হোম / আওয়ামী দুঃশাসনে শহীদ / শহীদ মোঃ নাঈম উদ্দিন মুরাদ
শহীদ মোঃ নাঈম উদ্দিন মুরাদ

শহীদ মোঃ নাঈম উদ্দিন মুরাদ

আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

ঘাড়ে গুলি লাগার কারণে দীর্ঘ সাত বছর প্যারালাইজড থাকার পর শাহাদাত বরণ করেন

🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ

শহীদ মোঃ নাঈম উদ্দিন মুরাদ কুমিল্লা

শহীদের পরিচিতি শহীদ মোঃ নাঈম উদ্দিন মুরাদ কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার বাতিসা ইউনিয়নের লুদিয়ারা গ্রামে ১৯৯০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মৃত মোঃ মুকবুল আহমেদ ও মাতা ছালেহা বেগম। তিনি ছিলেন ৬ ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট। খুব ছোটবেলা তার বাবা তাদেরকে রেখে সুদূর পাকিস্তানে চলে যাওয়ার পর আর ফিরে আসেননি। অনেকদিন হওয়ায় পরিবার ধরে নিয়েছে তিনি সেখানেই মারা গেছেন। তার মা সেই ছোট বেলা থেকে অনেক কষ্ট করে সকল ভাই-বোনকে বড় করেছেন। অভাবের কারণে তিনি তার সন্তানদের ঠিক মতো পড়াশুনা করাতে পারেননি। যদিও শহীদ নাঈম উদ্দিন মুরাদ দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করেছেন। তিনি কর্মজীবনে চৌদ্দগ্রাম বাজারে একটি মোবাইল দোকানের কর্মচারী ছিলেন।

যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে যান মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের নামে প্রহসন বন্ধ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ফরমায়েশী দণ্ডাদেশ বাতিলের দাবিতে এবং সরকারের জুলুম-নির্যাতন, হত্যা-সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের প্রতিবাদে, শীর্ষ নেতাদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ সোমবার দেশব্যাপী হরতালের ডাক দেয় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। হরতাল চলাকালে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা চৌদ্দগ্রামের আমজাদের বাজার সংলগ্ন কালিকসার রাস্তার মাথায় তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এক পর্যায়ে পুলিশ এসে লাঠিপেটা করলে আন্দোলনকারীরা পিকেটিং থেকে সরে যায়। পুলিশের তাড়া খেয়ে আন্দোলনকারীরা গ্রামের ভিতরের দিকে চলে যেতে থাকে ঠিক তখন পিছন থেকে চৌদ্দগ্রাম থানার এস আই নুরুল আলম আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি করতে থাকে। এতে শহীদ নাঈম উদ্দিন মুরাদসহ তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়। এদের মধ্যে থেকে দুইজনকে পুলিশ গুলিবিদ্ধ অবস্থায় টেনে হিঁচড়ে গাড়িতে তুলে প্রথমে চৌদ্দগ্রাম সরকারী হাসপাতালে নেয়। সেখানে ভর্তি না করলে পরে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজে নেয়ার পথে শহীদ নাঈম উদ্দিন মুরাদের সাথে থাকা শহীদ ইব্রাহিম খলিল শাহাদাত বরণ করেন এবং শহীদ নাঈম উদ্দিন মুরাদকে ওখানে ভর্তি করানো হয়। তার বিরুদ্ধে পুলিশ মামলা দিয়ে পুলিশ পাহারায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নিয়ে চিকিৎসা দেয়। যার কারণে তার সঠিক চিকিৎসা না হওয়ায় চিরতরে পঙ্গু হয়ে যায়। দুইমাস পুলিশ পাহারায় থাকার পর আদালত জামিন দিলে তাকে সাভার সিআরপিতে দুই বছর চিকিৎসা দেয়া হয়। কিন্তু তার অবস্থার কোন উন্নতি হয়নি। তিনি আহত হওয়ার পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কোনদিন দাঁড়াতে পারেননি। ধীরে ধীরে তাঁর সমস্ত শরীর শুকাইতে থাকে এবং পচন ধরে যায়। সাত বছরের অধিকাংশ সময় তিনি কুমিল্লার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। মৃত্যুর এক সপ্তাহ আগে তাঁর একটি পা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অবশেষে ২০২০ সালের ৯ মে দিবাগত রাত ২টা ২০ মিনিটের সময় তিনি শাহাদাত বরণ করেন। ১০ মে ২০২০ ইং সকাল ১০ ঘটিকায় লুদিয়ারা প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে তার জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। তাঁর জানাযায় ইমামতি করেন বসন্তপুর ফাজিল মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ সেলিম। পরে নিজ গ্রামের হাজি বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ ১৮ ফেব্রুয়ারি ’১৩ সোমবার দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা সর্বাত্মক হরতালের ডাক দেয় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। কেন্দ্রীয় কর্মসূচীর অংশ হিসেবে কক্সবাজারে চারজন হত্যা ও শীর্ষ নেতৃবৃন্দের মুক্তির দাবিতে কুমিল্লা মহানগরসহ বিভিন্ন উপজেলায় শান্তিপূর্ণ হরতাল পালন করে জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবির। কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রামের আমজাদের বাজারের পাশে কালিকসার রাস্তার মাথায় জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পুলিশ এসে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। আন্দোলনকারীরা সরে যাওয়ার সময় পুলিশ পিছন থেকে গুলি করলে ইব্রাহিম খলিল শাহাদাত বরণ করেন। এ ব্যাপারে বিস্তারিত খবর আসে পরের দিনের দৈনিক সমূহে। ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ দৈনিক সংগ্রাম নিম্নোক্ত রিপোর্ট করে- কুমিল্লায় পুলিশের গুলিতে ১ জামায়াত কর্মী নিহত

