হোম / আওয়ামী দুঃশাসনে শহীদ / শহীদ হাফেজ মোহাম্মদ নাজমুস শাহাদাত রুবেল
শহীদ হাফেজ মোহাম্মদ নাজমুস শাহাদাত রুবেল

শহীদ হাফেজ মোহাম্মদ নাজমুস শাহাদাত রুবেল

আওয়ামী দুঃশাসনের বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী শহীদ

📝 সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

কপালে গুলিবিদ্ধ হন শাহাদাতের তারিখ ও সময় : ৫ জানুয়ারি ২০১৪, হাসপাতালে নেয়ার পথে

🩸 শাহাদাতের ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণ

শহীদ হাফেজ মোহাম্মদ নাজমুস শাহাদাত রুবেল

শহীদ হাফেজ মোহাম্মদ নাজমুস শাহাদাত (রুবেল) ছিলেন দরিদ্র পরিবারের এক অসাধারণ মেধাবী সন্তান। তাঁর কথা উঠলেই এলাকার লোকেরা বলেন, ‘আল্লাহ একটা প্রদীপ দিছিলো, আবার নিয়ে গেল।’ জন্ম: ১৫ মার্চ ১৯৯২, শাহাদাতবরণ : ৫ জানুয়ারি ২০১৪

শহীদের পরিচিতি চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ থানাধীন ১৬নং রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের চরমান্দারী গ্রাম। ওই গ্রামের ভোলা গাজী ব্যাপারী বাড়ির সন্তান শহীদ হাফেজ মোহাম্মদ নাজমুস শাহাদাত রুবেল। শহীদের মরহুম পিতা রশিদ উল্লাহ ছিলেন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার। শৈশবে পিতাকে হারান শহীদ রুবেল। বিধবা মা ফিরোজা আক্তার অনেক দুঃখ-কষ্ট ও দারিদ্র্যের মধ্যেও সন্তানদের মানুষ করার আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালান। শহীদ রুবেল স্থানীয় কাওনিয়া শামসুল হক ভূঁইয়া হাফেজিয়া মাদ্রাসা থেকে পবিত্র কোরআনে হাফেজ হন। এরপর ঢাকায় কয়েকটি কওমী মাদরাসায় দুই বছর অধ্যয়ন করে গ্রামে ফিরে যান। ভর্তি হন রায়পুর আলিয়া মাদরাসায়। শহীদের পিতা তাঁর প্রথম স্ত্রীর ইন্তেকালের পর শহীদের মা ফিরোজা আক্তারকে বিয়ে করেন। শহীদের পিতার প্রথম সংসারে চার ছেলে এক মেয়ে, দ্বিতীয় সংসারে দুই ছেলে। সবার ছোট ছিলেন শহীদ হাফেজ নাজমুস শাহাদাত (রুবেল)।

