুলিতে ছবি আঁকা ও অভিনয়ে তাক লাগানো পারদর্শিতা ছিল। লেখালেখিতেও ভাল হাত ছিল তাঁর। তাঁর অভিনয় মুগ্ধ করতো সকলকে।
ঈমানের দৃঢ়তায় ছিলেন অটল অবিচল।
শাহাদাৎ ছিল তাঁর জীবনের একান্ত চাওয়া। ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে ঢাকায় একবার মারাত্মক জখমের পর ডায়েরিতে লিখেছিলেন- "আল্লাহ এভাবে হঠাৎ মৃত্যু চাই না, শহিদী মৃত্যু চাই।" ফেইসবুকে শহিদী বাসনার স্ট্যাটাস দিলে পরম ভাগ্যবান পিতা "আমিন" বলেছিলেন।"
সোহরাওয়ার্দি হল শাখার সাবেক সভাপতি মোঃ ফিরোজ হাসনাত লিখেছেন- মাসউদ ভাই আপনি আমাকে মাফ করে দিন, আপনাকে শেষ দেখাটাও আর দেখতে পাইনি। আপনাকে দেখতে পায়নি আপনার কাছের। মানুষগুলোই, যারা সব সময়ই আপনার সাথে মিশে ছিল। একদিনে ২ জন ভাইকে হারিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ও শোকে নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি কোণ থেকে নিস্তব্ধতার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল। মাসউদ ভাইকে হারিয়ে আর তৎকালীন সোহরাওয়ার্দী হল সভাপতি নুর হোসেন রিয়াজ ভাই গ্রেফতার হওয়ায় সোহরাওয়াদী হল আরও বেশি শূন্য মনে হয়েছিল আমাদের কাছে। এখনও মনে হয় সোহরাওয়াদী হল তোমার শূন্যতা পূরণ করতে পারেনি। সোহরাওয়ার্দী হল যেমন তোমাকে মিস করে, ১২১ নং রুম তোমারই স্পর্শ মিস করে।"
শহীদ মাসউদ বিন হাবিব-এর বোন তামান্না বিনতে হাবিব লিখেছেন-
ছোটবেলা থেকেই একটু অন্যরকম আলাদা একটা মানুষ। প্রাইমারী স্কুলের ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পাওয়ার পর আব্দু যখন সিদ্ধান্ত নিলেন মাদরাসায় ভর্তি করাবেন তখন খুশি মনেই মেনে নিলেন আন্দুর কথা। ছোট বেলায় ভীতুই ছিল আমার ভাইটা, আকাশে বিজলী চমকালেও ভয় পেত।
নরসিংদীর জামেয়া কাসেমিয়ায় ভর্তি হয়েছিল। খুব মিস করতাম আমি কারণ আমরা দু'জন পিঠাপিঠি বয়সের ছিলাম। আমি বয়সে ছোট হয়েও বেশি জ্বালাতাম, ভাইয়া মেনে নিত সব হাসিমুখে। যখন বাড়ি আসত তখন আমার জন্য নিয়ে আসত কথার ঝুড়ি। বাড়ি আসলে আমাদের কথা যেন শেষই হতো না। সাধারণ অনেক ঘটনাও এত অসাধারণভাবে বলতো যে আমরা সবাই না হেসে পারতাম না। দেখতে দেখতে ভাই আমার দাখিল পরীক্ষার্থী। আলহামদুলিল্লাহ দাখিলে জিপিএ-৫, আলিমেও তাই। এবার আব্বুর ইচ্ছা ভার্সিটিতে ইংরেজিতে অনার্স পড়াবেন। যদিও ভাইয়ার ইচ্ছা ছিল জার্নালিজমে পড়ার, কিন্তু আব্বুর সিদ্ধান্ত জানার পর তাই মেনে নিলেন।
....সবার মাতো ভাইয়ারও আশা ছিল ঢাকা ভার্সিটিতে চান্স পাওয়ার কিন্তু আম্মু দোয়া করলেন যেন ঢাকায় চান্স না পায়। কারণ আম্মু প্রায়ই টিভিতে দেখতেন যে ঢাকাতে শিবিরের ছাত্রদের সাথে অন্যদের মারামারি বেশি হয়। শেষে চট্টগ্রাম ভার্সিটিতে চান্স পায়।
