হোম / আওয়ামী দুঃশাসনে শহীদ / শহীদ মহিউদ্দীন মাসুম
শহীদ মহিউদ্দীন মাসুম

শহীদ মহিউদ্দীন মাসুম

আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী ছাত্র মহিউদ্দীন মাসুম। ছিলেন নীরব, ধর্মপ্রাণ ও দায়িত্বশীল এক তরুণ যার শেষ ইচ্ছা ছিল ন্যায় ও নৈতিকতার পথে অবিচল থাকা। ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১০ রাতে ষোলশহর স্টেশনের ছোট মসজিদে এশার নামাজ শেষ করে বের হতেই ওঁৎ পেতে থাকা সন্ত্রাসীদের ধারাল অস্ত্রের আঘাতে লুটিয়ে পড়েন তিনি।
নামাজের সিজদাহই হয়ে ওঠে তার দুনিয়ার শেষ কাজ, আর রক্তে রঙিন হয়ে যায় মসজিদের প্রাঙ্গন। হাসপাতালে নেওয়ার পর ডাক্তাররা জানিয়ে দেন তার মৃত্যুর সংবাদ যা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে পুরো ক্যাম্পাসে।
বাবা শুধু বলেছিলেন, “আল্লাহর সম্পদ আল্লাহ নিয়ে গেছেন” আর সহপাঠীরা তাকে ডেকেছেন এক নিরীহ ছাত্রসমাজের আর্তচিৎকার হিসেবে। শত সাথীর অশ্রুসিক্ত জানাজা ও প্রতিবাদী মিছিল জানিয়ে দেয় মাসুমের মৃত্যু কোনো একজনের নয়, এক প্রজন্মের বেদনা।

🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ

শহীদ মহিউদ্দীন মাসুম
চট্টগ্রাম মহানগরী
৮

শহীদের পরিচিতি
শহীদ মহিউদ্দীন মাসুম। খুনি ছাত্রলীগের অপরাজনীতির শিকার জান্নাতগামী এক তরুণ। স্বাধীন দেশের নিরীহ ছাত্র সমাজের এক নীরব আর্তচিৎকার। সালাতুল এশার সিজদাগুলোই ছিল যার দুনিয়ার জীবনের শেষ কাজ। দুনিয়ার লোভে লালায়িত না হয়ে ছাত্রলীগের নৈরাজ্য, চাঁদাবাজী ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম প্রত্যাখান করে কালজয়ী আদর্শ ইসলামকে বাস্তবায়নের আন্দোলনে অংশগ্রহণ করাই ছিল যার একমাত্র অপরাধ।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
২০১০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি। রাত তখন ৮.০০ টা। শাটল ট্রেনের উদ্দেশ্যে ষোলশহর স্টেশনে আসেন তিনি। ট্রেন আসতে তখনও ৩০ মিনিট বাকি। শহীদ মহিউদ্দীন মাসুম সময় নষ্ট না করে স্টেশন মসজিদে চলে যান সালাতুল এশা আদায় করতে। কে জানতো এটাই হবে মুনিবের কাছে তার শেষ সেজদাহ। নামাজ শেষ করে বের হতেই ওঁৎ পেতে থাকা ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা হামলা শুরু করে মাসুম ভাইয়ের উপর। দা-কিরিচ দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে খুনীরা রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে যায় শহীদ মাসুম ভাইকে। শহীদের রক্তে লাল হলো স্টেশন মসজিদের প্রাঙ্গন। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ এসে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের হাসপাতালে নিয়ে যায় তাকে। কিছুক্ষণ পরই কর্তব্যরত ডাক্তাররা মৃত ঘোষণা করে মাসুমকে। ধীরে ধীরে মুনিবের কাছে চলে গেলেন তার প্রিয় গোলাম শহীদ মহিউদ্দীন মাসুম।


শাহাদাতের পূর্বের বিভিন্ন ঘটনা
শহীদ মাসুমের ব্যাপারে তার মা হৃদয়স্পর্শী সাক্ষ্য দেন। শহীদ জননী বলেন, আমার ছেলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাড়ি আসার সময় একটা হাদীসের বই নিয়ে আসতো এবং নিয়মিত আমাকে হাদীস পড়ে শুনাতো। চলে যাওয়ার সময় বলে যেতো, মা তুমি প্রতিদিন এই হাদীসের বই পড়বে আর আমার জন্য দোয়া করবে। যুগে যুগে বাতিলরা তাদের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে চেয়েছে দীনের এই আলো নিভিয়ে দিয়ে ইসলামী আন্দোলনের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দিতে। কিন্তু দীনের মুজাহিদরা জীবন দিয়ে বারবার প্রমাণ করেছে এ আলো নিভানো যায় না। এ যাত্রা অনন্তকালের যা কখনো থামাবার নয়।


