শহীদ মো: আব্দুর রশিদ
আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ
📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
শহীদ মো: আব্দুর রশিদ (১৯৮৬–২০১৩) কক্সবাজার সদরের সাতজোলাকাঠা গ্রামের সন্তান।
দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে আলিম পাশ করা আব্দুর রশিদ জীবিকার তাগিদে প্রবাসে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন এবং দেশে ফিরে ব্যবসায় যুক্ত হন।
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে অংশ নিতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে চিকিৎসাবঞ্চিত অবস্থায় কক্সবাজার সদর হাসপাতালে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
দুই শিশুসন্তান ও পিতামাতার উদ্দেশে লেখা তার শেষ চিঠিগুলো আজও দায়িত্ববোধ, ক্ষমা ও ঈমানি দৃঢ়তার অনন্য দলিল।
ত্যাগ ও বিশ্বাসের এই সাহসী মানুষটি কক্সবাজারের ইতিহাসে এক গর্বিত শহীদের নাম হয়ে অমর।
দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে আলিম পাশ করা আব্দুর রশিদ জীবিকার তাগিদে প্রবাসে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন এবং দেশে ফিরে ব্যবসায় যুক্ত হন।
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে অংশ নিতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে চিকিৎসাবঞ্চিত অবস্থায় কক্সবাজার সদর হাসপাতালে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
দুই শিশুসন্তান ও পিতামাতার উদ্দেশে লেখা তার শেষ চিঠিগুলো আজও দায়িত্ববোধ, ক্ষমা ও ঈমানি দৃঢ়তার অনন্য দলিল।
ত্যাগ ও বিশ্বাসের এই সাহসী মানুষটি কক্সবাজারের ইতিহাসে এক গর্বিত শহীদের নাম হয়ে অমর।
🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ
শহীদ মো: আব্দুর রশিদ
কক্সবাজার
২
"সন্তানদের প্রতি শহীদের লেখা চিঠি "স্নেহের খুকামনি সুরাই ও তামিম আমার বুকভরা দোয়া ও আদর নিও। তোমাদেরকে পৃথিবীতে আমি কিছুই দিয়ে যাইতে পারি নাই শুধু তোমাদেরকে আল্লাহতায়ালার কাছে সোপর্দ করলাম।... তোমাদেরকে আবারও দোয়া ও আদর জানিয়ে তোমাদের সুখী জীবন ও দীর্ঘায়ু কামনা করে শেষ করলাম আর তোমাদের আব্বুকে ক্ষমা করে দিও।"... পিতামাতার প্রতি চিঠি 'মা বাবা আমার সালাম নিবেন। মা বাবা আমি তোমাদের মনে অনেক কষ্ট দিয়েছি.... তোমাদের পা ধরে ক্ষমা চাই, আমাকে ক্ষমা করে দিও।"
১. শহীদের পরিচিতি
শহীদ মোঃ আব্দুর রশিদ কক্সবাজার সদরের সাতজোলাকাঠা গ্রামে ১৯৮৬ইং সালে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা হাজী মোঃ ইলিয়াস ও মাতা হাজেরা বেগমের তের সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন কনিষ্ঠতম সন্তান। পাঁচ বোন ও আট ভাইয়ের অতি আদরের ছোট ভাই পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে খুব কষ্ট করে আলিম পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। দারিদ্র্যের অক্টোপাসে বাঁধা নিজ পরিবারের সচ্ছলতার মুখ দেখানোর জন্য অতি অল্প বয়সেই পাড়ি দেন মধ্যপ্রাচ্যের দুবাই। দেড় বছর বিদেশ থাকার পর বাড়িতে এসেই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। শাহাদাতের আগ পর্যন্ত তিনি দুই সন্তানের জনক ছিলেন। স্ত্রী, সন্তান এবং বাবা-মাকে সাথে নিয়ে ছিলো তার সুখী পরিবার। কিছুদিন পরেই নবীর দেশে পাড়ি জমানোর কথা, কিন্তু তার আগেই চলে গেলেন দুনিয়া থেকে চূড়ান্ত বিদায় নিয়ে নবীর সাথে সাক্ষাতের দেশে।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
ঘটনাস্থল শহীদের নিজ বাড়ি থেকে প্রায় ৫/৬ কিলোমিটার দূরে। আল্লামা সাঈদীর নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে মিছিলের খবর পেয়ে বিভিন্ন এলাকা থেকে শতশত লোক দলবেঁধে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কেউ রিক্সায়, বাইসাইকেলে, মোটরসাইকেলে আবার কেউবা নসিমনে করে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। তেমনি খবর পেয়ে শহীদ মো: আব্দুর রশিদ তার বাড়িতে বলে যান যে, তিনি তার বোনের বাড়িতে যাবেন টাকা সংগ্রহের জন্য। মূলত তিনি বোনের বাড়ির ওসিলায় মিছিলে যান। অবশ্য বোনের বাড়ির পাশেই ছিল মিছিলের স্থান। পুলিশের গুলি শুরু হলে আল্লামা সাঈদী মুক্তি পরিষদের দায়িত্বশীলদেরকে আব্দুর রশীদ জানান, "আমাকে কিছু যুবক দিন, আমি জালিমদের বিরুদ্ধে লড়তে চাই"। উত্তরে দায়িত্বশীলরা জানান, সামনে যেওনা পুলিশের গুলির মুখে পড়বে। কিন্তু কারো কোন উত্তরের অপেক্ষা না করেই সামনে এগিয়ে যান আলকোরানের এই মুজাহিদ, গুলিবিদ্ধ হন কাঁধে ও পায়ে। পুলিশ আহত আব্দুর রশীদকে থানায় নিয়ে যায়। রক্তাক্ত ও অসহায়ভাবে ফেলে রাখে থানার বারান্দায়।
