হোম / আওয়ামী দুঃশাসনে শহীদ / শহীদ মো: তোফায়েল আহমেদ
শহীদ মো: তোফায়েল আহমেদ

শহীদ মো: তোফায়েল আহমেদ

আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

শহীদ মো: তোফায়েল আহমেদ (১৯৮২–২০১৩) কক্সবাজার সদর উপজেলার উত্তর রোমালিয়ার ছড়া গ্রামের সন্তান।
দরিদ্র পরিবারের চতুর্থ সন্তান তোফায়েল জীবিকার তাগিদে মুদির দোকানের কর্মচারী হিসেবে কাজ করতেন এবং সততা ও মানবিকতায় সবার আস্থা অর্জন করেছিলেন।
১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, জুমার নামাজ শেষে হাশেমিয়া মাদ্রাসা মসজিদের সামনে আহত এক মুসল্লিকে উদ্ধার করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
সদ্য বিবাহিত তোফায়েল রেখে গেছেন অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ও অনাগত এক সন্তান যার জন্ম হবে বাবার ছায়া ছাড়া।
ত্যাগ, দায়িত্ববোধ ও মানবিক সাহসের প্রতীক হয়ে তিনি কক্সবাজারের মানুষের স্মৃতিতে অম্লান।

🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ

শহীদ মো: তোফায়েল আহমেদ
কক্সবাজার
১
"শহীদের ভবিষ্যৎ সন্তান এখনও মায়ের গর্ভে। সে জন্ম নিবে বাবা নামক একটি ছায়া ছাড়া। বুদ্ধি হলে, সে নিদারুণ কষ্ট নিয়ে দেখবে দুনিয়াতে সবার বাবা থাকলেও এরকম কিছু তার জীবনে নেই। সে জন্মগতভাবেই এতিম। শহীদের গর্বিত পিতা তার কলিজার টুকরোকে হারিয়ে মর্মাহত। আল্লাহর কাছে জান্নাত লাভের জন্য দোয়া করেন। তিনি বলেন আমার সন্তান ছিল আর বাকি সকল সন্তানের চেয়ে ভালো। সে আমার সামগ্রিক খোঁজখবর রাখতো। আল্লাহ তাকে নিয়ে গেছেন আমি দোয়া করি আল্লাহ যেন তাকে শহীদের মর্যাদা দান করেন।"
১. শহীদের পরিচিতি
শহীদ মো: তোফায়েল আহমেদ কক্সবাজার জেলা সদরের উত্তর রোমালিয়ার ছড়া গ্রামে ১৯৮২ সালে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মো: কলিমুল্লাহ ও মাতা মাইমুনা আক্তারের আট সন্তানের মধ্যে ৪র্থ সন্তান তোফায়েল আহমেদ। ৫ ভাই ৩ বোনের সংসারে দরিদ্র পিতামাতা কোন রকম সন্তানের মুখে দুটো অন্ন এবং কাপড়ের ব্যবস্থা করতেই ব্যতিব্যস্ত ছিলেন। পারেননি পড়ালেখার ভাল কোন ব্যবস্থা করতে। শারীরিক সামর্থ্যবান হওয়ার পর থেকে অন্যের মুদির দোকানে কাজ করাই ছিল পেশা। মাস শেষে এখানকার মাত্র ৪,৪০০ টাকা আয়ই ছিল তার একমাত্র সম্বল। মুদির দোকানের মজুরি এই দিয়েই তিনি স্ত্রী ও বৃদ্ধ পিতামাতার দেখাশুনা করতেন। তিনি সদ্য বিবাহিত ছিলেন এবং তার স্ত্রী কোহিনুর সুলতানা এখন ৪ মাসের সন্তান সম্ভবা।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
১৫ ফেব্রুয়ারি' ২০১৩। সেদিন ছিল জুমাবার। ঘটনাস্থল শহীদের নিজ বাড়ির প্রায় কয়েকশ গজ দূরে হাশেমিয়া মাদ্রাসা মসজিদ এর সামনে। মাওলানা সাঈদী সাহেবের মুক্তির দাবিতে বাদ জুমা মিছিল হওয়ার ঘোষণা ছিল। অন্যান্যের ন্যায় তিনিও মসজিদে নামাজ পড়তে যান। নামাজ শেষ হওয়ার আগেই পুলিশ ও বিজিবি মসজিদ ঘিরে ফেলে। মুসল্লিরা মসজিদ থেকে বের হলে পুলিশ সাথে সাথেই গুলি করে। গুলির আঘাতে একজন মাটিতে পড়ে যায় এবং তিনি তাকে উদ্ধার করতে যান। তখন আরেকটি বুলেট তার বুকের বাম পাশে লেগে পিছন দিয়ে বেরিয়ে যায় এবং তিনি সাথে সাথে শহীদ হন। তখনও চতুর্দিক থেকে মিছিল হাশেমিয়া মাদ্রাসা মসজিদের দিকে আসছিল এবং আশপাশের এলাকার প্রায় ১০ হাজার লোক সে মিছিলে সম্পৃক্ত হয়।
বেলা ২টায় তিনি শহীদ হবার পর পুলিশ টেনেহিঁচড়ে ভ্যানে করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে যায় পোস্টমর্টেম করার পর পরেরদিন ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে বিকাল ৩টার দিকে পুলিশ লাশ বাড়িতে নিয়ে আসে। হাশেমিয়া মাদ্রাসা ময়দানে জানাযার ব্যবস্থা করা হয়। পুলিশ এবং বিজিবি পরিবেষ্টিত অবস্থায় আসরের নামাজের পর জানাযা অনুষ্ঠিত হয় এবং জানাজা শেষে তাকে পাশের কবরস্থানে দাফন করা হয়। মুফতি হাবিবুল্লাহ, জানাজা নামাজ পড়ান প্রশাসনের কারণে এতে উপস্থিতি ছিল মাত্র ৩০০০ থেকে ৪০০০ মানুষ।