ঘটনার সামগ্রিক বিবরণ
২০১০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি। এই দিনেই শাহাদাত বরণ করেন শহীদ মহিউদ্দীন মাসুম। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র ছিলেন। শহীদি কাফেলার ১৩৫তম শহীদ
মহিউদ্দীন মাসুম ছিলেন সংগঠনের সক্রিয় কর্মী। তিনি ছিলেন প্রখর মেধাবী ও সাহসী প্রকৃতির। প্রতিদিনের ন্যায় ঐ দিনও মাসুম ভাই শহর থেকে টিউশনী শেষ করে শহীদ আইনুল, জোবায়ের, রহিমউদ্দীন ও মাহমুদুল হাসানের রক্তেভেজা শহীদি ক্যাম্পাস চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরছিলেন। না, আর ফেরা হলো না শহীদ মহিউদ্দীন মাসুমের। রাত তখন ৮.০০ টা। শাটল ট্রেনের উদ্দেশ্যে যোলশহর স্টেশনে আসেন তিনি। ট্রেন আসতে তখনও ৩০ মিনিট বাকি। শহীদ মহিউদ্দীন মাসুম সময় নষ্ট না করে স্টেশন মসজিদে চলে যান সালাতুল এশা আদায় করতে। কে জানত এটাই হবে মুনিবের কাছে তার শেষ সেজদাহ। নামাজ শেষ করে বের হতেই ওঁৎ পেতে থাকা ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা হামলা শুরু করে মাসুম ভাইয়ের উপর। দা-কিরিচ দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে খুনীরা রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে যায় শহীদ মাসুম ভাইকে। শহীদের রক্তে লাল হলো স্টেশন মসজিদের প্রাঙ্গন। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ এসে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের হাসপাতালে নিয়ে যায় তাকে।
কিছুক্ষণ পরই কর্তব্যরত ডাক্তাররা মৃত ঘোষণা করে মাসুমকে। ধীরে ধীরে মুনিবের কাছে চলে গেলেন তার প্রিয় গোলাম শহীদ মহিউদ্দীন মাসুম।