গতকাল সোমবার জামায়াতে ইসলামীর ডাকা সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালিত। চিত্রে (১) কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে পুলিশের গুলিতে নিহত জামায়াত কর্মী ইব্রাহিমের স্বজনদের আহাজারি উপরে। নিচে নিহত ইব্রাহিম ও আহত অপর দুই জামায়াত কর্মী মুরাদ ও এনায়েত শয্যাশায়ী (২) রাজধানীর ব্যস্ততম সড়ক ফার্মগেটের দৃশ্য (৩) ছাত্রশূন্য ভিকারুন্নেসা স্কুলে ক্লাস নেন শিক্ষক-সংগ্রাম

কুমিল্লা অফিস ও চৌদ্দগ্রাম সংবাদদাতা: কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে কক্সবাজারে ৪ জন হত্যা ও শীর্ষ নেতৃবৃন্দের মুক্তির দাবিতে কুমিল্লা মহানগরসহ বিভিন্ন উপজেলায় শান্তিপূর্ণ হরতাল পালন করে জামায়াত ও শিবির। কুমিল্লা চৌদ্দগ্রামে হরতাল পালনকালে পুলিশের সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষে পুলিশের গুলিতে ইব্রাহিম (২৩) নামে এক জামায়াতকর্মী নিহত হয়েছেন। গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন আরো ১০ জন। তাদের মধ্যে গুরুতর আহত জামায়াত কর্মী মুরাদকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক বিধায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করেন কর্তব্যরত ডাক্তার। আহত মুরাদকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পুলিশ অমানুষিকভাবে তার ক্ষতস্থানে আঘাত করতে থাকে। নিহত ইব্রাহিমের বাড়ি চৌদ্দগ্রাম উপজেলার আনন্দপুর গ্রামে। গতকাল সোমবার সকাল ১০টায় চৌদ্দগ্রামের বাতিসা ইউনিয়নের আমজাদ বাজার এলাকায় এ সংঘর্ষ হয়। গুলিবিদ্ধ অন্যরা হলেন- শিবিকর্মী মোজাম্মেল ও জীবন। এদিকে চৌদ্দগ্রাম ও চিওড়া থেকে ৫ জন এবং নগরীর শাসনগাছা, লাকসাম রোড ও সদর থেকে মোট ৬ জনসহ এ পর্যন্ত ১১ জনকে আটক করেছে পুলিশ। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, সকাল সাড়ে ১০টায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের আমজাদের বাজার এলাকায় হরতালের সমর্থনে জামায়াত ও ইসলামী ছাত্রশিবির মিছিল বের করলে পুলিশ মিছিলে বাধা দেয়। এ সময় দু’পক্ষের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। পুলিশ মিছিলটি ছত্রভঙ্গ করতে গুলি চালালে ১০ জন গুলিবিদ্ধ হয়। পরে ১ জামায়াতকর্মী নিহত হয়। জামায়াতকর্মী ইব্রাহিমের নিহতের খবরে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মহাসড়কের চৌদ্দগ্রাম অংশে বিপুল পরিমাণ পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। নগরীর টমছমব্রিজ, শাসনগাছা, চকবাজার, জাঙ্গালিয়া, পদুয়ারবাজার এলাকায় সকাল থেকেই