থানায় আটকাবস্থায় পুলিশ তার বাম কাঁধে গুলি করে। তখন তিনি কোন রকমে গোপনে নিজের মোবাইল বের করে তার স্ত্রীকে বলেন আমাকে পুলিশ থানায় নিয়ে এসে গুলি করেছে। এরপর পুলিশ মোবাইলে কথা বলে ৩০-৪০ মিনিট। তারপর আবার বাম রানে গুলি করে। দ্বিতীয়বার গুলি করার কিছুক্ষণ পর পুলিশ কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে আসে এবং সেখানে রাত আনুমানিক ৮.৩০ এর দিকে ইহধাম ত্যাগ করে চলে যান।
২৮ ফেব্রুয়ারি' ১৩ তারিখে রাত ৮.৩০ শহীদ। পরে পুলিশ তার লাশ মর্গে পাঠায় এবং ১ মার্চ ২০১৩ তারিখ বিকাল ৪.৩০টার দিকে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে। ঐ দিন মাগরিবের আগে লাশ বাসায় পৌঁছলে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। জানাজার নামাজ পড়ান মাওলানা আঃ গফুর, জানাযায় উপস্থিতি ছিলেন ২০ থেকে ২৫ হাজার তৌহীদি জনতা।
৩. সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
ঘটনাস্থল শহীদের নিজ বাড়ি থেকে প্রায় ৫/৬ কিলোমিটার দূরে। আল্লাম সাঈদীর নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে মিছিলের খবর পেয়ে বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত লোক দলবেঁধে স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে কেউ রিক্সায়, কেউ বাইসাইকেলে, কেউ মোটরসাইকেলে আবার কেউ বা নসিমনে করে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। তেমনি খবর পেয়ে শহীদ মো: আব্দুর রশিদ তার বাড়িতে বলে যায়। সে মিছিলে পুলিশ-বিজিবি নির্বিচারে গুলি করে এভাবেই ঐ দিন ঘটনাস্থলেই শহীদ হন চারজন ভাই। বিশেষ করে শহীদ আব্দুর রশিদের ঘটনাটি সরেজমিনে পত্রিকায় আসে। ১৬ জুন, ২০১৩ দৈনিক নয়া দিগন্তে বিস্তারিত প্রতিবেদনটি তুলে ধরা হলো।
শহীদ আবদুর রশিদ। আমার দুই শিশুকে যারা পিতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত করেছে তাদের বিচার চাই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গণহত্যায় নিহত আবদুর রশিদের স্ত্রী, দুই শিশুপুত্র এবং বয়োবৃদ্ধ পিতা: নয়া দিগন্ত
আমার দুই শিশুকে পিতৃস্নেহ থেকে যারা বঞ্চিত করেছে তাদের বিচার চাই, তারা মানুষ নয়, তারা জানোয়ার, তারা হিস্র পশুর চেয়ে নিকৃষ্ট। গুলি করার পর পুলিশ আমার স্বামীকে এক ফোঁটা পানি দেয়নি। পুলিশ বিটে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ আটকিয়ে রাখে এবং বিনা চিকিৎসায় আমার স্বামীর মৃত্যু নিশ্চিত করে।
আমার এখন একটাই প্রশ্ন, পুলিশের এই নৃশংসতার বিচার করবে কে? 'পুলিশ কি মানুষ নয়? মানবতাবোধ বলতে কী তাদের এতটুকুও নেই'? আমার আর কোনো দাবি নেই, দাবি শুধু একটাই আমার স্বামীকে যারা নির্মমভাবে হত্যা করেছে সেই 'খুনি পুলিশের' বিচার চাই এবং প্রতিনিয়ত প্রার্থনা করছি ওই খুনিদের ওপর যেন আল্লাহর গজব নাজিল হয়। এভাবে স্বামী আবদুর রশিদ হত্যার বিষয়ে কথা বলছিলেন স্ত্রী মরিয়ম পারভিন রোজি (২৬)। রোজি ইসলামাবাদের মিশকাতুন্নবী দাখিল মাদরাসার শিক্ষক। কক্সবাজার সদর উপজেলার ইসলামাবাদ ইউনিয়নের সাতজুলাকাটা গ্রামে শহীদ আবদুর রশীদের বাড়িতে গত শুক্রবার দুপুরে তার স্ত্রী, বৃদ্ধ বাবা ও পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। আলাপচারিতায় উঠে আসে আবদুর রশিদ হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক বর্ণনা।
অধিক শোকে অনেকটা পাথর হয়ে যাওয়া মরিয়ম পারভিন রোজি বলেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি দুপুরে কর্মস্থলে শুনি সাঈদী সাহেবের ফাঁসির রায় হয়েছে। তখন সাথে সাথে আমার স্বামীকে ফোন করি। জিজ্ঞেস করি তিনি কোথায় আছেন। জবাবে আমার স্বামী বলেন, তিনি ঈদগাহ স্টেশনে আছেন। আমি তাকে বলি দেশের অবস্থা ভালো নয়, তাড়াতাড়ি বাড়িতে চলে আসুন। পরে আড়াইটার দিকে ওনার মোবাইল থেকে ফোন। রিসিভ করা মাত্রই তিনি বলেন, পুলিশ আমাকে গুলি করেছে। এটা বলার পরই ফোনের লাইন কেটে যায়। আমি অনেক বার চেষ্টা করলাম। কিন্তু আর কিছুতেই আমার স্বামীর সাথে কথা বলতে পারলাম না। চারদিকে থেমে থেমে পুলিশের গুলির শব্দ। তারপরও বাড়ি থেকে বের হয়ে ঈদগাহ পুলিশ বিট স্টেশনের দিকে যেতে থাকি। চারদিকে উত্তেজনা। এর মধ্যে আমরা খবর পাই আমার স্বামী সাঈদী মুক্তি পরিষদের মিছিলে গিয়েছিলেন এবং পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে রাস্তায় পড় থাকা একজন বৃদ্ধকে উদ্ধার করতে গেলে পুলিশ তাকেও গুলি করলে তিনি রাস্তায় পড়ে যান। এই অবস্থায় পুলিশ আমার স্বামীকে ধরে