শুরু হলো ভার্সিটির জীবন। ভাইয়া বাড়ি এসে একটা পাণ্ডুলিপি হাতে তুলে দিল পড়ার জন্য "অদৃশ্য শত্রুর মুখোশ উন্মোচন"।... ওটা ছিল ভাইয়ার প্রথম লেখা, তারপরও খারাপ হয়নি। পবিত্র রমযান মাসে জেলও খাটতে হয়েছে মিথ্যা মামলায়। বাড়িতে আসার পর জেলের দিনগুলোর কথা এমনভাবে বলছিলো যে না হেসে পারিনি। আসলে নিজের কষ্টের কথা এড়িয়ে গিয়েছিল সে।... ভাইয়া জেলে বসে দুই-তিনবার কোরআন খতম করেছিলেন। জেল থেকে বাড়ি এসে আম্মুকে বললেন আমি এতেকাফে বসবো। আম্মু বললেন- এবার না, আমার খারাপ লাগবে, আগামীতে বসিস। এতদিন পর বাড়িতে এসেছিস। তার পরের বছর বাড়িতেই আসল না রমজানে। ওখানেই কাটিয়ে দিল এবং ওখানেই এতেকাফে বসলো। আম্মু যদি এতেকুফে বসতে না দেয় তাই রমজানে বাড়িতেই আসল না।
.... ফেব্রুয়ারির ৮ তারিখ ভাবীর ফোন পেলাম দুপুরে। মাসউদ ভাই অসুস্থ হাসপাতালে।... একটু পরে ব্রেকিং নিউজ। চট্টগ্রাম ভার্সিটিতে দুইজন নিহত। মাসউদ বিন হাবিব ও মুাজাহিদ নামের।... আব্বু ফোন করছেন আপুকে। বললেন ভাইয়ার শাহাদাতের কথা। আপুও সাথে সাথে নিজের অজান্তে বলে ফেলেন, "আলহামদুলিল্লাহ"। বলেই একটু পরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। সেদিনই শ্বশুর বাড়ি থেকে বাড়ির উদ্দেশ্যে। রওয়ানা দিলাম। পৌছতে পৌঁছতে সন্ধ্যা হয়ে গেল।
দেখলাম বাড়ি ভর্তি মানুষ। আব্বু সবার সাথে কথা বলছেন। আম্মু মাগরিবের নামাজ পড়ে তাসবিহ পড়ছেন। সারারাত আব্ন্ধু একটার পর একটা হাদীসের বই বের করছেন আর শহীদের মর্যাদা সম্পর্কে আম্মুকে বারবার বোঝাচ্ছেন আর সান্ত্বনা দিচ্ছেন। আবস্ত্র ওই দিন নিজে খুব শক্ত ছিলেন। উনি আম্মুর জন্য বেশি চিন্তা করাছিলেন কারণ আম্মু ডায়াবেটিস রোগী। সকাল সন্ধ্যা ইনসুলিন নেওয়া লাগে। ভোরের আলো ফুটতেই বাড়িতে মানুষ আসা শুরু হলো। আন্তু সবার সাথেই হাত মেলাচ্ছেন, স্বাভাবিকভাবেই কথা বলছেন। ছোট্ট একটা উপজেলা আমাদের আজমেরীগঞ্জ। শহীদকে দেখা, তাঁর জানাযার জন্য মানুষ ভিড় করছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে গাড়ি দিয়ে জামায়াত এবং শিবিরের ভাইয়েরা আসছে জানাযায় শরিক হওয়ার জন্য। এত মানুষ এবং গাড়ি এলাকার মানুষ আর কখনো দেখেনি। ওই দিন আকাশে বাতাসে ছিল কদ্ধার সুর আর শোকের মাতম। এলাকার গ্রামগুলোতে মহিলারাও কান্নাকাটি করছিলো। এ্যাম্বুলেন্সে লাশ আসতে আসতে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিলো। আওয়ামী পুলিশগুলো আস্তে আস্তে গাড়ি চালাচ্ছিল যাতে ভাইয়ার লাশ ঠিক সময়মত এসে না পৌঁছায়। চট্টগ্রাম থেকে এ্যাম্বুলেন্সে ভাইয়ার লাশ আনার সময় কুমিল্লার সংগঠনের ভাইয়েরা চাইছিলো লাশকে গোসল করিয়ে কফিনে ভরে জানাযা পরিয়ে দিবে কিন্তু পুলিশ তা দেয়নি। তারপর রাস্তায় আরও অনেক জেলাতেই জানাযা পড়তে চেয়েছিলো কিন্তু তা হতে দেওয়া হয়নি। আমরা সবাই অপেক্ষা করেছিলাম ভাইয়ার জন্য। যে ভাই আমাকে কথা দিয়েছিলো ১০ তারিখে শ্বশুর বাড়ি থেকে নিয়ে যাবে, সেই ভাই একদিন আগেই বাড়িতে চলে এসেছে, কিন্তু লাশ হয়ে।