৩. সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
১৫ ফেব্রুয়ারি '১৩। সেদিন ছিল জুমাবার। রোদ কলমল পৃথিবীর মনোমুগ্ধকর আলোতে জীবনের শেষ অবগাহন। সকালে ঘুম থেকে উঠে কঠিন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন- নাহ! আর দাড়ি কাটবো না, দাড়ি রেখে দেব। সেলুনে চুল কাটলেন, বাসায় ফিরে গ্রামের সকলের মতোই গোসলের পবিত্রতা সেরে স্থানীয় হাশেমিয়া মাদরাসা মসজিদে মহান রবের বন্দেগিতে নিমগ্ন হতে চললেন। যাওয়ার সময় পথে পথে পরিচিত জনদের বাদ জুমা সাঈদী মুক্তি পরিষদের মিছিলে শরিক হতে আহবান জানালেন। মসজিদে ঢুকে নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষ হওয়ার আগেই পুলিশ ও বিজিবি পুরো মসজিদ ঘিরে ফেলে। মুসল্লিরা মসজিদ থেকে বের হয়ে মিছিল শুরু করলে পুলিশ সাথে সাথেই ইতিহাসের বর্বর অধ্যায়ের দ্বার খোলে। কি নিদারুণ সেই কাহিনীর ইতিবৃত্ত। লোমহর্ষক বিভীষিকাময় ঘটনার সূত্রপাত। ঈমানী চেতনায় সীসা ঢালা প্রাচীরাবদ্ধ মর্দে মুজাহিদদের নারায়ের তাকবিরের আকাশ কাঁপানো মিছিলে নির্দয় পুলিশের উপর্যুপরি গুলি। রক্তের হোলি খেলতে শুরু করে হিংস্র পুলিশ। আর তখনই হিংস্রতার শিকার হলেন একজন মুসল্লি। গুলি লেগে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তোফায়েল আহমদ নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে আহত ভাইয়ের সেবায় দৌড়ে তার পাশে যান। ঠিক তখনই তপ্ত বুলেট তার বুকের বাম পাশে ঢুকে পড়ে অপরপ্রান্ত দিয়ে বের হয়ে যায়। রক্তে ভিজে ওঠে পুরো শরীর। স্থির থাকতে পারলেন না, ঢলে পড়েন মাটির বিছানায়। শাহাদাতের আমিয় সুধা পান করেন ঘটনাস্থলেই। শহীদি মর্যাদা লাভ করেন তোফায়েল আহমেদ। বাগানের সর্বোৎকৃষ্ট ফুলের বিদায়ে ভারাক্রান্ত হয়ে যায় তার বন্ধু, মাতাপিতা, প্রতিবেশী সহ সবার হৃদয়। আর হাসতে হাসতে তিনি চলে গেলেন হামযা, যায়েদ, রাওয়াহাদের পথযাত্রী হয়ে জান্নাতি কাননে।
৪. শহীদের আপনজনদের কথা
বাবা মায়ের আদরের দুলাল ছিলেন শহীদ তোফায়েল আহমদ। ব্যক্তিজীবনে স্বল্প শিক্ষিত হয়েও প্রশংসনীয় সব অনন্য গুণাবলীর অধিকারী ছিলেন। সামাজিকতা, উদারতা আর মানুষকে আপন করে নেয়ার মতো দৃষ্টান্তমূলক আচরণ ছিল তার চরিত্রের উজ্জ্বল দিক। প্রতিবেশীর হক আদায়ে তার অন্য ভাইদের উৎসাহী করা, পরিবারের যে কোন খাবার বন্টনে ইনসাফকে প্রাধান্য দেওয়াই প্রমাণ করে তার মানবিক মূল্যবোধের সর্বোৎকৃষ্ট চরিত্র। তিনি চাকুরী করতেন মুদি দোকানে, দোকানের মালামাল রক্ষণাবেক্ষণে তার কোন সামান্য ত্রুটি ছিল না, সততা ও ক্রেতাদের মাঝে জনপ্রিয়তার কারণে দোকানের মালিক তাকে ভীষণ ভালবাসতেন। নৈতিকতাবোধসম্পন্ন জীবন যাপনে ছিলেন অভ্যস্ত। নিজে ধার্মিক ছিলেন এবং অন্যের কাছেও ধর্মীয় গুরুত্বের কথা তুলে ধরতেন। ব্যক্তি জীবনেও তার প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন। সর্বোচ্চ ইসলামী অনুশাসন পালন করতেন। ইসলামী চেতনায় আঘাত দেয়াকে তিনি মেনে নিতে পারেননি। তাই তো আল্লামা সাঈদীর প্রহসনের রায়ের বিরুদ্ধে রুখে উঠা জনতার অগ্র মিছিলে নিজেকে সোপর্দ করেছিলেন ত্যাগের সর্বোচ্চ নমুনা হিসেবে। শহীদের গর্বিত পিতা তার কলিজার টুকরোকে হারিয়ে মর্মাহত। আল্লাহর কাছে জান্নাত লাভের জন্য দোয়া করেন। তিনি বলেন আমার সন্তান ছিল আর বাকি সকল সন্তানের চেয়ে ভালো। সে আমার সামগ্রিক খোঁজখবর রাখতো। আল্লাহ তাকে নিয়ে গেছেন আমি দোয়া করি আল্লাহ যেন তাকে শহীদের মর্যাদা দান করেন।
স্ত্রী কোহিনুর সুলতানা একান্তে ভাবেন; শহীদের ভবিষ্যৎ সন্তান এখনও মায়ের গর্ভে। সে জন্ম নেবে একটি ছায়া ছাড়া। বুদ্ধি হলে, সে নিদারুণ কষ্ট নিয়ে দেখবে দুনিয়াতে সবার বাবা থাকলেও এরকম কিছু তার জীবনে নেই। সে জন্মগতভাবেই এতিম।