নিয়ে যায় ঈদগাহ পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে। সেখানে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বাতাসে বারুদের গন্ধ। গলা শুকিয়ে গেছে। নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট পাচ্ছি। শুধু আল্লাহকে ডাকছি। চিৎকার করে পুলিশকে বলছি আমার স্বামীকে ফিরিয়ে দাও। কিন্তু কে শুনে কার আহাজারি। এভাবে কেটে গেল ঘণ্টা দেড়েক। পরে জানতে পারি আমার স্বামীকে পুলিশ কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে গেছে। হরতাল চলছে। রাস্তায় কোনো ধরনের যানবাহন নেই, এমনকি রিকশাও। এমনি অবস্থায় পাগলপারা হয়ে ঈদগাহ থেকে সদর হাসপাতালের উদ্দেশে ৩৫ কিলোমিটার পথ হেঁটে যেতে থাকি। পথিমধ্যে মোবাইলের রিং বেজে উঠল। দেখলাম আমার স্বামীর মোবাইল থেকে ফোন। আল্লাহ বলে চিৎকার দিয়ে উঠলাম। হ্যালো বলতে কানে আসল এক ভদ্রলোকের কন্ঠ, বললেন আপনার স্বামীর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তিনি সদর হাসপাতালের বেডে মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। ভদ্রলোক দয়াপরবশ হয়ে এক ব্যাগ রক্ত দিয়েছেন বটে; কিন্তু কোনো চিকিৎসা দেয়া তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। পুলিশ কঠোরভাবে বাধা দিচ্ছে। এমনকি একটু পানিও পুলিশ দিতে দিচ্ছে না।
অনেকটা জ্ঞানশূন্য হয়ে ৩৫ কিলোমিটার পথ হেঁটে সদর হাসপাতালে পৌঁছি রাত ৮টায়। কিন্তু ততক্ষণে আমার স্বামী শাহাদতের পেয়ালা পান করেছেন। হাসপাতালের পুরুষ ওয়ার্ড, জরুরি বিভাগ সবখানে খোঁজ করি আমার স্বামীর। পরে জানতে পারি তার দেহখানা লাশখানায়। অপেক্ষা করতে থাকলাম সারা রাত। কখন স্বামীর লাশ নিয়ে ঘরে ফিরি। রাত পেরিয়ে সকাল, দুপুর ও বিকেল। পুলিশ লাশ দিচ্ছে না। সাদা কাগজে অনেকগুলো সই। তারপরও পুলিশের ক্ষোভ। কঠোরভাবে শাসিয়ে পুলিশের হুমকি 'লাশ নিয়ে মিছিল মিটিং করলে তোদের সকলকে মামলায় ঢুকিয়ে দেবো'। পরে এলাকার চেয়ারম্যানের জিম্মায় পুলিশ লাশ দিলো।
রোজি বলেন, আমার স্বামীকে চিকিৎসা দিলে বাঁচানো যেতো। বাম পায়ের উপর অংশের জয়েন্টে এবং তান হাতের বাহুতে আমার স্বামীকে গুলি করেছে পুলিশ। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও দীর্ঘক্ষণ চিকিৎসা না দিয়ে পুলিশ আমার স্বামীকে মৃত্যুপথে ঠেলে দেয় এবং মৃত্যু নিশ্চিত করে লাশখানায় নিয়ে ক্ষান্ত হয়। হত্যার কী বীভৎস জিঘাংসা। তিনি বলেন, আমি 'পুলিশ খুনি'দের বিচার চাই। আমার স্বামী নিরপরাধ। কোনো রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন না। অপরাধ ছিল ওনি সাঈদী সাহেবের ভক্ত ছিলেন। আমি অকালে বিধবা হয়েছি তা সহ্য করছি এবং করব: কিন্তু আমার দুই শিশু যখন বলে আম্মু, আব্বা কখন আসবে? তখন তাদের এ প্রশ্নের কিভাবে জবাব দিই আপনারাই বলুন। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি, এরকম কষ্ট যেন আর কোনো নারীর জীবনে না আসে। আমার স্বামীর ইচ্ছানুযায়ী আমার দুই সন্তানকে কুরআনের হাফেজ করে যেন বড় আলেম বানাতে পারি এই দোয়া চাই বলতে বলতে তার চোখ ছলছল করে উঠল।
অনুসন্ধানে জানা যায়, পুলিশের গুলিতে আহত এবং পরে ৫ ঘণ্টারও অধিক সময় বিনা চিকিৎসার কারণে আবদুর রশিদ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। আবদুর রশিদ ইসলামাবাদের সাতজুলাকাটা হাজী মোহাম্মদ ইলিয়াছ মিয়ার (৭৫) ছেলে। ৮ ভাই ৫ বোনের মধ্যে আবদুর রশিদ সবার ছোট। ঈদগাহ আলমাছিয়া ফাজিল মাদরাসা থেকে তিনি আলিম পাস করার পর জীবনের তাগিদে তিনি দুবাই চলে যান। দুবাই থেকে ফিরে ২০০৬ সালে বিয়ে করেন এবং আবার দুবাই চলে যান। পরে দেশে এসে তিনি লবণের ব্যবসায় করতেন। তার দুই শিশু পুত্রের মধ্যে লোকমান হোসাইন সুরাই (৬) প্রথম শ্রেণীতে এবং তামিম ইকবাল (৪) মায়ের সাথে মাদরাসায় যাওয়া আসা করে। আবদুর রশিদের বৃদ্ধ বাবা ইলিয়াছ মিয়া বলেন, পুলিশের গুলিতে আহত আমার ছেলে আবদুর রশিদকে চিকিৎসা দিলে তাকে বাঁচানো যেত। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও দীর্ঘক্ষণ চিকিৎসা না পেয়ে সে মারা যায়। আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ী পুলিশের বিচার চাই।
ইসলামাবাদ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নুরুল হক সওদাগর জানান, আব্দুর রশিদ এলাকার একজন খুবই ভালো লোক ছিলেন। নিহত হওয়ার ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও পুলিশ আব্দুর রশিদের লাশ দিতে চাচ্ছিল না। পরে আমি নিজেই দায়িত্ব নিয়েই লাশ নিয়ে আসি ও দাফন করি।