কেমন ছিলেন শহীদ রুবেল তিনি ছিলেন অসাধারণ মেধাবী একজন ছাত্র। যা পড়তেন, তাই তার অন্তরে গেঁথে যেত, মুখস্থ হয়ে যেত। তাঁর পিতা ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ সমাজসেবক। পরোপকারে তাঁর খ্যাতি ছিলো। এলাকার মেম্বার ছিলেন, নিজের জন্য কিছু করেননি। মানুষের জন্য করেছেন। তাঁর ইন্তেকালের পর শহীদ রুবেলের পরিবারের সদস্যদের জন্য ঘর-ভিটা ছাড়া আর কিছুই ছিলো না। শহীদের মা তাঁর দুই সন্তানকে অতিকষ্টে মানুষ করার চেষ্টা করেন। শহীদ নাজমুস শাহাদাত হাফেজ হওয়ার পর থেকে নিজেই উপার্জন করা শুরু করেন। বিভিন্ন জায়গায় ছাত্র পড়ানোর মাধ্যমে তিনি উপার্জন করতেন, হাদিয়া পেতেন। এই অর্থ দিয়ে তিনি নিজের খরচ চালাতেন, মাকেও সহযোগিতা করতেন। অসাধারণ মেধাবী হওয়ায় তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকেও বিশেষ সুবিধা পেতেন। এলাকাবাসীর কাছে তিনি একটি প্রদীপের মতো ছিলেন। সবার সাথেই ছিলো তাঁর মধুর সম্পর্ক। ছোট-বড় সবাইকে তিনি আপন করে নিতেন। সবার খোঁজ-খবর রাখতেন। প্রাণ উজাড় করে তিনি মায়ের সেবা করতেন। শহীদের মা ফিরোজা আক্তার একদিন বাড়িতে কাজ করতে করতে কারো সাথে আলাপ করছিলেন, আজ ছেলে শহীদ রুবেল বাড়িতে আসলে এক কেজি কলিজা কিনে আনতে বলবেন। এর কিছুক্ষণ পরই এক কসাই এসে শহীদ রুবেলের মায়ের হাতে দুই কেজি কলিজা দিয়ে যায়। রাতে শহীদ রুবেল ঘরে ফিরলে মা জানতে চান কলিজার ব্যাপারটা। শহীদ রুবেল মাকে বলেন, ‘ফারুক ভাইকে বলছিলাম এক কেজি কলিজা দিতে। আইচ্ছা ঠিক আছে। দুই কেজি দিছে তো, আমিও টাকা ভাংগি ভাংগি দিবো। আপ্নে কতা কইয়েন না। আপ্নেরে কইছি খাইতে, আপ্নে খান।” শহীদ রুবেলের মা জানান, বাড়িতে কাপড় শুকানোর যে বাঁশ বাঁধা থাকে উঠানে। ওই বাঁশে কারো কাপড় থাকলে রুবেল সেগুলো সরাতো না। নিজের লুঙ্গির উপর গামছা, তাঁর উপর গেঞ্জি শুকাতে দিতো। কিন্তু কোনোদিন কারো কিছু সরাতো না। এ বিষয়ে কিছু বললে, সে বলতো যেগুলো ঝুলানো আছে সেগুলো শুকিয়ে গেলে আমারগুলো মেলে দিবো। এমনই ছিলেন শহীদ হাফেজ মোহাম্মদ নাজমুস শাহাদাত রুবেল।

যেভাবে তিনি আল্লাহর ডাকে চলে যান ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ক্ষমতাসীন স্বৈরাচার সরকারের একতরফা নির্বাচনের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ জনতা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। জনতার সঙ্গে যোগ দেন শহীদ রুবেল। নিজ এলাকায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এম.পি নির্বাচিত হয়ে যাওয়ায় তিনি পার্শ্ববর্তী এলাকায় নির্বাচন প্রতিরোধে শামিল হন। বিক্ষুব্ধ জনতাকে দমন করতে সরাসরি গুলি চালায় পুলিশ। একটি বুলেট এসে বিদ্ধ হয় শহীদ রুবেলের কপালে। দ্রুত তাকে হাসপাতালে নেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। হাসপাতালে নেয়ার পথেই তিনি পান করেন শাহাদাতের অমিয় পেয়ালা।

সামগ্রিক ঘটনার বিবরণ জানা যায় একতরফা নির্বাচনের দিন শহীদ রুবেল বাড়ি থেকে তিন কিলোমিটার দূরে লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ থানাধীন মাছিমপুর হাই স্কুল কেন্দ্রে প্রতিরোধে সামিল হন। এ ব্যাপারে তিনি দায়িত্বশীলের নিকট অনুমতি চান। স্থানীয় দায়িত্বশীল তাকে এ ব্যাপারে অনুমতি দেননি। তিনি লক্ষীপুরের দায়িত্বশীলের অনুমতির জন্য কল করেন। কিন্তু লক্ষীপুরের দায়িত্বশীলকে ফোনে না পেয়ে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে ২০/২৫ জনের একটি দল নিয়ে মাছিমপুর কেন্দ্রে চলে যান। তিনি যথাসময়ে সেখানে হাজির হন। তাঁর চাচা আবদুল হাই বলেন, ‘সেদিন খুব সকালেই আমার সাথে ওর দেখা হয় বর্ডার বাজারে। আমি বললাম, কোনদিকে যাইস না। ও চলে গেল। কিছুক্ষণ পরেই আমরা শুনলাম ওর গুলি লাগার কথা।’ শহীদ রুবেল মাছিমপুর হাই স্কুল মাঠে পৌঁছ্লেই বিক্ষুব্ধ জনতার সঙ্গে যোগ দিয়ে অবৈধ নির্বাচন ঠেকানোর চেষ্টা চালান। এ সময় পুলিশের সঙ্গে বিক্ষুব্ধ জনতার সংঘর্ষ শুরু হয়। পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালাতে থাকে। এক পর্যায়ে পুলিশের গুলি এসে লাগে শহীদ রুবেলের কপালে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। রায়পুর হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এম্বুলেন্সে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ চলতে থাকে এবং মাথার একাংশ দিয়ে মগজ পড়তে থাকে। এম্বুলেন্স যখন চাঁদপুর পৌঁছায় তখনই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