৫. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম: শহীদ মো: তোফায়েল আহমেদ (০৭০)। পেশা: মুদির দোকানের কর্মচারী।
জন্ম তারিখ ও বয়স: ১৯৮২ সাল, ৩১ বছর, আহত হওয়ার তারিখ: ১৫ ফেব্রুয়ারি'১৩।
শাহাদাতের তারিখ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, স্থান: কক্সবাজার হাশেমিয়া মাদ্রাসা মসজিদ-এর সামনে
আহতের ধরন ও পরবর্তী অবস্থা: বুকের বাম পাশে গুলি লেগে অপর পাশে দিয়ে বেরিয়ে যায়। আহত হবার সাথে সাথেই শহীদ হন। দাফন করা হয়: বাড়ির পাশের কবরস্থানে।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: উত্তর রোমালিয়ার ছড়া, ডাকঘর: কক্সবাজার, থানা: কক্সবাজার সদর, জেলা: কক্সবাজার।
পিতা: মো: কলিমুল্লাহ। অন্যের জমিতে বর্গাচাষ।
মাতা: মাইমুনা আক্তার, বয়স: ৬০ বছর।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা: ৩ শতকের উপর একটি বসতবাড়ি। আধাপাকা বাড়ি ৪টি রুম রয়েছে এবং সেখানেই পরিবারের সবাই মিলে বসবাস করেন। নিজেদের কোন কৃষি জমি নেই।
স্ত্রী ও সন্তানদের বিবরণ: স্ত্রী: শহীদের স্ত্রী কোহিনুর সুলতানা শাহাদাতের ৪ মাসের সন্তানসম্ভবা।
ভাই-বোনের বিবরণ: মোঃ রশিদ আহমেদ, প্রবাসী। মো: শফিক আহমেদ, প্রবাসী। মোঃ রফিক আহমেদ, দিনমজুর। মোঃ তোফায়েল আহমেদ, শহীদ। আব্দুল্লাহ আল নোমান, বয়স ১০ বছর। মরিয়ম বেগম, বিবাহিতা, জান্নাতুল বাকী, বিবাহিতা। আসমাউল হুসনা, বিবাহিতা।


📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