বড় ভাই হাফেজ আলতাফ হোসেন বলেন, আমার ভাই ঈমানের তাগিদে দেশবরেণ্য মোফাচ্ছিরে কুরআন আল্লামা সাঈদীর ফাঁসির রায়ের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করতে গিয়েছিলেন। পুলিশ তাকে আটক করে তদন্ত কেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে ঠাঝা মাথায় পৈশাচিক কায়দায় গুলি করে। তিনি বলেন, তার ভাই ইসলামাবাদের প্রথম শহীদ। একজন শহীদের ভাই হিসেবে আমরা গর্ববোধ করছি। এখন তার অসমাপ্ত কাজ শেষ করার দায়িত্ব আমাদের।
৪. শহীদের পিতামাতার প্রতিক্রিয়া
হাজী মোঃ ইলিয়াস বলেন, "কেন তারা আমার শান্ত-ভদ্র আদরের ছেলেটিকে গুলি করল? কী অপরাধ তার? আজ আমি শুধু শেষ বিচারের মালিকের কাছেই আমার ছেলের জন্য ক্ষমা এবং ঘাতকদের বিচার চাইবো। আল্লাহ তুমি তাকে শহীদ হিসেবে কবুল কর।" এই কথাগুলো বলেই তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। সন্তানের লাশ কাঁধে নেয়ার যে ভার কত বেদনাদায়ক তা শুধু সন্তানহারা পিতাই বুঝতে পারেন। শহীদের মায়ের সাথে কথা বলতে চাইলে তিনি কিছুই বলতে পারেন না, শুধু অব্যক্ত কথাগুলো চোখের পানি হয়ে গড়িয়ে পড়ে।
৫. শহীদের স্ত্রীর প্রতিক্রিয়া
প্রায়ই সে মিছিলে যেতো, আমাকে জানাতো না। আমি এ নিয়ে তার সাথে ঝগড়া করতাম। শেষ যেদিন সে মিছিলে গিয়ে শহীদ হলো, সেদিন আমি তার সব জামা কাপড় লকারে ঢুকিয়ে লকারের চাবি লুকিয়ে রাখি। সে আমার অলক্ষে লকারের চাবি খুঁজে পেয়ে যায় এবং গোপনে জামা কাপড় বের করে নেয়। যাওয়ার সময় বলে যায় বোনের বাড়ি যাচ্ছি, সত্যিই মিছিলের পথেই ছিলো বোনের বাড়ি। গুলিতে আক্রান্ত অবস্থায় আমাকে মোবাইলে এটুকু বলে-আমি মিছিলে এসেছি..."। সাঈদী সাহেবের রায়ের পূর্বে সে আমাকে প্রায় বলতো, আমি শহীদ হবো। কিন্তু আমি বলতাম তুমি শহীদ হলে তোমার স্ত্রী, সন্তানদের কী হবে? ও শুধুই বলতো, ওদের অভিভাবক হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট নয় কি? সে প্রায় বলতো, "সাঈদীর ফাঁসির রায় হলে আমি মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে সবাইকে এই মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানাবো"। মাঝে মাঝে সে বলতো, "আমি তোমার সকল মোহরানা পরিশোধ করতে পারিনি, আমাকে তোমার মোহরানা মাফ করে দিও, আমি যে শহীদ হয়ে যাবো। চলে যাব পৃথিবীর ওপারে। কষ্ট নিও না কখনো। ক্ষমা রেখো শুধু আমার পথে। শহীদের স্ত্রী আল্লাহর কাছে তার স্বামীর জন্য শহীদি মর্যাদা এবং জান্নাত কামনা করেন। সন্তান সন্ততির লালন পালনের জন্য অল্লাহর উপর ভরসা করে আছেন এই শহীদ পরিবার।
৬. শহীদের কলম থেকে
সাড়ে পাঁচ বছর বয়সী মোঃ লোকমান হোসেন এবং চার বছর বয়সী মোঃ তামিম ইকবাল এর প্রিয় মানুষটি আর কখনো সোনামনি বলে তাদের আদর করবে না। শাহাদাতের পূর্বে ডায়েরিতে তিনি সন্তান দুটিকে আল্লাহর হাতে সোপর্দ করার কথা লিখে যান।
সন্তানদের প্রতি শহীদের লেখা চিঠির হুবুহু উদ্ধৃতি, "স্নেহের খুকামনি সুরাই ও তামিম আমার বুক ভরা দোয়া ও আদর নিও। তোমাদেরকে পৃথিবীতে আমি কিছুই দিয়ে যাইতে পারি নাই শুধু তোমাদেরকে আল্লাহ তালার কাছে সোপর্দ করলাম। সুরাই কারও সাথে ঝগড়া বিবাদ করবে না, কারও সাথে খেলা করবে না, তোমরা দুইভাই এক সাথে থাকবে, এক সাথে খেলা করবে আর তোমাদের মায়ের কথা মতে চলবে আর দুষ্টামী করবে না, তোমাদের মায়ের পাশে পাশে থাকবে, তোমাদেরকে আবারও দোয়া ও আদর জানিয়ে তোমাদের সুখী জীবন ও দীর্ঘায়ু কামনা করে শেষ করলাম আর তোমাদের আব্বুকে ক্ষমা করে দিও।"
পিতামাতার প্রতি লেখা চিঠির উদ্ধৃতি, "মা বাবা আমার সালাম নিবেন। মা বাবা আমি তোমাদের মনে অনেক কষ্ট দিয়েছি, তোমাদের অনেক টাকা পয়সা নষ্ট করেছি, এবং মানসম্মান নষ্ট করেছি, আমাকে মাফ করে দিও আর বাবাকে বলছি আমার বৌ পোলা যাতে কোথাও না যায়, তাদের যাতে কষ্ট না হয়, তোমাদের আগে যদি আমি চলে যাই তাহলে আমার সন্তানরা বাপের সম্পত্তি পাবে না তাই বলছি তাদেরকে কষ্ট দিও না এবং আমি আবারও তোমাদের পা ধরে ক্ষমা চাই, আমাকে ক্ষমা করে দিও।"
৭. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম: শহীদ মোঃ আঃ রশিদ (০৭১)। পেশা: বিদেশে শ্রমিকের কাজ করতেন।
জন্ম তারিখ ও বয়স: ১৯৮৬ সাল, ২৭ বছর। আহত হওয়ার তারিখ: ২৮ ফেব্রুয়ারি'১৩।
আহতের ধরন ও পরবর্তী অবস্থা: বাম হাতে ও বাম উরুর উপরে গুলি করে। আহত হবার পর প্রায় ৫ ঘন্টা জীবিত ছিলেন।
শাহাদাতের তারিখ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, স্থান: কক্সবাজার সদর হাসপাতাল। দাফন করা হয়: পারিবারিক কবরস্থানে।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: সাতজোলাকাঠা, ডাকঘর: ইসলামাবাদ, উপজেলা: কক্সবাজার, জেলা: কক্সবাজার।
