হোম / আওয়ামী দুঃশাসনে শহীদ / শহীদ মোঃ আবদুল আজিজ
শহীদ মোঃ আবদুল আজিজ

শহীদ মোঃ আবদুল আজিজ

আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

শহীদ মোঃ আবদুল আজিজ কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলার ধুরংবাজার এলাকার এক দরিদ্র জেলে পরিবারের সন্তান। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে তিনি লবণ মাঠে দিনমজুরের কাজ করে পরিবারের হাল ধরেন এবং সততা ও শান্ত স্বভাবের জন্য এলাকায় পরিচিত ছিলেন। ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী আবদুল আজিজ অন্যায়ের প্রতিবাদে নীরবে সাহসী ছিলেন এবং ধর্মপ্রাণ মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিলেন।
২৯ অক্টোবর ২০১৩, ধুরং বাজারে হরতাল সমর্থনকারী মিছিলে অংশ নিয়ে পুলিশের গুলিতে গলার কণ্ঠনালী বিদীর্ণ হয়ে তিনি ঘটনাস্থলেই শাহাদাত বরণ করেন। অভাবী পরিবারের স্বপ্ন আর বিশ্বাসের প্রতীক হয়ে শহীদ আবদুল আজিজ আজও কুতুবদিয়ার মানুষের স্মৃতিতে ত্যাগ ও নির্ভীকতার এক জীবন্ত নাম।

🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ

শহীদ মোঃ আবদুল আজিজ
কক্সবাজার
৭
শহীদের পরিচিতি
শহীদ আব্দুল আজিজ, পিতা মুহাম্মদ আলমগীর, ছয় ভাই-বোনের মধ্যে তৃতীয়। তিনি কুতুবদিয়া উপজেলার, ধুরংবাজার হাজির পাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। জেলে পরিবার, সারা বছর আর্থিক সংকটে জীবন চলে। শহীদ আব্দুল আজীজ ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে আর পড়ালেখা করতে পারেনি। দিনমজুর হিসেবে লবনের মাঠে কাজ করে পরিবারকে সাহায্য করতো। পিতার মাছ ধরার (জেলে) আয় দিয়ে কোন মতে সংসার চলে।
যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে গেলেন
শহীদ মোঃ আব্দুল আজিজ ২৯/১০/২০১৩ তারিখে বাদ আছর নাস্তা করার জন্য বাজারে যায় এবং সেখানে হরতাল সমর্থনকারীরা মিছিল বের করলে তিনি মিছিলে যোগ দেন। মিছিল কিছু দূর অগ্রসর হলে পূর্ব থেকে অবস্থানরত পুলিশ কোন উসকানি ছাড়াই মিছিলকে লক্ষ্য করে গুলি করে। উক্ত গুলি শহীদ মোঃ আব্দুল আজিজের গলার কণ্ঠনালীর বাম দিকে ঢুকে ডান দিক দিয়ে বের হয়ে যায় এবং ঘটনাস্থলেই তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
ঘটনার সামগ্রিক বিবরণ
২৭.২৮ ও ২৯ অক্টোবর' ২০১৩ ১৮ দলীয় জোট ঘোষিত ৩ দিনের হরতালের শেষ দিন বিকাল আনুমানিক ৫টার দিকে ধুরং বাজারে হরতাল উত্তর সমাবেশ করার জন্যে শতশত লোক জমায়েত হয়। এ সময় ২টি মাইক বাধা হয়। স্থানীয় আওয়ামী সন্ত্রাসী মিজানের নেতৃত্বে কতিপয় আওয়ামী কর্মীরা পুলিশকে উস্কানী দিয়ে বাজারে নিয়ে আসে, পুলিশ এসে মাইক খুলে ফেলে, দায়িত্বশীলদের নেতৃত্বে জনগণ শান্ত থাকে। হঠাৎ সন্ত্রাসী মিজান সংঘাত সৃষ্টি করার জন্যে পুলিশকে লক্ষ্য করে ঢিল ছুড়ে এবং সংঘর্ষ শুরু হয়ে যায়।
আওয়ামী পুলিশ বাহিনী জনগণকে লক্ষ্য করে সরাসরি গুলি করে। এরপর আমজনতা পুলিশের বেপরোয়া গুলি বন্ধ করার জন্য অনুরোধ করলে পুলিশ তা অমান্য করে। অতঃপর লোকজন তা প্রতিহত করার জন্য ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে এবং এক পর্যায়ে পুলিশের গুলিতে ধুরং বাজারে মোঃ আব্দুল আজিজ শাহাদাত বরণ করেন।
উত্তর ধুরং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, কুতুবদিয়ার থানা আমীর জনাব শাহরিয়ার চৌধুরি জানান- আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন মুফাসসিরে কোরআন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত মামলার রায় প্রদানের পর পুরো এক সপ্তাহ অচল ছিল কক্সবাজার জেলার সাগরদ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়া। এই ঘটনার রেশ তখনও কাটেনি। এলাকার গণমানুষের মধ্যে এই রায়ের জন্য তখনও চাপা ক্ষোভ রয়ে গেছে। আঠারো দলীয় জোটের ডাকে ৬০ ঘন্টা
হরতালের শেষদিন ২৯ অক্টোবর ২০১৩ তারিখ রোজ মঙ্গলবার উত্তর ধুরং বাজারে জনসভার আয়োজন করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। জনসভা উপলক্ষ্যে লোক সমাগম বাড়তে থাকে। এ রকম পরিস্থিতিতে মাগরিবের নামাজের পর পুলিশ ও বিজিবির সদস্যরা জনসভা মঞ্চের আশেপাশে অবস্থান নেয়। তখন জনসভায় মাইক ব্যবহার নিয়ে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এ সময় ধুরং বাজারের দিক থেকে একটি বড় মিছিল এসে সমাবেশে যোগ দেয় এবং সমাবেশস্থলে প্রবেশ করে। তখন পুলিশ আশ-পাশের দোকানে আশ্রয় নেয়। এ সময় হঠাৎ করেই কোন রকম উসকানী ছাড়াই পুলিশ কনস্টেবল রাজিব গুলি করা শুরু করে। গুলির শুরুতেই লুটিয়ে পড়েন শহীদ ইসমাইল পারভেজ, আব্দুল আজিজ ও আবু বকর সিদ্দিক। এতে আহত হন আরো শতাধিক। আহতদের মধ্য থেকে ২ জন এখনও পঙ্গু। একজনের দাঁতের মাড়ি ছিঁড়ে গেছে, মাড়ির কোন হাড় নাই। আরেকজনের কাঁধে গুলি লেগে ডান হাত অবশ, আরেকজনের কিডনির ফিলামেন্ট ছিড়ে গেছে।
কুতুবদিয়ার একাধিক স্থানীয় ব্যবসায়ী, জামায়াত নেতা, ধুরুং বাজার কমিটির কর্মকর্তাসহ একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৮ দলের ডাকা ৬০ ঘণ্টার হরতালের শেষ দিন ২৯ অক্টোবর কুতুবদিয়া উপজেলা জামায়াত ও ছাত্রশিবির কর্মীরা কুতুবদিয়ার অজপাড়া গাঁ ধুরুং বাজারে সমাবেশের আয়োজন করেন। ওই সমাবেশের জন্য বাজারের মধ্যখানে মাইকও টানানো হয়। কিন্তু বিনা কারণে পুলিশ মাইক ছিনিয়ে নিয়ে তাদের গাড়িতে তুলে নেয়।
তাদের মতে, পুলিশের এই আচরণে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন জামায়াত-শিবির নেতাকর্মী ও স্থানীয় জনতা। ওই সময় পুলিশ নিজেদের রক্ষায় ধুরুং বাজার এলাকার সমাবেশস্থলের কাছে একটি চায়ের দোকান ও কসমেটিকসের দোকানে ঢুকে পড়ে। সেখানে বিক্ষুব্ধ জনতা পুলিশকে লক্ষ করে ইট-পাটকেল ছোড়ে। জবাবে পুলিশ টিয়ারশেল, রাবার বুলেট না ছুড়ে জনতার উদ্দেশে শুরুতেই গুলি চালায়। 'বৃষ্টির মতো গুলি'র কবল থেকে কোনোমতে বাজারের লোকজন, জামায়াত-শিবির কর্মীরা পালিয়ে রক্ষা পেলেও নিরীহ ৩ বৃদ্ধ ও তরুণ মারা যান।
একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, পরে ওসির নেতৃত্বে অতিরিক্ত পুলিশ এসে আরেক দফায় কয়েকশ' রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে। বিদ্যুৎবিহীন এলাকা কুতুবদিয়ার ধুরুং বাজারে সমবেত সাধারণ মানুষ ও জামায়াত-শিবির কর্মীরা দিগ্বিদিক ছুটতে শুরু করেন। ওই সময় অনেকেই আহত হন। পুলিশের গুলিতে আহত হন অন্তত ২৫ জনের বেশি মানুষ।