খন্ড খন্ড মিছিল করেছে জামায়াত-শিবিরকর্মীরা। এছাড়াও কুমিল্লা সিলেট সড়কের দেবিদ্বার ও ভিরাল্লায় পিকেটিংয়ের খবর পাওয়া গেছে। মহানগরের প্রায় সব শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান দোকান-পাট বন্ধ রাখা হয়েছে। মহানগরীর বাস টার্মিনালগুলো থেকে বন্ধ রয়েছে বাস চলাচল। মহাসড়কে রাতে আটকে পড়া ট্রাকগুলো থেমে থেমে চলাচল করেছে। এদিকে কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ পূর্ব শাখা জামায়াত-শিবির সর্বাত্মক হরতাল পালন করেছে। উপজেলার বিভিন্ন স্থানের সমর্থনকারী অবস্থান নেয়ার চেষ্টা করে। জানা যায়, উপজেলার বিপুলাসারে পিকেটাররা অবস্থান নেয়। সেখানে তারা গাছ ফেলে, টায়ার জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করে রাখে। হরতাল চলাকালে পিকেটাররা প্রায় ৫০টি দূরপাল্লার যান আটক করে রাখে এবং ব্যাপক ভাংচুর করে। খবর পেয়ে, মনোহরগঞ্জ থানা পুলিশ সেখানে গেলে পিকেটারদের সাথে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এক পর্যায়ে জামায়াত-শিবিরের তোপের মুখে পুলিশ না টিকতে পেরে পিছু হঠতে বাধ্য হয়।

শহীদের আপনজনের কথা মায়ের কথা: আমার ছেলে ছোটবেলা থেকে সহজ সরল জীবন যাপন করতো। কোনদিন কারো সাথে খারাপ ব্যবহার করতে আমি দেখিনি। সব সময় সমাজে সবার সাথে মিলেমিশে চলতো। শুধুমাত্র ইসলামী আন্দোলন করার কারণে পুলিশ আমার ছেলেকে হত্যা করেছে। আমি আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই।

শহীদের ভাই: শহীদ নাঈম উদ্দিন মুরা আমাদের সকলের ছোট ছিলো। তাকে অন্যায়ভাবে প্রশাসন গুলি করেছে। দীর্ঘ সাত বছর শরীরের বুলেট নিয়ে পঙ্গু অবস্থায় ২০২০ সালের ০৯ মে শাহাদাত বরণ করে। আমি আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানাই- যারা আমার ভাইকে অন্যায়ভাবে হত্যা করেছে আল্লাহ যেন তাদের বিচার করেন।

এক নজরে শহীদ মোঃ নাঈম উদ্দিন মুরাদ
শহীদের নাম : মোঃ নাঈম উদ্দিন মুরাদ
পিতার নাম : মৃত মুকবুল আহমেদ
মাতার নাম : ছালেহা বেগম।
বয়স- ৬০, পেশা- গৃহিণী
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম- লুদিয়ারা, ডাকঘর- পাতড্ডা বাজার থানা- চৌদ্দগ্রাম, জেলা- কুমিল্লা
আহত হওয়ার তারিখ : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, সকাল ১১ টাকা
আহতের ধরন ও পরবর্তী অবস্থা : ঘাড়ে গুলি লাগার কারণে দীর্ঘ সাত বছর প্যারালাইজড থাকার পর শাহাদাত বরণ করেন।
শাহাদাতের তারিখ ও সময় : ৯ মে ২০২০, দিবাগত রাত ২টা ২০ মিনিট।
ভাই-বোন : তিনভাই দুই বোন

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