শহীদের আপন জনদের কথা শহীদ মাতা ফিরোজা আক্তার বলেন আমি যা-ই খেতাম, সেটাই এনে হাজির করতো ছেলে। আমি কিছু বললেই বলতো, ‘আপ্নেরে কইছি কোন কতা কইতে না। কেবল খাইবেন। মৃত্যুর দুই দিন আগেও ইলিশ মাছ, রুই মাছ, তেলাপিয়া মাছ এনে ফ্রিজে রাখছে। এসব নিয়ে কিছু বললে, ছেলে সেই একই কথা বলতো, ‘মা আপ্নে কোন কতা কইয়েন না তো। আপ্নে শুধু খান।’ ফিরোজা আক্তার জানান, শহীদ হওয়ার আগে একটা মাদরাসায় ওর চাকরি হইছিলো। আমারে জানাইলো। ‘মা হুজুর কইছে সাত হাজার টাকা করে বেতন দিবো।’ আমি বললাম, নারে বাবা এখনই তোর চাকরিতে ঢুকার দরকার নাই। সামনে তোর দাখিল পরীক্ষা আগে পরীক্ষা দে। তারপর কোথাও ভর্তি হয়ে যা। আমার যত কষ্টই হোক তুই আগে পড়া শেষ কর। ছেলে বললো, ‘আর কত কষ্ট কইরবেন, আপ্নেরে আর কষ্ট কইরতে দিতাম ন।’ শহীদের মা বলেন, শহীদ হওয়ার পর একদিন স্বপ্নে দেখি পাশের বাড়ির একজন এসে আমাকে বলছে, ‘রুবেলের সাথে আইজ দেখা অইছে। ও কইলো, মা কিল্লাই কাঁদে। মারে কইয়েন কাঁদতে না। মা যদি কাঁদে হুজুরেরা বেজার অই যায়, যদি না কাঁদে হুজুরেরা খুশি থাকে।’ এরপর থেকে আর কাঁদি না ছেলের জন্য। আমার সোনার টুকরা ছেলে আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হয়ে গেছে। আমার আর দুঃখ নাই। চাচা আবদুল হাই বলেন, আমাকে খুব ভালোবাসতো রুবেল। যেখানেই থাকতো বাড়িতে এসেই আমার খবর নিতো। ওরে দেখলেই আমার ভালো লাগতো।

পারিবারিক অবস্থা শহীদের মা ফিরোজা আক্তার অসুস্থ। তাকে প্রতিদিনই বিভিন্ন ধরনের ওষুধ সেবন করতে হয়। আপন বড় ভাই ঢাকায় স্বল্প আয়ে ওষুধের হকারি করেন। তিনিও শারীরিকভাবে অসুস্থ। বড় ভাইয়ের একমাত্র কন্যা সন্তানটি প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়ে। সব মিলিয়ে পরিবারটি বর্তমানে আর্থিক সংকটে জর্জরিত। আর্থিক কারণে উপযুক্ত স্বাস্থ্যসেবা থেকেও বঞ্চিত।

ব্যক্তিগত তথ্য শাহাদাতের পূর্বে তিনি রায়পুর আলিয়া মাদ্রাসা থেকে দাখিল পরীক্ষার্থী ছিলেন। ছাত্র সংগঠনের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী ছিলেন।