যখন এ্যাম্বুলেন্স থেকে লাশ বাড়িতে আনা হলো এবং গোসল করানো শুরু করবে তখন আব্বু বললেন না, শহীদের লাশ গোসল করানোর দরকার নেই। পরে সিলেট থেকে আসা বয়োবৃদ্ধ জামায়াত নেতা জনাব ফরিদ উদ্দীন চৌধুরী এমপি সাহেব এবং অন্যান্যরা আব্বুকে বললেন যে যারা পোস্টমার্টেম করে তারা অনেক ক্ষেত্রে নাপাক আর মাতাল অবস্থায় থাকে। তাই পবিত্রতার জন্য গোসল করাতে হয়। গোসল করানোর দায়িত্ব নিলেন হবিগঞ্জ জামায়াত এবং শিবিরের ভাইয়েরা।
..... আমরা ভাইয়াকে দেখলাম। আম্মু ভাইয়াকে ছুঁয়ে দেখলেন। আব্বু ভাইয়ার কপালে চুমু এঁকে দিলেন। তারপর সবাই রাত প্রায় ৮টার সময় ভাইয়ার লাশ কাঁধে নিয়ে উচ্চস্বরে কালেমায়ে শাহাদাত পড়তে পড়তে ঈদগাহের দিকে রওয়ানা দিল। আব্বুর খুব ইচ্ছে ছিলো যে উনার মৃত্যুর পর মাসউদ ভাইয়া যেন উনার জানাযা পড়ান। কিন্তু তা আর হলো না।
ভাইয়ার জানাযা পড়ানোর কথা ছিলো আব্বুর, পরে বয়োবৃদ্ধ জনাব ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী সাহেব জানাযা পড়ালেন। রাত প্রায় ১০ টার সময় দাফন করা হয়। আব্বু আর খালেদ ভাই কবরে নেমে ভাইয়াকে কবরে শুইয়ে দেন।” [তথ্যসূত্র: পৃষ্ঠা নং- ১১৭-১১৯, প্রেরণার ক্যাম্পাস, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবির, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, অক্টোবর ২০১৯]

এক নজরে শহীদ মাসউদ বিন হাবিব
নাম: মাসউদ বিন হাবিব
পিতার নাম: হাবিবুর রহমান হাবীব, পিতার পেশা: ব্যবসা
মাতার নাম: হনুফা বেগম, মাতার পেশা: গৃহিণী
ভাইবোন: ৮ জন (৬ষ্ঠ)
জন্ম তারিখ: ২৬ জুলাই
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম- সমিপুর, থানা- আজমেরীগঞ্জ, জেলা- হবীগঞ্জ।
সাংগঠনিক মান: সদস্য, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবির।
দায়িত্ব: সেক্রেটারি, সোহরাওয়ার্দী হল, চ.বি।
সর্বশেষ লেখাপড়া: (ইংরেজি, ৪র্থ বর্ষ)
শিক্ষায় বিশেষ কৃতিত্ব: ৫ম শ্রেণি বৃত্তি, দাখিল- জিপিএ-৫, আলিম- জিপিএ-৫
সর্বশেষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
শাহাদাতের তারিখ: ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১২
আহত হওয়ার স্থান: জিরো পয়েন্ট, চ.বি
শাহাদাতের স্থান: কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনে, চ.বি।
আঘাতের ধরণ: গুলি ও কোপ
যাদের আঘাতে শহীদ: বাংলাদেশ ছাত্রলীগ

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