পিতা: হাজী মোঃ ইলিয়াস, পেশা: কৃষি, বয়স ৭৫ বছর।
মাতা: হাজেরা বেগম, ৭০ বছর, গৃহিণী।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা: নিজ জমির উপর একটি পাকা বসতবাড়ি। ১০ বিঘা কৃষিজমি
আছে। বিদেশ থেকে কৃত আয় দিয়ে সংসার চলতো।
স্ত্রী ও সন্তানদের বিবরণ: স্ত্রী-মরিয়ম পারভিন রোজি, ২৬ বছর, মাদ্রাসার শিক্ষিকা। ১ম ছেলে: মোঃ লোকমান হোসেন সুরাই ৬ বছর। ২য় ছেলে: তামীম ইকবাল, বয়স ৪ বছর।
ভাই- বোনের বিবরণ: মোঃ মমতাজ আহমেদ, কৃষি। নুরজাহান, বিবাহিত। গোলজারা বেগম, বিবাহিতা। হাফেজ মোঃ আলতাফ হোসন, সৌদি আরব প্রবাসী। আকতার হোসেন, সৌদি আরব প্রবাসী। নুরুন জিদা, বিবাহিতা। নুরুল আফছার, কৃষি। নুরবানু আক্তার, বিবাহিতা। নুরুল আমিন, সৌদি আরব প্রবাসী। মীর কাশেম, কৃষি। শামসুল আলম। লায়লা বেগম। শহীদ মোঃ আব্দুর রশিদ, সৌদি আরব যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
কক্সবাজার
২
"সন্তানদের প্রতি শহীদের লেখা চিঠি "স্নেহের খুকামনি সুরাই ও তামিম আমার বুকভরা দোয়া ও আদর নিও। তোমাদেরকে পৃথিবীতে আমি কিছুই দিয়ে যাইতে পারি নাই শুধু তোমাদেরকে আল্লাহতায়ালার কাছে সোপর্দ করলাম।... তোমাদেরকে আবারও দোয়া ও আদর জানিয়ে তোমাদের সুখী জীবন ও দীর্ঘায়ু কামনা করে শেষ করলাম আর তোমাদের আব্বুকে ক্ষমা করে দিও।"... পিতামাতার প্রতি চিঠি 'মা বাবা আমার সালাম নিবেন। মা বাবা আমি তোমাদের মনে অনেক কষ্ট দিয়েছি.... তোমাদের পা ধরে ক্ষমা চাই, আমাকে ক্ষমা করে দিও।"
১. শহীদের পরিচিতি
শহীদ মোঃ আব্দুর রশিদ কক্সবাজার সদরের সাতজোলাকাঠা গ্রামে ১৯৮৬ইং সালে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা হাজী মোঃ ইলিয়াস ও মাতা হাজেরা বেগমের তের সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন কনিষ্ঠতম সন্তান। পাঁচ বোন ও আট ভাইয়ের অতি আদরের ছোট ভাই পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে খুব কষ্ট করে আলিম পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। দারিদ্র্যের অক্টোপাসে বাঁধা নিজ পরিবারের সচ্ছলতার মুখ দেখানোর জন্য অতি অল্প বয়সেই পাড়ি দেন মধ্যপ্রাচ্যের দুবাই। দেড় বছর বিদেশ থাকার পর বাড়িতে এসেই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। শাহাদাতের আগ পর্যন্ত তিনি দুই সন্তানের জনক ছিলেন। স্ত্রী, সন্তান এবং বাবা-মাকে সাথে নিয়ে ছিলো তার সুখী পরিবার। কিছুদিন পরেই নবীর দেশে পাড়ি জমানোর কথা, কিন্তু তার আগেই চলে গেলেন দুনিয়া থেকে চূড়ান্ত বিদায় নিয়ে নবীর সাথে সাক্ষাতের দেশে।
২. যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
ঘটনাস্থল শহীদের নিজ বাড়ি থেকে প্রায় ৫/৬ কিলোমিটার দূরে। আল্লামা সাঈদীর নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে মিছিলের খবর পেয়ে বিভিন্ন এলাকা থেকে শতশত লোক দলবেঁধে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কেউ রিক্সায়, বাইসাইকেলে, মোটরসাইকেলে আবার কেউবা নসিমনে করে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। তেমনি খবর পেয়ে শহীদ মো: আব্দুর রশিদ তার বাড়িতে বলে যান যে, তিনি তার বোনের বাড়িতে যাবেন টাকা সংগ্রহের জন্য। মূলত তিনি বোনের বাড়ির ওসিলায় মিছিলে যান। অবশ্য বোনের বাড়ির পাশেই ছিল মিছিলের স্থান। পুলিশের গুলি শুরু হলে আল্লামা সাঈদী মুক্তি পরিষদের দায়িত্বশীলদেরকে আব্দুর রশীদ জানান, "আমাকে কিছু যুবক দিন, আমি জালিমদের বিরুদ্ধে লড়তে চাই"। উত্তরে দায়িত্বশীলরা জানান, সামনে যেওনা পুলিশের গুলির মুখে পড়বে। কিন্তু কারো কোন উত্তরের অপেক্ষা না করেই সামনে এগিয়ে যান আলকোরানের এই মুজাহিদ, গুলিবিদ্ধ হন কাঁধে ও পায়ে। পুলিশ আহত আব্দুর রশীদকে থানায় নিয়ে যায়। রক্তাক্ত ও অসহায়ভাবে ফেলে রাখে থানার বারান্দায়।
থানায় আটকাবস্থায় পুলিশ তার বাম কাঁধে গুলি করে। তখন তিনি কোন রকমে গোপনে নিজের মোবাইল বের করে তার স্ত্রীকে বলেন আমাকে পুলিশ থানায় নিয়ে এসে গুলি করেছে। এরপর পুলিশ মোবাইলে কথা বলে ৩০-৪০ মিনিট। তারপর আবার বাম রানে গুলি করে। দ্বিতীয়বার গুলি করার কিছুক্ষণ পর পুলিশ কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে আসে এবং সেখানে রাত আনুমানিক ৮.৩০ এর দিকে ইহধাম ত্যাগ করে চলে যান।
২৮ ফেব্রুয়ারি' ১৩ তারিখে রাত ৮.৩০ শহীদ। পরে পুলিশ তার লাশ মর্গে পাঠায় এবং ১ মার্চ ২০১৩ তারিখ বিকাল ৪.৩০টার দিকে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে। ঐ দিন মাগরিবের আগে লাশ বাসায় পৌঁছলে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। জানাজার নামাজ পড়ান মাওলানা আঃ গফুর, জানাযায় উপস্থিতি ছিলেন ২০ থেকে ২৫ হাজার তৌহীদি জনতা।