ভাই-বোনদের বিবরণ বড় চার ভাই গ্রামে কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এক বোন গৃহিণী। আরেক বড় ভাই মাহবুবুর রহমান বিবাহিত। এক কন্যা সন্তানের পিতা তিনি। ঢাকায় হকারি করেন। প্রায়ই অসুস্থ থাকেন। তাঁর কন্যাটিও বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত।

গণমাধ্যমে শাহাদাতের খবর জানুয়ারী ৭, ২০১৪, মঙ্গলবার খবরতরঙ্গ পত্রিকায় প্রকাশিত “শিবিরকর্মী নিহতের প্রতিবাদে চাঁদপুর জেলা ছাত্রশিবিরের বিক্ষোভ মিছিল” শিরোনামে নিম্নোক্ত খবর প্রচারিত হয়- গত রোববার ভোটারবিহীন নির্বাচন বর্জনের দাবীতে নির্বাচন বিরোধী মিছিলে পুলিশের নির্বিচার গুলিতে ফরিদগঞ্জের শিবির কর্মী শহীদ নাজমুস শাহাদাত নিহত হওয়ার প্রতিবাদে শহীদের নিজ উপজেলা ফরিদগঞ্জে মঙ্গলবার বিক্ষোভ মিছিল করে চাঁদপুর জেলা ইসলামী ছাত্রশিবির। বিক্ষোভ মিছিলে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ছাত্রশিবিরের চাঁদপুর জেলা সভাপতি মোঃ নজরুল ইসলাম মারুফ। অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ছাত্রশিবিরের জেলা দপ্তর সম্পাদক ইমরান হোসাইন, শিক্ষা সম্পাদক মাহবুবুর রহমান, স্কুল কার্যক্রম সম্পাদক নাজিম উদ্দিন, ফরিদগঞ্জ পৌর জামায়াত সেক্রটারী আমিনুর রহমান, ছাত্রশিবিরের ফরিদগঞ্জ শহর সভাপতি হেলাল উদ্দিন, দক্ষিণ সভাপতি আবু হানিফ, পূর্ব সভাপতি নূর মোহাম্মদ প্রমুখ। মিছিল পরবর্তী সমাবেশে জেলা সভাপতি বলেন, একতরফা ভোটার বিহীন নির্বাচন বাধা দিতে গিয়ে স্বৈরাচার সরকারের পেটুয়া বাহিনী পুলিশের গুলিতে শাহাদাত বরণ করেন হাফেজ নাজমুস শাহাদাত রুবেল। সে ছিল খুবই মেধাবী ও ছাত্রশিবিরের একজন সক্রিয় কর্মী। জেলা সভাপতি এমন অমানবিক হত্যার তীব্র নিন্দা জানান এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। এছাড়াও জেলার হাজীগঞ্জ, কচুয়া, শাহরাস্তিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।

এক নজরে শহীদ হাফেজ মোহাম্মদ নাজমুস শাহাদাত রুবেল
শহীদের নাম : হাফেজ মোহাম্মদ নাজমুস শাহাদাত রুবেল
পিতার নাম : মরহুম রশিদ উল্লাহ
মাতার নাম : ফিরোজা আক্তার
জন্ম তারিখ : ১৫ মার্চ ১৯৯২
স্থায়ী ঠিকানা : ভোলা গাজী ব্যাপারীর বাড়ী, গ্রাম- চর মান্দারী ইউনিয়ন- রূপসা দক্ষিণ, থানা- ফরিদগঞ্জ, জেলা- চাঁদপুর
আহত হওয়ার তারিখ : ৫ জানুয়ারি ২০১৪, লক্ষীপুর জেলার রামগঞ্জ থানাধীন মাছিমপুর হাই স্কুল ভোট কেন্দ্রে
আহতের ধরণ ও পরবর্তী অবস্থা : কপালে গুলিবিদ্ধ হন শাহাদাতের তারিখ ও সময় : ৫ জানুয়ারি ২০১৪, হাসপাতালে নেয়ার পথে

📸 তথ্য ও স্মৃতি সম্বলিত আলোকচিত্র

Memory Image
🔍
Memory Image
🔍
Memory Image
🔍