শহীদের আপনজনদের কথা
শহীদ মোঃ আব্দুল আজিজ একজন শান্ত স্বভাবের ছেলে ছিলেন। তিনি আল্লামা দেলোয়ার হোসাঈন সাঈদীর এক জন ভক্ত ছিলেন। তিনি সব সময় বলতেন বাবাকে অবসর দিয়ে তিনি নিজে সংসার চালাবেন এবং চাচাদের চাইতে বড় করে ঘর তুলবেন। এছাড়া তিনি সব সময় বাড়ির সবাইকে নামায পড়ার তাগিদ দিতেন। শহীদ আবদুল আজিজের ভাই মোঃ ইউনুস বলেন- আমার বয়স যখন ১৭/১৮ তখন আমরা তিন ভাই লবণ
শ্রমিক হিসেবে কাজ করে আয় ইনকাম করতাম। আমাদের সংসার মোটামুটি ভালই চলছিল। ঘটনার দিন আমরা কক্সবাজার ছিলাম। ফোন পেয়ে বাড়িতে এসে দেখি আমার ভাই শহীদ হয়ে গেছেন। ভাইকে এলাকার সবাই ভালোবাসতো। ভাই বলতেন, ধর্মের জন্য দরকার হলে প্রাণ দিয়ে দেবো। সাঈদীর কিছু হলে আমাদের বেঁচে থেকে কী লাভ।
শহীদ আবদুল আজিজের বড় ভাই মোঃ খোকন বেঁচে নেই। দ্বিতীয় ভাই মোঃ মুবিনের বয়স ৩১ বছর। পেশাগতভাবে তিনি অটো চালিয়ে সংসার নির্বাহ করেন। দুই মেয়ে নিয়ে তাঁর সংসার। তৃতীয় ভাই মো. ইউনুসের বয়স চব্বিশ বছর। দিন মজুর হিসেবে কাজ করেন। এখনও অবিবাহিত। পরিবারের চতুর্থ সন্তান শহীদ আব্দুল আজিজ। পঞ্চম সন্তান মোঃ ইলিয়াসের বয়স সতের বছর। তিনি এইচএসসিতে পড়ালেখা করছেন। ষষ্ঠ সন্তান শহিদ আবদুল আজিজের একমাত্র বোন তামজিয়ার বয়স চৌদ্দ বছর। পড়ছেন ক্লাস নাইনে এবং পরিবারের সর্বশেষ সন্তান মোঃ আসিফের বয়স দশ বছর। তিনি পড়ছেন চতুর্থ শ্রেণিতে।

গণমাধ্যমে কুতুবদিয়ার ঘটনা
কক্সবাজারের সাগরদ্বীপ কুতুবদিয়ার এই ঘটনা দেশের প্রতিটি জাতীয়, আঞ্চলিক প্রিন্ট ও অনলাইন মিডিয়ায় শুরুত্বের সাথে প্রচারিত হয়।
দৈনিক আমার দেশ-এর সংবাদে বলা হয়- নিহত মোহাম্মম্মদ আজিজুর রহমানের বাবা মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, 'আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই, একই সঙ্গে আমার নিরীহ ছেলেকে হত্যার পর কেন কাটা-ছেঁড়া করা হয়েছে তার বিচারও চাই।'
তিনি সাংবাদিকদের কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, 'আমার ছেলে মারা যাওয়ার পর কাটাছেড়া না করার জন্য এসপি, ডিসি, ওসিসহ অনেকের হাতে-পায়ে ধরেছি, কেউ আমার কান্না শোনেনি।'
ছেলের দলীয় পরিচয় সম্পর্কে আলমগীর বলেন, 'আজিজ প্রকাশ্যে কোনো দল করত না, তবে ছোটবেলা থেকেই আল্লামা সাঈদীর ভক্ত ছিল।'
তিনি বলেন, 'ঘটনার দিন বাজারে গেলে পুলিশ গুলি করে আমার ছেলেকে মেরে ফেলেছে। আমি ছেলে হত্যার সুষ্ঠু বিচার দাবি করছি।"
সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন জেলে মোহাম্মদ আলমগীর।
এলাকাবাসীর প্রতিক্রিয়া
নিহত আজিজের শিক্ষক বদিউল আলম কুতুবদিয়া সফরকারী সাংবাদিকদের জানান, নিহত তিনজনই এই এলাকার নিরীহ লোক। কোনো দলের সঙ্গেও তাদের সম্পর্ক নেই।
তিনি জানান, তার খুবই আদরের ছাত্র ছিল আজিজ। ছাত্রজীবন থেকে বেশি সাঈদীভক্ত ছিল সে। প্রায় সময় তার পকেটে সাঈদীর ক্যাসেট থাকত।
তিনি দাবি করেন, 'আজিজ অনেকবার আমাকে বলেছে, স্যার, সাঈদীর আগে যেন আমার মৃত্যু হয়।' সৃষ্টিকর্তা আজিজের স্বপ্ন পূরণ করেছেন বলে বিশ্বাস করেন মাস্টার বদিউল আলম।


এক নজরে শহীদ আবদুল আজিজ
নাম: আবদুল আজিজ
পিতার নাম: মো. আলমগীর
পিতার পোশা: শ্রমিক
মাতার নাম: রহিমা বেগম
মাতার পেশা: গৃহিণী
স্থায়ী ঠিকানা: বাবুলের বাপের বাড়ি, কাজির পাড়া, লেমশীখালী ১নং ওয়ার্ড ধুরং বাজার, কুতুবদিয়া, কক্সবাজার-৪৭২০,
সাংগঠনিক মান: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক
সর্বশেষ লেখা পড়া: ৫ম শ্রেণি
শহীদ হওয়ার স্থান: ধুরং বাজার
আঘাতের ধরন: গুলি
যাদের আঘাতে শহীদ: পুলিশ
শাহাদাতের তারিখ: ২৯ অক্টোবর ২০১৩

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