শহীদের জানাযায় বাধা ও গুলিবর্ষণ
শাহাদাতের ঐ ঘটনা চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ার পর শহীদের শত শত সাথীরা জড়ো হতে থাকে মেডিকেল কলেজের চতুর্পাশে। শুরু হয় নতুন ষড়যন্ত্র। নির্মমভাবে জবাই করে হত্যার পর শহীদ মাসুমকে নিজেদের। কর্মী বলে দাবী করে রক্তপিপাসু ছাত্রলীগ। শেষ পর্যন্ত পুলিশ পাহারায় শহীদের লাশ তার গ্রামের বাড়ি চকরিয়ায় রাজারবিলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরদিন সকালে শোকাহত শহীদের সহস্রাধিক সাথীরা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে গায়েবানা জানাযা পড়েন। জানাযা পরবর্তী শোকাহত জনতা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। তাতেও বাধা দিল সরকারের লেলিয়ে দেওয়া পুলিশ বাহিনী। পুলিশের বেপরোয়া লাঠিচার্জ ও গুলিবর্ষণে আহত হন শহীদের শিক্ষকসহ প্রায় দুই শতাধিক সহযোদ্ধা। গ্রেফতার করা হয় শতাধিক নেতা কর্মীকে।
এ সম্পর্কে ইসলামী ছাত্রশিবিরের চট্টগ্রাম মহানগরী দক্ষিণের সাবেক সভাপতি এম এইচ সোহেল লিখেছেন-১২ ফেব্রুয়ারি ২০১০ শহীদ মহিউদ্দীন মাসুমের শাহাদাতের পরদিন সকাল আনুমানিক ১০টায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ মর্গের পাশে প্রবর্তক মোড় এলাকায় শহীদের নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইমামতি করেন তৎকালীন চট্টগ্রাম মহানগরী জামায়াতের আমীর মাওলানা শামসুল ইসলাম। উক্ত জানাযায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন শাখার জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী ও সাধারণ জনতাসহ কয়েক হাজার মানুষের সমাবেশ হয়। জানাযার পূর্বে জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন।
অন্যায়ভাবে ঘটে যাওয়া এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ হিসেবে জানাযা শেষে মাওলানা শামসুল ইসলামের নেতৃত্বে শুরু হয় প্রতিবাদ মিছিল। মিছিলটি মেহেদীবাগ কাজীর দেওড়ী-জামালখান হয়ে গণি বেকারী অথবা চকবাজার গুলজার মোড়ে গিয়ে শেষ হওয়ার কথা ছিল। প্রতিবাদমুখর ছাত্র-জনতার মিছিলটি ছিল শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল। কিন্তু সেই শান্তিপূর্ণ মিছিলেও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা হামলা চালাতে দ্বিধাবোধ করেনি। সেদিন শান্তিপূর্ণ মিছিলটির সম্মুখভাগ কাজীর দেওড়ী পার হয়ে আসকার দিঘী ও জামালখান মোড়ের মাঝামাঝি পৌঁছাল মাত্র। অমনি সামনে ও পেছনে থেকে মিছিলের উপর অতর্কিতে আক্রমণ চালায় পুলিশ বাহিনী।
টিয়ারশেল, রাবার বুলেট আর আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে তাদের আক্রমণ ছিল হিংস্র বাঘের থাবার ন্যায়। ক্ষণিকের মধ্যেই ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় প্রতিবাদ মিছিল। বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্তভাবে ইট পাথর দিয়ে প্রতিবাদ গড়ে তুলে। তবে টিয়ার শেল আর বুলেটের বিরুদ্ধে ইট পাথরের গড়ে তোলা প্রতিরোধ বেশিক্ষণ টিকেনি। নিরপরাধ ছাত্র জনতার ওপর পুলিশের অমানবিক নির্যাতনে আহত হয় অসংখ্য ভাই। গ্রেফতার করা হয় তৎকালীন চট্টগ্রাম মহানগরী জামায়াতের নায়েবে আমীর অধ্যাপক আহসান উল্লাহসহ প্রায় ৩০/৪০ জন ছাত্র জনতাকে। গ্রেফতারকৃতরাসহ অসংখ্য নেতাকর্মীদের নামে দায়ের করা হয় মামলা। মামলার তালিকা থেকে বাদ পড়েনি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকগণও। মহিউদ্দিন মাসুমের বিভাগের শিক্ষক আ ন ম মুনির স্যারকেও মামলার আসামী করা হয়। গ্রেফতারকৃত ভাইয়েরা বিভিন্ন মেয়াদে কারাবাস করে পরবর্তীতে মুক্তি পায়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করা প্রতিটি মানুষের নাগরিক, গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকার। শহীদ মহিউদ্দীন মাসুমের শাহাদাৎ পরবর্তী সময় থেকে অদ্যাবধি বাংলাদেশে এই অধিকার আজ চরমভাবে লঙ্ঘিত। এই দেশে মানবাধিকার আজ ভুলুণ্ঠিত, মানবতা আজ লজ্জিত।


এক নজরে শহীদ মহিউদ্দীন মাসুম

নাম: মহিউদ্দীন মাসুম
পিতার নাম: ফজলুল কাদের
মাতার নাম: হাসিনা আক্তার
মাতার পেশা: গৃহিণী
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: রাজার বিল, পোস্ট- ফাসিয়া খালী, থানা- চকরিয়া, কক্সবাজার।
ভাই-বোন: ৩ ভাই, ১ বোন (সবার বড়)
সাংগঠনিক মান: বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কর্মী
দায়িত্ব: উপশাখার পাঠাগার সম্পাদক, আলাওল হল, চ. বি।
সর্বশেষ লেখা-পড়া: এমএসএস (শেষ বর্ষ), রাজনীতি বিজ্ঞান।
সর্বশেষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
শিক্ষায় বিশেষ কৃতিত্ব: ৩য় শ্রেণিতে বৃত্তি
আহত হওয়ার স্থান: ষোলশহর রেল স্টেশন
আঘাতের ধরন: কুপিয়ে হত্যা
শহীদ হওয়ার স্থান: চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
যাদের আঘাতে শহীদ: বাংলাদেশ ছাত্রলীগ
শাহাদাতের তারিখ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১০
পিতার প্রতিক্রিয়া: "আল্লাহর সম্পদ আল্লাহ নিয়ে গেছেন, এ জন্য আমার কোন দুঃখ নেই।"

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