৩. সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ
ঘটনাস্থল শহীদের নিজ বাড়ি থেকে প্রায় ৫/৬ কিলোমিটার দূরে। আল্লাম সাঈদীর নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে মিছিলের খবর পেয়ে বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত লোক দলবেঁধে স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে কেউ রিক্সায়, কেউ বাইসাইকেলে, কেউ মোটরসাইকেলে আবার কেউ বা নসিমনে করে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। তেমনি খবর পেয়ে শহীদ মো: আব্দুর রশিদ তার বাড়িতে বলে যায়। সে মিছিলে পুলিশ-বিজিবি নির্বিচারে গুলি করে এভাবেই ঐ দিন ঘটনাস্থলেই শহীদ হন চারজন ভাই। বিশেষ করে শহীদ আব্দুর রশিদের ঘটনাটি সরেজমিনে পত্রিকায় আসে। ১৬ জুন, ২০১৩ দৈনিক নয়া দিগন্তে বিস্তারিত প্রতিবেদনটি তুলে ধরা হলো।
শহীদ আবদুর রশিদ। আমার দুই শিশুকে যারা পিতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত করেছে তাদের বিচার চাই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গণহত্যায় নিহত আবদুর রশিদের স্ত্রী, দুই শিশুপুত্র এবং বয়োবৃদ্ধ পিতা: নয়া দিগন্ত
আমার দুই শিশুকে পিতৃস্নেহ থেকে যারা বঞ্চিত করেছে তাদের বিচার চাই, তারা মানুষ নয়, তারা জানোয়ার, তারা হিস্র পশুর চেয়ে নিকৃষ্ট। গুলি করার পর পুলিশ আমার স্বামীকে এক ফোঁটা পানি দেয়নি। পুলিশ বিটে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ আটকিয়ে রাখে এবং বিনা চিকিৎসায় আমার স্বামীর মৃত্যু নিশ্চিত করে।
আমার এখন একটাই প্রশ্ন, পুলিশের এই নৃশংসতার বিচার করবে কে? 'পুলিশ কি মানুষ নয়? মানবতাবোধ বলতে কী তাদের এতটুকুও নেই'? আমার আর কোনো দাবি নেই, দাবি শুধু একটাই আমার স্বামীকে যারা নির্মমভাবে হত্যা করেছে সেই 'খুনি পুলিশের' বিচার চাই এবং প্রতিনিয়ত প্রার্থনা করছি ওই খুনিদের ওপর যেন আল্লাহর গজব নাজিল হয়। এভাবে স্বামী আবদুর রশিদ হত্যার বিষয়ে কথা বলছিলেন স্ত্রী মরিয়ম পারভিন রোজি (২৬)। রোজি ইসলামাবাদের মিশকাতুন্নবী দাখিল মাদরাসার শিক্ষক। কক্সবাজার সদর উপজেলার ইসলামাবাদ ইউনিয়নের সাতজুলাকাটা গ্রামে শহীদ আবদুর রশীদের বাড়িতে গত শুক্রবার দুপুরে তার স্ত্রী, বৃদ্ধ বাবা ও পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। আলাপচারিতায় উঠে আসে আবদুর রশিদ হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক বর্ণনা।
অধিক শোকে অনেকটা পাথর হয়ে যাওয়া মরিয়ম পারভিন রোজি বলেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি দুপুরে কর্মস্থলে শুনি সাঈদী সাহেবের ফাঁসির রায় হয়েছে। তখন সাথে সাথে আমার স্বামীকে ফোন করি। জিজ্ঞেস করি তিনি কোথায় আছেন। জবাবে আমার স্বামী বলেন, তিনি ঈদগাহ স্টেশনে আছেন। আমি তাকে বলি দেশের অবস্থা ভালো নয়, তাড়াতাড়ি বাড়িতে চলে আসুন। পরে আড়াইটার দিকে ওনার মোবাইল থেকে ফোন। রিসিভ করা মাত্রই তিনি বলেন, পুলিশ আমাকে গুলি করেছে। এটা বলার পরই ফোনের লাইন কেটে যায়। আমি অনেক বার চেষ্টা করলাম। কিন্তু আর কিছুতেই আমার স্বামীর সাথে কথা বলতে পারলাম না। চারদিকে থেমে থেমে পুলিশের গুলির শব্দ। তারপরও বাড়ি থেকে বের হয়ে ঈদগাহ পুলিশ বিট স্টেশনের দিকে যেতে থাকি। চারদিকে উত্তেজনা। এর মধ্যে আমরা খবর পাই আমার স্বামী সাঈদী মুক্তি পরিষদের মিছিলে গিয়েছিলেন এবং পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে রাস্তায় পড় থাকা একজন বৃদ্ধকে উদ্ধার করতে গেলে পুলিশ তাকেও গুলি করলে তিনি রাস্তায় পড়ে যান। এই অবস্থায় পুলিশ আমার স্বামীকে ধরে নিয়ে যায় ঈদগাহ পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে। সেখানে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বাতাসে বারুদের গন্ধ। গলা শুকিয়ে গেছে। নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট পাচ্ছি। শুধু আল্লাহকে ডাকছি। চিৎকার করে পুলিশকে বলছি আমার স্বামীকে ফিরিয়ে দাও। কিন্তু কে শুনে কার আহাজারি। এভাবে কেটে গেল ঘণ্টা দেড়েক। পরে জানতে পারি আমার স্বামীকে পুলিশ কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে গেছে। হরতাল চলছে। রাস্তায় কোনো ধরনের যানবাহন নেই, এমনকি রিকশাও। এমনি অবস্থায় পাগলপারা হয়ে ঈদগাহ থেকে সদর হাসপাতালের উদ্দেশে ৩৫ কিলোমিটার পথ হেঁটে যেতে থাকি। পথিমধ্যে মোবাইলের রিং বেজে উঠল। দেখলাম আমার স্বামীর মোবাইল থেকে ফোন। আল্লাহ বলে চিৎকার দিয়ে উঠলাম। হ্যালো বলতে কানে আসল এক ভদ্রলোকের কন্ঠ, বললেন আপনার স্বামীর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তিনি সদর হাসপাতালের বেডে মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। ভদ্রলোক দয়াপরবশ হয়ে এক ব্যাগ রক্ত দিয়েছেন বটে; কিন্তু কোনো চিকিৎসা দেয়া তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। পুলিশ কঠোরভাবে বাধা দিচ্ছে। এমনকি একটু পানিও পুলিশ দিতে দিচ্ছে না।
অনেকটা জ্ঞানশূন্য হয়ে ৩৫ কিলোমিটার পথ হেঁটে সদর হাসপাতালে পৌঁছি রাত ৮টায়। কিন্তু ততক্ষণে আমার স্বামী শাহাদতের পেয়ালা পান করেছেন। হাসপাতালের পুরুষ ওয়ার্ড, জরুরি বিভাগ সবখানে খোঁজ করি আমার স্বামীর। পরে জানতে পারি তার দেহখানা লাশখানায়। অপেক্ষা করতে থাকলাম সারা রাত। কখন স্বামীর লাশ নিয়ে ঘরে ফিরি। রাত পেরিয়ে সকাল, দুপুর ও বিকেল। পুলিশ লাশ দিচ্ছে না। সাদা কাগজে অনেকগুলো সই। তারপরও পুলিশের ক্ষোভ। কঠোরভাবে শাসিয়ে পুলিশের হুমকি 'লাশ নিয়ে মিছিল মিটিং করলে তোদের সকলকে মামলায় ঢুকিয়ে দেবো'। পরে এলাকার চেয়ারম্যানের জিম্মায় পুলিশ লাশ দিলো।
রোজি বলেন, আমার স্বামীকে চিকিৎসা দিলে বাঁচানো যেতো। বাম পায়ের উপর অংশের জয়েন্টে এবং তান হাতের বাহুতে আমার স্বামীকে গুলি করেছে পুলিশ। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও দীর্ঘক্ষণ চিকিৎসা না দিয়ে পুলিশ আমার স্বামীকে মৃত্যুপথে ঠেলে দেয় এবং মৃত্যু নিশ্চিত করে লাশখানায় নিয়ে ক্ষান্ত হয়। হত্যার কী বীভৎস জিঘাংসা। তিনি বলেন, আমি 'পুলিশ খুনি'দের বিচার চাই। আমার স্বামী নিরপরাধ। কোনো রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন না। অপরাধ ছিল ওনি সাঈদী সাহেবের ভক্ত ছিলেন। আমি অকালে বিধবা হয়েছি তা সহ্য করছি এবং করব: কিন্তু আমার দুই শিশু যখন বলে আম্মু, আব্বা কখন আসবে? তখন তাদের এ প্রশ্নের কিভাবে জবাব দিই আপনারাই বলুন। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি, এরকম কষ্ট যেন আর কোনো নারীর জীবনে না আসে। আমার স্বামীর ইচ্ছানুযায়ী আমার দুই সন্তানকে কুরআনের হাফেজ করে যেন বড় আলেম বানাতে পারি এই দোয়া চাই বলতে বলতে তার চোখ ছলছল করে উঠল।
অনুসন্ধানে জানা যায়, পুলিশের গুলিতে আহত এবং পরে ৫ ঘণ্টারও অধিক সময় বিনা চিকিৎসার কারণে আবদুর রশিদ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। আবদুর রশিদ ইসলামাবাদের সাতজুলাকাটা হাজী মোহাম্মদ ইলিয়াছ মিয়ার (৭৫) ছেলে। ৮ ভাই ৫ বোনের মধ্যে আবদুর রশিদ সবার ছোট। ঈদগাহ আলমাছিয়া ফাজিল মাদরাসা থেকে তিনি আলিম পাস করার পর জীবনের তাগিদে তিনি দুবাই চলে যান। দুবাই থেকে ফিরে ২০০৬ সালে বিয়ে করেন এবং আবার দুবাই চলে যান। পরে দেশে এসে তিনি লবণের ব্যবসায় করতেন। তার দুই শিশু পুত্রের মধ্যে লোকমান হোসাইন সুরাই (৬) প্রথম শ্রেণীতে এবং তামিম ইকবাল (৪) মায়ের সাথে মাদরাসায় যাওয়া আসা করে। আবদুর রশিদের বৃদ্ধ বাবা ইলিয়াছ মিয়া বলেন, পুলিশের গুলিতে আহত আমার ছেলে আবদুর রশিদকে চিকিৎসা দিলে তাকে বাঁচানো যেত। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও দীর্ঘক্ষণ চিকিৎসা না পেয়ে সে মারা যায়। আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ী পুলিশের বিচার চাই।
ইসলামাবাদ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নুরুল হক সওদাগর জানান, আব্দুর রশিদ এলাকার একজন খুবই ভালো লোক ছিলেন। নিহত হওয়ার ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও পুলিশ আব্দুর রশিদের লাশ দিতে চাচ্ছিল না। পরে আমি নিজেই দায়িত্ব নিয়েই লাশ নিয়ে আসি ও দাফন করি।
বড় ভাই হাফেজ আলতাফ হোসেন বলেন, আমার ভাই ঈমানের তাগিদে দেশবরেণ্য মোফাচ্ছিরে কুরআন আল্লামা সাঈদীর ফাঁসির রায়ের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করতে গিয়েছিলেন। পুলিশ তাকে আটক করে তদন্ত কেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে ঠাঝা মাথায় পৈশাচিক কায়দায় গুলি করে। তিনি বলেন, তার ভাই ইসলামাবাদের প্রথম শহীদ। একজন শহীদের ভাই হিসেবে আমরা গর্ববোধ করছি। এখন তার অসমাপ্ত কাজ শেষ করার দায়িত্ব আমাদের।
৪. শহীদের পিতামাতার প্রতিক্রিয়া
হাজী মোঃ ইলিয়াস বলেন, "কেন তারা আমার শান্ত-ভদ্র আদরের ছেলেটিকে গুলি করল? কী অপরাধ তার? আজ আমি শুধু শেষ বিচারের মালিকের কাছেই আমার ছেলের জন্য ক্ষমা এবং ঘাতকদের বিচার চাইবো। আল্লাহ তুমি তাকে শহীদ হিসেবে কবুল কর।" এই কথাগুলো বলেই তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। সন্তানের লাশ কাঁধে নেয়ার যে ভার কত বেদনাদায়ক তা শুধু সন্তানহারা পিতাই বুঝতে পারেন। শহীদের মায়ের সাথে কথা বলতে চাইলে তিনি কিছুই বলতে পারেন না, শুধু অব্যক্ত কথাগুলো চোখের পানি হয়ে গড়িয়ে পড়ে।
৫. শহীদের স্ত্রীর প্রতিক্রিয়া
প্রায়ই সে মিছিলে যেতো, আমাকে জানাতো না। আমি এ নিয়ে তার সাথে ঝগড়া করতাম। শেষ যেদিন সে মিছিলে গিয়ে শহীদ হলো, সেদিন আমি তার সব জামা কাপড় লকারে ঢুকিয়ে লকারের চাবি লুকিয়ে রাখি। সে আমার অলক্ষে লকারের চাবি খুঁজে পেয়ে যায় এবং গোপনে জামা কাপড় বের করে নেয়। যাওয়ার সময় বলে যায় বোনের বাড়ি যাচ্ছি, সত্যিই মিছিলের পথেই ছিলো বোনের বাড়ি। গুলিতে আক্রান্ত অবস্থায় আমাকে মোবাইলে এটুকু বলে-আমি মিছিলে এসেছি..."। সাঈদী সাহেবের রায়ের পূর্বে সে আমাকে প্রায় বলতো, আমি শহীদ হবো। কিন্তু আমি বলতাম তুমি শহীদ হলে তোমার স্ত্রী, সন্তানদের কী হবে? ও শুধুই বলতো, ওদের অভিভাবক হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট নয় কি? সে প্রায় বলতো, "সাঈদীর ফাঁসির রায় হলে আমি মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে সবাইকে এই মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানাবো"। মাঝে মাঝে সে বলতো, "আমি তোমার সকল মোহরানা পরিশোধ করতে পারিনি, আমাকে তোমার মোহরানা মাফ করে দিও, আমি যে শহীদ হয়ে যাবো। চলে যাব পৃথিবীর ওপারে। কষ্ট নিও না কখনো। ক্ষমা রেখো শুধু আমার পথে। শহীদের স্ত্রী আল্লাহর কাছে তার স্বামীর জন্য শহীদি মর্যাদা এবং জান্নাত কামনা করেন। সন্তান সন্ততির লালন পালনের জন্য অল্লাহর উপর ভরসা করে আছেন এই শহীদ পরিবার।
৬. শহীদের কলম থেকে
সাড়ে পাঁচ বছর বয়সী মোঃ লোকমান হোসেন এবং চার বছর বয়সী মোঃ তামিম ইকবাল এর প্রিয় মানুষটি আর কখনো সোনামনি বলে তাদের আদর করবে না। শাহাদাতের পূর্বে ডায়েরিতে তিনি সন্তান দুটিকে আল্লাহর হাতে সোপর্দ করার কথা লিখে যান।
সন্তানদের প্রতি শহীদের লেখা চিঠির হুবুহু উদ্ধৃতি, "স্নেহের খুকামনি সুরাই ও তামিম আমার বুক ভরা দোয়া ও আদর নিও। তোমাদেরকে পৃথিবীতে আমি কিছুই দিয়ে যাইতে পারি নাই শুধু তোমাদেরকে আল্লাহ তালার কাছে সোপর্দ করলাম। সুরাই কারও সাথে ঝগড়া বিবাদ করবে না, কারও সাথে খেলা করবে না, তোমরা দুইভাই এক সাথে থাকবে, এক সাথে খেলা করবে আর তোমাদের মায়ের কথা মতে চলবে আর দুষ্টামী করবে না, তোমাদের মায়ের পাশে পাশে থাকবে, তোমাদেরকে আবারও দোয়া ও আদর জানিয়ে তোমাদের সুখী জীবন ও দীর্ঘায়ু কামনা করে শেষ করলাম আর তোমাদের আব্বুকে ক্ষমা করে দিও।"
পিতামাতার প্রতি লেখা চিঠির উদ্ধৃতি, "মা বাবা আমার সালাম নিবেন। মা বাবা আমি তোমাদের মনে অনেক কষ্ট দিয়েছি, তোমাদের অনেক টাকা পয়সা নষ্ট করেছি, এবং মানসম্মান নষ্ট করেছি, আমাকে মাফ করে দিও আর বাবাকে বলছি আমার বৌ পোলা যাতে কোথাও না যায়, তাদের যাতে কষ্ট না হয়, তোমাদের আগে যদি আমি চলে যাই তাহলে আমার সন্তানরা বাপের সম্পত্তি পাবে না তাই বলছি তাদেরকে কষ্ট দিও না এবং আমি আবারও তোমাদের পা ধরে ক্ষমা চাই, আমাকে ক্ষমা করে দিও।"
৭. ব্যক্তিগত প্রোফাইল
নাম: শহীদ মোঃ আঃ রশিদ (০৭১)। পেশা: বিদেশে শ্রমিকের কাজ করতেন।
জন্ম তারিখ ও বয়স: ১৯৮৬ সাল, ২৭ বছর। আহত হওয়ার তারিখ: ২৮ ফেব্রুয়ারি'১৩।
আহতের ধরন ও পরবর্তী অবস্থা: বাম হাতে ও বাম উরুর উপরে গুলি করে। আহত হবার পর প্রায় ৫ ঘন্টা জীবিত ছিলেন।
শাহাদাতের তারিখ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, স্থান: কক্সবাজার সদর হাসপাতাল। দাফন করা হয়: পারিবারিক কবরস্থানে।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: সাতজোলাকাঠা, ডাকঘর: ইসলামাবাদ, উপজেলা: কক্সবাজার, জেলা: কক্সবাজার।
পিতা: হাজী মোঃ ইলিয়াস, পেশা: কৃষি, বয়স ৭৫ বছর।
মাতা: হাজেরা বেগম, ৭০ বছর, গৃহিণী।
বাড়ি-ঘর ও সম্পদের অবস্থা: নিজ জমির উপর একটি পাকা বসতবাড়ি। ১০ বিঘা কৃষিজমি
আছে। বিদেশ থেকে কৃত আয় দিয়ে সংসার চলতো।
স্ত্রী ও সন্তানদের বিবরণ: স্ত্রী-মরিয়ম পারভিন রোজি, ২৬ বছর, মাদ্রাসার শিক্ষিকা। ১ম ছেলে: মোঃ লোকমান হোসেন সুরাই ৬ বছর। ২য় ছেলে: তামীম ইকবাল, বয়স ৪ বছর।
ভাই- বোনের বিবরণ: মোঃ মমতাজ আহমেদ, কৃষি। নুরজাহান, বিবাহিত। গোলজারা বেগম, বিবাহিতা। হাফেজ মোঃ আলতাফ হোসন, সৌদি আরব প্রবাসী। আকতার হোসেন, সৌদি আরব প্রবাসী। নুরুন জিদা, বিবাহিতা। নুরুল আফছার, কৃষি। নুরবানু আক্তার, বিবাহিতা। নুরুল আমিন, সৌদি আরব প্রবাসী। মীর কাশেম, কৃষি। শামসুল আলম। লায়লা বেগম। শহীদ মোঃ আব্দুর রশিদ, সৌদি আরব যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍
🔍